ٱتۡلُ مَآ أُوحِيَ إِلَيۡكَ مِنَ ٱلۡكِتَٰبِ وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَۖ إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِۗ وَلَذِكۡرُ ٱللَّهِ أَكۡبَرُۗ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ مَا تَصۡنَعُونَ

উতলুমাঊহিয়া ইলাইকা মিনাল কিতা-বি ওয়া আকিমিসসালা-তা ইন্নাসসালা-তা তানহা-‘আনিল ফাহশাই ওয়াল মুনকারি ওয়ালাযিকরুল্লা-হি আকবারু ওয়াল্লা-হু ইয়া‘লামুমা-তাসনা‘ঊন।উচ্চারণ

(হে নবী!) তোমার প্রতি অহির মাধ্যমে যে কিতাব পাঠানো হয়েছে তা তেলাওয়াত করো এবং নামায কায়েম করো, ৭৭ নিশ্চিতভাবেই নামায অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। ৭৮ আর আল্লাহর স্মরণ এর চাইতেও বড় জিনিস। ৭৯ আল্লাহ জানেন তোমরা যা কিছু করো। তাফহীমুল কুরআন

(হে নবী!) ওহীর মাধ্যমে তোমার প্রতি যে কিতাব নাযিল করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত কর ও নামায কায়েম কর। নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। #%৩২%# আর আল্লাহর যিকিরই তো সর্বাপেক্ষা বড় জিনিস #%৩৩%#। তোমরা যা-কিছু কর, আল্লাহ তা জানেন।মুফতী তাকী উসমানী

তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব আবৃত্তি কর এবং সালাত প্রতিষ্ঠিত কর। নিশ্চয়ই সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে। আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা জানেন।মুজিবুর রহমান

আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তুমি আবৃত্তি কর কিতাব হতে যা তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। এবং সালাত কায়েম কর। সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কার্য হতে। আর আল্লাহ্ র স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা জানেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত কর এবং সালাত কায়েম কর। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন যা তোমরা কর।আল-বায়ান

তোমার প্রতি যা ওয়াহী করা হয়েছে কিতাব থেকে তা পাঠ কর আর নামায প্রতিষ্ঠা কর; নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে। নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ (বিষয়)। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।তাইসিরুল

তুমি পাঠ কর ধর্মগ্রন্থ থেকে যা তোমার কাছে প্রত্যাদিষ্ট করা হয়েছে, আর নামায কায়েম কর। নিঃসন্দেহ নামায অশালীনতা ও অন্যায়াচরণ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ্‌র স্মরণই তো সর্বোত্তম। আর আল্লাহ্ জানেন তোমরা যা কর।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৭৭

আপাত দৃষ্টিতে নবী (সা.) কে সম্বোধন করা হয়েছে কিন্তু আসলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে উদ্দেশ্যে করেই বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের ওপর সে সময় যেসব জুলুম-নিপীড়ন চালানো হচ্ছিল এবং ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য তাদের যেসব কঠিন সমস্যা ও সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল সে সবের মোকাবিলা করার জন্য পিছনের চার রুকুতে অনবরত সবর, দৃঢ়তা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার উপদেশ দেবার পর এখন তাদেরকে বাস্তব ব্যবস্থা হিসেবে কুরআন তেলাওয়াত ও নামায কায়েম করার কথা বলা হচ্ছে। কারণ এ দু ’টি জিনিসই মু’মিনকে এমন সুগঠিত চরিত্র ও উন্নতর যোগ্যতার অধিকারী করে যার সাহায্যে সে বাতিলের প্রবল বন্যা এবং দুষ্কৃতির ভয়াবহ ঝনঝার মোকাবিলায় শুধু মাত্র টিকে থাকতে নয় বরং তার গতি ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কুরআন তেলাওয়াত ও নামাযের মাধ্যমে এ শক্তি মানুষ তখনই অর্জন করতে পারে যখন সে কুরআনের তেলাওয়াত শুধুমাত্র শব্দগুলো পাঠ করেই ক্ষান্ত হয় না বরং তার শিক্ষাগুলোও সঠিকভাবে অনুধাবন করে হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে সেগুলোকে সঞ্চারিত করে যেতে থাকে এবং তার নামায কেবলমাত্র শারীরিক কসরতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তার অন্তরের প্রতিধ্বনি এবং চরিত্র ও কর্মেও সক্রিয় শক্তিতে পরিণত হয়। সামনের দিকের বক্তব্যে কুরআন মাজীদ নিজেই নামাযের কাঙ্ক্ষিত গুণ বর্ণনা করছে। আর কুরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে এতটুকু জানা দরকার যে, মানুষের কণ্ঠনালী অতিক্রম করে তার হৃদয়তন্ত্রীতে যে তেলাওয়াত আঘাত হানতে পারে না তা তাকে কুফরীর বন্যা প্রবাহের মোকাবেলায় শক্তি তো দূরের কথা ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার শক্তিও দান করতে পারে না। যেমন হাদীসে একটি দল সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ ، ولاَ يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ مُرُوقَ السَّهْمِ مِنَ الرَّمِيَّةِ

“তারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালীল নীচে নামনে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন শর ধনুক থেকে বের হয়ে যায়।” (বুখারী, মুসলিম, মুয়াত্তা)

আসলে যে তেলাওয়াতের পরে মানুষের মন-মানস, চিন্তা-চেতনা ও চরিত্র কর্মনীতিতেও কোন পরিবর্তন আসে না বরং কুরআন পড়ার পরও কুরআন যা নিষেধ করে মানুষ তা সব করে যেতে থাকে তা একজন মু’মিনের কুরআন তেলাওয়াত হতেই পারে না। এ সম্পর্কে তো নবী (সা.) পরিষ্কার বলেনঃ مَا آمَنَ بِالْقُرْآنِ مَنِ اسْتَحَلَّ مَحَارِمَهُ “কুরআনের হারামকৃত জিনিসকে যে হালাল করে নিয়েছে সে কুরআনের প্রতি ঈমান আনেনি।” (তিরমিযী) এ ধরনের তেলাওয়াত মানুষের আত্মিক সংশোধন এবং তার আত্মায় শক্তি সঞ্চার করার পরিবর্তে তাকে আল্লাহর মোকাবিলায় আরো বেশি বিদ্রোহী এবং নিজের বিবেকের মোকাবেলায় আরো বেশি নির্লজ্জ করে তোলে। এ অবস্থায় তার মধ্যে চরিত্র বলে কোন জিনিসেরই আর অস্তিত্ব থাকে না। কারণ যে ব্যক্তি কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে মেনে নেয়, তা পাঠ করে তার মধ্যে আল্লাহ‌ তাকে কি নির্দেশ দিয়েছেন তা জানতেও থাকে এবং তারপর তার নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে যেতে থাকে, তার ব্যাপারটা তো দাঁড়ায় এমন একজন অপরাধীর মতো যে আইন না জানার কারণে নয় বরং আইন সম্পর্কে ভালোভাবে জানার পর অপরাধমূলক কাজ করে। এ অবস্থাটিকে মহানবী (সা.) একটি ছোট্ট বাক্যেও মধ্য দিয়ে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সুস্পষ্ট করে তোলে ধরেছেনঃ الْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ “কুরআন তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ।” (মুসলিম) অর্থাৎ যদি কুরআনকে যথাযথভাবে অনুসরণ করে চলা হয় তাহলে তা তোমার জন্য সাক্ষ্য ও প্রমাণ হবে। দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত যেখানেই তোমাকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে সেখানেই তুমি নিজের সাফাই হিসেবে কুরআনকে পেশ করতে পারবে। অর্থাৎ তুমি বলতে পারবে, আমি যা কিছু করেছি এ কিতাব অনুযায়ী করেছি। যদি তোমার কাজ যথার্থই কুরআন অনুযায়ী হয়ে থাকে তাহলে দুনিয়ায় ইসলামের কোন বিচারক তোমাকে শাস্তি দিতে পারবেন না এবং আখেরাতে হাশরের ময়দানেও তোমাকে পাকড়াও করা হবে না। কিন্তু যদি এ কিতাব তোমার কাছে পৌঁছে গিয়ে থাকে এবং তা পড়ে তুমি জেনে নিয়ে থাকো তোমার রব তোমাকে কি বলতে চান, তোমাকে কোনো কাজের হুকুম দেন, কোনো কাজ করতে নিষেধ করেন এবং আবার তুমি তার বিরোধী কর্মনীতি অবলম্বন করো, তাহলে এ কিতাব তোমার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহর আদালতে এ কিতাব তোমার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলাকে আরো বেশি জোরদার করে দেবে। এরপর না জানার ওজর পেশ করে শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া অথবা হালকা শাস্তি লাভ করা তোমার জন্য সম্ভব হবে না।

৭৮

নামাযের বহু গুণের মধ্যে এটি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গুণ। পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এটিকে সুস্পষ্ট করে এখানে পেশ করা হয়েছে। মক্কার বিরুদ্ধ পরিবেশে মুসলমানরা যে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার মোকাবিলা করার জন্য তাদের বস্তুগত শক্তির চাইতে বেশি প্রয়োজন ছিল নৈতিক শক্তির। এ নৈতিক শক্তির উদ্ভব ও তার বিকাশ সাধনের জন্য প্রথমে দু’টি ব্যবস্থা অবলম্বন করার কথা বলা হয়েছে। একটি হচ্ছে কুরআন তেলাওয়াত করা এবং দ্বিতীয় নামায কায়েম করা। এরপর এখানে বলা হচ্ছে, নামায কায়েম করা হচ্ছে এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে তোমরা এমনসব দুষ্কৃতি থেকে মুক্ত হতে পারো ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে যেগুলোতে তোমরা নিজেরাই লিপ্ত ছিলে এবং যেগুলোতে বর্তমানের লিপ্ত আছে তোমাদের চারপাশের আরবীয় ও অনারবীয় জাহেলী সমাজ।

