ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ

আল্লাযীনা হুম ফী সালা-তিহিম খা-শি‘ঊন,উচ্চারণ

যারাঃ নিজেদের নামাযে বিনয়াবনত হয়, তাফহীমুল কুরআন

যারা তাদের নামাযে আন্তরিকভাবে বিনীত। মুফতী তাকী উসমানী

যারা নিজেদের সালাতে বিনয়, নম্র –মুজিবুর রহমান

যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র;মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যারা বিনয়-নম্র নিজেদের সালাতে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত।আল-বায়ান

যারা নিজেদের নামাযে বিনয় নম্রতা অবলম্বন করে।তাইসিরুল

যারা স্বয়ং তাদের নামাযে বিনয়-নম্র হয়,মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

এখান থেকে নিয়ে ৯ আয়াত পর্যন্ত মু’মিনদের যে গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে তা আসলে মু’মিনরা সফলকাম হয়েছে এ বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তিস্বরূপ। অন্য কথায়, বলা হচ্ছে, যেসব লোক এ ধরনের গুণাবলীর অধিকারী তারা কেনইবা সফল হবে না। এ গুণাবলি সম্পন্ন লোকেরা ব্যর্থ ও অসফল কেমন করে হতে পারে। তারাই যদি সফলকাম না হয় তাহলে আর কারা সফলকাম হবে।

মূল শব্দ হচ্ছে “খুশূ”। এর আসল মানে হচ্ছে কারোর সামনে ঝুঁকে পড়া, দমিত বা বশীভূত হওয়া, বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করা। এ অবস্থাটার সম্পর্ক মনের সাথে এবং দেহের বাহ্যিক অবস্থার সাথেও। মনের খূশূ’ হচ্ছে, মানুষ কারোর ভীতি, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতাপ ও পরাক্রমের দরুন সন্ত্রস্ত ও আড়ষ্ট থাকবে। আর দেহের খুশূ’ হচ্ছে, যখন সে তার সামনে যাবে তখন মাথা নত হয়ে যাবে, অংগ-প্রত্যংগ ঢিলে হয়ে যাবে, দৃষ্টি নত হবে, কন্ঠস্বর নিম্নগামী হবে এবং কোন জবরদস্ত প্রতাপশালী ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হলে মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক ভীতির সঞ্চার হয় তার যাবতীয় চিহ্ন তার মধ্যে ফুটে উঠবে। নামাযে খুশূ’ বলতে মন ও শরীরের এ অবস্থাটা বুঝায় এবং এটাই নামাযের আসল প্রাণ। হাদিসে বলা হয়েছে, একবার নবী ﷺ এক ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখলেন এবং সাথে সাথে এও দেখলেন যে, সে নিজের দাড়ি নিয়ে খেলা করছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, لو خشع قلبه خشعت جوارحه “যদি তার মনে খুশূ’ থাকতো তাহলে তার দেহেও খুশূ’র সঞ্চার হতো।”

