ওয়া ইন কনতুন্না তুরিদনাল্লা-হা ওয়া রছূলাহূওয়াদ্দা-রল আ-খিরতা ফাইন্নাল্লা-হা আ‘আদ্দা লিলমুহছিনা-তি মিনকুন্না আজরন ‘আজীমা-।উচ্চারণ
আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতের প্রত্যাশী হও, তাহলে জেনে রাখো তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য আল্লাহ মহা প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। ৪২ তাফহীমুল কুরআন
আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখেরাতের নিবাস কামনা কর, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীলা, তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। #%২৪%#মুফতী তাকী উসমানী
আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাত কামনা কর তাহলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্মশীল আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।মুজিবুর রহমান
পক্ষান্তরে যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও পরকাল কামনা কর, তবে তোমাদের সৎকর্মপরায়ণদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
‘আর যদি তোমরা কামনা কর আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও আখিরাত, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল আল্লাহ্ তাদের জন্যে মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
‘আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’।আল-বায়ান
আর তোমরা যদি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও পরকালের গৃহ কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।তাইসিরুল
আর যদি তোমরা আল্লাহ্কে ও তাঁর রসূলকে এবং আখেরাতে আবাস কামনা করে থাক তাহলে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যের সৎকর্মশীলদের জন্য প্রস্তুত করেছেন এক বিরাট প্রতিদান।মাওলানা জহুরুল হক
৪২
এ আয়াতটি নাযিল হবার সময় নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী ছিল চারজন। তাঁরা ছিলেন হযরত সওদা (রা.), হযরত আয়েশা (রা.), হযরত হাফসা (রা.) এবং হযরত উম্মে সালামাহ (রা.)। তখনো হযরত যয়নবের (রা.) সাথে নবী করীমের ﷺ বিয়ে হয়নি। (আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী, ১৯৫৮ সালে মিসর থেকে মুদ্রিত, ৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২-৫১৩) এ আয়াত নাযিল হবার পর নবী করীম ﷺ সর্বপ্রথম হযরত আয়েশার সাথে আলোচনা করেন এবং বলেন, “আমি তোমাকে একটি কথা বলছি, জবাব দেবার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না। তোমার বাপ-মায়ের মতামত নাও এবং তারপর ফায়সালা করো।” তারপর তিনি তাঁকে বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এ হুকুম এসেছে এবং তাঁকে এ আয়াত শুনিয়ে দেন। হযরত আয়েশা বলেন, “এ ব্যাপারটি কি আমি আমার বাপ-মাকে জিজ্ঞেস করবো? আমি তো আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে চাই।” এরপর নবী ﷺ এক এক করে তাঁর অন্যান্য পবিত্র স্ত্রীদের প্রত্যেকের কাছে যান এবং তাঁদেরকে একই কথা বলেন। তারা প্রত্যেকে হযরত আয়েশার (রা.) মতো একই জবাব দেন। (মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম ও নাসাঈ)
ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় “তাখঈর।” অর্থাৎ স্ত্রীকে তার স্বামীর থাকার বা আলাদা হয়ে যাবার মধ্য থেকে যে কোন একটিকে বাছাই করে নেবার ফায়সালা করার ইখতিয়ার দান করা। এই তাখঈর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওয়াজিব ছিল। কারণ আল্লাহ তাঁকে এর হুকুম দিয়েছিলেন। যদি তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণের কেউ আলাদা হয়ে যাবার পথ অবলম্বন করতেন তাহলে তিনি আপনা আপনিই আলাদা হয়ে যেতেন না বরং নবী করীমের ﷺ আলাদা করে দেবার কারণে আলাদা হয়ে যেতেন যেমন আয়াতের শব্দাবলী থেকে সুস্পষ্ট হচ্ছেঃ “এসো আমি কিছু দিয়ে তোমাদের ভালোভাবে বিদায় করে দেই।” কিন্তু এ অবস্থায় তাঁকে আলাদা করে দেয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওয়াজিব ছিল। কারণ নিজের প্রতিশ্রুতি পালন না করা নবী হিসেবে তাঁর জন্য সমীচীন ছিল না। আলাদা হয়ে যাবার পর বাহ্যত এটাই মনে হয়, মু’মিনের মাতার তালিকা থেকে তাঁর নাম কাটা যেতো এবং অন্য মুসলমানের সাথে তাঁর বিবাহ আর হারাম থাকতো না। কারণ তিনি দুনিয়া এবং তার সাজসজ্জার জন্যই তো রসূলে করীমের ﷺ থেকে আলাদা হতেন এবং এর অধিকার তাঁকে দেয়া হয়েছিল। আর একথা সুস্পষ্ট যে, অন্য কারো সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ থাকলে তাঁর এ উদ্দেশ্য পূর্ণ হতো না। অন্যদিকে আয়াতের এটিও একটি উদ্দেশ্য মনে হয়, নবী করীমের ﷺ যে সকল স্ত্রী আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে পছন্দ করে নিয়েছেন তাঁদেরকে তালাক দেবার ইখতিয়ার নবীর আর থাকেনি। কারণ তাখঈরের দু’টি দিক ছিল। এক, দুনিয়াকে গ্রহণ করলে তোমাদেরকে আলাদা করে দেয়া হবে। দুই, আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ করলে তোমাদের আলাদা করে দেয়া হবে না। এখন একথা সুস্পষ্ট, এ দু’টি দিকের মধ্য থেকে যে কোন একটি দিকই কোন মহিমান্বিতা মহিলা গ্রহণ করলে দ্বিতীয় দিকটি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যেতো।
ইসলামী ফিকহে “তাখঈর” আসলে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার পর্যায়ভুক্ত। অর্থাৎ স্বামী এর মাধ্যমে স্ত্রীকে এ ক্ষমতা দেয় যে, সে চাইলে তার স্ত্রী হিসেবে থাকতে পারে এবং চাইলে আলাদা হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়টির ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইজতিহাদের মাধ্যমে ফকীহগণ যে বিধান বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নরূপঃ
একঃ এ ক্ষমতা একবার স্ত্রীকে দিয়ে দেবার পর স্বামী আর তা ফেরত নিতে পারে না এবং স্ত্রীকে তা ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতেও পারে না। তবে স্ত্রীর জন্য তা ব্যবহার করা অপরিহার্য হয়ে যায় না। সে চাইলে স্বামীর সাথে থাকতে সম্মত হতে পারে, চাইলে আলাদা হয়ে যাবার কথা ঘোষণা করতে পারে এবং চাইলে কোন কিছুর ঘোষণা না দিয়ে এ ক্ষমতাকে এমনিই নষ্ট হয়ে যাবার সুযোগ দিতে পারে।
দুইঃ এ ক্ষমতাটি স্ত্রীর দিকে স্থানান্তরিত হবার জন্য দু’টি শর্ত রয়েছে। প্রথমত স্বামী কর্তৃক তাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তালাকের ইখতিয়ার দান করা চাই, অথবা তালাকের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় না বললেও এ ইখতিয়ার দেবার নিয়ত তার থাকা চাই। যেমন, সে যদি বলে, “তোমার ইখতিয়ার আছে” বা “তোমার ব্যাপার তোমার হাতে আছে,” তাহলে এ ধরনের ইঙ্গিতধর্মী কথার ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত ছাড়া তালাকের ইখতিয়ার স্ত্রীর কাছে স্থানান্তরিত হবে না। যদি স্ত্রী এর দাবী করে এবং স্বামী হলফ সহকারে বিবৃতি দেয় যে, এর মাধ্যমে তালাকের ইখতিয়ার সোপর্দ করার উদ্দেশ্য তার ছিল না, তাহলে স্বামীর কথা গ্রহণ করা হবে। তবে স্ত্রী যদি এ মর্মে সাক্ষ্য হাজির করে যে, অবনিবনা ঝগড়া বিবাদের পরিবেশে বা তালাকের কথাবার্তা চলার সময় একথা বলা হয়েছিল, তাহলে তখন তার দাবী বিবেচিত হবে। কারণ এ প্রেক্ষাপটে ইখতিয়ার দেবার অর্থ এটাই বুঝা যাবে যে, স্বামীর তালাকের ইখতিয়ার দেবার নিয়ত ছিল। দ্বিতীয়ত স্ত্রীর জানতে হবে যে, তাকে এ ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে। যদি সে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তার কাছে এ খবর পৌঁছতে হবে এবং যদি সে উপস্থিত থাকে, তাহলে এ শব্দগুলো তার শুনতে হবে। যতক্ষণ সে নিজ কানে শুনবে না অথবা তার কাছে খবর পৌঁছবে না ততক্ষণ ইখতিয়ার তার কাছে স্থানান্তরিত হবে না।
