وَأَنذِرۡ عَشِيرَتَكَ ٱلۡأَقۡرَبِينَ

ওয়া আনযির ‘আশীরতাকাল আকরবীন।উচ্চারণ

নিজের নিকটতম আত্নীয়-পরিজনদেরকে ভয় দেখাও ১৩৫ তাফহীমুল কুরআন

এবং (হে নবী!) তুমি তোমার নিকটতম খান্দানকে সতর্ক করে দাও। #%৬৩%#মুফতী তাকী উসমানী

তোমার নিকটতম আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও।মুজিবুর রহমান

আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তোমার নিকট-আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক কর।আল-বায়ান

আর তুমি সতর্ক কর তোমার নিকটাত্মীয় স্বজনদেরতাইসিরুল

আর তোমার নিকটতম আ‌ত্মীয়দের সাবধান করে দাও,মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১৩৫

অর্থাৎ আল্লাহর এ পবিত্র পরিচ্ছন্ন দ্বীনের মধ্যে যেমন নবীকে কোন সুবিধা দেয়া হয়নি ঠিক তেমনি নবীর পরিবার ও তাঁর নিকটতম আত্মীয়-বান্ধবদের জন্যও কোন সুবিধার অবকাশ রাখা হয়নি। এখানে যার সাথেই কিছু করা হয়েছে তার গুণাগুণের (Merits) প্রেক্ষিতেই করা হয়েছে। কারো বংশ মর্যাদা বা কারো সাথে কোন ব্যক্তির সম্পর্ক কোন উপকার করতে পারে না। পথ ভ্রষ্টতা ও অসৎকর্মের জন্য আল্লাহর আযাবের ভয় সবার জন্য সমান। এমন নয় যে, অন্য সবাই তো এসব জিনিসের জন্য পাকড়াও হবে কিন্তু নবীর আত্মীয়রা রক্ষা পেয়ে যাবে। তাই হুকুম দেয়া হয়েছে, নিজের নিকটতম আত্মীয়দেরকেও পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দাও। যদি তারা নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপ পরিচ্ছন্ন না রাখে তাহলে তারা যে নবীর আত্মীয় একথা তাদের কোন কাজে লাগবেনা।

নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে, এ আয়াত নাযিল হবার পর নবী ﷺ সবার আগে নিজের দাদার সন্তানদের ডাকলেন এবং তাদের একেক জনকে সম্বোধন করে বললেনঃ

يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ, يَا عَبَّاس,يَا صَفِيَّةُ عَمَّة رَسُول الله, يَا فَاطِمَةَ بنَت مُحَمَّدٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ , فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ مِنَ اللهِ شَيْئًا سَلُونِى مِنْ مَالِى مَا شِئْتُمْ-

“হে বনী আবদুল মুত্তালিব, হে আব্বাস, হে আল্লাহর রসূলের ফুফী সফীয়াহ, হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা, তোমরা আগুনের আযাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার চিন্তা করো। আমি আল্লাহর আযাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবো না। তবে হ্যাঁ আমার ধন-সম্পত্তি থেকে তোমরা যা চাও চাইতে পারো।”

