ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তাকূনূকাল্লাযীনা আ-যাও মূছা-ফাবাররআহুল্লা-হু মিম্মা-ক-লূ ওয়া ক-না ‘ইনদাল্লা-হি ওয়াজীহা-।উচ্চারণ
হে ঈমানদারগণ! ১১৮ তাদের মতো হয়ে যেয়ো না যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল, তারপর আল্লাহ তাদের তৈরি করা কথা থেকে তাকে দায়মুক্ত করেন এবং সে আল্লাহর কাছে ছিল সম্মানিত। ১১৯ তাফহীমুল কুরআন
হে মুমিনগণ! তাদের মত হয়ো না, যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল, অতঃপর আল্লাহ তারা যা রটনা করেছিল, তা হতে তাকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। #%৫৪%# সে ছিল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান।মুফতী তাকী উসমানী
হে মু’মিনগণ! মূসাকে যারা ক্লেশ দিয়েছে তোমরা তাদের মত হয়োনা; তারা যা রটনা করেছিল আল্লাহ তা হতে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর নিকট সে মর্যাদাবান।মুজিবুর রহমান
হে মুমিনগণ! মূসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মত হয়ো না। তারা যা বলেছিল, আল্লাহ তা থেকে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করেছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে ছিলেন মর্যাদাবান।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
হে মু’মিনগণ ! মূসাকে যারা ক্লেশ দিয়েছে তোমরা এদের ন্যায় হয়ো না; এরা যা রটনা করেছিল আল্লাহ্ তা হতে তাকে নির্দোষ প্রমাণ করেন; এবং আল্লাহ্ র নিকট সে মর্যাদাবান। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
হে ঈমানদারগণ, তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল। অতঃপর তারা যা বলেছিল, তা থেকে আল্লাহ তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন। আর সে ছিল আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান।আল-বায়ান
হে মু’মিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল। অতঃপর তারা যা বলেছিল আল্লাহ তাত্থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন। সে ছিল আল্লাহর নিকট সম্মানিত।তাইসিরুল
ওহে যারা ঈমান এনেছ! তাদের মতো হয়ো না যারা মূসার নিন্দা করেছিল, কিন্তু আল্লাহ্ তাঁকে নির্দোষ ঠাওরে ছিলেন তারা যা বলেছিল তা থেকে। আর তিনি আল্লাহ্র সমক্ষে সম্মানিত ছিলেন।মাওলানা জহুরুল হক
১১৮
মনে রাখতে হবে, কুরআন মজীদে “যে ঈমানদারগণ।” শব্দাবলীর মাধ্যমে কোথাও তো সাচ্চা মু’মিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে আবার কোথাও মুসলমানদের দলকে সামগ্রীকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে, যার মধ্যে মু’মিন মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদার সবাই শামিল আছে। আবার কোথাও মুনাফিকদের দিকে কথার মোড় ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারদেরকে যখনই الَّذِينَ آمَنُوا বলে সম্বোধন করা হয় তখন এর উদ্দেশ্য তাদেরকে লজ্জা দেয়া এই মর্ম যে, তোমরা তো ঈমান আনার দাবী করে থাকো আর এই হচ্ছে তোমাদের কাজ। আগের পিছের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে প্রত্যেক জায়গায় الَّذِينَ آمَنُوا বলে কোন্ জায়গায় কার কথা বলা হয়েছে তা সহজেই জানা যায়। এখানে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা পরিষ্কার জানাচ্ছে যে, এখানে সাধারণ মুসলমানদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে।
১১৯
