কাযযাবা আসহা-বুল আইকাতিল মুরছালীন।উচ্চারণ
আইকাবাসীরা রসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করলো। ১১৫ তাফহীমুল কুরআন
আয়কাবাসীগণ রাসূলগণকে অস্বীকার করেছিল। #%৪৯%#মুফতী তাকী উসমানী
আইকাবাসীরা রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল –মুজিবুর রহমান
বনের অধিবাসীরা পয়গম্বরগণকে মিথ্যাবাদী বলেছে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আয়কাবাসীরা রাসূলগণকে অস্বীকার করেছিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আইকার অধিবাসীরা রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল।আল-বায়ান
বনের অধিবাসীরা রসূলদেরকে মিথ্যে বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।তাইসিরুল
আইকার অধিবাসীরা রসূলগণকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।মাওলানা জহুরুল হক
১১৫
আইকাবাসীদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ইতিপূর্বে সূরা আল হিজরের ৭৮-৮৪ আয়াতে করা হয়েছে। এখানে করা হচ্ছে তার বিস্তারিত আলোচনা। মাদয়ান ও আইকাবাসীরা দু’টি আলাদা জাতি অথবা একটি জাতির পৃথক নাম, এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। একদল মনে করেন, তারা দু’টি পৃথক জাতি। এজন্য তাদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে, সূরা আ’রাফে হযরত শো’আইবকে মাদয়ানবাসীদের ভাই বলা হয়েছেঃ وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا আর এখানে আইকাবাসীদের উল্লেখ করতে গিয়ে শুধুমাত্র বলা হয়েছে إِذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ (যখন শু’আইব তাদেরকে বললো)। এখানে তাদের ভাই (اَخُوْهُمْ) শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। পক্ষান্তরে কোন কোন মুফাসসির উভয়কে একই জাতি গণ্য করেছেন। কারণ, সূরা আ’রাফ ও সূরা হূদে মাদয়ানবাসীদের যেসব রোগ ও গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে এখানে আইকাবাসীদের সে একই রোগ ও গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে। হযরত শো’আইবের দাওয়াত ও উপদেশও একই এবং শেষে তাদের পরিণতির মধ্যেও কোন ফারাক নেই।
গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, এ দু’টি উক্তি মূলতঃ সঠিক। সন্দেহাতীতভাবে মাদয়ানবাসী ও আইকাবাসীরা দু’টি আলাদা গোত্র। কিন্তু মূলত তারা একই বংশধারার দু’টি পৃথক শাখা। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী বা দাসী কাতুরার গর্ভজাত সন্তানরা আরব ও ইসরাঈলী ইতিহাসে বনী কাতুরা নামে পরিচিত। এদের একটি গোত্র সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করে। মাদয়ান ইবনে ইব্রাহীমের বংশোদ্ভূত হবার ফলে তাদেরকে মাদয়ানী বা মাদয়ানবাসী বলা হয়। এদের বসতি উত্তর হেজায থেকে ফিলিস্তীনের দক্ষিণ পর্যন্ত এবং সেখান থেকে সিনাই ব-দ্বীপের শেষ কিনারা পর্যন্ত লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের পশ্চিম উপকূল এলাকায় বিস্তৃত