ওয়া ক-লূইন নাত্তাবি‘ইল হুদা-মা‘আকা নুতাখাততাফ মিন আরদিনা- আওয়ালাম নুমাক্কিল লাহুম হারমান আ-মিনাইঁ ইউজবাইলাইহি ছামার-তুকুল্লি শাইইররিঝকাম মিল্লাদুন্না-ওয়ালা-কিন্না আকছারহুম লা-ইয়া‘লামূন।উচ্চারণ
তারা বলে, “যদি আমরা তোমার সাথে এ হেদায়াতের অনুসরণ করি তাহলে নিজেদের দেশ থেকে আমাদেরকে উৎখাত করে দেয়া হবে।” ৮০ এটা কি সত্য নয়, একটি নিরাপদ হারমকে আমি তাদের জন্য অবস্থানস্থলে পরিণত করেছি, যেদিকে সব ধরনের ফলমূল চলে আসে আমার পক্ষ থেকে রিযিক হিসেবে? কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না। ৮১ তাফহীমুল কুরআন
তারা বলে, আমরা যদি তোমার সাথে হেদায়াতের অনুসরণ করি, তবে আমাদেরকে নিজ ভূমি থেকে উৎখাত করা হবে। #%৩৯%# আমি কি তাদেরকে এমন এক নিরাপদ হরমে প্রতিষ্ঠিত করিনি, যেখানে আমার পক্ষ হতে প্রদত্ত রিযকস্বরূপ সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী করা হয়? কিন্তু তাদের অধিকাংশেই জানে না।মুফতী তাকী উসমানী
তারা বলেঃ আমরা যদি তোমার সাথে সৎ পথ অনুসরণ করি তাহলে আমাদেরকে দেশ হতে উৎখাত করা হবে। (আল্লাহ বলেন) আমি কি তাদের জন্য এক নিরাপদ ‘‘হারাম’’ প্রতিষ্ঠিত করিনি, যেখানে সর্ব প্রকার ফলমূল আমদানী হয় আমার দেয়া রিয্ক স্বরূপ? কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা জানেনা।মুজিবুর রহমান
তারা বলে, যদি আমরা আপনার সাথে সুপথে আসি, তবে আমরা আমাদের দেশ থেকে উৎখাত হব। আমি কি তাদের জন্যে একটি নিরাপদ হরম প্রতিষ্ঠিত করিনি? এখানে সর্বপ্রকার ফল-মূল আমদানী হয় আমার দেয়া রিযিকস্বরূপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
এরা বলে, ‘আমরা যদি তোমার সঙ্গে সৎপথ অনুসরণ করি তবে আমাদেরকে দেশ হতে উৎখাত করা হবে।’ আমি কি এদেরকে এক নিরাপদ হারামে প্রতিষ্ঠিত করি নাই, যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয় আমার দেওয়া রিযিক স্বরূপ ? কিন্তু এদের অধিকাংশই এটা জানে না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর তারা বলে, ‘আমরা যদি তোমার সাথে হিদায়াতের অনুসরণ করি তবে আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে উৎখাত করা হবে’। আমি কি তাদের জন্য এক নিরাপদ ‘হারাম’ এর সুব্যবস্থা করিনি? সেখানে সব ধরনের ফলমূল আমদানী করা হয়, আমার পক্ষ থেকে রিয্কস্বরূপ? কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।আল-বায়ান
তারা বলে- ‘আমরা যদি তোমার সাথে সৎপথের অনুসরণ করি তাহলে আমরা আমাদের দেশ থেকে উৎখাত হব।’ আমি কি তাদের জন্য এক নিরাপদ ‘হারাম’ প্রতিষ্ঠিত করিনি যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূলের নজরানা আসে আমার পক্ষ থেকে রিযক স্বরূপ? কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।তাইসিরুল
আর তারা বলে -- "আমরা যদি তোমার সঙ্গে ধর্মপথ অনুসরণ করি তাহলে আমাদের দেশ থেকে আমাদের উৎখাত করা হবে।" আমরা কি তাদের জন্য এক নিরাপদ পুণ্যস্থান প্রতিষ্ঠিত করি নি যেখানে আনা হয় হরেক রকমের ফল-ফসল, আমাদের তরফ থেকে রিযেকস্বরূপে? কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।মাওলানা জহুরুল হক
৮০
কুরাইশ বংশীয় কাফেররা ইসলাম গ্রহণ না করার অজুহাত হিসাবে একথাটি বলতো। গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে জানা যাবে, এটিই ছিল তাদের কুফরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কারণ। একথাটি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে আমাদের দেখতে হবে ঐতিহাসিকভাবে সে সময় কুরাইশদের কি মর্যাদা ছিল, যার ওপর আঘাত আসার আশংকা ছিল।
