যা-লিকাল্লাযী ইয়ুবাশশিরুল্লা-হু ‘ইবা-দাহুল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি কুল লাআছআলুকুম ‘আলাইহি আজরন ইল্লাল মাওয়াদ্দাতা ফিল কুরবা- ওয়া মাইঁ ইয়াকতারিফ হাছানাতান নাঝিদ লাহূফীহা-হুছনান ইন্নাল্লা-হা গাফূরুন শাকূর।উচ্চারণ
এটাই সেই জিনিস যার সুসংবাদ আল্লাহ তাঁর সেই সব বান্দাদের দেন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে। হে নবী, এসব লোককে বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। ৪০ তবে আত্মীয়তার ভালবাসা অবশ্যই চাই। ৪১ যে কল্যাণ উপার্জন করবে আমি তার জন্য তার সেই কল্যাণের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দেব। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড় ক্ষমাশীল ও নেক কাজের মর্যাদাদাতা। ৪২ তাফহীমুল কুরআন
এরই সুসংবাদ আল্লাহ তার সেই সকল বান্দাকে দান করেন, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে। (হে রাসূল! কাফেরদেরকে) বলে দাও, আমি এর (অর্থাৎ তাবলীগের) বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না আত্মীয়ের সৌহার্দ্য ছাড়া। যে-কেউ সৎকর্ম করবে আমি তার জন্য সে সৎকর্মে অতিরিক্ত সৌন্দর্য বৃদ্ধি করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অত্যন্ত গুণগ্রাহী।মুফতী তাকী উসমানী
এই সুসংবাদই আল্লাহ দেন তাঁর বান্দাদেরকে যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে। বলঃ আমি এর বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আত্মীয়ের সৌহার্দ্য ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাইনা। যে উত্তম কাজ করে আমি তার জন্য এতে কল্যাণ বর্ধিত করি। আল্লাহ ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী।মুজিবুর রহমান
এরই সুসংবাদ দেন আল্লাহ তার সেসব বান্দাকে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে। বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্যে তোমাদের কাছে কেবল আত্নীয়তাজনিত সৌহার্দ চাই। যে কেউ উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্যে তাতে পুণ্য বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকারী, গুণগ্রাহী।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
এই সুসংবাদই আল্লাহ্ দেন তাঁর বান্দাদেরকে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। বল, ‘আমি এটার বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আত্মীয়ের সৌহার্দ্য ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাই না।’ যে উত্তম কাজ করে আমি তার জন্যে এতে কল্যাণ বর্ধিত করি। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
এটা তাই, যার সুসংবাদ আল্লাহ তার বান্দাদেরকে দেন- যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। বল, ‘আমি এর জন্য তোমাদের কাছে আত্মীয়তার সৌহার্দ ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না’। যে উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য তাতে কল্যাণ বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই গুণগ্রাহী।আল-বায়ান
এটা হল তাই আল্লাহ যার সুসংবাদ দিয়েছেন তাঁর সে সব বান্দাহদের জন্য যারা ঈমান আনে আর সৎ কাজ করে। বল, এ কাজের জন্য আত্মীয়তার ভালবাসা ছাড়া তোমাদের কাছে কিছুই চাই না। যে কেউ উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য তাতে পুণ্য বাড়িয়ে দেই। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, ভাল কাজের বড়ই মর্যাদাদানকারী।তাইসিরুল
এইটি যার সুসংবাদ আল্লাহ্ দিচ্ছেন তাঁর বান্দাদের -- যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করছে। তুমি বলো -- "আমি তোমাদের থেকে এর জন্যে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভালবাসা ব্যতীত অন্য কোনো প্রতিদান চাইছি না।" আর যে কেউ ভাল কাজ অর্জন করে আমরা তার জন্য এতে আরো ভাল যোগ দিই। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, গুণগ্রাহী।মাওলানা জহুরুল হক