যদিও খুশূ’র সম্পর্ক মূলত মনের সাথে এবং মনের খুশূ’ আপনা আপনি দেহে সঞ্চারিত হয়, যেমন ওপরে উল্লেখিত হাদিস থেকে এখনই জানা গেলো, তবুও শরীয়তে নামাযের এমন কিছু নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে যা একদিকে মনের খুশূ’ (আন্তরিক বিনয়-নম্রতা) সৃষ্টিতে সাহায্য করে এবং অন্যদিকে খুশূ’র হ্রাস-বৃদ্ধির অবস্থায় নামাযের কর্মকান্ডকে কমপক্ষে বাহ্যিক দিক দিয়ে একটি বিশেষ মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত রাখে। এই নিয়ম-কানুনগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, নামাযী যেন ডানে বামে না ফিরে এবং মাথা উঠিয়ে ওপরের দিকে না তাকায়, (বড়জোর শুধুমাত্র চোখের কিনারা দিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে পারে। হানাফি ও শাফেয়ীদের মতে দৃষ্টি সিজদার স্থান অতিক্রম না করা উচিত। কিন্তু মালেকীগণ মনে করেন দৃষ্টি সামনের দিকে থাকা উচিত।) নামাযের মধ্যে নড়াচড়া করা এবং বিভিন্ন দিকে ঝুঁকে পড়া নিষিদ্ধ। বারবার কাপড় গুটানো অথবা ঝাড়া কিংবা কাপড় নিয়ে খেলা করা জায়েয নয়। সিজদায় যাওয়ার সময় বসার জায়গা বা সিজদা করার জায়গা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতেও নিষেধ করা হয়েছে। গর্বিত ভংগীতে খাড়া হওয়া, জোরে জোরে ধমকের সুরে কুরআন পড়া অথবা কুরআন পড়ার মধ্যে গান গাওয়াও নামাযের নিয়ম বিরোধী। জোরে জোরে আড়মোড়া ভাংগা ও ঢেকুর তোলাও নামাযের মধ্যে বেআদবি হিসেবে গণ্য। তাড়াহুড়া করে টপাটপ নামায পড়ে নেয়াও ভীষণ অ-পছন্দনীয়। নির্দেশ হচ্ছে, নামাযের প্রত্যেকটি কাজ পুরোপুরি ধীর-স্থিরভাবে শান্ত সমাহিত চিত্তে সম্পন্ন করতে হবে। এক একটি কাজ যেমন রুকু’, সিজদা, দাঁড়ানো বা বসা যতক্ষণ পুরোপুরি শেষ না হয় ততক্ষণ অন্য কাজ শুরু করা যাবে না। নামায পড়া অবস্থায় যদি কোন জিনিস কষ্ট দিতে থাকে তাহলে এক হাত দিয়ে তা দূর করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু বারবার হাত নাড়া অথবা উভয় হাত একসাথে ব্যাবহার করা নিষিদ্ধ।

এ বাহ্যিক আদবের সাথে সাথে নামাযের মধ্যে জেনে বুঝে নামাযের সাথে অসংশ্লিষ্ট ও অবান্তর কথা চিন্তা করা থেকে দূরে থাকার বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনিচ্ছাকৃত চিন্তা-ভাবনা মনের মধ্যে আসা ও আসতে থাকা মানুষ মাত্রেরই একটি স্বভাবগত দুর্বলতা। কিন্তু মানুষের পূর্ণপ্রচেষ্টা থাকতে হবে নামাযের সময় তার মন যেন আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট থাকে এবং মুখে সে যা কিছু উচ্চারণ করে মনও যেন তারই আর্জি পেশ করে। এ সময়ের মধ্যে যদি অনিচ্ছাকৃত ভাবে অন্য চিন্তাভাবনা এসে যায় তাহলে যখনই মানুষের মধ্যে এর অনুভূতি সজাগ হবে তখনই তার মনোযোগ সেদিক থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় নামাযের সাথে সংযুক্ত করতে হবে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এটা খুশু-এর অর্থ। আরবীতে খুযূ (خُضُوْعْ)-এর অর্থ বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নত করা আর খুশু (خُشُوْعْ) অর্থ অন্তরকে বিনয়ের সাথে নামাযের অভিমুখী রাখা। এর সহজ পন্থা হল, নামাযে মুখে যা পড়া হয় তার দিকে ধ্যান রাখা, অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন দিকে খেয়াল গেলে সেটা ধর্তব্য নয়। কিন্তু স্মরণ হওয়া মাত্র ফের নামাযের শব্দাবলীর প্রতি মনোযোগ দেওয়া চাই।

তাফসীরে জাকারিয়া

২. যারা তাদের সালাতে ভীতি-অবনত(১)

(১) এ হচ্ছে সফলতা লাভে আগ্রহী মুমিনের প্রথম গুণ। “খুশূ” এর আসল মানে হচ্ছে, স্থিরতা, অন্তরে স্থিরতা থাকা; অর্থাৎ ঝুঁকে পড়া, দমিত বা বশীভূত হওয়া, বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করা। (আদওয়াউল বায়ান) ইবন আব্বাস বলেন, এর অর্থ, ভীত ও শান্ত থাকা। (ইবন কাসীর) মুজাহিদ বলেনঃ দৃষ্টি অবনত রাখা। শব্দ নিচু রাখা। (বাগভী) “ খুশূ এবং খুদূ” দুটি পরিভাষা। অর্থ কাছাকাছি। তবে খুদূ কেবল শরীরের উপর প্রকাশ পায়। আর খুশূ মন, শরীর, চোখ ও শব্দের মধ্যে প্রকাশ পায়। আল্লাহ বলেন, “আর রহমানের জন্য যাবতীয় শব্দ বিনীত হয়ে গেছে।” (সূরা ত্বা-হা: ১০৮) আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, খুশূ’ হচ্ছে, ডানে বা বাঁয়ে না তাকানো। (বাগভী) অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, খুশূ’ হচ্ছে মনের বিনয়। (ইবন কাসীর) সায়ীদ ইবন জুবাইর বলেন, খুশূ হচ্ছে, তার ডানে ও বামে কে আছে সেটা না জানা। আতা বলেনঃ দেহের কোন অংশ নিয়ে খেলা না করা। (বাগভী)

