ফী বিদ‘ই ছিনীনা লিল্লা-হিল আমরু মিন কাবলুওয়া মিম বা‘দু ওয়া ইয়াওমাইযিইঁ ইয়াফরহুল মু’মিনূন।উচ্চারণ
আর সেদিনটি হবে এমন দিন যেদিন আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ে মুসলমানরা আনন্দে উৎফুল্ল হবে। ৩ তাফহীমুল কুরআন
বছর কয়েকের মধ্যেই। সমস্ত ক্ষমতা আল্লাহরই, পূর্বেও এবং পরেও। সে দিন মুমিনগণ আনন্দিত হবেমুফতী তাকী উসমানী
কয়েক বছরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। আর সেদিন মু’মিনরা হর্ষোৎফুল্ল হবে –মুজিবুর রহমান
কয়েক বছরের মধ্যে। অগ্র-পশ্চাতের কাজ আল্লাহর হাতেই। সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
কয়েক বৎসরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেই দিন মু’মিনগণ হর্ষোৎফুল্ল হবে,ইসলামিক ফাউন্ডেশন
কয়েক বছরের মধ্যেই*। পূর্বের ও পরের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে,আল-বায়ান
কয়েক (তিন থেকে নয়) বছরের মধ্যেই; (কোন্ কাজ হবে) আগে ও (কোন্ কাজ হবে) পরে সে ফয়সালা আল্লাহরই। সেদিন মু’মিনরা আনন্দ করবে।তাইসিরুল
বছর কয়েকের মধ্যেই। বিধান হচ্ছে আল্লাহ্রই -- আগেরবারে এবং পরেরবারে। আর সেইদিন মুমিনরা হর্ষোল্লাস করবে --মাওলানা জহুরুল হক
৩
ইবনে আব্বাস (রা.) আবু সাঈদ খুদরী (রা.), সুফিয়ান সওরী (রা.), সুদ্দী প্রমুখ মনীষীগণ বর্ণনা করেন, ইরানীদের ওপর রোমীয়রা এবং বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের ওপর মুসলমানরা একই সময় বিজয় লাভ করেন। এ জন্য মুসলমানরা দ্বিগুণ আনন্দিত হয়। ইরান ও রোমের ইতিহাস থেকেও একথাই প্রমাণিত হয়। ৬২৪ সালে বদরের যুদ্ধ হয়। এ বছরই রোমের কায়সার অগ্নি উপাসনাবাদের প্রবর্তক জরথুষ্ট্রের জন্মস্থান ধ্বংস করেন এবং ইরানের সবচেয়ে বড় অগ্নিকুণ্ড বিধ্বস্ত করেন।
এ ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে সূরাটির পরিচিতিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, ‘কয়েক বছর’ বোঝানোর জন্য কুরআন মাজীদ بِضْعِ سِنِيْنَ শব্দ ব্যবহার করেছে।بِضْعٌ -এর অর্থ ‘কয়েক’ করা হলেও আরবীতে এ শব্দটি ‘তিন’ থেকে ‘নয়’ পর্যন্ত বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যে কারণে উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর সাথে যে বাজি ধরেছিল, তাতে সে প্রথমে বলেছিল, রোমকগণ যদি তিন বছরের মধ্যে জয়লাভ করতে পারে, তবে সে হযরত আবু বকর (রাযি.)কে দশটি উট দেবে, আর যদি তা না পারে তবে হযরত আবু বকর (রাযি.) তাকে দশটি উট দেবে। হযরত আবু বকর (রাযি.) যখন এ বাজির কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালেন, তিনি বললেন, কুরআন মাজীদে তো بِضْعٌ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা তিন থেকে নয় বছর পর্যন্তের অবকাশ রাখে। কাজেই তুমি উবাই ইবনে খালফের সাথে দশের স্থলে একশতটি উটের বাজি ধর এবং মেয়াদ তিন বছরের পরিবর্তে নয় বছর করে দাও। হযরত আবু বকর (রাযি.) তাই করলেন। যেহেতু বাহ্য দৃষ্টিতে রোমকদের জয়লাভের দূর-দূরান্তের কোন সম্ভাবনাও ছিল না তাই উবাই ইবনে খালফও তাতে সহজেই রাজি হয়ে গেল। সেমতে বাজির শর্ত দাঁড়াল, যদি রোমকগণ নয় বছরের ভেতর ইরানীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে, তবে উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রাযি.)কে একশতটি উট দেবে আর তা না হলে হযরত আবু বকর (রাযি.) তাকে একশ উট দেবেন। পূর্বে বলা হয়েছে, তখনও পর্যন্ত এরূপ বাজি ধরাকে হারাম করা হয়নি, কিন্তু যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ হয়ে যায় তত দিনে এটা হারাম হয়ে গিয়েছিল। কাজেই উবাই ইবনে খালফের পুত্রগণ একশ উট হযরত আবু বকর (রাযি.)কে আদায় করলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হুকুম দিলেন, উটগুলো সদকা করে দাও।
৪. কয়েক বছরের মধ্যেই।(১) আগের ও পরের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনগণ খুশী হবে(২),