৪০
‘এ কাজ’ অর্থ যে প্রচেষ্টার মাধ্যমে নবী ﷺ মানুষকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচানো এবং জান্নাতের সুসংবাদের উপযুক্ত বানানোর জন্য যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
৪১
মূল আয়াতের বাক্যাংশ হলো অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى র ভালবাসা অবশ্যই প্রত্যাশা করি। এই قُرْبَى শব্দটির ব্যাখ্যায় মুফসসিরদের মধ্যে বেশ মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।
এক দল এ শব্দটিকে আত্মীয়তা (আত্মীয়তার বন্ধন) অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং আয়াতের অর্থ বর্ণনা করেছেন এই যে, “আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক বা বিনিময় চাই না। তবে তোমাদের ও আমাদের মাঝে আত্মীয়তার যে বন্ধন আছে তোমরা (কুরাইশরা) অন্তত সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এতটুকু আমি অবশ্যই চাই। তোমাদের উচিত ছিল আমার কথা মেনে নেয়া। কিন্তু যদি তোমরা তা না মানো তাহলে গোটা আরবের মধ্যে সবার আগে তোমরাই আমার সাথে দুশমনী করতে বদ্ধপরিকর হবে তা অন্তত করো না।” এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ব্যাখ্যা। ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে জারীর, তাবারানী, বায়হাকী, ইবনে সা’দ ও অন্যান্য পণ্ডিতগণ বহু সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে এ ব্যাখ্যাটি উদ্ধৃত করেছেন এবং মুজাহিদ, ইকরিমা, কাতাদা, সুদ্দী, আবু মালেক, আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম, দাহহাক, আতা ইবনে দীনার এবং আরো অনেক বড় বড় মুফাসসির এ ব্যাখ্যাটাই বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয় দলটি قُرْبَى শব্দটিকে নৈকট্য বা নৈকট্য অর্জন অর্থে গ্রহণ করেন এবং আয়াতটির অর্থ করেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নৈকট্যের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া ছাড়া আমি তোমাদের কাছে এ কাজের জন্য আর কোন বিনিময় চাই না। অর্থাৎ তোমরা সংশোধিত হয়ে যাও। শুধু এটাই আমার পুরস্কার। এ ব্যাখ্যা হাসান বাসারী থেকে উদ্ধৃত হয়েছে এবং কাতাদা থেকেও এর সমর্থনে একটি মত বর্ণিত হয়েছে। এমনকি তাবারানীর একটি বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের সাথেও এ মতকে সম্পর্কিত করা হয়েছে। কুরআন মজীদেরও আরেক স্থানে বিষয়টি এ ভাষায় বলা হয়েছেঃ
قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِلَّا مَنْ شَاءَ أَنْ يَتَّخِذَ إِلَى رَبِّهِ سَبِيلًا- الفرقان : 58
“এদের বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। যার ইচ্ছা সে তার রবের পথ অনুসরণ করুক, আমার পারিশ্রমিক শুধু এটাই।” তৃতীয় দলটি قُرْبَى শব্দটিকে নিকট আত্মীয় (আত্মীয় স্বজন) অর্থে গ্রহণ করেন। তারা আয়াতের অর্থ করেনঃ “তোমরা আমার আত্মীয় ও আপনজনদের ভালবাসবে এছাড়া আমার এ কাজের কোন পারিশ্রমিক আমি চাই না।” এই দলের কেউ আত্মীয়দের মধ্যে গোটা বনী আবদুল মুত্তালিবকে অন্তর্ভুক্ত করেন আবার কেউ কেউ একে শুধু হযরত আলী, ফাতেমা ও তাঁদের সন্তান-সন্ততি পর্যন্ত সীমিত রাখেন। এ ব্যাখ্যাটি সাঈদ ইবনে জুবায়ের এবং ‘আমর ইবনে শু’আইব থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। আবার কোন কোন বর্ণনাতে একে ইবনে আব্বাস ও হযরত আলী ইবনে হুসাইনের (যয়নুল আবেদীন) সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু কারণে এ ব্যাখ্যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রথমত সন্তানের প্রশ্ন তো দূরের কথা মক্কায় যে সময় এ সূরা শূরা নাযিল হয় সে সময় হযরত আলী ও ফাতিমার বিয়ে পর্যন্ত হয়নি। বনী আবদুল মুত্তালিব গোষ্ঠীরও সবাই আবার নবী সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সহযোগিতা করছিলো না। বরং তাদের কেউ কেউ তাঁর প্রকাশ্য দুশমনদের সহযোগী ছিল। এক্ষেত্রে