কুল লিল্লাযীনা আ-মানূইয়াগফিরূলিল্লাযীনা লা-ইয়ারজূনা আইয়া-মাল্লা-হি লিইয়াজঝিয়া কাওমাম বিমা-ক-নূইয়াকছিবূন।উচ্চারণ
হে নবী, যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলে দাও, যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন কঠিন দিন আসার আশঙ্কা করে না ১৮ তাদের আচরণ সমূহ যেন ক্ষমা করে দেয় যাতে আল্লাহ নিজেই একটি গোষ্ঠীকে তাদের কৃতকর্মের বদলা দেন। ১৯ তাফহীমুল কুরআন
(হে রাসূল!) যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বল, যারা আল্লাহর দিনসমূহের ভয় রাখে না, তাদেরকে যেন ক্ষমা করে। এইজন্য যে, আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দান করবেন। মুফতী তাকী উসমানী
মু’মিনদেরকে বলঃ তারা যেন ক্ষমা করে তাদেরকে যারা আল্লাহর দিনগুলির প্রত্যাশা করেনা, এটা এ জন্য যে আল্লাহ প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তার কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিবেন।মুজিবুর রহমান
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে, যারা আল্লাহর সে দিনগুলো সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে না যাতে তিনি কোন সম্প্রদায়কে কৃতকর্মের প্রতিফল দেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
মু’মিনদেরকে বল, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এদেরকে, যারা আল্লাহ্ র দিবসগুলির প্রত্যাশা করে না। এটা এইজন্যে যে, আল্লাহ্ প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তার কৃতকর্মের জন্যে প্রতিদান দিবেন।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বল, ‘যারা আল্লাহর দিবসসমূহ প্রত্যাশা করে না, এরা যেন তাদের ক্ষমা করে দেয়, যাতে আল্লাহ প্রত্যেক কওমকে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন।আল-বায়ান
মু’মিনদেরকে বল ঐ লোকদেরকে ক্ষমা করতে যারা আল্লাহর ‘আযাবের দিন আসার ব্যাপারে কোন আশংকাবোধ করে না। কেননা আল্লাহই (ভাল বা মন্দ) প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের কৃতকর্ম অনুসারে প্রতিফল দিবেন।তাইসিরুল
যারা বিশ্বাস করে তাদের তুমি বলো যে তারা ক্ষমা করুক তাদের যারা আল্লাহ্র দিনগুলোর প্রত্যাশা করে না, এই জন্য যে তিনি লোকদের যেন প্রতিদান দিতে পারেন যা তারা অর্জন করছিল সেজন্য।মাওলানা জহুরুল হক
১৮
মূল আয়াতাংশ হচ্ছে لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ । এর শাব্দিক অনুবাদ হবে, “যেসব মানুষ আল্লাহর দিনসমূহের আশা রাখে না।” কিন্তু আরবী বাকরীতিতে এ রকম ক্ষেত্রে اَيَّام অর্থ শুধু দিন নয়, বরং এমন সব স্মরনীয় দিন যখন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়েছে। যেমন اَيَّامُ الْعَرَبْ শব্দ আরব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী এবং আরব গোত্রসমূহের এমন সব বড় বড় যুদ্ধ-বিগ্রহ বুঝানোর জন্য বলা হয় যা পরবর্তী বংশধররা শত শত বছর ধরে স্মরণ করে আসছে। এখানে اَيَّامُ الله অর্থ কোন জাতির জীবনের সর্বাধিক অকল্যাণকর দিন, যেদিন তাদের ওপর আল্লাহর গযব নেমে আসে এবং নিজ কৃতকর্মের পরিণামে তাদের ধ্বংস করে দেয়া হয়। এই অর্থ অনুসারে আমরা এই আয়াতাংশের অনুবাদ করেছি, ‘যারা আল্লাহর পক্ষে থেকে ভয়াবহ দিন আসারআশঙ্কা করে না। অর্থাৎ যাদের এ চিন্তা নেই যে, কখনো এমন দিনও আসতে পারে যখন আমাদের এসব কাজ-কর্মের ফলশ্রুতিতে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য নেমে আসবে। এই উদাসীনতাই তাদেরকে জুলুম-অত্যাচারের ব্যাপারে দুঃসাহস যুগিয়েছে।
১৯
মুফাসসিরগণ এ আয়াতের দু’টি অর্থ বর্ণনা করেছেন। আয়াতের শব্দাবলী থেকে এ দু’টি অর্থ গ্রহণেরই অবকাশ আছে। একটি অর্থ হচ্ছে, মু’মিনদেরকে এ জালেম গোষ্ঠীর অত্যাচার উপেক্ষা করতে হবে যাতে আল্লাহ তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে তাদের ধৈর্য ও মহানুভবতা এবং শিষ্টাচারের প্রতিদান দেন এবং তারা আল্লাহর পথে যে দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছে তার পুরস্কার দান করেন।
আরেকটি অর্থ হচ্ছে, মু’মিনগণ যেন, এই গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে যাতে আল্লাহ নিজেই তাদের অত্যাচারের প্রতিফল দান করেন।