তিনঃ যদি স্বামী কোন সময় নির্ধারণ করা ছাড়াই শর্তহীনভাবে স্ত্রীকে ইখতিয়ার দান করে, তাহলে স্ত্রী কতক্ষণ পর্যন্ত এ ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে? এ ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ পাওয়া যায়। একটি দল বলেন, যে বৈঠকে স্বামী একথা বলে সে বৈঠকেই স্ত্রী তার ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। যদি সে কোন জবাব না দিয়ে সেখান থেকে উঠে যায় অথবা এমন কাজে লিপ্ত হয় যা একথাই প্রমাণ করে যে, সে জবাব দিতে চায় না, তাহলে তার ইখতিয়ার বাতিল হয়ে যাবে। এ মত পোষণ করেন হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.), হযরত জাবের ইবনে যায়েদ, আতা (র), মুজাহিদ (র), শা’বী (র), ইবরাহীম নাখঈ (র), ইমাম মালেক (র), ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম শাফেঈ (র), ইমাম আওযায়ী (র), সুফিয়ান সওরী (র) ও আবু সওর (র)। দ্বিতীয় দলের মতে, তার ইখতিয়ার ঐ বৈঠক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তারপরও সে এ ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবে। এ মত পোষণ করেন হযরত হাসান বসরী (র), কাতাদাহ ও যুহরী।
চারঃ স্বামী যদি সময় নির্ধারণ করে দেয়। যেমন, সে যদি বলে, এক মাস বা এক বছর পর্যন্ত তোমাকে ইখতিয়ার দিলাম অথবা এ সময় পর্যন্ত তোমার বিষয় তোমার হাতে রইলো, তাহলে ঐ সময় পর্যন্ত সে এ ইখতিয়ার ভোগ করবে। তবে যদি সে বলে, তুমি যখন চাও এ ইখতিয়ার ব্যবহার করতে পারো, তাহলে এ অবস্থায় তার ইখতিয়ার হবে সীমাহীন।
পাঁচঃ স্ত্রী যদি আলাদা হতে চায়, তাহলে তাকে সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত অর্থবোধক শব্দাবলীর মাধ্যমে তা প্রয়োগ করতে হবে। অস্পষ্ট শব্দাবলী, যার মাধ্যমে বক্তব্য সুস্পষ্ট হয় না, তা দ্বারা ইখতিয়ার প্রয়োগ কার্যকর হতে পারে না।
ছয়ঃ আইনত স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে ইখতিয়ার দেবার জন্য তিনটি বাক্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এক, সে বলবে, “তোমার ব্যাপারটি তোমার হাতে রয়েছে।” দুই, সে বলবে, “তোমাকে ইখতিয়ার দেয়া হচ্ছে।” তিন, সে বলবে, “যদি তুমি চাও তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম।” এর মধ্যে প্রত্যেকটির আইনগত ফলাফল হবে ভিন্ন রকমেরঃ
(ক) “তোমার বিষয়টি তোমার হাতে রয়েছে” --এ শব্দগুলো যদি স্বামী বলে থাকে এবং স্ত্রী এর জবাবে এমন কোন স্পষ্ট কথা বলে যা থেকে বুঝা যায় যে, সে আলাদা হয়ে গেছে, তাহলে হানাফী মতে এক তালাক বায়েন হয়ে যাবে। অর্থাৎ এরপর স্বামী আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ইদ্দত অতিবাহিত হবার পর উভয়ে আবার চাইলে পরস্পরকে বিয়ে করতে পারে। আর যদি স্বামী বলে থাকে, “এক তালাক পর্যন্ত তোমার বিষয়টি তোমার হাতে রয়েছে,” তাহলে এ অবস্থায় একটি ‘রজঈ’ তালাক অনুষ্ঠিত হবে। (অর্থাৎ ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে।) কিন্তু স্বামী যদি বিষয়টি স্ত্রীর হাতে সোপর্দ করতে গিয়ে তিন তালাকের নিয়ত করে থাকে অথবা একথা সুস্পষ্ট করে বলে থাকে, তাহলে সে সুস্পষ্ট ভাষায় নিজের ওপর তিন তালাক আরোপ করুক অথবা কেবলমাত্র একবার বলুক আমি আলাদা হয়ে গেলাম বা নিজেকে তালাক দিলাম, এ অবস্থায় স্ত্রীর ইখতিয়ার তালাকের সমার্থক হবে।