হয়। এর কেন্দ্রস্থল ছিল মাদয়ান শহর। আবুল ফিদার মতে এটি আকাবা উপসাগরের উপকূলে আইলা (বর্তমান আকাবা) থেকে পাঁচ দিনের দুরত্বে অবস্থিত। বনী কাতুরার অন্যান্য গোত্রের মধ্যে বনী দীদান (Dedanties) তুলনামূলকভাবে বেশী পরিচিত। উত্তর আরবে তাইমা, তাবুক ও আলা’উলার মাঝামাঝি স্থানে তারা বসতি গড়ে। তাদের কেন্দ্রীয় স্থান ছিল তাবুক। প্রাচীনকালে একে আইকা বলা হতো। (মু’জামুল বুলদান গ্রন্থে ইয়াকূত আইকা শব্দের আলোচনায় বলেছেন, এটি তাবুকের পুরাতন নাম এবং তাবুকবাসীদের মধ্যে একথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল যে, এ স্থানটিই এক সময় আইকা নামে পরিচিত ছিল।)
মাদয়ানবাসী ও আইকাবাসীদের জন্য একজন রসূল পাঠাবার কারণ সম্ভবত এ ছিল যে, তারা একই বংশধারার সাথে সম্পর্কিত ছিল, একই ভাষায় কথা বলতো এবং তাদের এলাকাও পরস্পরের সাথে সংযুক্ত ছিল। বরং বিচিত্র নয়, কোন কোন এলাকায় তাদের বসতি একই সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়ে সমাজে তারা মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া বনী কাতুরার এ দু’শাখার লোকদের পেশাও ছিল ব্যবসা। তাদের মধ্যে একই ধরণের ব্যবসায়িক অসততা এবং ধর্মীয় ও চারিত্রিক দোষ পাওয়া যেত। বাইবেলের প্রথম দিকের পুস্তকগুলোতে বিভিন্ন জায়গায় এ আলোচনা পাওয়া যায় যে, এরা বা’লে ফুগূরের পূজা করতো। বনী ইসরাঈল যখন মিসর থেকে বের হয়ে এদের এলাকায় আসে তখন তাদের মধ্যেও এরা শিরক ও ব্যভিচারের রোগ ছড়িয়ে দেয়। (গণনা পুস্তক ২৫: ১-৫ এবং ৩১: ১৬-১৭) তাছাড়া দু’টি বড় বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের ওপর এদের বসতি গড়ে উঠেছিল। এ পথ দু’টি ইয়ামন থেকে সিরিয়া এবং পারস্য উপসাগর থেকে মিসরের দিকে চলে গিয়েছিল। এ দু’টি রাজপথের ধারে বসতি হবার কারণে এদের লুটতরাজ ও রাহাজানির কারবার ছিল খুবই রমরমা। অন্যসব জাতির বাণিজ্য কাফেলাকে বিপুল পরিমাণ কর না দিয়ে তারা এ এলাকা অতিক্রম করতে দিতো না। নিজেরা আন্তর্জাতিক পথ দখল করে রাখার ফলে পথের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে রেখেছিল। কুরআন মজীতে তাদের এ অবস্থানকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ إِنَّهُمَا لَبِإِمَامٍ مُبِينٍ “এ জাতি দু’টি (লূতের জাতি ও আইকাবাসী) প্রকাশ্য রাজপথের ওপর বসবাস করতো।” এদের রাহাজানির কথা সূরা আ’রাফে এভাবে বলা হয়েছেঃ وَلَا تَقْعُدُوا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوعِدُونَ “আর প্রত্যেক পথের ওপর লোকদেরকে ভয় দেখাবার জন্য বসে যেয়ো না।” এ সমস্ত কারণে আল্লাহ এ উভয় সম্প্রদায়ের জন্য একই নবী পাঠিয়েছিলেন এবং তাদেরকে একই ধরণের শিক্ষা দিয়েছিলেন।
হযরত শো’আইব ও মাদয়ানবাসীদের কাহিনী বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন আল আ’রাফের ৮৫-৯৩, হূদের ৮৪-৯৫, এবং আল আনকাবুতের ৩৬-৩৭ আয়াত।