(১) এই সূরায় রোমক ও পারসিকদের যুদ্ধের কাহিনী আলোচিত হয়েছে। এই যুদ্ধে উভয়পক্ষই ছিল কাফের। তাদের মধ্যে কারও বিজয় এবং কারও পরাজয় বাহ্যতঃ ইসলাম ও মুসলিমদের জন্যে কোন কৌতুহলের বিষয় ছিল না। কিন্তু উভয় কাফের দলের মধ্যে পারসিকরা ছিল অগ্নিপূজারী মুশরিক এবং রোমকরা ছিল নাসারা আহলে কিতাব। ফলে এরা ছিল মুসলিমদের অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী। (ইবন কাসীর)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় অবস্থানকালে পারসিকরা রোমকদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করে। হাফেজ ইবনে হাজার প্রমুখের উক্তি অনুযায়ী তাদের এই যুদ্ধ শাম দেশের আযরূ’আত ও বুসরার মধ্যস্থলে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধ চলাকালে মক্কার মুশরিকরা পারসিকদের বিজয় কামনা করত। কেননা, শির্ক ও প্রতিমা পুজায় তারা ছিল পারসিকদের সহযোগী। অপরপক্ষে মুসলিমদের আন্তরিক বাসনা ছিল রোমকরা বিজয়ী হোক। কেননা, ধর্ম ও মাযহাবের দিক দিয়ে তারা ইসলামের নিকটবর্তী ছিল। (সা'দী)
কিন্তু ফল হল এই যে, তখনকার মত পারসিকরা যুদ্ধে জয়লাভ করল। এমনকি তারা কনষ্টাণ্টিনোপলও অধিকার করে নিল এবং সেখানে উপাসনার জন্যে একটি অগ্নিকুণ্ড নির্মাণ করল। এই ঘটনায় মক্কার মুশরিকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং মুসলিমদেরকে লজ্জা দিতে লাগল যে, তোমরা যাদের সমর্থন করতে তারা হেরে গেছে। ব্যাপার এখানেই শেষ নয়; বরং আহলে কিতাব রোমকরা যেমন পারসিকদের মোকাবেলায় পরাজয় বরণ করেছে, তেমনি আমাদের মোকাবিলায় তোমরাও একদিন পরাজিত হবে। এতে মুসলিমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত হয়। (সা'দী)
সূরা রূমের প্রাথমিক আয়াতগুলো এই ঘটনা সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে। এসব আয়াতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, কয়েক বছর পরেই রোমকরা পারসিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন এসব আয়াত শুনলেন, তখন মক্কার চতুষ্পার্শ্বে এবং মুশরিকদের সমাবেশ ও বাজারে উপস্থিত হয়ে ঘোষণা করলেন, তোমাদের হর্ষোৎফুল্ল হওয়ার কোন কারণ নেই। কয়েক বছরের মধ্যে রোমকরা পারসিকদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করবে। মুশরিকদের মধ্যে উবাই ইবনে খালফ কথা ধরল এবং বলল, তুমি মিথ্যা বলছ। এরূপ হতে পারে না। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আল্লাহর দুশমন, তুই-ই মিথ্যাবাদী। আমি এই ঘটনার জন্যে বাজি রাখতে প্ৰস্তুত আছি। যদি তিন বছরের মধ্যে রোমকরা বিজয়ী না হয়, তবে আমি তোকে দশটি উষ্ট্রী দেব।
উবাই এতে সম্মত হল। একথা বলে আবু বকর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে ঘটনা বিবৃত করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো তিন বছরের সময় নির্দিষ্ট করিনি। কুরআনের এই জন্যে بضع শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কাজেই তিন থেকে নয় বছরের মধ্যে এই ঘটনা ঘটতে পারে। তুমি যাও এবং উবাইকে বল যে, আমি দশটি উষ্ট্রীর স্থলে একশ উষ্ট্রী বাজি রাখছি, কিন্তু সময়কাল তিন বছরের পরিবর্তে নয় বছর এবং কোন কোন বর্ণনা মতে সাত বছর নির্দিষ্ট করছি। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আদেশ পালন করলেন এবং উবাইও নতুন চুক্তিতে সম্মত হল। (তিরমিযী: ৩১৯৩, ৩১৯৪) বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায় যে, হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে এই ঘটনা সংঘটিত হয় এবং সাত বছর পূর্ণ হওয়ার পর বদর যুদ্ধের সময় রোমকরা পারসিকদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে।
(২) অর্থাৎ যেদিন রোমকরা পারসিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে, সেদিন আল্লাহর সাহায্যের কারণে মুসলিমরা উৎফুল্ল হবে। বাক্যবিন্যাস পদ্ধতির দিক দিয়ে বাহ্যতঃ এখানে রোমকদের সাহায্য বোঝানো হয়েছে। তারা যদিও কাফের ছিল, কিন্তু অন্য কাফেরদের তুলনায় তাদের কুফর কিছুটা হাল্কা ছিল। কাজেই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে সাহায্য করা অবান্তর নয়। বিশেষতঃ যখন তাদেরকে সাহায্য করলে মুসলিমরাও আনন্দিত হয় এবং কাফেরদের মোকাবিলায় তাদের জিত হয়। (সা'দী)
(৪) কয়েক বছরের মধ্যেই, আগের ও পরের সকল সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। সেদিন বিশ্বাসীরা আনন্দিত হবে;