এ পর্যায়ে নামাযের এই বিশেষ উপকারিতার কথা বলা হয়েছে কেন, একটু চিন্তা করলে একথা অতি সহজে অনুধাবন করা যেতে পারে। একথা সুস্পষ্ট যে, নৈতিক দুষ্কৃতিমুক্ত চরিত্রের অধিকারী লোকেরা এর মাধ্যমে কেবলমাত্র দুনিয়ায় ও আখেরাতেই লাভবান হয় না বরং এর ফলে তারা অনিবার্যভাবে এমন সব লোকদের ওপর ব্যাপক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে যারা নানান নৈতিক দুষ্কৃতির শিকার হয়ে গেছে এবং এসব দুষ্কৃতির লালনকারী জাহেলিয়াতের পুতিগন্ধময় অপবিত্র ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অশ্লীল ও অসৎকাজ বলতে যেসব দুষ্কৃতি বুঝায় মানুষের প্রকৃতি সেগুলোকে খারাপ বলে জানে এবং সবসময় সকল জাতি ও সকল সমাজের লোকেরা, কার্যত তারা যতই বিপথগামী হোক না কেন, নীতিগত ভাবে সেগুলোকে খারাপই মনে করে এসেছে। কুরআন নাযিল হওয়ার সময় আরবের সমাজ মানসও এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। সে সমাজের লোকেরাও নৈতিকতার পরিচিত দোষ-গুণ সম্পর্কে সচেতন ছিল। তারা অসৎকাজের মোকাবিলায় সৎকাজের মূল্য জানতো। কদাচিত হয়তো এমন কোন লোকও তাদের মধ্যে থেকে থাকবে যে অসৎকাজকে ভালো মনে করে থাকবে এবং ভালো কাজকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখে থাকবে। এ অবস্থায় এ বিকৃত সমাজের মধ্যে যদি এমন কোন আন্দোলন সৃষ্টি হয় যার সাথে জড়িত হওয়ার সাথে সাথেই সংশ্লিষ্ট সমাজের ব্যক্তিবর্গ নিজেরাই নৈতিক দিক দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং নিজেদের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নিজেদের সমকালীন লোকদের থেকে সুস্পষ্ট উন্নতি লাভ করে, তাহলে অবশ্যই সে তার প্রভাব বিস্তার না করে থাকতে পারে না। এটা কোনক্রমেই সম্ভবপর ছিল না যে, আরবের সাধারণ লোকেরা অসৎকাজ নির্মূলকারী এবং সৎ ও পবিত্র-পরিচ্ছন্ন মানুষ গঠনকারী এ আন্দোলনের নৈতিক প্রভাব মোটেই অনুভব করবে না এবং এর মোকাবিলায় নিছক জাহেলিয়াত প্রীতির অন্তঃসারশূন্য শ্লোগানের ভিত্তিতে এমনসব লোকদের সাথে সহযোগিতা করে যেতে থাকবে যারা নিজেরাই নৈতিক দুষ্কৃতিতে লিপ্ত ছিল এবং জাহেলিয়াতের যে ব্যবস্থা শত শত বছর থেকে সে দুষ্কৃতিগুলো লালন করে চলছিল তাকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। এ কারণেই কুরআন এ অবস্থায় মুসলমানদের বস্তুগত উপকরণাদি ও শক্তিমত্তা সংগ্রহ করার পরামর্শ দেবার পরিবর্তে নামায কায়েম করার নির্দেশ দিচ্ছে। এর ফলে মুষ্টিমেয় মানুষের এ দলটি এমন চারিত্রিক শক্তির অধিকারী হবে যার ফলে তারা মানুষের মন জয় করে ফেলবে এবং তীর ও তরবারির সাহায্য ছাড়াই শত্রুকে পরাজিত করবে।