‘আয়কা’ অর্থ নিবিড় বন। হযরত শুআইব (আ.)কে যে সম্প্রদায়ের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তারা এ রকম বনের পাশেই বাস করত। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এ জনপদেরই নাম ছিল ‘মাদইয়ান’। কারও মতে ‘আয়কা’ ও ‘মাদইয়ান’ এক নয়; বরং স্বতন্ত্র দু’টি জনপদ। হযরত শুআইব আলাইহিস সালাম উভয়ের প্রতিই প্রেরিত হয়েছিলেন। এ সম্প্রদায়ের ঘটনা বিস্তারিতভাবে সূরা আরাফে চলে গেছে (৭ : ৮৫-৯৩)। টীকাসহ দ্রষ্টব্য।
১৭৬. আইকাবাসীরা(১) রাসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল,
(১) ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর পরে আল্লাহ্ তা'আলা শু'আইব 'আলাইহিস সালামকে পাঠান। তার জাতি ছিল মাদইয়ান জাতি। (সূরা আল-আরাফঃ ৮৫) মাদইয়ান ছিল শু'আইব 'আলাইহিস সালাম-এর জাতির এক পূর্বপুরুষের নাম। অপরদিকে কখনো কখনো পবিত্র কুরআনে শুয়াইব 'আলাইহিস সালাম-এর কওম সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আসহাবুল আইকাহ’ বা গাছওয়ালাগণ। (সূরা আশ-শুয়ারাঃ ১৭৬) অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে আইকাবাসী দ্বারা মাদইয়ান জাতিকে বুঝানো হয়েছে। (আদওয়াউল-বায়ান)
(১৭৬) আইকাহবাসীরা(1) রসূলগণকে মিথ্যা মনে করেছিল;
(1) ‘আইকাহ’ জঙ্গলকে বলা হয়। এখানে শুআইব (আঃ)-এর জাতি ও মাদয়্যান শহরের আশপাশের বাসিন্দাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আরো বলা হয় যে, ‘আইকাহ’ অর্থ ঘন ডাল-পাতা বিশিষ্ট গাছ। আর এ রকমই একটি গাছ মাদয়্যানের উপকণ্ঠে ছিল, যার পূজা করা হত। শুআইব (আঃ)-এর নবুঅতের পরিধি ও দাওয়াত-তাবলীগের পরিসীমা মাদয়্যান থেকে ওর আশপাশের বসতি পর্যন্ত ছিল; যেখানে ‘আইকাহ’ গাছের পূজা হত। সেখানে বসবাসকারীদেরকে ‘আসহাবুল আইকাহ’ বলা হয়েছে। এই হিসাবে ‘আসহাবুল আইকাহ’ ও মাদয়্যানবাসীদের নবী ছিলেন একজন, অর্থাৎ কেবল শুআইব (আঃ)। আর এই উভয় জাতিই ছিল একই নবীর উম্মত। ‘আইকাহ’ যেহেতু জাতি নয়, বরং একটি গাছ সেহেতু এখানে ভাই সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়নি। যেমন, অন্যান্য জাতির নবীর ক্ষেত্রে করা হয়েছে। অবশ্য যেখানে মাদয়্যানের সঙ্গে শুআইব (আঃ)-এর উল্লেখ হয়েছে সেখানে ভাই সম্পর্ক জুড়ে বর্ণনা করা হয়েছে। যেহেতু মাদয়্যান একটি জাতির নাম।
{وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا} (৮৫) سورة الأعراف কোন কোন তফসীরকারগণ (আইকাহ ও মাদয়্যানকে) আলাদা আলাদা বসতি ধরে আসহাবুল আইকাহ ও মাদয়্যানবাসীদেরকে পৃথক পৃথক দু’টি উম্মত বলেছেন। যাদের নিকট পালাক্রমে শুআইব (আঃ)-কে পাঠানো হয়েছিল; একবার মাদয়্যানের দিকে ও আর একবার আসহাবুল আইকার দিকে। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেছেন, সঠিক তথ্য হল, এরা ছিল একটিই উম্মত। কারণ ওজন ও মাপে কমবেশী করার ব্যাপারে যে উপদেশ মাদয়্যানবাসীদেরকে দেওয়া হয়েছে, সেই একই উপদেশ আসহাবুল আইকাদেরকেও দেওয়া হয়েছে। যাতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, এরা একই উম্মত, দুই নয়।