তারপর তিনি অতি প্রত্যুষে সাফা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেনঃ يا صباحاه (হায়, সকালের বিপদ!) হে কুরাইশের লোকেরা! হে বনী কা’ব ইবনে লুআই! হে বনী মুররা! হে কুসাইর সন্তান-সন্ততিরা! হে বনী আবদে মান্নাফ! হে বনী আবদে শামস! হে বনী হাশেম, হে বনী আবদুল মুত্তালিব! এভাবে কুরাইশদের প্রত্যেকটি গোত্র ও পরিবারের নাম ধরে তিনি আওয়াজ দেন। আরবে একটি প্রচলিত নিয়ম ছিল, অতি প্রত্যুষে যখন কোন বহিশত্রুর হামলার আশঙ্কা দেখা দিতো ওয়াকিফহাল ব্যক্তি এভাবেই সবাইকে ডাকতো এবং লোকেরা তার আওয়াজ শুনতেই চারদিকে থেকে দৌড়ে যেতো। কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ আওয়াজ শুনে লোকেরা যার যার ঘর থেকে বের হয়ে এলো। তখন তিনি বললেনঃ “হে লোকেরা! যদি আমি বলি, এ পাহাড়ের পেছনে একটি বিশাল সেনাবাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য ওঁৎ পেতে আছে। তাহলে কি তোমরা আমার কথা সত্য বলে মেনে নেবে? ” সবাই বললো, হ্যাঁ আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তুমি কখনো মিথ্যা বলনি। তিনি বললেন, “বেশ, তাহলে আমি আল্লাহর কঠিন আযাব আসার আগে তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। তাঁর পাকড়াও থেকে নিজেদের বাঁচাবার চিন্তা করো। আল্লাহর মোকাবিলায় আমি তোমাদের কোন কাজে লাগতে পারবোনা। কিয়ামতের দিন কেবলমাত্র মুত্তাকীরাই হবে আমার আত্মীয়। এমন যেন না হয়, অন্য লোকেরা সৎকাজ নিয়ে আসবে এবং তোমরা দুনিয়ার জঞ্জাল মাথায় করে নিয়ে উপস্থিত হবে। সে সময় তোমরা ডাকবে, হে মুহাম্মাদ! কিন্তু আমি তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবো। তবে দুনিয়ায় আমার সাথে তোমাদের রক্তের সম্পর্ক এবং এখানে আমি তোমাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবো।” এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অনেকগুলো হাদীস বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আয়েশা, আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, যুহাইর ইবনে আমর ও কুবাইসাহ ইবনে মাহারিক থেকে বর্ণিত হয়েছে।

কুরআনে وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ---এর হুকুম হলো এবং নবী (সা.) তাঁর আত্মীয়দেরকে একত্র করে একথা জানিয়ে দিয়ে সে হুকুম তামিল করলেন, ব্যাপারটির এখানেই শেষ নয়। আসলে এর মধ্যে যে মূলনীতি সুস্পষ্ট করা হয়েছিল তা ছিল এই যে, দ্বীনের মধ্যে নবী ও তাঁর বংশের জন্য এমন কোন বিশেষ সুবিধা নেই যা থেকে অন্যরা বঞ্চিত। যে জিনিসটি প্রাণ সংহারক বিষ সেটি সবারই জন্য প্রাণ সংহারক। নবীর কাজ হচ্ছে সবার আগে নিজে তা থেকে বাঁচবেন এবং নিজের নিকটবর্তী লোকদেরকে তার ভয় দেখাবেন। তারপর সাধারণ অসাধারণ নির্বিশেষে সবাইকে এ মর্মে সতর্ক করে দেবেন যে, এটি যে-ই খাবে, সে-ই মারা পড়বে। আর যে জিনিসটি লাভজনক তা সবার জন্য লাভজনক। নবীর দায়িত্ব হচ্ছে, সবার আগে তিনি নিজে সেটি অবলম্বন করবেন এবং নিজের আত্মীয়দেরকে সেটি অবলম্বন করার উপদেশ দেবেন। এর ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি দেখে নেবে এ ওয়াজ-নসিহত শুধুমাত্র অন্যের জন্য নয় বরং নিজের দাওয়াতের ব্যাপারে নবী আন্তরিক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবন এ পদ্ধতি অবলম্বন করে গেছেন। মক্কা বিজয়ের দিন যখন তিনি শহরে প্রবেশ করলেন তখন ঘোষণা করে দিলেনঃ

كُلَّ رِبًا فِى الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ تحت قدمى ها تين وأَوَّلَ رِباً يُوضَعُ رِبَا عَبَّاسِ

“লোকদের কাছে অনাদায়কৃত জাহেলী যুগের প্রত্যেকটি সুদ আমার এ দু’পায়ের তলে পিষ্ট করা হয়েছে। আর সবার আগে যে সুদকে আমি রহিত করে দিচ্ছি তা হচ্ছে আমার চাচা আব্বাসের সুদ।”