অন্য কথায় এর অর্থ হচ্ছে, “হে মুসলমানরা! তোমরা ইহুদিদের মতো করো না। মূসা আলাইহিস সালামের সাথে বনী ইসরাঈল যে আচরণ করে তোমাদের নবীর সাথে তোমাদের তেমনি ধরনের আচরণ করা উচিত নয়।” বনী ইসরাঈল নিজেরাই একথা স্বীকার করে যে, হযরত মূসা ছিলেন তাদের সবচেয়ে বড় অনুগ্রাহক ও উপকারী। এ জাতির যা কিছু উন্নতি অগ্রগতি সব তাঁরই বদৌলতে। নয়তো মিসরে তাদের পরিণতি ভারতের শূদ্রদের চাইতেও খারাপ হতো। কিন্তু নিজেদের এ মহান হিতকারীর সাথে এ জাতির যে আচরণ ছিল তা অনুমান করার জন্য বাইবেলের নিম্নোক্ত স্থানগুলোর ওপর একবার নজর বুলিয়ে নেয়া যথেষ্ট হবেঃ
যাত্রাপুস্তক ৫:২০-২১, ১৪: ১১-১২, ১৬: ২-৩, ১৭: ৩-৪; গণনা পুস্তক ১১: ১-১৫, ১৪: ১-১০, ১৬: সম্পূর্ণ ২০: ১-৫।
এত বড় হিতকারী ব্যক্তিত্বের সাথে বনী ইসরাঈল যে বৈরী নীতি অবলম্বন করেছিল। তার প্রতি ইঙ্গিত করে কুরআন মজিদ মুসলমানদেরকে এই বলে সতর্ক করে দিচ্ছে যে, তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এ ধরনের আচরণ করো না। অন্যথায় ইহুদিরা যে পরিণাম ভোগ করেছে ও করছে, তোমরা নিজেরাও সেই পরিণামের জন্য তৈরি হয়ে যাও।
একথাটিই বিভিন্ন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছেন। একবারের ঘটনা, নবী (সা.) মুসলমানদের মধ্যে কিছু সম্পদ বিতরণ করছিলেন। এ মজলিস থেকে লোকেরা বাইরে বের হলে এক ব্যক্তি বললো, “মুহাম্মাদ এই বিতরণের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি একটুও নজর রাখেননি।” একথা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) শুনতে পান। তিনি নবী করীমের কাছে গিয়ে বলেন, আজ আপনার সম্পর্কে এ ধরনের কথা তৈরি করা হয়। তিনি জবাবে বলেনঃ
رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَى مُوسَى فانه أُوذِىَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ
“মূসার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তাঁকে এর চেয়েও বেশী পীড়া ও যন্ত্রণা দেয়া হয় এবং তিনি সবর করেন। (মুসনাদে আহমাদ, তিরযিমী ও আবু দাউদ)
বনী ইসরাঈল হযরত মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নানা রকমের কথা প্রচার করত ও ভিত্তিহীন সব অভিযোগ তার সম্পর্কে উত্থাপন করত। এভাবে তারা তাকে কষ্ট দিয়ে বেড়াত। এই উম্মতকে বলা হচ্ছে, তাদের মত আচরণ যেন তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে না করে।
৬৯. হে ঈমানদারগণ! মূসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে তোমরা তাদের মত হয়ো না; অতঃপর তারা যা রটনা করেছিল আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন(১); আর তিনি ছিলেন আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান।(২)
(১) এ আয়াতে বিশেষভাবে মুসলিমদেরকে আল্লাহ্ ও রাসূলের বিরোধিতা থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, এই বিরোধিতা তাদের কষ্টের কারণ। তাদেরকে মূসা আলাইহিস সালামের কওমের মত হতে নিষেধ করা হয়েছে। যারা সবসময় মূসা আলাইহিস সালামকে সার্বিকভাবে কষ্ট দিত। (দেখুন, ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াতের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঘটনাটি হলো, মূসা আলাইহিস সালাম অত্যন্ত লজ্জাশীল হওয়ার কারণে তাঁর দেহ ঢেকে রাখতেন। তাঁর শরীর কেউ দেখত না।
তিনি পর্দার আড়ালে গোসল করতেন। তাঁর সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলের মধ্যে সকলের সামনে উলঙ্গ হয়ে গোসল করার ব্যাপক প্রচলন ছিল। মূসা আলাইহিস সালাম কারও সামনে গোসল করেন না দেখে কেউ কেউ বলাবলি করল- এর কারণ এই যে, তার দেহে নিশ্চয় কোন খুঁত আছে-হয় তিনি ধবল কুষ্ঠরোগী, না হয় একশিরা রোগী। নতুবা তিনি অন্য কোন ব্যাধিগ্রস্ত। আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের খুঁত থেকে মূসা আলাইহিস সালাম-এর নির্দেষিতা প্রকাশ করার ইচ্ছা করলেন।