শুরুতে আরবে যে জিনিসটির জন্য কুরাইশ গোষ্ঠী গুরুত্ব লাভ করে, সেটি হচ্ছে তাদের হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশধর হওয়ার বিষয়টি আরবীয় বংশধারার দিক দিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত ছিল। এ কারণে তাদের বংশটি ছিল আরবদের দৃষ্টিতে পীরজাদার বংশ। তারপর যখন কুশাই ইবনে কিলাবের বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কারণে তারা কাবা গৃহের মুতাওয়াল্লী ও পরিচালকে পরিণত হলো এবং মক্কায় তাদের আবাস গড়ে উঠলো তখন তাদের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশী বেড়ে গেল। কারণ এখন তারা ছিল আরবের সবচেয়ে বড় তীর্থ স্থানের পরিচালক। আরবের সকল গোত্রের মধ্যে তারা ধর্মীয় পুরোহিতের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর হজ্জের কারণে আরবের এমন কোন গোত্র ছিল না যারা তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতো না। এ কেন্দ্রীয় মর্যাদাকে পুঁজি করে কুরাইশরা ক্রমান্বয়ে ব্যবসায়িক উন্নতি লাভ করতে থাকে। সৌভাগ্যক্রমে রোম ও ইরানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তাদেরকে আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দান করে। সে সময় রোম, গ্রীস, মিশর ও সিরিয়ার যত প্রকার বাণিজ্য চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার সাথে চলতো তার সমস্ত পথই ইরান বন্ধ করে দিয়েছিল। লোহিত সাগরের পথটিই ছিল সর্বশেষ পথ। একমাত্র এ পথটিই খোলা ছিল। পরে ইরান যখন ইয়ামেন দখল করে নিল, তখন সে এ পথটিও বন্ধ করে দিল। এখন আরব বণিকরা একদিকে রোম অধিকৃত এলাকার পণ্য সম্ভার আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরের বন্দরসমূহে পৌঁছিয়ে দিতে লাগলো এবং অন্যদিকে একই বন্দরসমূহ থেকে পূর্বদেশীয় বাণিজ্যপণ্য নিয়ে রোম সাম্রাজের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে থাকলো। এ ছাড়া এ বাণিজ্যটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হলো। এ সময় কুরাইশরাই বলতে গেলে এ ব্যবসায়ের ইজারাদারী লাভ করে বসেছিল। কিন্তু যেসব উপজাতীয় এলাকার মধ্য দিয়ে এ বাণিয়জ্য পথগুলো গিয়েছিল তাদের সাথে তাদের সাথে আরবদের গভীর বন্ধুত্ব সম্পর্ক ছাড়া আরবের রাজনৈতিক অরাজকতার পরিবেশে এ ব্যবসায়িক আদান প্রদান সম্ভবপর ছিল না। এ উদ্দেশ্যে কুরাইশ সরদাররা শুধুমাত্র নিজেদের ধর্মীয় প্রভাবের ওপর নির্ভর করতে পারতো না। এ জন্য তারা সকল উপজাতির সাথে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করে রেখেছিল। ব্যবসায়িক মুনাফায়ও তাদেরকে অংশীদার করতো। উপজাতীয় শেখ ও প্রভাবশালী সরদারদেরকে মূল্যবান তোহ্ফা দিয়ে তুষ্ট করতো। এই সঙ্গে পাতা ছিল সূদী ব্যবসায়ের জাল। এতে জড়িয়ে পড়েছিল প্রায় সকল প্রতিবেশী উপজাতীয় ব্যবসায়ী ও সরদারবৃন্দ।
এ অবস্থায় যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদের দাওয়াত সম্প্রসারিত হতে লাগলো তখন বাপ-দাদার ধর্মের প্রতি অন্ধপ্রীতির চাইতে বড় হয়ে যে জিনিসটি কুরাইশদেরকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠার কারণ হয়ে দেখা দিল সেটি ছিল এই যে, এ দাওয়াতের ফলে তারা নিজেদের স্বার্থহানির আশংকা করছিল। তারা মনে করছিল, যুক্তিপূর্ণ দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে শিরক ও মূর্তিপূজা মিথ্যা এবং তাওহীদ সঠিক প্রমাণিত হয়ে গেলেও তো তাকে পরিত্যাগ করে একে গ্রহণ করে নেয়া আমাদের জন্য ধ্বংসকর হবে। এমনটি করার সাথে সাথেই সমগ্র আরবের অধিবাসীরা আমাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। কাবাগৃহের পরিচালনায় দায়িত্ব থেকে আমাদের সরিয়ে দেবে। সন্ধি চুক্তির ফলে মূর্তিপূজক উপজাতিগুলোর সাথে আমাদের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যার ভিত্তিতে আমাদের বাণিজ্য কাফেলা দিন-রাত আরবের বিভিন্ন অংশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা সবই ছিন্ন হয়ে যাবে। এভাবে এ দ্বীনটি আমাদের ধর্মীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং এই সাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও অবসান ঘটাবে। বরং বিচিত্র নয় যে, আরবের সমস্ত উপজতি মিলে আমাদের মক্কা ত্যাগ করতে বাধ্য করবে।
