وَإِذۡ تَقُولُ لِلَّذِيٓ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ وَأَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِ أَمۡسِكۡ عَلَيۡكَ زَوۡجَكَ وَٱتَّقِ ٱللَّهَ وَتُخۡفِي فِي نَفۡسِكَ مَا ٱللَّهُ مُبۡدِيهِ وَتَخۡشَى ٱلنَّاسَ وَٱللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخۡشَىٰهُۖ فَلَمَّا قَضَىٰ زَيۡدٞ مِّنۡهَا وَطَرٗا زَوَّجۡنَٰكَهَا لِكَيۡ لَا يَكُونَ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ حَرَجٞ فِيٓ أَزۡوَٰجِ أَدۡعِيَآئِهِمۡ إِذَا قَضَوۡاْ مِنۡهُنَّ وَطَرٗاۚ وَكَانَ أَمۡرُ ٱللَّهِ مَفۡعُولٗا

ওয়া ইযতাকূলু লিল্লাযী আন‘আমাল্লা-হু আলাইহি ওয়াআন‘আমতা ‘আলাইহি আমছিক ‘আলাইকা ঝাওজাকা ওয়াত্তাকিল্লা-হা ওয়া তুখফী ফী নাফছিকা মাল্লা-হু মুবদীহি ওয়া তাখশান্না-ছা ওয়াল্লা-হু আহাক্কুআন তাখশা-হু ফালাম্মা-কাদা-ঝাইদুম মিন হাওয়াতারন ঝাওয়াজনা-কাহা-লিকাই লা-ইয়াকূনা ‘আলাল মু’মিনীনা হারজুন ফীআঝওয়াজি আদ‘ইয়াইহিম ইযা-কাদাও মিনহুন্না ওয়াতার- ওয়া ক-না আমরুল্লা-হি মাফ ‘ঊলা-।উচ্চারণ

হে নবী! ৬৭ স্মরণ করো, যখন আল্লাহ‌ এবং তুমি যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে ৬৮ তাকে তুমি বলছিলে, “তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় করো।” ৬৯ সে সময় তুমি তোমার মনের মধ্যে যে কথা গোপন করছিলে আল্লাহ‌ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন, তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহ‌ এর বেশী হকদার যে, তুমি তাঁকে ভয় করবে। ৭০ তারপর তখন তার ওপর থেকে যায়েদের সকল প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল ৭১ তখন আমি সেই (তালাকপ্রাপ্তা মহিলার) বিয়ে তোমার সাথে দিয়ে দিলাম, ৭২ যাতে মু’মিনদের জন্য তাদের পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কোন প্রকার সংকীর্ণতা না থাকে যখন তাদের ওপর থেকে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। ৭৩ আর আল্লাহর হুকুম তো কার্যকর হয়েই থাকে। তাফহীমুল কুরআন

এবং (হে রাসূল!) স্মরণ কর, যার প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তুমিও অনুগ্রহ করেছিলে, #%৩৩%# তাকে যখন তুমি বলছিলে, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিজ বিবাহে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। #%৩৪%# তুমি নিজ অন্তরে এমন কথা গোপন করছিলে, আল্লাহ যা প্রকাশ করে দেওয়ার ছিলেন। #%৩৫%# তুমি মানুষকে ভয় করছিলে অথচ আল্লাহই এ বিষয়ের বেশি হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে। অতঃপর যায়দ যখন নিজ স্ত্রীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটাল তখন আমি তার সাথে তোমার বিবাহ সম্পন্ন করলাম, যাতে মুসলিমদের পক্ষে তাদের পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীগণকে বিবাহ করাতে কোন সমস্যা না থাকে, যখন তারা তাদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে ফেলবে। আর আল্লাহর আদেশ তো কার্যকর হওয়ারই ছিল।মুফতী তাকী উসমানী