এ আয়াতে নামাযের যে গুণ বর্ণনা করা হয়েছে তার দু’টি দিক রয়েছে। একটি তার অনিবার্য গুণ। অর্থাৎ সে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে। আর দ্বিতীয় তার কাঙ্ক্ষিত গুণ। অর্থাৎ নামায আদায়কারী কার্যক্ষেত্রে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখুক। বিরত রাখার ব্যাপারে বলা যায়, নামায অবশ্যই এ কাজ করে। যে ব্যক্তিই নামাযের ধরনের ব্যাপারে সামান্য চিন্তা করবে সে-ই স্বীকার করবে, মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য যত ধরনের ব্রেক লাগানো সম্ভব তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ব্রেক নামাযই হতে পারে। এর চেয়ে বড় প্রভাবশালী নিরোধক আর কী হতে পারে যে, মানুষকে প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য আহ্বান করা হবে এবং তার মনে একথা জাগিয়ে দেয়া হবে যে, তুমি এ দুনিয়ায় স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী নও বরং এক আল্লাহর বান্দা এবং তোমার আল্লাহ‌ হচ্ছেন তিনি যিনি তোমার প্রকাশ্য ও গোপন সকল কাজ এমনকি তোমার মনের ইচ্ছা ও সংকল্পও জানেন এবং এমন একটি সময় অবশ্যই আসবে যখন তোমাকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে নিজের যাবতীয় কাজের জবাবদিহি করতে হবে। তারপর কেবলমাত্র একথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত থাকলে চলবে না বরং কার্যত প্রত্যেক নামাযের সময় যাতে লুকিয়ে লুকিয়েও সে আল্লাহর কোন হুকুম অমান্য না করে তার অনুশীলনও করতে হবে। নামাযের জন্য ওঠার পর থেকে শুরু করে নামায খতম হওয়া পর্যন্ত মানুষকে অনবরত এমনসব কাজ করতে হয় যেগুলো করার সময় সে আল্লাহর হুকুম মেনে চলছে অথবা তার বিরুদ্ধাচরণ করছে এ কথা সে এবং তার আল্লাহ‌ ছাড়া তৃতীয় কোন সত্ত্বা জানতে পারে না। যেমন, যদি কারো ওযু ভেঙ্গে গিয়ে থাকে এবং সে নামায পড়তে দাঁড়ায়, তাহলে তার যে অযু নেই একথা সে এবং আল্লাহ‌ ছাড়া আর কে-ই বা জানতে পারবে। মানুষ যদি নামাযের নিয়তই না করে এবং বাহ্যত রুকু, সিজদা ও উঠা-বসা করে নামাজের সূরা-কেরাত, দোয়া-দরুদ ইত্যাদি পড়ার পরিবর্তে নিরবে গজল পড়তে থাকে তাহলে সে যে আসলে নামায পড়েনি সে এবং আল্লাহ‌ ছাড়া আর কে এ রহস্য উদঘাটন করতে পারবে? এ সত্ত্বেও যখন মানুষ শরীর ও পোশাকের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন থেকে শুরু করে নামাযের আরকান ও সূরা-কেরাত-দোয়া-দরূদ পর্যন্ত সবকিছু সম্পন্ন করে আল্লাহ‌ নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী প্রতিদিন পাঁচবার নামায পড়ে তখন তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, এ নামাযের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েকবার তার বিবেকে প্রাণ সঞ্চার করা হচ্ছে, তার মধ্যে দায়িত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাকে দায়িত্বশীল মানুষে পরিণত করা হচ্ছে এবং যে আইনের প্রতি সে ঈমান এনেছে তা মেনে চলার জন্য বাইরে কোন শক্তি থাক বা না থাক এবং বিশ্ববাসী তার কাজের অবস্থা জানুক বা না জানুক নিজের আনুগত্য প্রবণতার প্রভাবাধীনে গোপনে ও প্রকাশ্যে সকল অবস্থায় সে সেই আইন মেনে চলবে-কার্যত তাকে এরই অনুশীলন করানো হচ্ছে।

