فَلَمَّا جَآءَهَا نُودِيَ أَنۢ بُورِكَ مَن فِي ٱلنَّارِ وَمَنۡ حَوۡلَهَا وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ

ফালাম্মা-জাআহা-নূদিইয়া আম বূরিকা মান ফিন্না-রি ওয়া মান হাওলাহা- ওয়া ছুবহা-নাল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন।উচ্চারণ

সেখানে পৌঁছবার পর আওয়াজ এলো ১০ “ধন্য সেই সত্তা যে এ আগুনের মধ্যে এবং এর চারপাশে রয়েছে, পাক-পবিত্র আল্লাহ‌ সকল বিশ্ববাসীর প্রতিপালক। ১১ তাফহীমুল কুরআন

সুতরাং যখন সে সেই আগুনের কাছে পৌঁছল, তাকে ডাক দিয়ে বলা হল, বরকত হোক যে আগুনের ভেতর আছে তার প্রতি এবং যে তার আশপাশে আছে তার প্রতিও। আল্লাহ পবিত্র, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর সে যখন ওর নিকট এলো তখন ঘোষিত হলঃ ধন্য সেই ব্যক্তি যে আছে এই আগুনের মধ্যে এবং যারা আছে ওর চতুস্পার্শ্বে। জগতসমূহের রাব্ব আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।মুজিবুর রহমান

অতঃপর যখন তিনি আগুনের কাছে আসলেন তখন আওয়াজ হল ধন্য তিনি, যিনি আগুনের স্থানে আছেন এবং যারা আগুনের আশেপাশে আছেন। বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এরপর সে যখন এর নিকট এলো, তখন ঘোষিত হল ‘ধন্য, যারা আছে এই আলোর মধ্যে এবং যারা আছে এটার চতুষ্পার্শ্বে, জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্ পবিত্র ও মহিমান্বিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তারপর সে যখন সেখানে এসে পৌঁছল, তখন ডেকে বলা হল, ‘বরকতময় যা এ আলোর মধ্যে ও এর চারপাশে আছে। আর সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ মহাপবিত্র, মহিমান্বিত’।আল-বায়ান

অতঃপর সে যখন আগুনের কাছে আসল তখন আওয়াজ হল- ‘ধন্য, যারা আছে এই আলোর মধ্যে আর তার আশেপাশে, বিশ্বজাহানের প্রতিপালক পবিত্র, মহিমান্বিত।তাইসিরুল

অতঃপর যখন তিনি এর কাছে এলেন তখন আওয়াজ হলো এই বলে -- "ধন্য সেইজন যে আগুনের ভেতরে এবং যে এর আশেপাশে রয়েছে। আর সকল মহিমা বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ্‌র!মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১০

সূরা কাসাসে বলা হয়েছে, আওয়াজ আসছিল একটি বৃক্ষ থেকেঃ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ এ থেকে ঘটনাটির যে দৃশ্য সামনে ভেসে ওঠে তা হচ্ছে এই যে, উপত্যাকার এক কিনারে আগুনের মতো লেগে গিয়েছিল কিন্তু কিছু জ্বলছিল না এবং ধোঁয়াও উড়ছিল না। আর এ আগুনের মধ্যে একটি সবুজ শ্যামল গাছ দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে সহসা এ আওয়াজ আসতে থাকে।

আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সাথে এ ধরণের অদ্ভূত ব্যাপার ঘটা চিরাচরিত ব্যাপার। নবী ﷺ যখন প্রথম বার নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন হেরা গিরিগূহায় একান্ত নির্জনে সহসা একজন ফেরেশতা আসেন। তিনি তাঁর কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাতে থাকেন। হযরত মূসার ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটে। এক ব্যক্তি সফর কালে এক জায়গায় অবস্থান করছেন। দূর থেকে আগুন দেখে পথের সন্ধান নিতে বা আগুন সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে আসেন। অকস্মাৎ সকল প্রকার আন্দাজ অনুমানের ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী স্বয়ং আল্লাহ‌ তাঁকে সম্বোধন করেন। এসব সময় আসলে এমন একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বাইরেও এবং নবীগণের মনের মধ্যেও বিরাজমান থাকে যার ভিত্তিতে তাঁদের মনে এরূপ প্রত্যয় জন্মে যে, এটা কোন জিন বা শয়তানের কারসাজী অথবা তাদের নিজেদের কোন মানসিক ভাবান্তর নয় কিংবা তাঁদের ইন্দ্রিয়ানুভূতিও কোন প্রকার প্রতারিত হচ্ছে না বরং প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু অথবা তাঁর ফেরেশতাই তাঁদের সাথে কথা বলছেন। (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আন নাজম, ১০ নং টীকা)