স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করছ, তুমি তাকে বলেছিলেঃ তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন রেখেছ আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোকদেরকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকে ভয় করাই তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। অতঃপর যায়িদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বিয়ের সর্ম্পক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম, যাতে মু’মিনদের পোষ্য পুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সূত্র ছিন্ন করলে সেই সব রমনীকে বিয়ে করায় মু’মিনদের জন্য কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।মুজিবুর রহমান

আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

স্মরণ কর, আল্লাহ্ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলিতেছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহ্কে ভয় কর।’ তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছো আল্লাহ্ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন ; তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহ্কেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত। এরপর যায়দ যখন যয়নবের সঙ্গে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করলাম, যাতে মু’মিনদের পোষ্য পুত্রগণ নিজ স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সেইসব রমণীকে বিবাহ করায় মু’মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহ্ র আদেশ কার্যকরী হয়েই থাকে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর স্মরণ কর, আল্লাহ যার উপর নিআমত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর’। আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে।* আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে।আল-বায়ান

স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন আর তুমিও যাকে অনুগ্রহ করেছ তাকে তুমি যখন বলছিলে- তুমি তোমার স্ত্রীকে (বিবাহবন্ধনে) রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে লুকিয়ে রাখছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চান, তুমি লোকদেরকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহই সবচেয়ে বেশি এ অধিকার রাখেন যে, তুমি তাঁকে ভয় করবে। অতঃপর যায়্দ যখন তার (যায়নাবের) সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব নারীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হবেই।তাইসিরুল

আর স্মরণ করো! তুমি তাকে বলেছিলে যার প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন ও যার প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ -- "তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই রাখো, আর আল্লাহ্‌কে ভয়ভক্তি করো, আর তুমি তোমার অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিলে আল্লাহ্ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন, আর তুমি মানুষকে ভয় করেছিলে, অথচ আল্লাহ্‌রই বেশী অধিকার যে তুমি তাঁকেই ভয় করবে।" কিন্তু যায়েদ যখন তার থেকে বিবাহবন্ধন সন্বন্ধে মীমাংসা করে ফেলল তখন আমরা তাকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম -- যাতে মুমিনদের উপরে কোন বাধা না থাকে তাদের পালকপুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে, যখন তারা তাদের থেকে বিবাহবন্ধন সন্বন্ধে মীমাংসা করে ফেলে। আর আল্লাহ্‌র নির্দেশ প্রতিপালিত হয়েই থাকে।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৬৭

এখান থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্তকার বিষয়বস্তু এমন সময় নাযিল হয় যখন নবী ﷺ হযরত যয়নবকে (রা.) বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং একে ভিত্তি করে মুনাফিক, ইহুদী ও মুশরিকরা রসূলের বিরুদ্ধে তুমূল অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিল। এ আয়াতগুলো অধ্যয়ন করার সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যে শত্রুরা নবী (সঃ) বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেই দুর্নাম রটাবার এবং নিজেদের অন্তর্জ্বালা মিটাবার জন্য মিথ্যা, অপবাদ, গালমন্দ ও নিন্দাবাদের অভিযান চালাচ্ছিল তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে এগুলো বলা হয়নি। বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ অভিযানের প্রভাব থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষ করা এবং ছাড়ানো সন্দেহ-সংশয় থেকে তাদেরকে সংরক্ষিত রাখা। একথা স্পষ্ট, আল্লাহর কালাম অস্বীকারকারীদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো না। এ কালাম যদি কাউকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো, তাহলে তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা একে আল্লাহর কালাম বলে জানতো এবং সে হিসেবে একে মেনে চলতো। শত্রুদের এসব আপত্তি কোনভাবে তাদের মনেও সন্দেহ-সংশয় এবং তাদের মস্তিষ্কেও জটিলতা ও সংকট সৃষ্টিতে সক্ষম না হয়ে পড়ে, সম্ভাব্য সকল সন্দেহ নিরসন করেছেন অন্যদিকে মুসলমানদেরকেও এবং স্বয়ং নবীকেও ﷺ এ ধরনের অবস্থায় তাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা জানিয়ে দিয়েছেন।