(উল্লেখ্য, সুদ হারাম হবার আগে আব্বাস (রা.) সুদে টাকা খাটাতেন এবং সে সময় পর্যন্ত লোকদের কাছে তাঁর বহু টাকার সুদ পাওনা ছিল) একবার চুরির অভিযোগে তিনি কুরাইশদের ফাতিমা নামের একটি মেয়ের হাত কাটার হুকুম দিলেন। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) তার পক্ষে সুপারিশ করলেন। এতে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করতো তাহলে আমি তার হাত কেটে দিতাম।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনের তাবলীগ ও প্রকাশ্যে প্রচারকার্য চালানোর নির্দেশ সর্বপ্রথম যে আয়াত দ্বারা দেওয়া হয়, এটাই সেই আয়াত, এতে সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী খান্দান থেকে তাবলীগের সূচনা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে উঠে নিজ খান্দানের নিকটবর্তী লোকদেরকে ডাক দিলেন এবং তারা সেখানে সমবেত হলে, সত্য দীনের প্রতি তাদেরকে দাওয়াত দিলেন। এ আয়াতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, যারা ইসলামী দাওয়াতের কাজ করবে, তাদের কর্তব্য প্রথমে নিজ পরিবার ও খান্দান থেকেই তা শুরু করা।

তাফসীরে জাকারিয়া

২১৪. আর আপনার নিকটস্থ জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে সতর্ক করুন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(২১৪) তোমার নিকটতম স্বজনবর্গকে তুমি সতর্ক করে দাও। (1)

(1) নবীর আহবান (দাওয়াত) কেবলমাত্র আত্মীয়দের জন্য নয়; বরং তা পুরো জাতির জন্য। আর আমাদের নবী (সাঃ) তো ছিলেন পূর্ণ মানবতার পথ-প্রদর্শক ও সৎপথের দিশারী। তবে নিকট আত্মীয়দেরকে ঈমানের পথে আহবান করা সাধারণ আহবানের বিরোধী নয়। বরং তা দাওয়াতের এক অংশ এবং প্রাধান্যযোগ্য দিক। যেমন, ইবরাহীম (আঃ)ও প্রথমে পিতা আযরকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এই আদেশের পর নবী (সাঃ) স্বাফা পাহাড়ের উপর উঠলেন এবং يا صباحاه বলে ডাক দিলেন। এই শব্দ ঐ সময় তারা ব্যবহার করত, যখন হঠাৎ কোন শত্রু আক্রমণ করে বসত। এ দ্বারা জাতিকে সতর্ক করা হত। মহানবী (সাঃ)-এর এই শব্দ শুনে সবাই একত্রিত হল। তিনি কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ডাকলেন আর বললেন যে, ‘বল, আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পিছনে এক শত্রুদল রয়েছে, যারা তোমাদের উপর আক্রমণ করতে চায়, তাহলে তোমরা কি আমার একথা বিশ্বাস করবে?’ সকলেই বলল, ‘হ্যাঁ! অবশ্যই বিশ্বাস করব। (আমাদের অভিজ্ঞতায় তোমাকে মিথ্যাবাদী পাইনি।)’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছেন। আমি তোমাদেরকে এক কঠিন আযাব হতে সতর্ক করছি।’ এ কথা শুনে আবু লাহাব বলেছিল, تبًا لَكَ أَمَا دَعَوْتَنَا إِلاَّ لِهَذَا! ‘তুমি ধ্বংস হও, তুমি কি আমাদেরকে এ জন্যই ডেকেছিলে?’ এর উত্তরে ‘সূরা লাহাব’ অবতীর্ণ  হয়েছিল। (বুখারীঃ তাফসীর সূরাতুল মাসাদ) তিনি নিজ কন্যা ফাতেমা (রাঃ)  ও ফুফু স্বাফিয়্যাহ (রাঃ) -কেও বললেন যে, তোমরা নিজেদেরকে বাঁচানোর ব্যবস্থা গ্রহণ কর। আমি আল্লাহর নিকট তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। (মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায় أنذر عشيرتك الأقربين পরিচ্ছেদ)