এখানে এসে দুনিয়া পূজারীদের প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির অভাবের এক বিষ্ময়কর চিত্র মানুষের সামনে ফুটে ওঠে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার তাদেরকে এ নিশ্চয়তা দান করেছিলেন যে, তোমাদের সমানে আমি যে কালেমা পেশ করছি তা মেনে নাও, আরব ও আজম তোমাদের পদাবনত হয়ে যাবে। (দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা সা’দ, ভূমিকা : ঐতিহাসিক পটভূমি) কিন্তু তারা এর মধ্যে নিজেদের মৃত্যু দেখছিল। তারা মনে করছিল, আমরা আজ যে সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করেছি এও খতম হয়ে যাবে। তারা আশংকা করছিল, এ কালেমা গ্রহণ করার সাথে সাথেই আমরা সরেজমিনে এমনই বন্ধু-বান্ধব ও সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়বো যে, চিল-কাকেরা আমাদের গায়ের গোশত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। নিজেদের সংকীর্ণ দৃষ্টির কারণে তারা এ দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিল না যে, মাত্র কয়েক বছর পরেই সমগ্র আরব ভূ-খন্ড মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার আওতাভূক্ত হতে যাচ্ছিল। তারপর এ একই প্রজন্মের জীবনকালেই ইরান, ইরাক, সিরিয়া, মিশর সব দেশই এক এক করে এ রাষ্ট্র ব্যবস্থার আওতাধীন হতে চলছিল। আর এ উক্তির পরে এক শতক অতিক্রান্ত হবার আগেই কুরাইশ বংশীয় খলিফাগণই সিন্ধু থেকে স্পেন এবং কাফ্ফাজ থেকে ইয়ামেনের উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত দুনিয়ার একটি বৃহত্তম অংশের শাসন পরিচালনা করতে যাচ্ছিল।
৮১
এটি হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের আপত্তির প্রথম জবাব। এর অর্থ হচ্ছে, যে হারমের শান্তি ও নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় গুরুত্বের বদৌলতে আজ তোমরা এমন যোগ্যতার অধিকারী হয়েছো, যার ফলে সারা দুনিয়ার বাণিজ্যপণ্যের স্রোত এহেন অনুর্বর ধূলিবিবর্ণ উপত্যকায় চলে আসছে, তার এই নিরাপদ ও কেন্দ্রীয় মর্যাদা কি তোমাদের কোন কৌশল অবলম্বনের ফলে অর্জিত হয়েছে? আড়াই হাজার বছর আগে আল্লাহর এক বান্দা জনশূন্য পাহাড়ের মাঝখানে এ পানি ও বৃক্ষলতাহীন উপত্যকায় তাঁর স্ত্রী ও দুধের বাচ্চাকে নিয়ে এখানে আসেন। তিনি এখানে পাথর ও কাদা দিয়ে একটি কক্ষ নির্মাণ করেন এবং ডাক দিয়ে বলেন, আল্লাহ একে হারমে পরিণত করেছেন, এসো এ ঘরের দিকে এবং একে প্রদক্ষিণ করো। এখন ২৫ শতক বছর থেকে এ জায়গাটি আরবের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে, মারাত্মক ধরণের নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশে দেশের এ একটিমাত্র স্থানে নিরাপত্তা লাভ করা যায়, আরবের আবালবৃদ্ধবণিতা একে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ একে প্রদক্ষিণ করার জন্য চলে আসে। এসব আল্লাহ প্রদত্ত বরকত ও সমৃদ্ধি নয়তো আর কি হতে পারে? এ নিয়ামত লাভের ফলেই তো তোমরা আরবের সরদার হয়ে গেছো এবং বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ তোমাদের করতলগত হয়েছে। এখন কি তোমরা মনে করো, যে আল্লাহ তোমাদেরকে এ নিয়ামত দান করেছেন তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তোমরা সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠবে আর তাঁর দ্বীনের অনুগত হয়ে চললেই ধ্বংস হয়ে যাবে?