৬৮

এখানে যায়েদের (রা.) কথা বলা হয়েছে। সামনের দিকে কথাটি সুস্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ কি ছিল এবং নবী ﷺ এর অনুগ্রহ কি ছিল? এ বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য এখানে সংক্ষেপে তাঁর কাহিনীটি বর্ণনা করে দেয়া জরুরী মনে করছি। তিনি ছিলেন আসলে কালব গোত্রের হারেসা ইবনে শারাহীল নামক এক ব্যক্তির পুত্র। তাঁর মাতা সু’দা বিনতে সা’লাব ছিলেন তাঈ গোত্রের বনী মা’ন শাখার মেয়ে। তাঁর বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর মা তাঁকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান। সেখানে নবী কাইন ইবনে জাসরের লোকেরা তাদের লোকালয় আক্রমণ করে এবং লুটপাট করে যেসব লোককে নিজেদের সাথে পাকড়াও করে নিয়ে যায় তাদের মধ্যে হযরত যায়েদও ছিলেন। তারা তায়েফের নিকটবর্তী উকাযের মেলায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে বিক্রি করে দেয়। হযরত খাদীজার (রা.) ভাতিজা হাকিম ইবনে হিযাম তাঁকে কিনে নিয়ে যান। তিনি তাঁকে মক্কায় নিয়ে এসে নিজের ফুফুর খেদমতে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করেন। নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত খাদীজার (রা.) যখন বিয়ে হয় তখন নবী করীম ﷺ তাঁর কাছে যায়েদকে দেখেন এবং তাঁর চালচলন ও আদব কায়দা তাঁর এত বেশী পছন্দ হয়ে যায় যে, তিনি হযরত খাদীজার (রা.) কাছ থেকে তাঁকে চেয়ে নেন। এভাবে এই সৌভাগ্যবান ছেলেটি সৃষ্টির সেরা এমন এক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসে যান যাঁকে কয়েক বছর পরেই মহান আল্লাহ‌ নবীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে যাচ্ছিলেন। তখন হযরত যায়েদের (রা.) বয়স ছিল ১৫ বছর। কিছুকাল পরে তাঁর বাপ চাচা জানতে পারেন তাদের ছেলে মক্কায় আছে। তারা তাঁর খোঁজ করতে করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে যার। তারা বলেন, আপনি মুক্তিপণ হিসেবে যা নিতে চান বলুন আমরা তা আপনাকে দিতে প্রস্তুত আছি, আপনি আমাদের সন্তান আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিন। নবী করীম ﷺ বলেন, আমি ছেলেকে ডেকে আনছি এবং তাঁর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দি‌চ্ছি, সে চাইলে আপনাদের সাথে চলে যেতে পারে এবং চাইলে আমার কাছে থাকতে পারে। যদি সে আপনাদের সাথে চলে যেতে চায় তাহলে আমি এর বিনিময়ে মুক্তি পণ হিসেবে কোন অর্থ নেবো না এবং তাঁকে এমনিই ছেড়ে দেবো। আর