এ দৃষ্টিতে বিচার করলে একথা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না যে, নামায কেবলমাত্র মানুষকে অশ্লীল ও অসৎকাজ থেকেই বিরত রাখে না বরং আসলে দুনিয়ার দ্বিতীয় এমন কোন অনুশীলন পদ্ধতি নেই যা মানুষকে দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে এত বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষ নিয়মিত নামায পড়ার পর কার্যতও দুষ্কৃতি থেকে দূরে থাকে নি। জবাবে বলা যায়, এটা নির্ভর করে যে ব্যক্তি আত্মিক সংশোধন ও পরিশুদ্ধির অনুশীলন করছে তার ওপর। সে যদি এ থেকে উপকৃত হবার সংকল্প করে এবং এ জন্য প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে নামাযের সংশোধনমূলক প্রভাব তার ওপর পড়বে। অন্যথায় দুনিয়ার কোন সংশোধন ব্যবস্থা এমন ব্যক্তির ওপর কার্যকর হতে পারে না যে তার প্রভাব গ্রহণ করতে প্রস্তুতই নয় অথবা জেনে বুঝে তার প্রভাবকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকে। এর দৃষ্টান্ত যেমন দেহের পরিপুষ্টি ও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে খাদ্যের অনিবার্য বিশেষত্ব। কিন্তু এ ফল তখনই লাভ করা সম্ভবপর হতে পারে যখন মানুষ তাকে শরীরের অংশে পরিণত হবার সুযোগ দেবে। যদি কোন ব্যক্তি প্রত্যেক বারে খাবার পরে বমি করে সমস্ত খাবার বের করে দিতে থাকে তাহলে এ ধরনের আহার তার জন্য মোটেই উপকারী হতে পারে না। এ ধরনেরকোন ব্যক্তিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখিয়ে যেমন একথা বলা চলে না যে, খাদ্য দ্বারা দেহের পরিপুষ্টি হয় না। কারণ, দেখা যাচ্ছে অমুক ব্যক্তি আহার করার পরও শুকিয়ে যাচ্ছে। এভাবে এমন একজন নামাযী যে অসৎকাজ করে যেতেই থাকে, তার দৃষ্টান্ত পেশ করেও একথা বলা যেতে পারে না যে, নামায অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে না। কারণ, অমুক ব্যক্তি নামায পড়ার পরও খারাপ কাজ করে। এ ধরনের নামাযী সম্পর্কে তো একথা বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত হবে যে, সে আসলে নামায পড়ে না যেমন যে ব্যক্তি আহার করে বমি করে তার সম্পর্কে একথা বলা বেশি যুক্তিযুক্ত যে, সে আসলে আহার করে না।

ঠিক একথাই বিভিন্ন হাদীসে নবী ﷺ এবং অনেক নেতৃস্থানীয় সাহাবী ও তাবেঈগণ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমরান ইবনে হুসাইন বর্ণনা করেন, নবী ﷺ বলেছেনঃمن لم تنهه صلاته عن الفحشاء والمنكر فلا صلاة له- “যার নামায তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখেনি তার নামাযই হয়নি।”(ইবনে আবী হাতেম) ইবনে আব্বাস (রা.) নবী (সা.) এর এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে,

من لم تنهه صلوته عن الفحشاء والمنكر لم يزدد بها من الله الابعدا-

“যার নামায তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখেনি তাকে তার নামায আল্লাহ‌ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দিয়েছে।”

হাসান বসরী (র) একই বস্তু সম্বলিত হাদীস নবী (সা.) থেকে মুরসাল রেওয়ায়াতের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। (ইবনে জারীর ও বাইহাকী) ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে নবী করীমের ﷺ এ উক্তি উদ্ধৃত হয়েছেঃ

لاصلوة لمن لم يطع الصلوة وطاعة الصلوة ان تنهى عن الفحشاء والمنكر-

“যে ব্যক্তি নামাযের আনুগত্য করেনি তার নামাযই হয়নি আর নামাযের আনুগত্য হচ্ছে, মানুষ অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে।” (ইবনে জারীর ও ইবনে আবী হাতেম)

একই বক্তব্য সম্বলিত একাধিক উক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হাসান বাসরী, কাতাদাহ, আ’মাশ ও আরো অনেকের থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম জাফর সাদেক বলেন, যে ব্যক্তি তার নামায কবুল হয়েছে কিনা জানতে চায় তার দেখা উচিত তার নামায তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে কি পরিণাম বিরত রেখেছে। যদি নামাযের বাধা দেবার পর সে খারাপ কাজ করা থেকে বিরত হয়ে থাকে, তাহলে তার নামায কবুল হয়ে গেছে। (রুহুল মা’আনী)

৭৯

এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। একঃ আল্লাহর যিকির (অর্থাৎ নামায) এর চেয়ে বড়। এর প্রভাব কেবল নেতিবাচকই নয়। শুধুমাত্র অসৎকাজ থেকে বিরত রেখেই সে ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হবার জন্য মানুষকে উদ্যোগী করে। দ্বিতীয় অর্থঃ আল্লাহর স্মরণ নিজেই অনেক বড় জিনিস, সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। মানুষের কোনো কাজ এর চেয়ে বেশি ভালো নয়। এর তৃতীয় অর্থঃ তোমার আল্লাহকে স্মরণ করার চাইতে আল্লাহর তোমাকে স্মরণ করা অনেক বেশি বড় জিনিস। কুরআনে মহান আল্লাহ‌ বলেনঃفَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো আমি তোমাদের স্মরণ করবো।” (আল বাকারাহ ১৫২) কাজেই বান্দা যখন নামাযে আল্লাহকে স্মরণ করার তুলনায় আল্লাহর বান্দাকে স্মরণ করা অনেক বেশি উচ্চমানের। এ তিনটি অর্থ ছাড়া আরো একটি সূক্ষ্ম অর্থও এখানে হয়। হযরত আবু দারদা (রা.) এর সম্মানিতা স্ত্রী এ অর্থটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আল্লাহর স্মরণ নামায পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয় বরং তার সীমানা এর চাইতেও বহুদূর বিস্তৃত। যখন মানুষ রোযা রাখে, যাকাত দেয় বা অন্য কোন সৎকাজ করে তখন অবশ্যই সে আল্লাহকে স্মরণই করে, তবেই তো তার দ্বারা ঐ কাজটি সম্পাদিত হয়। অনুরূপভাবে যখন কোন ব্যক্তি কোন অসৎকাজ করার সুযোগ পাওয়ার পর তা থেকে দূরে থাকে তখন এটাও হয় আল্লাহর স্মরণেরই ফল। এ জন্য আল্লাহর স্মরণ একজন মু’মিনের সমগ্র জীবনে পরিব্যাপ্ত হয়।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