কতিপয় মুফাসসির এ আয়াতকে ‘মনসূখ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলেনঃ যতদিন মুসলমানদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়নি ততদিন এ আদেশ বহাল ছিল। কিন্তু যুদ্ধের অনুমতি দেয়ার পর এ হুকুম ‘মনসূখ’ হয়ে গিয়েছে। তবে আয়াতের শব্দসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মনসুখ হওয়ার এ দাবী ঠিক নয়। ব্যক্তি যখন কারো জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম নয় তখন তাকে ক্ষমা করে দেয়া অর্থে এই ‘মাফ’ শব্দটি কখনো ব্যবহৃত হয় না। বরং এক্ষেত্রে ধৈর্য, সহ্য ও বরদাশত শব্দগুলো প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এ শব্দগুলো বাদ দিয়ে এখানে যখন ‘মাফ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তখন আপনা থেকেই তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঈমানদারগণ সেই সব লোকের জুলুম ও বাড়াবাড়ির জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকবে আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভীক হওয়া যাদেরকে নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের সীমালংঘনের দুঃসাহস যুগিয়েছে। যেসব আয়াতে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে তার সাথে এ নির্দেশের কোন অমিল বা বৈপরীত্য নেই। যুদ্ধের অনুমতি দানের প্রশ্নটি এমন অবস্থার সাথে সম্পর্কিত যখন কোন কাফের কওমের বিরুদ্ধে যথারীতি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মুসলিম সরকারের কাছে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে। আর ক্ষমার নির্দেশ এমন সাধারণ পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত যখন কোন না কোনভাবে মু’মিনদের সম্মুখীন হতে হয় আল্লাহর ভয়ে ভীত নয় এমন সব লোকদের এবং তারা তাদের বক্তব্য, লেখনী ও আচার-আচরণ দ্বারা মু’মিনদেরক নানাভাবে কষ্ট দেয়। এ নির্দেশের উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানরা যেন তাদের উচ্চতর আসন থেকে নেমে এসব হীন চরিত্র লোকদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের প্রতিটি অর্থহীন কাজের জবাব দিতে শুরু না করে। যতক্ষণ পর্যন্ত শিষ্টতা ও যৌক্তিতার সাহায্যে কোন অভিযোগ ও আপত্তির জবাব দেয়া কিংবা কোন জুলুমের প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। কিন্তু যখনই এ সীমা লংঘিত হবে তখনই সেখানেই ক্ষান্তি দিয়ে ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে। মুসলমানরা নিজেরাই যদি তাদের মোকাবিলায় ময়দানে নেমে পড়ে তাহলে আল্লাহ তাদের সাথে মোকাবিলার ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে তাদের আপন অবস্থার ওপর ছেড়ে দেবেন। কিন্তু তারা যদি ক্ষমা ও উপেক্ষার নীতি অনুসরণ করে তাহলে আল্লাহ নিজেই জালেমদের সাথে বুঝাপড়া করবেন এবং মজলুমদেরকে তাদের ধৈর্য ও মহানুভবতার পুরস্কার দান করবেন।
‘আল্লাহর দিনসমূহ’ দ্বারা আল্লাহ তাআলা যেসব দিনে মানুষকে তাদের কর্মের পুরস্কার বা শাস্তি দেন, সেইগুলোকে বোঝানো হয়েছে, তা দুনিয়ায় হোক বা আখেরাতে। বলা হচ্ছে যে, যারা এরূপ দিন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ চিন্তাহীন; বরং এরূপ দিনের আগমনকে অস্বীকার করে তাদেরকে ক্ষমা কর।
১৪. যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলুন, তারা যেন ক্ষমা করে ওদেরকে, যারা আল্লাহর দিনগুলোর প্রত্যাশা করে না। যাতে আল্লাহ প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন।
(১৪) বিশ্বাসীদের বল, তারা যেন ক্ষমা করে ওদেরকে; যারা আল্লাহর দিনগুলির আশা করে না।(1) যাতে আল্লাহ এক সম্প্রদায়কে তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেন। (2)
(1) অর্থাৎ, যারা এই ভয় রাখে না যে, আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের সাহায্য করার এবং তাঁর শত্রুদের ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখেন। উদ্দেশ্য হল কাফের ও অবিশ্বাসীরা। أيَّام الله (আল্লাহর দিনগুলি) বলতে ঘটনাঘটন (আযাব-শাস্তি ইত্যাদি) যেমন, {وَذَكِّرْهُمْ بأَيَّامِ اللهِ} (إبراهيم: ৫) আয়াতে রয়েছে। অর্থাৎ, সেই কাফেরদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর, যারা আল্লাহর আযাব এবং তাঁর পাকড়াও থেকে বেপরোয়া। এ নির্দেশ প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদেরকে দেওয়া হয়েছিল। পরে যখন তারা মোকাবেলা করার যোগ্য হয়ে গেল, তখন তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (জিহাদ) করার নির্দেশ দেওয়া হল।
(2) অর্থাৎ, যখন তোমরা তাদের দেওয়া যাবতীয় কষ্টে ধৈর্য ধারণ করবে এবং তাদের যুলুম-অত্যাচারকে ক্ষমা করবে, তখন এই সমস্ত পাপ তাদের ঘাড়ে থাকবে, যার শাস্তি কিয়ামতের দিন তাদেরকে দেওয়া হবে।