যদি সে আমার কাছে থাকতে চায় তাহলে আমি এমন লোক নই যে, কেউ আমার কাছে থাকতে চাইলে আমি তাকে খামখা তাড়িয়ে দেবো। জবাবে তারা বলেন, আপনি যে কথা বলেছেন তাতো ইনসাফেরও অতিরিক্ত। আপনি ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে নিন। নবী করীম ﷺ যায়েদকে ডেকে আনেন এবং তাঁকে বলেন, এই দু’জন ভদ্রলোককে চেনো? যায়েদ জবাব দেন, জি হ্যাঁ, ইনি আমার পিতা এবং ইনি আমার চাচা। তিনি বলেন, আচ্ছা, তুমি এদেরকেও জানো এবং আমাকেও জানো। এখন তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, তুমি চাইলে এদের সাথে চলে যেতে পারো এবং চাইলে আমার সাথে থেকে যাও। তিনি জবাব দেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কারো কাছে যেতে চাই না। তার বাপ ও চাচা বলেন, যায়েদ, তুমি কি স্বাধীনতার ওপর দাসত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছো এবং নিজের মা-বাপ ও পরিবার পরিজনকে ছেড়ে অন্যদের কাছে থাকতে চাও? তিনি জবাব দেন, আমি এ ব্যক্তির যে গুণাবলী দেখেছি তার অভিজ্ঞতা লাভ করার পর এখন আর দুনিয়ার কাউকেও তাঁর ওপর প্রাধান্য দিতে পারি না। যায়েদের এ জবাব শুনে তার বাপ ও চাচা সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁকে রেখে যেতে রাজি হয়ে যান। নবী ﷺ তখনই যায়েদকে আযাদ করে দেন এবং হারাম শরীফে গিয়ে কুরাইশদের সাধারণ সমাবেশে ঘোষণা করেন, আপনারা সবাই সাক্ষী থাকেন আজ থেকে যায়েদ আমার ছেলে, সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং আমি তাঁর উত্তরাধিকারী হবো। এ কারণে লোকেরা তাঁকে যায়েদ ইবণে মুহাম্মাদ বলতে থাকে। এসব নবুওয়াতের পূর্বের ঘটনা। তারপর যখন নবী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন চারজন এমন ছিলেন যারা এক মুহূর্তের জন্যও কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই তাঁর মুখে নবুওয়াতের দাবী শুনতেই তাকে নবী বলে মেনে নেন। তাদের একজন হযরত খাদীজা (রা.), দ্বিতীয়জন হযরত যায়েদ (রা.), তৃতীয় জন হযরত আলী (রা.) এবং চতুর্থজন হযরত আবু বকর (রা.)। এ সময় হযরত যায়েদের (রা.) বয়স ছিল ৩০ বছর এবং নবী করীমের ﷺ সাথে তাঁর ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। হিজরাতের পরে ৪ হিজরীতে নবী (সা.) নিজের ফুফাত বোনের সাথে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন। নিজের পক্ষ থেকে তার মোহরানা আদায় করেন এবং ঘর-সংসার গুছিয়ে নেবার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও দেন।