আবু লাহাবের শত্রুতার বিষয় তো সর্বজনবিদিত। দ্বিতীয়ত, শুধু বনী আবদুল মুত্তালিব গোষ্ঠীই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয় ছিল না। নবীর ﷺ মহিয়ষী মা, তাঁর মহান বাপ এবং হযরত খাদীজার (রা.) মাধ্যমে কুরাইশদের সকল পরিবারের সাথেই তাঁর আত্মীয়তা ছিল। সেই সব পরিবারে নবীর ﷺ গুণী সাহাবা যেমন ছিলেন তেমনি ঘোরতর শত্রুও ছিল। তাই ঐ সব আত্মীয়দের মধ্য থেকে তিনি কেবল বনী আবদুল মুত্তালিব গোষ্ঠীকে নিজের ঘনিষ্ঠজন আখ্যায়িত করে এই ভালবাসার দাবীকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট রাখবেন তা নবীর ﷺ জন্য কি করে সম্ভব ছিল? তৃতীয়ত, যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, একজন নবী যে উচ্চাসনে দাঁড়িয়ে সুউচ্চ কন্ঠে আল্লাহর দিকে আহবান জানান সেই উচ্চাসন থেকে এ মহান কাজের জন্য তিনি এত নীচ পর্যায়ের পুরস্কার চাইবেন যে, তোমরা আমার আত্মীয়-স্বজনকে ভালবাসো, তা কোনত্রুমেই সম্ভব নয়। এটা এমনই নীচ পর্যায়ের ব্যাপার যে কোন সুস্থ-স্বাভাবিক রুচিসম্পন্ন ব্যক্তি কল্পনাও করতে পারে না যে, আল্লাহ তাঁর নবীকে একথা শিখিয়ে থাকবেন আর নবী কুরাইশদের মধ্যে দাঁড়িয়ে একথা বলে থাকবেন। কুরআন মজীদে নবী-রসূলদের যেসব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তাতে আমরা দেখি একের পর এক নবী এসে তাঁদের কওমকে বলছেনঃ আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় প্রত্যাশা করি না। আমার পারিশ্রমিক বিশ্ব-জাহানের রব আল্লাহর কাছে প্রাপ্য (ইউনুস ৭২, হূদ ২৯ ও ৫১, আশ-শুআরা ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪ ও ১৮০ আয়াত)। সূরা ইয়াসীনে নবীর সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড বলা হয়েছে এই যে, তিনি দাওয়াতের ব্যাপারে নিস্বার্থ হন (আয়াত ২১)। কুরআন মজিদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ দিয়ে বার বার একথা বলানো হয়েছে যে, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না (আল আনয়াম ৯০, ইউসুফ ১০৪, আল মু’মিনুন ৭২, আল ফুরকান ৫৭, সাবা ৪৭, সোয়াদ ৮৬, আত তুর ৪০, আল কলম ৪৬ আয়াত)। এরপরে একথা বলার কি কোন সুযোগ থাকে যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে আহবান জানানোর যে কাজ করছি তার বিনিময়ে তোমরা আত্মীয়-স্বজনকে ভালোবাসো। তাছাড়া যখন আমরা দেখি, এ ঈমানদারদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়নি বরং এখানে সম্বোধন করা হয়েছে কাফেরদেরকে তখন তা আরো খাপছাড়া বলে মনে হয়। আগে থেকেই কাফেরদেরকে লক্ষ্য করেই গোটা বক্তব্য চলে আসছে এবং পরবর্তী বক্তব্যও তাদের লক্ষ্য করেই পেশ করা হয়েছে। বক্তব্যের এই ধারাবাহিকতার মধ্যে বিরোধীদের কাছে কোন রকম বিনিময় চাওয়ার প্রশ্ন কি করে আসতে পারে? বিনিময় চাওয়া যায় তাদের কাছে যাদের কাছে কোন ব্যক্তির তাদের জন্য সম্পাদিত কাজের কোন মূল্য থাকে। কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কাজের কি মূল্য দিচ্ছিলো যে, তিনি তাদের কাছে বলতেন, আমি তোমাদের জন্য যে কাজ করেছি তার বিনিময়ে তোমরা আমার আত্মীয়-স্বজনদের ভালবাসবে? তারা তো উল্টা সেটাকে অপরাধ মনে করছিলো এবং সেজন্য তাঁকে হত্যা করতে সংকল্পবদ্ধ ছিলো।
৪২
অর্থাৎ যারা জেনে বুঝে নাফরমানী করে সেই সব অপরাধীদের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয় নেক কাজে সচেষ্ট বান্দাদের সাথে আল্লাহর আচরণ তেমন নয়। তাদের সাথে আল্লাহর আচরণ হচ্ছে (১) তারা নিজের পক্ষ থেকে যতটা সৎকর্মশীল হওয়ার চেষ্টা করে আল্লাহ তাদেরকে তার চেয়েও বেশী সৎকর্মশীল বানিয়ে দেন। (২) তাদের কাজকর্মে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায় অথবা সৎকর্মশীল হওয়ার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যে গোনাহ সংঘটিত হয় আল্লাহ তা উপেক্ষা করেন এবং (৩) যে সামান্য পরিমাণ নেক কাজের পুঁজি তারা নিয়ে আসে সেজন্য আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদা দেন এবং অধিক পুরস্কার দান করেন।