একদিন মূসা আলাইহিস সালাম নির্জনে গোসল করার জন্যে কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের উপর তা রেখে দিলেন। গোসল শেষে যখন হাত বাড়িয়ে কাপড় নিতে চাইলেন, তখন প্রস্তর খণ্ডটি (আল্লাহর আদেশে) নড়ে উঠল এবং তার কাপড়সহ দৌড়াতে লাগল। মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর লাঠি নিয়ে প্রস্তরের পেছনে পেছনে “আমার কাপড় আমার কাপড়” বলতে বলতে দৌড় দিলেন। কিন্তু প্ৰস্তরটি থামল না- যেতেই লাগল। অবশেষে প্ৰস্তুরটি বনী-ইসরাঈলের এক সমাবেশে পৌঁছে থেমে গেল।
তখন সেসব লোক মুসা আলাইহিস সালাম-কে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে নিল এবং তাঁর দেহ নিখুঁত ও সুস্থ দেখতে পেল। (এতে তাদের বর্ণিত কোন খুঁত বিদ্যমান ছিল না।) এভাবে আল্লাহ্ তা'আলা মুসা আলাইহিস সালাম-এর নির্দোষিতা সকলের সামনে প্রকাশ করে দিলেন। অতঃপর তিনি লাঠি দ্বারা প্রস্তর খণ্ডকে মারতে লাগলেন। আল্লাহর কসম, মূসা আলাইহিস সালাম এর আঘাতের কারণে পাথরের গায়ে তিন, চার অথবা পাঁচটি দাগ পড়ে গিয়েছিল। (বুখারী: ৩৪০৪)
(২) অর্থাৎ মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন। (কুরতুবী)
(৬৯) হে বিশ্বাসীগণ! মূসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মত হয়ো না; ওরা যা রটনা করেছিল আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেছেন।(1) আর আল্লাহর নিকট সে মর্যাদাবান।
(1) এর ব্যাখ্যা হাদীসে এইভাবে এসেছে যে, মূসা (আঃ) অত্যন্ত লজ্জাশীল নবী ছিলেন, সুতরাং তিনি নিজের শরীর কখনো মানুষের সামনে খুলতেন না; বরং ঢেকে রাখতেন। বানী ইস্রাঈলরা বলতে আরম্ভ করল যে, সম্ভবতঃ মূসা (আঃ) এর শরীরে ধবলের দাগ অথবা ঐ ধরনের কোন খুঁত আছে, যার ফলে তিনি সব সময় পোষাক পরে তা ঢেকে রাখেন। এক দিন মুসা (আঃ) নির্জনে কাপড় খুলে পাথরের উপর রেখে একাকী গোসল করতে লাগলেন, (আল্লাহর আদেশে) পাথর তাঁর সেই কাপড় নিয়ে পালাতে লাগল। আর মূসা (আঃ) তার পিছন পিছন দৌড়তে লাগলেন। পরিশেষে বানী ইসরাঈলের এক সমাবেশে পৌঁছে গেলেন। তারা মূসা (আঃ)-কে উলঙ্গ অবস্থায় দেখে তাদের সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। মূসা (আঃ) একজন সুন্দর এবং সকল প্রকার দাগ ও ত্রুটিমুক্ত ছিলেন। এইভাবে আল্লাহ তাআলা মু’জিযা স্বরূপ পাথর দ্বারা তাঁকে সেই অপবাদ ও সন্দেহ থেকে নির্মল প্রমাণ করলেন, যা বানী ইস্রাঈলদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি আরোপ করা হচ্ছিল। (বুখারীঃ কিতাবুল আম্বিয়া)
মূসা (আঃ)-এর ঘটনা উল্লেখ করে মু’মিনগণকে বোঝানো হয়েছে যে, তোমরা আমার শেষ পয়গম্বর মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বানী ইস্রাঈলদের মত কষ্ট দিও না এবং তাঁর সম্পর্কে এমন কোন কথা বলো না, যা শুনে তাঁর মনে দুশ্চিন্তা ও কষ্ট হয়। যেমন এক সময় গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ) মাল বন্টন করার সময় এক ব্যক্তি বলল যে, এ বন্টন ইনসাফের সাথে করা হয়নি। নবী (সাঃ) এই কথা শুনে এমন রাগান্বিত হলেন যে, তাঁর চেহারা মুবারক লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘‘মূসা (আঃ) এর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষণ হোক। তাঁকে এর থেকেও অধিক কষ্ট দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন। (বুখারী ঐ, মুসলিম কিতাবুয যাকাত)