(খ) “তোমাকে ইখতিয়ার দিলাম” শব্দগুলোর সাথে যদি স্বামী স্ত্রীকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ইখতিয়ার দিয়ে থাকে এবং স্ত্রী আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে থাকে, তাহলে হানাফীর মতে স্বামীর তিন তালাকের ইখতিয়ার দেবার নিয়ত থাকলেও একটি বায়েন তালাকই অনুষ্ঠিত হবে। তবে যদি স্বামীর পক্ষ থেকে তিন তালাকের ইখতিয়ার দেবার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রীর তালাকের ইখতিয়ারের মাধ্যমে তিন তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। ইমাম শাফেঈর (র) মতে, যদি স্বামী ইখতিয়ার দেবার সময় তালাকের নিয়ত করে থাকে এবং স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়, তাহলে একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে। ইমাম মালেকের (র) মতে, স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস করে থাকে তাহলে তিন তালাক অনুষ্ঠিত হবে আর যদি সহবাস না করে থাকে, তাহলে এ অবস্থায় স্বামী এক তালাকের নিয়তের দাবী করলে তা মেনে নেয়া হবে।
(গ) “যদি তুমি চাও, তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম” --একথা বলার পর যদি স্ত্রী তালাকের ইখতিয়ার ব্যবহার করে, তাহলে বায়েন নয় বরং একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে।
সাতঃ যদি স্বামীর পক্ষ থেকে আলাদা হবার ইখতিয়ার দেবার পর স্ত্রী তার স্ত্রী হয়ে থাকার জন্য নিজের সম্মতি প্রকাশ করে, তাহলে কোন তালাক সংঘটিত হবে না। এ মত পোষণ করেন হযরত উমর (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত আয়েশা (রা.), হযরত আবু দারদা (রা.), হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) ও হযরত ইবনে উমর (রা.)। সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহগণ এ মতই অবলম্বন করেছেন। মাসরূক হযরত আয়েশাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাব দেনঃ
خَيَّرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نِسَاءَهُ فَاخْتَرْنَهُ ، أَفَكَانَ ذَلِكَ طَلاَقًا؟
“রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদেরকে ইখতিয়ার দিয়েছিলেন এবং তাঁরা রসূলূল্লাহরই সাথে থাকা পছন্দ করেছিলেন। একে কি তালাক বলে গণ্য করা হয়? ”
এ ব্যাপারে একমাত্র হযরত আলীর (রা.) ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেতের (রা.) এ অভিমত উদ্ধৃত হয়েছে যে, এক্ষেত্রে একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এ উভয় মনীষীর অন্য একটি বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তাঁরাও এক্ষেত্রে কোন তালাক সংঘটিত হবে না বলে মত প্রকাশ করেছেন।
এ আয়াতসমূহের পটভূমি এই যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুণ্যবতী স্ত্রীগণ সম্পর্কে সকলেরই জানা তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি পরম নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। কোন রকম কষ্টের অভিযোগ তাদের মুখে কখনও উচ্চারিত হয়নি। আহযাব ও বনু কুরাইজার যুদ্ধের পর কেবল এতটুকু ঘটেছিল যে, এসব যুদ্ধ জয়ের ফলে যখন মুসলিমদের কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য লাভ হল, তখন উম্মত মাতাদের অন্তরে খেয়াল জাগল, এতদিন তারা যে দৈন্যদশার ভেতর দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন, এখন তার ভেতর কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। সুতরাং একবার তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে বিষয়টা উত্থাপনও করলেন। কথা প্রসঙ্গে তারা কায়সার ও কিসরার রাণীদের উদাহরণও টানলেন যে, তারা কতটা জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করে এবং তাদের প্রত্যেকের কত সেবক-সেবিকা রয়েছে। এখন যখন মুসলিমদের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসে গেছে, তখন আমাদের খোরপোষও কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও নবী-পত্নীদের