মক্কার কুরাইশদের সাথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে আত্মীয়তা ছিল তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, আমি তোমাদের কাছে তাবলীগের জন্য কোন পারিশ্রমিক চাই না, কিন্তু অন্ততপক্ষে তোমাদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তার বিষয়টা তো লক্ষ রাখ এবং সেই খাতিরে আমাকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাক ও আমার কাজে বাধা সৃষ্টি হতে নিবৃত্ত থাক।
২৩. এটা হলো তা, যার সুসংবাদ আল্লাহ দেন তার বান্দাদেরকে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে। বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে আত্মীয়তার সৌহাদ্য ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না।(১) যে উত্তম কাজ করে আমরা তার জন্য এতে কল্যাণ। বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, গুণগ্ৰাহী।
(১) অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে القربى এর ভালবাসা অবশ্যই প্রত্যাশা করি। এই শব্দটির ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের মধ্যে বেশ মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এক দল মুফাসসির এ শব্দটিকে আত্মীয়তা (আত্মীয়তার বন্ধন) অর্থে গ্ৰহণ করেছেন এবং আয়াতের অর্থ বর্ণনা করেছেন এই যে, “আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক বা বিনিময় চাই না। তবে তোমাদের ও আমাদের মাঝে আত্মীয়তার যে বন্ধন আছে তোমরা (কুরাইশরা) অন্তত সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এতটুকু আমি অবশ্যই চাই। তোমাদের উচিত ছিল আমার কথা মেনে নেয়া। কিন্তু যদি তোমরা তা না মানো তাহলে গোটা আরবের মধ্যে সবার আগে তোমরাই আমার সাথে দুশমনী করতে বদ্ধপরিকর হবে তা অন্তত করো না। তোমাদের অধিকাংশ গোত্রে আমার আত্মীয়তা রয়েছে। আত্মীয়তার অধিকার ও আত্মীয় বাৎসল্যের প্রয়োজন তোমরা অস্বীকার কর না। অতএব, আমি তোমাদের শিক্ষা, প্রচার ও কর্ম সংশোধনের যে দায়িত্ব পালন করি, এর কোন পারিশ্রমিক তোমাদের কাছে চাই না। তবে এতটুকু চাই যে, তোমরা আত্মীয়তার অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখ। মানা না মানা তোমাদের ইচ্ছা। কিন্তু শক্রতা প্রদর্শনে তো কমপক্ষে আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিবন্ধক হওয়া উচিত।
বলাবাহুল্য, আত্মীয়তার অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখা স্বয়ং তাদেরই কর্তব্য ছিল। একে কোন শিক্ষা ও প্রচারকার্যের পারিশ্রমিক বলে অভিহিত করা যায় না। অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে এটা চাই। এটা প্রকৃতপক্ষে কোন পারিশ্রমিক নয়। তোমরা একে পারিশ্রমিক মনে করলে ভুল হবে। যুগে যুগে নবী রাসুলগণ নিজ নিজ সম্প্রদায়কে পরিস্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন, আমি তোমাদের মঙ্গলার্থে যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, তার কোন বিনিময় তোমাদের কাছে চাই না। আমার প্রাপ্য আল্লাহ তা'আলাই দেবেন। অতএব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের সেরা নবী হয়ে স্বজাতির কাছে কেমন করে বিনিময় চাইবেন? ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরাইশদের যে গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতেন, তার প্রত্যেকটি শাখা-পরিবারের সাথে তাঁর আত্মীয়তার জন্মগত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। (মুসনাদে আহমাদ: ১/২২৯) তাই আল্লাহ বলেছেন, আপনি মুশরিকদের বলুন, দাওয়াতের জন্যে আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না। আমি চাই, তোমরা আত্মীয়তার খাতিরে আমাকে তোমাদের মধ্যে অবাধে থাকতে দাও এবং আমার হেফাযত কর। আরবের অন্যান্য লোক আমার হেফাযত ও সাহায্যে অগ্রণী হলে তোমাদের জন্যে তা গৌরবের বিষয় হবে না।