এ অবস্থার প্রতিই মহান আল্লাহ‌ তাঁর “যার প্রতি আল্লাহ‌ ও তুমি অনুগ্রহ করেছিল” বাক্যাংশের মধ্যে ইশারা করেছেন।

৬৯

এটা সে সময়ের কথা যখন হযরত যায়েদ (রা.) ও হযরত যয়নবের (রা.) সম্পর্ক তিক্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি বারবার অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত নবী (সা.) এর কাছে নিবেদন করেন, আমি তাকে তালাক দিতে চাই। হযরত যয়নব (রা.) যদিও আল্লাহ ও তাঁর রসূলের হুকুম মেনে নিয়ে তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান কিন্তু নিজের মন থেকে এ অনুভূতিটি তিনি কখনো মুছে ফেলতে পারেননি যে, যায়েদ একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস, তাদের নিজোদের পরিবারের অনুগ্রহে লালিত এবং তিনি নিজে আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের একজন নিম্নমানের লোকের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অনুভূতির কারণে দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো হযরত যায়েদকে নিজের সমকক্ষ ভাবেননি। এ কারণে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যেতে থাকে। এক বছরের কিছু বেশী দিন অতিবাহিত হতে না হতেই অবস্থা তালাক দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

৭০

কেউ কেউ এ বাক্যটির উল্টা অর্থ গ্রহণ করেছেন এভাবে, নবী ﷺ নিজেই হযরত যয়নবকে (রা.) বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং তাঁর মন চচ্ছিল হযরত যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দিক। কিন্তু যখন যায়েদ (রা.) এসে বললেন, আমি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই তখন তিনি নাউযুবিল্লাহ আসল কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে কেবলমাত্র মুখেই তাঁকে নিষেধ করলেন। একথায় আল্লাহ‌ বলছেন, “তুমি মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়ে রাখছিলে আল্লাহ‌ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন।” অথচ আসল ব্যাপারটা এর সম্পূর্ণ উল্টো। যদি এ সূরার ১, ২, ৩ ও ৭ আয়াতের সাথে এ বাক্যটি মিলিয়ে পড়া হয়, তাহলে পরিষ্কার অনুভূত হবে যে, হযরত যায়েদ ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে যে সময় তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছিল সে সময়ই আল্লাহ‌ নবী ﷺ কে এ মর্মে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যায়েদ যখন তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবে তখন তোমাকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আরবের সে সমাজে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করার অর্থ কি তা নবী ﷺ জানতেন এবং তাও এমন এক অবস্থায় যখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মুসলমান ছাড়া বাকি সমগ্র আরব দেশ তাঁর বিরুদ্ধে ধনুকভাঙাপণ করে বসেছিল-এ অবস্থায় তিনি এ কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইতস্তত করছিলেন। এ কারণে হযরত যায়েদ (রা.) যখন স্ত্রীকে তালাক দেবার সংকল্প প্রকাশ করেন তখন নবী করীম ﷺ তাঁকে বলেন আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যায়েদ যদি তালাক না দেন, তাহলে তিনি এ বিপদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। নয়তো যায়েদ তালাক দিলেই তাঁকে হুকুম পালন করতে হবে এবং তারপর তাঁর বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় ও অপপ্রচারের ভয়াবহ তুফান সৃষ্টি করা হবে। কিন্তু মহান আল্লাহ‌ তাঁর নবীকে উচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর ফায়সালায় রাজি থাকার যে উচ্চ মর্যাদার আসনে দেখতে চাচ্ছিলেন সে দৃষ্টিতে নবী করীমের ﷺ ইচ্ছা করে যায়েদকে তালাক থেকে বিরত রাখা নিম্নমানের কাজ বিবেচিত হয়। তিনি আসলে ভাবছিলেন যে, এর ফলে তিনি এমন কাজ করা থেকে বেঁচে যাবেন যাতে তাঁর দুর্নামের আশঙ্কা ছিল। অথচ আল্লাহ‌ একটি বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে দিয়ে সে কাজটি করাতে চাচ্ছিলেন। “তুমি লোকভয় করছ অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিকতর সঙ্গত”-এ কথাগুলো পরিষ্কারভাবে এ বিষয়বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করছে।

ইমাম যয়নুল আবেদীন হযরত আলী ইবনে হোসাইন (রা.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাই বলেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ নবী ﷺ কে এই মর্মে খবর দিয়েছিলেন যে, যয়নব (রা.) আপনার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হতে যাচ্ছেন। কিন্তু যায়েদ (রা.) যখন এসে তাঁর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রী ত্যাগ করো না। এ কথায় আল্লাহ‌ বললেন, আমি তোমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি তোমাকে যয়নবের সাথে যয়নবের সাথে বিয়া দিচ্ছি অথচ তুমি যায়েদের সাথে কথা বলার সময় আল্লাহ‌ যেকথা প্রকাশ করতে চান তা গোপন করছিলে। (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)

আল্লামা আলূসীও তাফসীর রুহল মা’আনীতে এর একই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “এটি হচ্ছে শ্রেয়তর কাজ পরিত্যাগ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ। নবী ﷺ নিশ্চুপ থাকতেন অথবা যায়েদকে (রা.) বলতেন, তুমি যা চাও করতে পারো, এ অবস্থায় এটিই ছিল শ্রেয়তর। অভিব্যক্ত ক্রোধের সারৎসার হচ্ছেঃ তুমি কেন যায়েদকে বললে তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না? অথচ আমি তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে, যয়নব তোমার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হবে।”