১১

এ অবস্থায় “পাক-পবিত্র আল্লাহ” বলার মাধ্যমে আসলে হযরত মূসাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হচ্ছে যে, বিভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়েই এ ঘটনাটি ঘটছে। অর্থাৎ এমন নয় যে, আল্লাহ‌ রব্বুল আলামীন এ গাছের ওপর বসে আছেন অথবা এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এসেছেন কিংবা তাঁর একচ্ছত্র নূর তোমাদের দৃষ্টিসীমায় বাঁধা পড়েছে বা কারো মুখে প্রবিষ্ট কোন জিহ্বা নড়াচড়া করে এখানে কথা বলছে। বরং এ সমস্ত সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন থেকে সেই সত্তা নিজেই তোমার সাথে কথা বলছেন।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

প্রকৃতপক্ষে এটা আগুন ছিল না; বরং নূর ছিল এবং তার ভেতর ছিল ফিরিশতা। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বরকতের শুভেচ্ছা জানানো হল সেই ফিরিশতাকেও এবং হযরত মূসা আলাইহিস সালামকেও, যিনি তার আশপাশেই ছিলেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

৮. অতঃপর তিনি যখন সেটার কাছে আসলেন(১), তখন ঘোষিত হল, বরকতময়, যা আছে এ আলোর মধ্যে এবং যা আছে এর চারপাশে(২), আর সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ পবিত্র ও মহিমান্বিত!(৩)

(১) যখন তিনি গাছের কাছে আসলেন, তখন তিনি ভয়ানক ও আশ্চর্যজনক এক দৃশ্য দেখতে পেলেন, তিনি সেখানে দেখতে পেলেন সবুজ গাছে আগুন জলছে। আর সে আগুনে শুধু আলোর তীব্ৰতাই প্রকাশ পাচ্ছে। অপরদিকে গাছটিতেও সবুজতা ও সজীবতা বেড়েই চলেছে। তারপর তিনি তার মাথা উপরের দিকে উঠালেন, দেখলেন সে নূর আকাশ পর্যন্ত ছেয়ে আছে। ইবন আব্বাস বলেন, এটা কোন আগুন ছিল না বরং জ্বলে উঠার মত আলো ছিল। তখন মূসা আলাইহিস সালাম আশ্চর্যান্বিত ও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আর তখনই বলা হল, যিনি আগুনে আছেন তিনি বরকতময় হোন। ইবন আব্বাস বলেন, বরকতময় হওয়ার অর্থ, পবিত্র ও মহিয়ান হওয়া। আর তার পাশে যারা আছে তারা হচ্ছেন ফিরিশতা। (ইবন কাসীর)

(২) এখানে আল্লাহর বাণীঃ “বরকতপূর্ণ হয়েছে, যা আছে এ আলোর মধ্যে এবং যা আছে এর চারপাশে” এর মধ্যে আলোতে কে আছে এবং আলোর চারপাশে কি আছে তা নির্ধারণ করার ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে।

এক. এখানে ‘অগ্নিতে যা আছে তা দ্বারা মূসা আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে। আর তখন এর চারপাশে যা আছে তা বলে আশেপাশে উপস্থিত ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হবে। (বাগভী; কুরতুবী)

দুই. কোন কোন মুফাসসির এখানে ‘অগ্নিতে যা আছে’ বলে ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন এবং ‘এর চারপাশে যা আছে’ তা বলে মূসা আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। (বাগভী)

তিন. ‘এখানে অগ্নিতে যা আছে’ তা বলে আল্লাহর নূরকে বুঝানো হয়েছে, আর ‘এর চারপাশে যা আছে’ তা বলে ফেরেশতা (ইবন কাসীর) অথবা মূসা বা সেই পবিত্ৰ উপত্যকা অথবা সে গাছ সবই উদ্দেশ্য হতে পারে। আর এ মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। তবে কোন অবস্থাতেই এখানে ‘অগ্নিতে যা আছে’ দ্বারা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র ও মহান সত্তা বুঝানো হবে না। কেননা স্রষ্টা তাঁর আরশে রয়েছেন। কোন সৃষ্টিবস্তুর মধ্যে স্রষ্টার অনুপ্রবেশ হতে পারে না। এটা তাওহীদের পরিপন্থী কথা। সুতরাং রাব্বুল আলামিনের নূরের আলোর দ্বারাই সে গাছ কোন ভাবে আলোকিত হয়েছিল। তবে সরাসরি কোন আলো কোথায় পতিত হলে তা ভষ্ম হয়ে যাবে।