অন্তরে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের এতটুকু চাহিদা জাগা কোন গুনাহের বিষয় ছিল না, কিন্তু শ্রেষ্ঠতম নবীর জীবনসঙ্গিনী হওয়ার সুবাদে তারা যে উচ্চতর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এরূপ চাহিদা পেশকে তাদের পক্ষে শোভন মনে করা হয়নি। সেই সঙ্গে রাজা-রাণীদের উদাহরণ টানায়ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে কষ্ট লেগে থাকবে যে, তারা নিজেদেরকে রাণীদের সঙ্গে তুলনা করার মত অমর্যাদাকর উক্তি কেন করলেন। এ প্রেক্ষাপটেই আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের এ আয়াতসমূহ দ্বারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশনা দান করলেন যে, আপনি আপনার স্ত্রীগণকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন, তারা যদি নবীর সঙ্গে থাকতে চায়, তবে তাদের জীবনদৃষ্টির পরিবর্তন করতে হবে। অন্যান্য নারীদের মত দুনিয়ার ডাটফাট যেন তাদের লক্ষ্যবস্তু না হয়; বরং তাদের লক্ষ্যবস্তু থাকতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং তার ফলশ্রুতিতে আখেরাতের সফলতা। সেই সঙ্গে তাদের সামনে এ বিষয়টাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যদি দুনিয়ায় ভোগ-সামগ্রী কামনা করে তবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার তাদের রয়েছে। আর তারা তা চাইলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম যে তাদেরকে তিক্ততার সাথে বিদায় দেবেন তা নয়; বরং সুন্নত মোতাবেক উপঢৌকনাদি দিয়ে অত্যন্ত সৌজন্যের সাথেই তাদেরকে বিদায় দেবেন। সুতরাং এ আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীগণের সামনে এ প্রস্তাবনা রাখলেন, কিন্তু তারাও তো ছিলেন নবী-পত্নী। নবীর নুরানী সান্নিধ্যে থেকে থেকে ইতোমধ্যেই তো পার্থিব মোহমুক্তি তাদের অর্জিত হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলার ও তাঁর নবীর মহব্বতে তাদের অন্তর ছিল প্লাবিত। কাজেই তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন আর সেজন্য যত দৈন্য ও দুঃখের সম্মুখীন হতে হোক না কেন তাকে তারা তুচ্ছ গণ্য করলেন।
২৯. আর যদি তোমরা কামনা কর আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাতের আবাস, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীলা আল্লাহ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্ৰস্তুত রেখেছেন।(১)
(১) এ আয়াতে সকল পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে অধিকার প্রদান করা হয়েছে যে, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বর্তমান দারিদ্র্যপীড়িত চরম আর্থিক সঙ্কটপূৰ্ণ অবস্থা বরণ করে হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক অক্ষুন্ন রেখে জীবন যাপন করবেন অথবা তালাকের মাধ্যমে তার থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। প্রথমাবস্থায় অন্যান্য স্ত্রীলোকের তুলনায় পুরস্কার এবং আখেরাতে স্বতন্ত্র ও সুউচ্চ মর্যাদাসমূহের অধিকারী হবেন। আর দ্বিতীয় অবস্থা, অর্থাৎ তালাক গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতেও তাদেরকে দুনিয়ার অপরাপর লোকের ন্যায় বিশেষ জটিলতা ও অগ্ৰীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে না; বরং সুন্নত মোতাবেক যুগল বস্ত্ৰ প্রভৃতি প্রদান করে সসম্মানে বিদায় দেয়া হবে। ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় “তাখঈর”। অর্থাৎ স্ত্রীকে তার স্বামীর সাথে থাকার বা আলাদা হয়ে যাবার মধ্য থেকে যে কোন একটিকে বাছাই করে নেবার ফায়সালা করার ইখতিয়ার দান করা। (ফাতহুল কাদীর; বাগাবী)