৭১

অর্থাৎ যায়েদ (রা.) যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তাঁর ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। “প্রয়োজন পূর্ণ করলো” শব্দ গুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তাঁর কাছে যায়েদের আর কোন প্রয়োজন থাকলো না। কেবলমাত্র তালাক দিলেই এ অবস্থাটির সৃষ্টি হয় না। কারণ স্বামীর আর কোন আকর্ষণ থেকে গেলে ইদ্দতের মাঝখানে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার কথা জানতে পারার মধ্যেও স্বামীর প্রয়োজন থেকে যায়। তাই যখন ইদ্দত খতম হয়ে যায় একমাত্র তখনই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর মধ্যে স্বামীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।

৭২

নবী ﷺ নিজেই নিজের ইচ্ছায় এ বিয়ে করেননি বরং আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে করেন, এ ব্যাপারে এ শব্দগুলো একবারেই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

৭৩

এ শব্দগুলো একথা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে যে, আল্লাহ‌ এ কাজ নবী ﷺ এর মাধ্যমে এমন একটি প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য করিয়েছিলেন যা এ পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনভাবে সম্পাদিত হতে পারতো না। আরবে পালক পুত্রদের সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যাপারে যে সমস্ত ভ্রান্ত রসম-রেওয়াজের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল আল্লাহর রসূল নিজে অগ্রসর হয়ে না ভাঙলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ও উচ্ছেদ করার আর কোন পথ ছিল না। কাজেই আল্লাহ‌ নিছক নবীর গৃহে আর একজন স্ত্রী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নয় বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ বিয়ে করিয়েছিলেন।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এর দ্বারা হযরত যায়দ ইবনে হারেছা (রাযি.)কে বোঝানো হয়েছে। তার প্রতি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তো ছিল এই যে, তিনি তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে পৌঁছে দেন ও ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন। তিনি ছিলেন সেই চার সাহাবীর একজন, যারা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছিলেন, তার ব্যাখ্যা এই যে, তিনি আট বছর বয়সে নিজ মায়ের সাথে নানাবাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে কায়ন গোত্রের লোক হামলা চালিয়ে তাকে গোলাম বানিয়ে ফেলে এবং উকাজের মেলায় হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রাযি.)-এর কাছে বিক্রি করে ফেলে। তিনি তার এ শিশু গোলামটিকে নিজ ফুফু হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রাযি.)কে দিয়ে দেন। অতঃপর যখন হযরত খাদীজা (রাযি.)-এর সাথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবাহ হয়, তখন হযরত খাদীজা (রাযি.) তাকে তাঁর খেদমতে পেশ করেন। হযরত যায়দ (রাযি.)-এর বয়স তখন পনের বছর। এর কিছুকাল পর তার পিতা ও চাচা জানতে পারে যে, তাদের সন্তান মক্কা মুকাররমায় আছে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছুটে আসল এবং আরজ করল আপনি যে কোনও বিনিময় চান আমরা দিতে রাজি আছি, তবু আমাদের সন্তানকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। তিনি বললেন, আপনাদের ছেলে যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, তবে কোনরূপ বিনিময় ছাড়াই তাকে আপনাদের হাতে ছেড়ে দেব। কিন্তু সে যদি যেতে সম্মত না হয়, তবে আমি তাকে যেতে বাধ্য করতে পারব না। একথা শুনে তারা অত্যন্ত খুশী হল। তারপর হযরত যায়দ (রাযি.)কে ডাকা হল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এখতিয়ার দিলেন যে, তিনি চাইলে নিজ পিতা ও চাচার সঙ্গে যেতে পারেন এবং চাইলে থেকেও যেতে পারেন, কিন্তু হযরত যায়দ (রাযি.) এই বিস্ময়কর উত্তর দিলেন যে, আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। একথা শুনে তার পিতা ও চাচা হতবিহ্বল হয়ে গেল। কী বলে তাদের ছেলে! স্বাধীনতার চেয়ে দাসত্বকেই সে বেশি পছন্দ করছে? নিজ পিতা ও চাচার উপর এক অনাত্মীয় ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে? কিন্তু হযরত যায়দ (রাযি.) তার কথায় অনড়। তিনি বললেন, আমি আমার এ প্রভুর আচার-ব্যবহার দেখেছি। আমি তার যে ব্যবহার পেয়েছি তারপর দুনিয়ার কোনও ব্যক্তিকেই আমি তার উপর প্রাধান্য দিতে পারব না। প্রকাশ থাকে যে, এটা সেই সময়ের ঘটনা, যখনও পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেননি। শেষ পর্যন্ত তার পিতা ও চাচা তাকে ছাড়াই ফিরে গেল, তবে আশ্বস্ত হয়ে গেল যে, তাদের ছেলে এখানে ভালো থাকবে। অনন্তর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে দিলেন এবং পবিত্র কাবার কাছে গিয়ে কুরাইশের লোকজনের সামনে ঘোষণা করে দিলেন ‘আজ থেকে সে আমার পুত্র! আমি তাকে দত্তক গ্রহণ করলাম। এরই ভিত্তিতে লোকে তাকে যায়দ ইবনে মুহাম্মাদ ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র’ বলে ডাকত।