অর্থাৎ, মানুষ যদি যথাযথভাবে নামায আদায় করে এবং তার উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগী থাকে, তবে তা অবশ্যই তাকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। কেননা মানুষ নামাযে সর্বপ্রথম তাকবীর বলে আল্লাহ তাআলার মহত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণা করে। তার মানে সে আল্লাহ তাআলার হুকুমকে সবকিছুর উপরে বলে বিশ্বাস করে। এর বিপরীতে কারও কোন কথাকে সে ভ্রুক্ষেপযোগ্য মনে করে না। তারপর সে প্রতি রাকাতে আল্লাহ তাআলার সামনে স্বীকার করে যে, হে আল্লাহ! আমি আপনারই বন্দেগী করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য চাই, এভাবে সে জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে চলার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হয়। কাজেই যে ব্যক্তি পূর্ণ ধ্যানের সাথে নামায পড়ে তার অন্তরে কোন গুনাহের প্রতি ঝোঁক দেখা দিলে তখন অবশ্যই তার সেই ওয়াদার কথা মনে পড়বে, ফলে সে সচকিত হয়ে যাবে এবং সে আর গুনাহের দিকে অগ্রসর হবে না। তাছাড়া রুকু, সিজদা, ওঠা-বসা ও নামাযের অন্যান্য কার্যাবলী দ্বারা ইবাদত করে নামাযী ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ তাআলার সামনে একজন বাধ্য ও অনুগত বান্দারূপে পেশ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি অনুধ্যানের সাথে নামায পড়বে এবং নামাযের হাকীকতের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে যথাযথভাবে তা আদায় করবে তার নামায তাকে অবশ্যই অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৪৫. আপনি(১) তেলাওয়াত করুন কিতাব থেকে যা আপনার প্রতি ওহী করা হয়(২) এবং সালাত কায়েম করুন।(৩) নিশ্চয় সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে।(৪) আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ।(৫) তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।

(১) আপাত দৃষ্টিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে কিন্তু আসলে সমস্ত মুসলিমদেরকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এতে দুটি অংশ আছে, কুরআন তেলাওয়াত ও সালাত কায়েম করা। কারণ এ দু'টি জিনিসই মুমিনকে এমন সুগঠিত চরিত্র ও উন্নতর যোগ্যতার অধিকারী করে যার সাহায্যে সে বাতিলের প্রবল বন্যা এবং দুস্কৃতির ভয়াবহ ঝঞ্ঝার মোকাবিলায় সঠিক পথে থাকতে পারে। (দেখুন: আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর)

(২) কুরআন তেলাওয়াতের এ শক্তি মানুষ তখনই অর্জন করতে পারে যখন সে কুরআনের শুধুমাত্র শব্দগুলো পাঠ করেই ক্ষান্ত হয় না বরং তার শিক্ষাগুলোও সঠিকভাবে অনুধাবন করে হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে সেগুলোকে সঞ্চারিত করে যেতে থাকে। আসলে যে তেলাওয়াতের পরে মানুষের মন-মানস, চিন্তা-চেতনা ও চরিত্র-কর্মনীতিতে কোন পরিবর্তন আসে না বরং কুরআন পড়ার পরও কুরআন যা নিষেধ করে মানুষ তা সব করে যেতে থাকে তা একজন মুমিনের কুরআন তেলাওয়াত হতেই পারে না। মূলত: কুরআনের হারামকৃত জিনিসকে যে হালাল করে নিয়েছে যে কুরআনের প্রতি ঈমানই আনেনি। এ অবস্থাটিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি ছোট্ট বাক্যের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেনঃ “কুরআন তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ।” (মুসলিম: ২২৩)

