লা‘আললীআ‘মালুসা-লিহান ফীমা-তারকতুকাল্লা- ইন্নাহা-কালিমাতুন হুওয়া কাইলুহা- ওয়ামিওঁ ওয়ারইহিম বারঝাখুন ইলা-ইয়াওমি ইউব‘আছূন।উচ্চারণ
আশা করি এখন আমি সৎকাজ করবো। ৯০ কখনোই নয়, ৯১ এটা তার প্রলাপ ছাড়া আর কিছু আর নয়। ৯২ এখন এ মৃতদের পেছনে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে একটি অন্তরবর্তীকালীন যুগ—বরযখ যা পরবর্তী জীবনের দিন পর্যন্ত থাকবে। ৯৩ তাফহীমুল কুরআন
যাতে আমি যা (অর্থাৎ যে দুনিয়া) ছেড়ে এসেছি সেখানে গিয়ে সৎকাজ করতে পারি। কখনও না। এটা একটা কথার কথা, যা সে মুখে বলছে মাত্র। তাদের (অর্থাৎ মৃতদের) সামনে রয়েছে ‘বরযখ’ #%৩৯%# যা তাদেরকে পুনরুত্থিত করার দিন পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।মুফতী তাকী উসমানী
যাতে আমি সৎ কাজ করতে পারি যা আমি পূর্বে করিনি। না এটা হবার নয়; এটাতো তার একটা উক্তি মাত্র; তাদের সামনে বারযাখ থাকবে পুনরুত্থান দিন পর্যন্ত।মুজিবুর রহমান
যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
‘যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি পূর্বে করি নাই।’ না, এটা হওয়ার নয়। এটা তো এর একটি উক্তি মাত্র। এদের সামনে বারযাখ থাকবে উত্থান দিবস পর্যন্ত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ।আল-বায়ান
যাতে আমি সৎ কাজ করতে পারি যা আমি করিনি। কক্ষনো না, এটা তো তার একটা কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা থাকবে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।তাইসিরুল
"যেন আমি সৎকর্ম করতে পারি সেইখানে যা আমি ছেড়ে এসেছি।" কখনোই না! এ তো শুধু একটি মুখের কথা যা সে বলছে। আর তার সামনে রয়েছে 'বরযখ’ সেইদিন পর্যন্ত যখন তাদের পুনরুত্থান করা হবে।মাওলানা জহুরুল হক
৯০
কুরআন মজীদের বহু জায়গায় এ বক্তব্যটি উচ্চারিত হয়েছে। অপরাধীরা মৃত্যুর সীমানায় প্রবেশ করার সময় থেকে নিয়ে আখেরাতে প্রবেশ করে জাহান্নামে দাখিল হওয়া পর্যন্ত বরং তার পরও বারবার এ আবেদনই করতে থাকবেঃ আমাদের আর একবার মাত্র দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হোক। এখন আমরা তাওবা করছি, আর কখনো নাফরমানি করবো না, এবার আমরা সোজা পথে চলবো। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, সূরা আল আন’আম, ২৭ ও ২৮; আল আ’রাফ, ৫৩; ইবরাহীম ৪৪ ও ৪৫; আল মু’মিনূন, ১০৫ থেকে ১১৫; আশ শু’আরা, ১০২; আস সাজ্দাহ, ১২ থেকে ১৪; ফাতের, ৩৭; আয যুমার, ৫৮ ও ৫৯; আল মু’মিন, ১০ থেকে ১২ ও আশ্ শূরা, ৪৪ আয়াত এবং এ সঙ্গে টীকাগুলোও)।
৯১
অর্থাৎ ফেরত পাঠানো হবে না। নতুন করে কাজ শুরু করার জন্য তাকে আর দ্বিতীয় কোন সুযোগ দেয়া যেতে পারে না। এর কারণ হচ্ছে, মানুষকে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করার জন্য পুনরায় যদি এ দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয় তাহলে অনিবার্যভাবে দু’টি অবস্থার মধ্য থেকে একটি অবলম্বন করতে হবে। মৃত্যুর পর সে যা কিছু করেছে সেসব তার স্মৃতি ও চেতনায় সংরক্ষিত করে রাখতে হবে। অথবা এসব কিছু নিশ্চিহ্ন করে দিয়েপ্রথমবার যেমন স্মৃতির কোঠা শূন্য করে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল ঠিক তেমনি অবস্থায় আবার তাকে সৃষ্টি করা হবে। উল্লেখিত প্রথম অবস্থায় পরীক্ষার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ এ দুনিয়ায় মানুষ সত্যকে প্রত্যক্ষ না করে নিজেই বুদ্ধি-বিবেকেরসাহায্যে সত্যকে জেনে তাকে মেনে নেয় কিনা এবং আনুগত্য ও অবাধ্যতা করার স্বাধীনতা লাভ করা সত্ত্বেও এ দু’টি পথের মধ্য থেকে কোন্টি অবলম্বন করে-এরি ভিত্তিতেই হচ্ছে তার পরীক্ষা। এখন যদি তাকে সত্য দেখিয়েও দেয়া হয় এবং গোনাহের পরিণাম বাস্তবে দেখিয়ে দিয়ে