তাফসীরে জাকারিয়া

৩৭. আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে বজায় রাখ এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর(১) আর আপনি আপনার অন্তরে গোপন করছিলেন এমন কিছু যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিচ্ছেন(২); এবং আপনি লোকদেরকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সংগত। তারপর যখন যায়েদ তার (স্ত্রীর) সাথে প্রয়োজন শেষ করল(৩), তখন আমরা তাকে আপনার নিকট বিয়ে দিলাম(৪), যাতে মুমিনদের পোষ্য পুত্রদের স্ত্রীদেরকে (স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে) কোন সমস্যা না হয় যখন তারা (পোষ্য পুত্ররা) নিজ স্ত্রীর সাথে প্রয়োজন শেষ করবে (এবং তালাক দিবে)। আর আল্লাহ্‌র আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।

(১) অর্থাৎ “স্মরণ করুন যখন আল্লাহ ও আপনি নিজে যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তাকে বলছিলেন যে, তুমি নিজের স্ত্রীকে তোমার বিবাহাধীনে থাকতে দাও।” এ ব্যক্তি হলো যায়েদ। আল্লাহ তাকে ইসলামে দীক্ষিত করে তার প্রতি প্রথম অনুগ্রহ প্ৰদৰ্শন করেন। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যায়নাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার সম্পর্কে ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব, গোত্ৰগত কৌলিন্যভিমান এবং আনুগত্য ও শৈথিল্য প্রদর্শনের অভিযোগ উত্থাপন করতেন। একদিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে এসব অভিযোগ পেশ করতে গিয়ে যায়নবকে তালাক দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেনঃ “নিজ স্ত্রীকে তোমার বিবাহধীনে থাকতে দাও এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর।” (দেখুন: বাগভী; ফাতহুল কাদীর; তাবারী)

(২) এর ব্যাখ্যা এই যে, আপনি অন্তরে যে বিষয় গোপন রেখেছেন তা এ বাসনা যে, যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যয়নবকে তালাক দিলে পরে আপনি তাকে বিয়ে করবেন। (ফাতহুল কাদীর; বাগভী)

(৩) অর্থাৎ যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। “প্রয়োজন পূর্ণ করলো” শব্দগুলো স্বতঃস্ফৰ্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তার কাছে যায়েদের আর কোন প্রয়োজন থাকলো না। (মুয়াস্‌সার; ফাতহুল কাদীর)

(৪) অর্থাৎ আপনার সাথে তার বিয়ে স্বয়ং আমরা সম্পন্ন করে দিয়েছি। এর ফলে একথা বোঝা যায় যে, এ বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ নিজেই সম্পন্ন করে দেয়ার মাধ্যমে বিয়ে-শাদীর সাধারণভাবে প্রচলিত শর্তাবলীর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে এ বিয়ের প্রতি বিশেষ মর্যাদা আরোপ করেছেন। (তাবারী; বাগভী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৩৭) স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলেছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।’ আর তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোককে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত।(1) অতঃপর যায়েদ যখন তার (স্ত্রী যয়নাবের) সাথে বিবাহ-সম্পর্ক ছিন্ন করল,(2) তখন আমি তোমার সাথে তার বিবাহ দিলাম;(3) যাতে বিশ্বাসীদের পোষ্যপুত্রগণ নিজ স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সে সব রমণীকে বিবাহ করায় তাদের কোন বিঘ্ন না থাকে।(4) আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।(5)