(৩) কুরআন তেলাওয়াতের পর দ্বিতীয় যে কাজটির প্রতি উম্মতকে অনুবর্তী করার নির্দেশ এখানে দেয়া হয়েছে তা হলো, সালাত৷ সালাতকে অন্যান্য ফরয কর্ম থেকে পৃথক করার এই রহস্যও বর্ণিত হয়েছে যে, সালাত স্বকীয়ভাবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং দ্বীনের স্তম্ভ। এর উপকারিতা এই যে, যে ব্যক্তি সালাত কায়েম করে, সালাত তাকে অশ্লীল ও গৰ্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। (ইবন কাসীর) আয়াতে ব্যবহৃত “ফাহশা’ শব্দের অর্থ এমন সুস্পষ্ট মন্দ কাজ, যাকে প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিই মন্দ মনে করে; যেমন ব্যভিচার, অন্যায় হত্যা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি। পক্ষান্তরে ‘মুনকার’ এমন কথা ও কাজকে বলা হয়, যার হারাম ও অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে শরীআত বিশারদগণ একমত। (বাগভী; ফাতহুল কাদীর) ‘ফাহশা’ ও ‘মুনকার’ শব্দদ্বয়ের মধ্যে যাবতীয় অপরাধ এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গোনাহ দাখিল হয়ে গেছে। যেগুলো স্বয়ং নিঃসন্দেহরূপে মন্দ এবং সৎকর্মের পথে সর্ববৃহৎ বাধা। সালাতের মাধ্যমে এ সকল বাধা দূরীভূত হয়।

(৪) এখানে কেউ কেউ সন্দেহ করে যে, অনেক মানুষকে সালাতের অনুবর্তী হওয়া সত্বেও বড় বড় গুনাহে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। এটা আলোচ্য আয়াতের পরিপন্থী নয় কি? এর কয়েকটি জওয়াব দেয়া হয়। এক. প্রকৃত সালাত আদায়কারীকে সালাত অবশ্যই অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখবে। হাসান ও কাতাদাহ বলেন, যার সালাত তাকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখল না সে সালাত দ্বারা আল্লাহ থেকে দূরেই রয়ে গেল। (তাবারী) দুই. ইবন কাসীর বলেন, এর অর্থ যারা নিয়মিত সালাত আদায় করবে, তাদের এ অবস্থাটি তৈরী হবে। হাদীসে এসেছে, এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, অমুক লোক রাতে সালাত আদায় করে, আর সকাল হলে চুরি করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অচিরেই তার সালাত তাকে তা থেকে নিষেধ করবে। (মুসনাদে আহমাদ: ২/৪৪৭)

(৫) অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। এক, আল্লাহর যিকির সবচেয়ে বড় ইবাদাত। সালাত বড় ইবাদাত হবার কারণ হচ্ছে, এতে আল্লাহর যিকির থাকে। সুতরাং যে সালাতে যিকির বেশী সে সালাত বেশী উত্তম। (ইবন কাসীর; মুয়াস্‌সার)। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর স্মরণ অনেক বড় জিনিস, সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। মানুষের কোন কাজ এর চেয়ে বেশী বড় নয়। (তাবারী) এর তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমার আল্লাহকে স্মরণ করার চাইতে আল্লাহ কর্তৃক তোমাকে স্মরণ করা অনেক বেশী বড় জিনিস। (তাবারী)

কুরআনে মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো আমি তোমাদের স্মরণ করবো।” সূরা আল-বাকারাহ: ১৫২) কাজেই বান্দা যখন সালাতে আল্লাহকে স্মরণ করবে। তখন অবশ্যই আল্লাহও তাকে স্মরণ করবেন। আর বান্দার আল্লাহকে স্মরণ করার তুলনায় আল্লাহর বান্দাকে স্মরণ করা অনেক বেশী উচ্চমানের। বান্দা যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন আল্লাহ ওয়াদা অনুযায়ী স্মরণকারী বান্দাকে ফেরেশতাদের সমাবেশেও স্মরণ করেন। আল্লাহর এ স্মরণ ইবাদতকারী বান্দার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এ স্থলে অনেক সাহাবী ও তাবেয়ী থেকে এই অর্থই বর্ণিত আছে। এই অর্থের দিক দিয়ে এতে এদিকেও ইঙ্গিত আছে যে, সালাত পড়ার মধ্যে গোনাহ থেকে মুক্তির আসল কারণ হল আল্লাহ্ স্বয়ং সালাত আদায়কারীর দিকে অভিনিবেশ করেন এবং ফেরেশতাদের সমাবেশে তাকে স্মরণ করেন। (দেখুন: বাগভী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৪৫) তোমার প্রতি যে গ্রন্থ অহী করা হয়েছে তা পাঠ কর(1) এবং যথাযথভাবে নামায পড়।(2) নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। (3) আর অবশ্যই আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ।(4) তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।

(1) কুরআন কারীম তেলাঅত (বা পাঠ) করার আদেশ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে; নেকী লাভের উদ্দেশ্যে, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার উদ্দেশ্যে, শিক্ষা ও উপদেশ দেওয়া-নেওয়ার উদ্দেশ্যে। তেলাঅতের এই আদেশের মাঝে সব কিছু শামিল আছে।