গোনাহকে নির্বাচন করার পথই তার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে এরপর তাকেপরীক্ষাগৃহে পাঠানোই অর্থহীন হয়ে যায়। এরপর কে ঈমান আনবে না এবং কে আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে? আর দ্বিতীয় অবস্থাটি সম্পর্কে বলা যায় যে, এটি পরীক্ষিতকে আবার পরীক্ষা করার মতো অবস্থা। যে ব্যক্তি একবার এ পরীক্ষায়অকৃতকার্য হয়েছে তাকে আবার সে একই ধরনের আর একটি পরীক্ষায় পাঠানো নিরর্থক। কারণ সে আবার সেই আগের মতোই করবে। (আরো বেশী ব্যাখ্যা জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল বাকারাহ, ২২৮; আল আন’আম, ৬, ১৩৯ ও ১৪০ এবং ইউনুস, ২৬ টীকা)।
৯২
এ অনুবাদও হতে পারে, “এ তো এখন সে বলবেই”। এর অর্থ হচ্ছে, তার এ কথা ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য নয়। সর্বনাশ হবার পর এখন সে একথা বলবে না তো আর কি বলবে। এ নিছক কথার কথা। ফিরে আসবে যখন তখন আবার সেসব কিছু করবে যা আগে করে এসেছে। কাজেই তাকে প্রলাপ বকতে দাও ফেরার দরজা তার জন্য খোলা যেতে পারে না।
৯৩
“বরযখ”-----শব্দটি ফার্সী “পরদা”-----শব্দটি আরবীকরণ। আয়াতের অর্থ হচ্ছে, এখন তাদের ও দুনিয়ার মধ্যে রয়েছে একটি প্রতিবন্ধক। এটি তাদেরকে দুনিয়ায় ফিরে যেতে দেবে না এবং কিয়ামত পর্যন্ততারা দুনিয়া ও আখেরাতের মাঝখানের এ যবনিকার আড়ালে অবস্থান করবে।
মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি যে জগতে থাকে, তাকে ‘বরযখ’ বলে। আয়াতে বলা হচ্ছে, মৃতদেরকে তাদের কথার জবাবে বলা হবে, মৃত্যুর পর এখন আর তোমাদের দুনিয়ায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কেননা তোমাদের সামনে রয়েছে বরযখের বাধা। এ বাধা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। [ورائه শব্দটি যেমন ‘পিছন’ অর্থে আসে, তেমনি ‘সম্মুখ’ অর্থেও আসে]
১০০. যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি আগে করিনি।(১) না, এটা হবার নয়। এটা তো তার একটি বাক্য মাত্র যা সে বলবেই(২)৷ তাদের সামনে বার্যাখ(৩) থাকবে উত্থান দিন পর্যন্ত।
(১) অর্থাৎ মৃত্যুর সময় যখন কাফের ব্যক্তি আখেরাতের আযাব অবলোকন করতে থাকে, তখন এরূপ বাসনা প্ৰকাশ করে, আফসোস, আমি যদি পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে যেতাম এবং সৎকর্ম করে এই আযাব থেকে রেহাই পেতাম। (ইবন কাসীর) অন্য আয়াতেও এসেছে, “আর আমরা তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। অন্যথায় মৃত্যু আসলে সে বলবে, হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ দিতাম ও সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম! আর যখন কারো নির্ধারিত কাল উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা আমল করা আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।” (সূরা আল-মুনাফিকূন: ১০–১১)
আরও এসেছে, “আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে বের করুন, আমরা যা করতাম তার পরিবর্তে সৎকাজ করব।’ আল্লাহ বলবেন, “আমরা কি তোমাদেরকে এতো দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ উপদেশ গ্ৰহণ করতে চাইলে উপদেশ গ্ৰহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। কাজেই শাস্তি আস্বাদন কর; আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা ফাতির: ৩৭) কিন্তু তাদের সে চাওয়া পূরণ করা হবে না। (ইবন কাসীর)
(২) অৰ্থাৎ ফেরত পাঠানো হবে না। নতুন করে কাজ শুরু করার জন্য তাকে আর দ্বিতীয় কোন সুযোগ দেয়া যেতে পারে না। তাছাড়া যদি তাদের কথামত তাদেরকে পাঠানোও হতো তারপরও তারা আবার অন্যায় করত। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “আর তারা আবার ফিরে গেলেও তাদেরকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছিল আবার তারা তাই করত” (সূরা আল-আন’আম: ২৮) (কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর)
