ফাহাল ‘আছাইতুম ইন তাওয়াল্লাইতুম আন তুফছিদূফিল আরদি ওয়া তুকাত্তি‘ঊআরহামাকুম।উচ্চারণ
এখন তোমাদের থেকে এছাড়া অন্য কিছুর কি আশা করা যায় যে, তোমরা যদি ইসলাম থেকে ফিরে যাও ৩৩ তাহলে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং একে অপরের গলা কাটবে? ৩৪ তাফহীমুল কুরআন
অতঃপর তোমরা (জিহাদ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিলে কি তোমাদের দ্বারা ভূমিতে অশান্তি বিস্তার এবং রক্তের আত্মীয়তা ছিন্ন করার সম্ভাবনা আছে? #%১৪%#মুফতী তাকী উসমানী
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।মুজিবুর রহমান
ক্ষমতা লাভ করলে, সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্নীয়তা বন্ধন ছিন্ন করবে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তবে তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে?আল-বায়ান
ক্ষমতা পেলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে আর আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।তাইসিরুল
কিন্ত যদি তোমাদের শাসনভার দেওয়া যায় তাহলে তোমাদের থেকে তো আশা করা যাবে যে তোমরা অবশ্যই দেশে ফসাদ সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের রক্ত-সম্পর্ক ছিন্ন করবে।মাওলানা জহুরুল হক
৩৩
মূল কথাটি হলো إِنْ تَوَلَّيْتُمْ । এ বাক্যাংশের একটি অনুবাদ আমরা ওপরে করেছি। এর দ্বিতীয় অনুবাদ হচ্ছে, “যদি তোমরা মানুষের শাসক হয়ে যাও।”
৩৪
এ কথাটির একটি অর্থ হলো মুহাম্মাদ ﷺ এবং ঈমানদারগণ যে মহান সংস্কারমূলক বিপ্লবের জন্য চেষ্টা-সাধনা করেছেন এ সময় তোমরা যদি ইসলামের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে টালবাহানা করো এবং সে মহান সংস্কারমূলক বিপ্লবের জন্য প্রাণ ও সম্পদের বাজি ধরা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে শেষ পর্যন্ত তার পরিণাম এছাড়া আর কি হতে পারে যে, তোমরা আবার সেই জাহেলী জীবন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাবে যার ব্যবস্থাধীনে তোমরা শত শত বছর ধরে একে অপরের গলা কেটেছো, নিজেদের সন্তানদের পর্যন্ত জীবন্ত দাফন করেছো এবং আল্লাহর দুনিয়াকে জুলুম ও ফাসাদে ভরে তুলেছো। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমাদের জীবনাচার ও কর্মকাণ্ডের অবস্থা যখন এই যে, যে দ্বীনের প্রতি ঈমান পোষণের কথা তোমরা স্বীকার করেছিলে তার জন্য তোমাদের মধ্য কোন আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা নেই এবং তার জন্য কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার করতেও তোমরা প্রস্তুত নও। তাহলে এ নৈতিক অবস্থার মধ্যে আল্লাহ তা’আলা যদি তোমাদেরকে ক্ষমতা দান করেন এবং পার্থিব সব কাজ-কর্মের দায়-দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পিত হয় তাহলে জুলুম-ফাসাদ এবং ভ্রাতৃঘাতি কাজ ছাড়া তোমাদের থেকে আর কী আশা করা যেতে পারে?
এ আয়াতটি এ কথাও স্পষ্ট করে দেয় যে, আয়াত ইসলামে ‘আত্মীয়তার বন্ধন’ ছিন্ন করা হারাম। অপরদিকে ইতিবাচক পন্থায় কুরআন মজীদের কয়েকটি স্থানে আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম ব্যবহারের বড় নেকীর কাজ বলে গণ্য করা হয়েছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দেখুন, আল বাকারা, ৮৩; ১৭৭; আন নিসা, ৮-৩৬; আন নাহল, ৯০; বনী ইসরাঈল, ২৬ এবং আন নূর, ২২ আয়াত। رحم শব্দটি আরবী ভাষায় রূপক অর্থে নৈকট্য ও আত্মীয়তা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। কোন ব্যক্তির দূর ও নিকট সম্পর্কীয় সব আত্মীয়ই তার نوى الارحام তাদের যার সাথে যত নিকট আত্মীয়তার সম্পর্ক তার অধিকার তত বেশী এবং তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা তত বড় গোনাহ। অত্মীয়তা রক্ষা করার অর্থ হলো, আত্মীয়ের উপকার করার যতটুকু সামর্থ্য ব্যক্তির আছে, তা করতে দ্বিধা না করা। আর আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তির তার সাথে খারাপ ব্যবহার বা আচরণ করা, অথবা যে উপকার করা তার পক্ষে সম্ভব তা না করে পাশ কাটিয়ে চলা। হযরত উমর (রা.) এ আয়াত থেকে প্রমাণ প্রশ করে “উম্মে ওয়ালাদ” বা সন্তানদের মা ক্রীতদাসকে বিক্রি করা হারাম ঘোষণা করেছিলেন এবং সাহাবা কিরামের সবাই এতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছিলেন। হাকেম মুসতাদরিক গ্রন্থে হযরত বুরাইদা থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, একদিন তিনি হযরত উমরের (রা.) মজলিসে বসেছিলেন। হঠাৎ মহল্লার মধ্যে চেঁচামেচি শুরু হলো। জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে, এক ক্রীতদাসীকে বিক্রি করা হচ্ছে তাই তাঁর মেয়ে কাঁদছে। হযরত উমর (রা.) সে মুহূর্তেই আনসার ও মুহাজিরদের একত্র করে তাদের জিজ্ঞেস করলেন, হযরত মুহাম্মাদ ﷺ যে জীবন ব্যবস্থা দিয়েছেন তার মধ্যে আত্মীয়তা বা রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কোন বৈধতা কি আপনারা পেয়েছেন? সবাই জবাব দিলেন, ‘না’। হযরত উমর (রা.) বললেনঃ তাহলে এটা কেমন কথা যে, আপনাদের এ সমাজেই মাকে তার মেয়ে থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে? এর চেয়ে বড় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নের কাজ আর কী হতে পারে? তারপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন। সবাই বললো ত্রুটি রোধ করার জন্য আপনার মতে যে ব্যবস্থা উপযুক্ত মনে করেন তাই গ্রহণ করুন। সুতরাং হযরত উমর (রা.) গোটা ইসলামী অঞ্চলে এই সাধারণ নির্দেশ জারী করে দিলেন যে, যে দাসীর গর্ভে তার মালিকের ঔরসজাত সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে তাকে বিক্রি করা যাবে না। কারণ, এটা আত্মীয়তা বা রক্তের বন্ধন ছিন্ন করা। সুতরাং এ কাজ হালাল নয়।
জিহাদের এক উদ্দেশ্য হল দুনিয়ায় ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা এবং অনৈসলামিক শাসন দ্বারা যে অন্যায়-অনাচার বিস্তার লাভ করেছে তার অবসান ঘটানো। আল্লাহ তাআলা বলছেন, তোমরা জিহাদ থেকে বিমুখ হলে পৃথিবীতে ব্যাপক অশান্তি দেখা দেবে এবং আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করার পরিণামে চারদিকে অন্যায়-অনাচার বিস্তার লাভ করবে। তার একটা দিক এইও যে, আত্মীয়-স্বজনের হক পদদলিত করা হবে। [আয়াতটির অন্য অর্থ হতে পারে, ‘ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে কি তোমাদের দ্বারা ভূমিতে অশান্তি বিস্তার ও রক্তের আত্মীয়তা ছিন্ন করার সম্ভাবনা আছে?’ যেমনটা ক্ষমতার মদমত্তে বেসামাল লোকদের দ্বারা হয়ে থাকে। -অনুবাদক]
২২. সুতরাং অবাধ্য হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে সম্ভবত তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন(১) ছিন্ন করবে।
(১) أرْحِامٌ শব্দটি رِحْمٌ এর বহুবচন। এর অর্থ জননীর গর্ভাশয়। সাধারণ সম্পর্ক ও আত্মীয়তার ভিত্তি সেখান থেকেই সুচিত হয়, তাই বাকপদ্ধতিতে رِحْمٌ শব্দটি আত্মীয়তা ও সম্পর্কের অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইসলাম আত্মীয়তার হক আদায় করার জন্যে খুবই তাকীদ করেছে। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তা বজায় রাখবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে নৈকট্য দান করবেন এবং যে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ছিন্ন করবেন। (বুখারী: ৫৫২৯) আত্মীয় ও সম্পর্কশীলদের সাথে কথায়, কর্মে ও অর্থ ব্যয়ে সহৃদয় ব্যবহার করার জোর নির্দেশ আছে। অন্য এক হাদীসে আছে, আল্লাহ তা'আলা যেসব গোনাহের শাস্তি দুনিয়াতেও দেন এবং আখেরাতেও দেন, সেগুলোর মধ্যে নিপীড়ন ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার সমান কোন গোনাহ নেই। (ইবনে মাজাহঃ ৪২১১)
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ যে ব্যক্তি আয়ুবৃদ্ধি ও রুযী রোযগারে বরকত কামনা করে সে যেন আত্মীয়তার সাথে সহৃদয় ব্যবহার করে। (মুসনাদে আহমাদ ৫/২৭৯) সহীহ হাদীসসমূহে আরও বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার অধিকারের ক্ষেত্রে অপরপক্ষ থেকে সদ্ব্যবহার আশা করা উচিত নয়। যদি অপরপক্ষ সম্পর্ক ছিন্ন ও অসৌজন্যমূলক ব্যবহারও করে, তবুও তার সাথে তোমার সদ্ব্যবহার করা উচিত। এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ সে ব্যক্তি আত্মীয়ের সাথে সদ্ব্যবহারকারী নয় যে কোন প্রতিদানের সমান সদ্ব্যবহার করে; বরং সেই সদ্ব্যবহারকারী, যে অপরপক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখে। (বুখারী: ৫৫৩২)
(২২) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে(1) এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।
(1) একে অপরকে হত্যা করে। অর্থাৎ এখতিয়ার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করবে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) تَوَلَّيْتُمْ এর অর্থ করেছেন, ‘‘তোমরা জিহাদ থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও’’। অর্থাৎ, তোমরা পুনরায় সেই মূর্খতার যুগে ফিরে যাবে এবং পরস্পর খুনোখুনি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। আয়াতে সাধারণভাবে পৃথিবীতে ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি এবং বিশেষভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। আর পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হল, মৌখিকভাবে, কর্মের মাধ্যমে এবং মাল-ধন ব্যয় করার মাধ্যমে আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার কর। বহু হাদীসেও এ বিষয়ে বড়ই তাকীদ ও ফযীলতের কথা এসেছে। (ইবনে কাসীর)