কোন কোন কাফের ইসলাম গ্রহণ না করার পক্ষে এই অজুহাত দেখাত যে, ইসলাম গ্রহণ করলে সারা আরববাসী আমাদের বিরোধী হয়ে যাবে। তারা এ যাবৎকাল আমাদেরকে যে ইজ্জত-সম্মান করে আসছে, তা তো ছেড়ে দেবেই, উল্টো তারা লুটতরাজ চালিয়ে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে আমাদের বাস্তুভিটা থেকে উৎখাত করেও ছাড়বে। কুরআন মাজীদ তাদের এ কথার তিনটি উত্তর দিয়েছে। প্রথম উত্তর তো এ আয়াতেই দেওয়া হয়েছে যে, তারা কাফের হওয়া সত্ত্বেও আমি তাদেরকে পবিত্র হরমের ভেতর নিরাপদ রেখেছি। সারা আরবের সর্বত্র অরাজক পরিস্থিতি চলছে, সব জায়গায় মারামারি-হানাহানি, কিন্তু হরমের ভেতর যারা বাস করছে তাদেরকে কেউ কিছু বলে না। পরন্তু চারদিক থেকে তাদের কাছে সব রকমের ফলমূল অবাধে আমদানী হচ্ছে এবং তারা তা নির্বিঘ্নে খাচ্ছে-দাচ্ছে। হরমের দিকে যারা মালামাল নিয়ে আসে, তারাও কোন রকম লুণ্ঠনের শিকার হয় না। কুফর সত্ত্বেও যখন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এতটা নিরাপত্তা দান করেছেন, তখন ঈমান আনার পর বুঝি তোমাদের এ নিরাপত্তা তিনি তুলে নিবেন এবং তখন তিনি তোমাদের হেফাজত করবেন না? ৫৮নং আয়াতে দ্বিতীয় উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, ধ্বংস ও বিপর্যয় তো আসে আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করার ফলে। তোমাদের পূর্বে যে সকল জাতি নাফরমানী করেছে শেষ পর্যন্ত তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। যারা ঈমান এনেছিল তাদের কিছুই হয়নি। দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই তারা সফলতা লাভ করেছে। সবশেষে ৬০নং আয়াতে তৃতীয় উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, ইসলাম গ্রহণের কারণে ইহকালে যদি তোমাদের কিছুটা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়ও, তাতে এত ভয় কেন? আখেরাতের দুর্ভোগের তুলনায় এ কষ্ট কোন হিসেবেই আসে না।
৫৭. আর তারা বলে, আমরা যদি তোমার সাথে সৎপথ অনুসরণ করি তবে আমাদেরকে দেশ থেকে উৎখাত করা হবে।(১) আমরা কি তাদের জন্য এক নিরাপদ হারাম প্রতিষ্ঠা করিনি, যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয় আমাদের দেয়া রিযিকস্বরূপ?(২) কিন্তু তাদের বেশীর ভাগই এটা জানে না।
(১) মক্কার কাফেররা তাদের ঈমান কবুল না করার এক কারণ এই বর্ণনা করল যে, আপনার শিক্ষাকে সত্য মনে করি, কিন্তু আমাদের আশংকা এই যে, আপনার পথনির্দেশ মেনে আমরা আপনার সাথে একাতা হয়ে গেলে সমগ্র আরব আমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে উৎখাত করে দেয়া হবে। আরবের সমস্ত উপজাতি মিলে আমাদের মক্কা ত্যাগ করতে বাধ্য করবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাদের এই অজুহাত বাতিল। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে মক্কাবাসীদের হেফাযতের জন্যে একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা পূর্ব থেকেই করে রেখেছেন। তা এই যে, তিনি মক্কার ভূখণ্ডকে নিরাপদ হারাম করে দিয়েছেন। তাছাড়া জগতের অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত কর। কুফর ও শিরকের কারণে তারা কীভাবে নিপাত হয়েছে। তাদের বসত-বাড়ি, সুদৃঢ় দুর্গ ও প্রতিরক্ষামূলক সাজ-সরঞ্জাম মাটিতে মিশে গেছে। অতএব কুফার ও শির্কই হচ্ছে প্রকৃত আশঙ্কার বিষয়। এটা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। তাওহীদ অনুসরণের মাধ্যমে ধ্বংসের ভয় নেই। (দেখুন: ইবন কাসীর)
(২) মক্কা মোকার্রামা, যাকে আল্লাহ্ তা'আলা নিজ গৃহের জন্যে সারা বিশ্বের মধ্য থেকে মনোনীত করেছেন, এটা এমন একটি স্থান যে, এখানে পার্থিব জীবনোপকরণের কোন বস্তু সহজে পাওয়া যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু মক্কার এসব বস্তুর প্রাচুর্য দেখে বিবেকবুদ্ধি বিমুঢ় হয়ে পড়ে। প্রতি বছর হজ্জের মওসুমে মক্কায় লাখ লাখ লোক একত্রিত হয়। কিন্তু কখনও শোনা যায়নি যে, সেখানে কোন প্রকার অভাব হয়েছে। এ হচ্ছে মক্কার কাফেরদের অজুহাতের জওয়াব যে, যিনি তোমাদের কুফর ও শির্ক সত্বেও তোমাদের প্রতি এতসব অনুগ্রহ করেছেন, তোমাদের দেশকে যাবতীয় বিপদাশঙ্কা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন এবং এদেশে কোন কিছুই উৎপন্ন না হওয়া সত্বেও সারা বিশ্বের উৎপাদিত দ্ৰব্য-সামগ্ৰী এখানে এনে সমাবেশ করেছেন, সেই বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে এসব নেয়ামত হাতছাড়া হয়ে যাবে-এরূপ আশংকা করা চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা বৈ নয়। (দেখুন: ইবন কাসীর)
(৫৭) ওরা বলে, ‘আমরা যদি তোমার পথ ধরি, তবে আমাদের দেশ হতে আমাদেরকে উৎখাত করা হবে।’(1) আমি কি ওদেরকে (মক্কায়) এক নিরাপদ হারামে (পবিত্র স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করিনি;(2) যেখানে আহারের জন্য আমার নিকট থেকে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয়?(3) কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না।
(1) অর্থাৎ, আমরা যেখানে বসবাস করছি সেখানে আমাদেরকে বসবাস করতে দেওয়া হবে না এবং আমাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট অথবা বিরোধীদের সঙ্গে যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। এ ছিল কিছু কাফেরদের ঈমান না আনার খোঁড়া ওজর। আল্লাহ তাদের উত্তরে বললেন, ‘‘আমি কি---।’’
(2) অর্থাৎ, তাদের এই ওজর যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ, যে শহরে তারা বাস করে, সে শহরকে আল্লাহ নিরাপত্তা ও শান্তির শহর বানিয়েছেন। যদি এই শহর তাদের কুফরী ও শিরক সত্ত্বেও শান্তির হয়ে থাকে, তাহলে ঈমান আনার পর কি এই শহর শান্তির থাকবে না?
(3) এটি মক্কার এমন এক বৈশিষ্ট্য; যা লক্ষ লক্ষ হজ্জ ও উমরাহ আদায়কারীগণ প্রত্যক্ষ করে থাকেন। মক্কায় উৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত রকমের ফলমূল ও পৃথিবীর নানান আসবাব-পত্র সেখানে পাওয়া যায়।