(৩) ‘বারযাখ’ এর শাব্দিক অর্থ অন্তরায় ও পৃথককারী বস্তু। দুই অবস্থা অথবা দুই বস্তুর মাঝখানে যে বস্তু আড়াল হয় তাকে বারযাখ বলা হয়। (ফাতহুল কাদীর) এ কারণেই মৃত্যুর পর কেয়ামত ও হাশার পর্যন্ত কালকে বারযাখ বলা হয়। কারণ এটা দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের জীবনের মাঝখানে সীমা প্রাচীর। আয়াতের অর্থ এই যে, মরণোম্মুখ ব্যক্তির ফেরেশতাদেরকে দুনিয়াতে পাঠানোর কথা বলা শুধু একটি কথা মাত্র, যা সে বলতে বাধ্য। কেননা, এখন আযাব সামনে এসে গেছে। কিন্তু এখন এই কথার ফায়দা নেই। কারণ, সে বরযাখে পৌছে গেছে। বারযাখ থেকে দুনিয়াতে ফিরে আসে না এবং কেয়ামত ও হাশর-নশরের পূর্বে পুনর্জীবন পায় না, এটাই নিয়ম।
(১০০) যাতে আমি আমার ছেড়ে আসা জীবনে সৎকর্ম করতে পারি।’(1) না, এটা হবার নয়;(2) এটা তো তার একটা উক্তি মাত্র;(3) তাদের সামনে ‘বারযাখ’ (যবনিকা) থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।(4)
(1) এই কামনা প্রতিটি কাফের মৃত্যুর সময়, পুনর্জীবিত হওয়ার সময়, আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হওয়ার সময় এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ হওয়ার সময় করে থাকে ও করবে। কিন্তু এতে কোন লাভ হবে না। কুরআন কারীমে এ বিষয়টিকে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ সূরা মুনাফিকূন ১০-১১, ইবরাহীম ৪৪, আ’রাফ ৫৩, সাজদাহ ১২, আনআম ২৭-২৮, শূরা ৪৪, মু’মিন ১১-১২, ফাত্বির ৩৭ আয়াত ইত্যাদি।
(2) كَلا শব্দটি ধমকরূপে প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ রকম কখনই হবে না যে, তাদেরকে পৃথিবীতে পুনর্বার পাঠিয়ে দেয়া হবে।
(3) এর একটি অর্থ এই যে, এ রকম কথা তো প্রত্যেক কাফের তার মৃত্যুর সময় বলে থাকে। দ্বিতীয় অর্থ হল, এটা শুধু তাদের মুখের কথা; যা কাজে পরিণত হওয়ার নয়। অর্থাৎ, তাদেরকে পৃথিবীতে পুনর্বার পাঠিয়ে দেওয়া হলেও তাদের এ কথা কথাই থেকে যাবে; সৎকাজের সুমতি তাদের হবে না। যেমন, এক জায়গায় বলা হয়েছে ‘‘যদি তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেও যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল তারা তাই করবে।’’ (সূরা আনআমঃ ২৮) ক্বাতাদাহ (রহঃ) বলেন, কাফেরদের এই কামনায় আমাদের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। কাফের নিজ বংশে ও গোত্রে ফিরে যাওয়ার কামনা করবে না। বরং পৃথিবীতে সৎকর্ম করার কামনা করবে। সেই জন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করে অধিকাধিক সৎকর্ম করা উচিত। যাতে কাল কিয়ামত দিবসে এ রকম কামনা করার প্রয়োজন না হয়। (ইবনে কাসীর)
(4) দুই জিনিসের মধ্যেকার পর্দা ও আড়ালকে ‘বারযাখ’ বলে। ইহকাল ও পরকাল জীবনের মধ্যকার যে একটি জীবন রয়েছে, তাকেই ‘বারযাখ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ, মৃত্যুর পরপরই পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। আর আখেরাতের জীবন তখন শুরু হবে, যখন সমস্ত মানুষকে পুনর্বার জীবিত করা হবে। এর মধ্যকার জীবন যা কবরে বা পশু-পক্ষীর পেটে কিংবা পুড়িয়ে ছাই করে দিলে শেষ পর্যন্ত মাটির ধূলিকণা আকারে অতিবাহিত হয়, তাকে ‘বারযাখী জীবন’ বলে। মানুষের এই অস্তিত্ব যেখানেই থাক আর যেভাবেই থাক, শেষ পর্যন্ত মাটিতে মিশে মাটিতে পরিণত হবে অথবা ছাই হয়ে হাওয়ায় উড়ে যাবে, অথবা সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হবে অথবা কোন জন্তুর খাদ্যে পরিণত হবে। পরিশেষে মহান আল্লাহ সকলকে এক নতুন অস্তিত্ব দান করে হাশরের মাঠে জমা করবেন।