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ ঘুমান না, ঘুমানো তার জন্য সমীচীনও নয়, ইনসাফের পাল্লা বাড়ান এবং কমান, দিবাভাগের আগেই রাতের আমল তার কাছে উত্থিত হয় অনুরূপভাবে রাত্রি আগমণের আগেই তার কাছে দিবাভাগের আমল উত্থিত হয়। তাঁর পর্দা হলো নূরের। যদি তিনি তার পর্দাকে অপসারণ করেন তবে তা তার চেহারার আলো দৃষ্টিশক্তি যতদূর যায় ততদুর জ্বলিয়ে ভষ্ম করে দেবে।” (সহীহ মুসলিমঃ ১৭৯)

(৩) অর্থাৎ তিনি আরশের উপর থেকেও যমীনে এক গাছের উপরে তাঁর আলো ফেলে সেখান থেকে তাঁর বান্দা মূসার সাথে কথা বলছেন। তিনি অত্যন্ত মহান ও পবিত্র, তিনি যা ইচ্ছে করতে পারেন। তাঁর সত্তা, গুণাগুণ ও কার্যধারা কোন কিছুই কোন সৃষ্টজীবের মত হতে পারে না। তাঁর সৃষ্ট কোন কিছু তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না। আসমান ও যমীন তাঁকে ঘিরে রাখতে পারে না। তিনি সুউচ্চ, সুমহান, সমস্ত সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক। (ইবন কাসীর)

তিনি এ গাছের উপর থেকে কথা বললেও এটা যেন কেউ মনে না করে বসে যে, তিনি সৃষ্ট কোন কিছুর ভিতরে প্রবেশ করেছেন। এ আয়াতাংশ বলার উদ্দেশ্য সম্ভবত এও হতে পারে যে, দুনিয়াতে অধিকাংশ শির্ক সংঘটিত হয়েছে আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে। তাঁর কোন দৃষ্টি কোন কিছুর উপর পতিত হলে মানুষ সেটাকেই ইলাহ মনে করে পুজা করতে আরম্ভ করে। যদি আল্লাহকে সঠিকভাবে তাঁর মর্যাদা, সম্মান ও প্রতিপত্তি দেয়া হতো তা হলে কেউ শির্কে লিপ্ত হতো না। তাই এখানে তাঁকে এ ধরণের কাজ থেকে মুক্ত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৮) অতঃপর সে যখন আগুনের নিকট এল তখন তাকে ডেকে বলা হল, ‘যে (এই) আগুনে এবং যারা ওর চারিপাশে আছে তারা বরকতপ্রাপ্ত, (1) বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমার্নিত।(2)

(1) দূর হতে যেখানে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল, সেখানে পৌঁঁছলেন অর্থাৎ, ত্বুর পাহাড়ে এবং দেখলেন এক সবুজ গাছ হতে আগুনের শিখা উপরে উঠছে। এটি বাস্তবে আগুন ছিল না; বরং আল্লাহর নূর ছিল। যার আলো আগুনের মত মনে হচ্ছিল। مَنْ فِي النَّار (যে আগুনে আছে) বলতে মহান আল্লাহ। আর نار (আগুন) বলতে তাঁর নূরকে বুঝানো হয়েছে। আর وَمَنْ حَوْلَهَا (যারা ওর চারিপাশে আছে) বলতে মূসা (আঃ) ও ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসে মহান আল্লাহর পর্দাকে نور (জ্যোতি) আর এক অন্য বর্ণনায় نار (আগুন) বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর বলা হয়েছে যে, তিনি যদি নিজেকে পর্দা থেকে প্রকাশ করে দেন তাহলে তাঁর প্রতাপ সমস্ত সৃষ্টিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।

(মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়, বিস্তারিত দেখার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ ৫/৪৬৪- ৪৫৯)

(2) এখানে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনার অর্থ এই যে, ঐ অদৃশ্য ডাক হতে কেউ যেন এটা মনে না করে যে, আল্লাহ ঐ গাছ বা আগুনে প্রবেশ করে আছেন; যেমন অনেক মুশরিকরা ধারণা করে থাকে। বরং এটি সত্য দর্শনের একটি পদ্ধতি যার দ্বারা প্রত্যেক নবীকে নবুঅতের শুরুতে সম্মানিত করা হয়। কখনো ফিরিশতার মাধ্যমে, আবার কখনো বা স্বয়ং আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করে এবং সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে; যেমন, এখানে মূসা (আঃ)-এর সাথে ঘটেছে।