(2) কারণ (প্রকৃত) নামাযের মাধ্যমে মানুষের সাথে আল্লাহর এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যার ফলে মানুষের উপর আল্লাহর সাহায্য আসে। যে সাহায্য তার জীবনের সর্বত্রই সুপ্রতিষ্ঠা ও দৃঢ় মনোভাবের কারণ এবং হিদায়াতের সহায়ক হয়। এই জন্যই কুরআন কারীমে বলা হয়েছে ‘‘হে মু’মিনগণ তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।’’ (সূরা বাক্বারাহ ১৫৩ আয়াত) নামায ও ধৈর্য এমন কোন দৃশ্য বস্তু নয় যে, মানুষ তা ধরে বসে সাহায্য অর্জন করবে। এ তো অদৃশ্য বস্তু। উদ্দেশ্য হল, তার মাধ্যমে প্রভুর সাথে মানুষের যে বিশেষ সম্পর্ক কায়েম হয়, সেই সম্পর্ক তার জীবনের পদে পদে সাহায্য ও তাকে পথ প্রদর্শন করে থাকে। যার জন্য মহানবী (সাঃ)-কে রাত্রের অন্ধকারে নির্জনে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করার প্রতি তাকীদ করা হয়েছিল। কারণ, নবী (সাঃ)-কে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছিল তাতে তাঁর জন্য আল্লাহর অনেক সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। আর এই কারণেই যখন নবী (সাঃ) কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি নামায পড়তেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)

(3) অর্থাৎ, অশ্লীল ও মন্দ কর্ম থেকে বিরত থাকার কারণ ও মাধ্যম হয়। যেমন ঔষধের নানা প্রতিক্রিয়া আছে এবং বলাও হয় যে, অমুক ঔষধে অমুক অসুখ ভাল হয়। আর বাস্তবে তা হয়েও থাকে। কিন্তু তা তখনই সম্ভব, যখন দুটি কথা পালন করা হবে, প্রথমতঃ ঔষধ ডাক্তারের পরামর্শ মত নিয়মিত সেবন করতে হবে। আর দ্বিতীয়তঃ এমন সকল জিনিস থেকে পরহেয করতে বা বিরত থাকতে হবে, যা ঔষধের প্রতিক্রিয়া-ক্ষমতাই নষ্ট করে ফেলে। অনুরূপ আল্লাহ তাআলা অবশ্যই নামাযে এমন আধ্যাত্মিক ক্ষমতা রেখেছেন, যা মানুষকে অশ্লীল এবং মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে। কিন্তু তা তখনই সম্ভব, যখন নামায মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ ও তরীকা অনুযায়ী ঐ সকল আদব ও শর্ত পালন করার সাথে আদায় করা হবে, যা তার শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য অপরিহার্য করা হয়েছে। যেমন তার প্রথম হলঃ ইখলাস ও হৃদয়-বিশুদ্ধতা, অর্থাৎ কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া এবং নামাযে আল্লাহ ছাড়া অন্যের দিকে মনোযোগ না হওয়া। দ্বিতীয়ঃ পবিত্রতা, তৃতীয়ঃ নির্দিষ্ট সময় মত জামাআত সহকারে তা আদায় করা। চতুর্থঃ নামাযের আরকান (ক্বিরাআত, রুকূ, কাওমাহ, সিজদাহ ইত্যাদি) পূর্ণরূপে ধীরতা ও স্থিরতার সাথে আদায় করা। পঞ্চমঃ একাগ্রতা এবং বিনয় বজায় রাখা। ষষ্ঠঃ নিয়মনিষ্ঠ হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা আদায় করতে থাকা। সপ্তমঃ হালাল রুযী খাওয়া। বস্তুতঃ আমাদের নামায এই সকল আদব ও শর্তশূন্য, ফলে তার সেই প্রভাব আমাদের জীবনে প্রকাশ পাচ্ছে না, যা কুরআন করীমে বলা হয়েছে। অনেকে এই আয়াতের খবরকে আদেশার্থে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ নামাযীদের জন্য জরুরী যে, তারা অশ্লীল ও মন্দ কর্ম হতে বিরত থাকবে।

(4) অর্থাৎ, অশ্লীল ও মন্দ কর্ম হতে বিরত রাখতে আল্লাহর যিকর (স্মরণ) নামায থেকেও বেশি প্রভাব-ক্ষমতা রাখে । কারণ, মানুষ যতক্ষণ নামাযে থাকে, ততক্ষণ মন্দ কর্ম থেকে বিরত থাকে। কিন্তু পরে তার প্রভাব কম হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সর্বদা আল্লাহর যিকর মানুষকে সর্বক্ষণের জন্য মন্দ কর্মে বাধা দিয়ে থাকে।