(1) কিন্তু যেহেতু তাঁদের মন-মানসিকতায় পার্থক্য ছিল, স্ত্রীর মনে বংশ-মর্যাদা ও আভিজাত্য বাসা বেঁধেই ছিল, অন্য দিকে যায়েদের সমভ্রমে ছিল দাসত্বের দাগ। ফলে তাঁদের আপোসে কলহ লেগেই থাকত, যা যায়েদ (রাঃ) মাঝে মাঝে নবী (সাঃ)-এর নিকট প্রকাশ করতেন এবং ত্বালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কিন্তু নবী (সাঃ) তাঁকে ত্বালাক দিতে নিষেধ করতেন ও কোন রকম ভাবে চালিয়ে নেওয়ার জন্য বলতেন। অপর দিকে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-কে অহীর মাধ্যমে এই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছিলেন যে, যায়েদের পক্ষ থেকে ত্বালাক হবে এবং তারপর যয়নাবের সাথে তোমার বিয়ে হবে; যাতে জাহেলিয়াতের পোষ্যপুত্র রাখার প্রথার উপর জোর কুঠারাঘাত হেনে প্রকাশ করে দেওয়া হবে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে পোষ্যপুত্র আপন পুত্রের মত নয় এবং তার ত্বালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা বৈধ। উক্ত আয়াতে এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যায়েদ (রাঃ)-এর উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এই ছিল যে, তিনি তাঁকে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। আর নবী (সাঃ)-এর তাঁর প্রতি দয়া এই ছিল যে, তিনি তাঁকে দ্বীনী তরবিয়ত দান করেন ও তাঁকে স্বাধীন করে আপন পুত্র বানিয়ে নেন এবং আপন ফুফু উমাইমা বিনতে আব্দুল মুত্তালেবের মেয়ের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করেন। অন্তরে গোপন করা কথা তাই ছিল, যা তাঁকে যয়নাবের সাথে তাঁর নিজের বিয়ের ব্যাপারে অহী দ্বারা জানানো হয়েছিল। নবী (সাঃ) এই কথার ভয় করতেন যে, লোকে বলবে, ছেলের স্ত্রীকে (পুত্রবধূকে) বিয়ে করে নিয়েছে। অথচ যখন আল্লাহ তাঁর দ্বারা এই প্রথার মূল উৎপাটন করতে চান, তখন মানুষকে ভয় করার কোন প্রয়োজন ছিল না। নবী (সাঃ)-এর যদিও এটা প্রকৃতিগত ভয় ছিল, তবুও তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ করার অর্থ হল যে, এ বিবাহ হবে, যাতে এ ব্যাপারে সকলে অবগত হয়ে যায়।

(2) অর্থাৎ, বিয়ের পর ত্বালাক দিল এবং যয়নাব ইদ্দত পূর্ণ করল।

(3) অর্থাৎ, এ বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাকের আদেশে সাধারণ বিয়ে-শাদীর প্রচলিত নিয়ম ও শর্তাবলী থেকে ব্যতিক্রম ভাবে সুসম্পন্ন হয়। অর্থাৎ ঈজাব-কবুল, অলী (অভিভাবক), মোহর এবং কোন সাক্ষী ছাড়াই।

(4) এটি হল যয়নাবের সাথে নবী (সাঃ)-এর বিয়ের কারণ। আর তা এই যে, আগামীতে কোন মুসলিম যেন এই ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতা বোধ না করে এবং প্রয়োজনে পোষ্যপুত্রের ত্বালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারে।

(5) অর্থাৎ, পূর্ব থেকে তকদীরে লেখা ছিল। যা যে কোন অবস্থাতেই হওয়ার ছিল।