হাদীসে এসেছে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন অধিকার প্রদানের এ আয়াত নাযিল হয়, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এটি প্রকাশ ও প্রচারের সূচনা করেন। আয়াত শোনানোর পূর্বে বলেন যে, আমি তোমাকে একটি কথা বলব-উত্তরটা কিন্তু তাড়াহুড়া করে দেবে না। বরং তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শের পর দেবে। আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমাকে আমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ না করে মতামত প্রকাশ করা থেকে যে বারণ করেছিলেন, তা ছিল আমার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক অপার অনুগ্রহ। কেননা, তার অটুট বিশ্বাস ছিল যে, আমার পিতা-মাতা কখনো আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বনের পরামর্শ দেবেন না। এ আয়াত শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আরয করলাম যে, এ ব্যাপারে আমার পিতা-মাতার পরামর্শ গ্রহণের জন্য যেতে পারি কি? আমি তো আল্লাহ্ তা'আলা, তাঁর রাসূল ও আখেরাতকে বরণ করে নিচ্ছি। আমার পরে অন্যান্য সকল পুণ্যবতী স্ত্রীগণকে কুরআনের এ নির্দেশ শোনানো হলো। আমার মত সবাই একই মত ব্যক্ত করলেন; রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দাম্পত্য সম্পর্কের মোকাবেলায় ইহলৌকিক প্রাচুর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যকে কেউ গ্রহণ করলেন না। (মুসলিম: ১৪৭৫)
(২৯) পক্ষান্তরে তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং পরকাল কামনা করলে, তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীলা আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’ (1)
(1) বিভিন্ন দেশ জয়লাভ করার পর যখন মুসলিমদের অবস্থা পূর্বের তুলনায় কিছুটা সচ্ছল হল, তখন মুহাজির ও আনসারদের স্ত্রীদের দেখাদেখি মহানবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগণও খোরপোষের পরিমাণ বৃদ্ধির দাবী জানালেন। নবী (সাঃ) যেহেতু বিলাসহীন জীবন-যাত্রা পছন্দ করতেন, সেহেতু স্ত্রীদের এই দাবীতে বড় দুঃখিত হলেন এবং এক মাসের জন্য স্ত্রীদের নিকট থেকে আলাদা হয়ে একাকী বাস করলেন।
অবশেষে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন। উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সর্বপ্রথম তিনি আয়েশা (রাঃ) -কে উক্ত আয়াত শুনিয়ে তাঁকে তাঁর সংসারে থাকা ও না থাকার ব্যাপারে এখতিয়ার দিলেন এবং বললেন, নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পিতা-মাতার পরামর্শ নিয়ে যা করার করবে। আয়েশা (রাঃ) বললেন, আপনার বিষয়ে পরামর্শ করব তা কি করে হয়? বরং আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে পছন্দ করি। অন্য সকল স্ত্রীগণও এই একই মত ব্যক্ত করলেন এবং কেউ নবী (সাঃ)-কে ত্যাগ করে পার্থিব প্রাচুর্য ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দিলেন না। (সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা আহযাব) সেই সময় নবী (সাঃ)-এর সংসারে নয়জন স্ত্রী ছিলেন; পাঁচজন ছিলেন কুরাইশ বংশের। আয়েশা, হাফস্বা, উম্মে হাবীবা, সাওদা ও উম্মে সালামা (রাঃ) এবং এ ছাড়া বাকি চার জন হলেন; সাফিয়্যা, মাইমুনা, যায়নাব ও জুওয়াইরিয়া (রাঃ) । অনেকে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে পৃথক হয়ে যাওয়ার এখতিয়ারকে ত্বালাক বলে গণ্য করেন। কিন্তু এ কথা সঠিক নয়। সঠিক মাসআলা এই যে, এখতিয়ার দেওয়ার পর যদি স্ত্রী পৃথক হয়ে যাওয়াকে বেছে নেয়, তাহলে অবশ্যই ত্বালাক হয়ে যাবে। (আর তা হবে ত্বালাকে রাজয়ী; ত্বালাকে বায়েনাহ নয়, যেমন কিছু উলামার মত।) আর যদি স্ত্রী পৃথক হয়ে যাওয়াকে বেছে না নেয়, তাহলে ত্বালাক হবে না। যেমন নবী (সাঃ)-এর স্ত্রীগণ পৃথক না হয়ে তাঁর সাথে থাকাকে বেছে নিয়েছিলেন। অথচ এই বেছে নেওয়াকে ত্বালাক গণ্য করা হয়নি। (বুখারীঃ ত্বালাক অধ্যায়, মুসলিম)