কোন কোন মুফাস্সির القربى শব্দটিকে নৈকট্য (নৈকট্য অর্জন) অর্থে গ্রহণ করেন। এবং আয়াতটির অর্থ করেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নৈকট্যের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া ছাড়া আমি তোমাদের কাছে। এ কাজের জন্য আর কোন বিনিময় চাই না। অর্থাৎ তোমরা সংশোধিত হয়ে যাও। শুধু এটাই আমার পুরস্কার। এ ব্যাখ্যা হাসান বাসারী থেকে উদ্ধৃত হয়েছে পবিত্র কুরআনের অন্য এক স্থানে বিষয়টি এ ভাষায় বলা হয়েছেঃ ‘এদের বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। যার ইচ্ছা সে তার রবের পথ অনুসরণ করুক, (আমার পারিশ্রমিক শুধু এটাই)।’ (সূরা আল-ফুরকান: ৫৭) (দেখুন: তাবারী, ইবনে কাসীর, সা’দী)
(২৩) আল্লাহ এ সুসংবাদই তাঁর দাসদেরকে দেন, যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে। বল, ‘আমি আমার আহবানের জন্য তোমাদের নিকট হতে আত্মীয়তার সৌহার্দ্য ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাই না।’(1) আর যে উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য এতে কল্যাণ বর্ধিত করি।(2) নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতীব গুণগ্রাহী।(3)
(1) কুরাইশ গোত্রগুলো এবং নবী (সাঃ)-এর মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। আয়াতের অর্থ একেবারে পরিষ্কার যে, আমি ওয়ায-নসীহত এবং দ্বীনের দাওয়াতের কোন পারিশ্রমিক তোমাদের কাছে চাই না। তবে একটি জিনিস অবশ্যই চাই যে, আমার ও তোমাদের মাঝে যে আত্মীয়তা আছে, তার খেয়াল কর। আমার দাওয়াতকে তোমরা মেনে নিচ্ছ না, তো নিয়ো না। এটা তোমাদের ইচ্ছার ব্যাপার। কিন্তু আমার অনিষ্ট করা হতে তো বিরত থাক। তোমরা আমার বন্ধু ও সহায়ক হতে না পারলেও আত্মীয়তার খাতিরে আমাকে কষ্ট দিয়ো না এবং আমার পথে বাধা হয়ো না, যাতে আমি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে পারি। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অর্থ করেছেন, আমার ও তোমাদের মাঝে যে আত্মীয়তা আছে, তা বজায় রাখ। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা আশ্-শুরা) নবী (সাঃ)-এর বংশ অবশ্যই মর্যাদা-সম্মানের দিক দিয়ে দুনিয়ার সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত বংশ। এই বংশের প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা রাখা এবং তাঁদেরকে ইজ্জত ও সম্মান দান করা, ঈমানের অংশ। কেননা, নবী (সাঃ) বহু হাদীসে তাঁদেরকে সম্মান ও হিফাযত করার ব্যাপারে তাকীদ করেছেন। পক্ষান্তরে এই আয়াতের কোনই সম্পর্ক সে বিষয়ের সাথে নেই, যে বিষয়কে শিয়ারা প্রমাণ করতে চেয়েছে। তারা টেনে-হেঁচড়ে এই আয়াতকে নবী-বংশের প্রতি ভালবাসার সাথে জুড়ে দেয়। আর এই বংশের আওতায় কারা পড়ে তার ব্যক্তিত্বও তারা আলী, ফাতিমা এবং হাসান-হুসাইন (রাযিবয়াল্লাহ আনহুম) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। অনুরূপ তাঁদেরকে ভালবাসার অর্থ তাদের কাছে এই যে, তাঁদেরকে নিষ্পাপ এবং ইলাহী এখতিয়ারের মালিক মনে করতে হবে। অন্য দিকে মক্কার কাফেরদের কাছে তবলীগের বিনিময় স্বরূপ স্বীয় বংশীয় ভালবাসা প্রার্থনা অতীব বিস্ময়কর ব্যাপার; যা নবী (সাঃ)-এর সুউচ্চ মর্যাদার তুলনায় অনেক নিম্নতর। তাঁর তবলীগকে গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তাঁর দাবী কেবল এই ছিল যে, আত্মীয়তার ভিত্তিতে ভালবাসা প্রতিষ্ঠিত রাখা হোক। তাছাড়া এই আয়াত ও সূরাটি হল মক্কী। তখন আলী ও ফাতিমা (রাযিআল্লাহু আনহুমা)র মধ্যে বিবাহ বন্ধন সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ, তখনও পর্যন্ত এ বংশ অস্তিত্বে আসেনি, যার প্রতি মনগড়া ভালবাসা রাখার প্রমাণ এই আয়াত থেকে করা হয়।
(2) অর্থাৎ, নেকী ও সওয়াবে বৃদ্ধি দান করি। অথবা নেকীর পর তার প্রতিদানে আরো নেকী করার তাওফীক দান করি। যেমন, পাপের প্রতিফল স্বরূপ অনেকে আরো অধিক পাপে লিপ্ত হয়ে থাকে।
(3) এই জন্য তিনি গোপন করেন ও ক্ষমা করে দেন এবং বেশী বেশী করে নেকী দান করেন।