উপরের বর্ণনাগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারি যে, খুশূ’র সম্পর্ক মনের সাথে এবং দেহের বাহ্যিক অবস্থার সাথেও ৷ মনের খুশূ’ হচ্ছে, মানুষ কারোর ভীতি, শ্রেষ্ঠত্ব, প্ৰতাপ ও পরাক্রমের দরুন সন্ত্রস্ত ও আড়ষ্ট থাকবে। আর দেহের খুশূ' হচ্ছে, যখন সে তার সামনে যাবে তখন মাথা নত হয়ে যাবে, অংগ-প্রত্যঙ্গ ঢিলে হয়ে যাবে, দৃষ্টি নত হবে, কণ্ঠস্বর নিম্নগামী হবে এবং কোন জবরদস্ত প্রতাপশালী ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হলে মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক ভীতির সঞ্চার হয় তার যাবতীয় চিহ্ন তার মধ্যে ফুটে উঠবে। সালাতে খুশূ বলতে মন ও শরীরের এ অবস্থাটি বুঝায় এবং এটাই সালাতের আসল প্ৰাণ।

যদিও খুশূর সম্পর্ক মূলত মনের সাথে এবং মনের খুশূ আপনা আপনি দেহে সঞ্চারিত হয়, তবুও শরীআতে সালাতের এমন কিছু নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে যা একদিকে মনের খুশূ (আন্তরিক বিনয়-নম্রতা) সৃষ্টিতে সাহায্য করে এবং অন্যদিকে খুশূর হ্রাস-বৃদ্ধির অবস্থায় সালাতের কর্মকাণ্ডকে কমপক্ষে বাহ্যিক দিক দিয়ে একটি বিশেষ মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত রাখে। এই নিয়মগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, সালাত আদায়কারী যেন ডানে বামে না ফিরে এবং মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে না তাকায়, সালাতের মধ্যে বিভিন্ন দিকে ঝুঁকে পড়া নিষিদ্ধ। বারবার কাপড় গুটিানো অথবা ঝাড়া কিংবা কাপড় নিয়ে খেলা করা জায়েয নয়। সিজদায় যাওয়ার সময় বসার জায়গা বা সিজদা করার জায়গা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতেও নিষেধ করা হয়েছে। তাড়াহুড়া করে টপাটপ সালাত আদায় করে নেয়াও ভীষণ অপছন্দনীয়। নির্দেশ হচ্ছে, সালাতের প্রত্যেকটি কাজ পুরোপুরি রুকূ, সিজদা, দাঁড়ানো বা বসা যতক্ষণ পুরোপুরি শেষ না হয় ততক্ষণ অন্য কাজ শুরু করা যাবে না। সালাত আদায় করা অবস্থায় যদি কোন জিনিস কষ্ট দিতে থাকে তাহলে এক হাত দিয়ে তা দূর করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু বারবার হাত নাড়া অথবা বিনা প্রয়োজনে উভয় হাত একসাথে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।

এ বাহ্যিক আদবের সাথে সাথে সালাতের মধ্যে জেনে বুঝে সালাতের সাথে অসংশ্লিষ্ট ও অবান্তর কথা চিন্তা করা থেকে দূরে থাকার বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনিচ্ছাকৃত চিন্তা-ভাবনা মনের মধ্যে আসা ও আসতে থাকা মানুষ মাত্রেরই একটি স্বভাবগত দুর্বলতা। কিন্তু মানুষের পুর্ণপ্রচেষ্টা থাকতে হবে সালাতের সময় তার মন যেন আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট থাকে এবং মুখে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য চিন্তাভাবনা এসে যায় তাহলে যখনই মানুষের মধ্যে এর অনুভূতি সজাগ হবে তখনই তার মনোযোগ সেদিক থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় সালাতের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। সুতরাং পূর্ণাঙ্গ খুশূ হচ্ছে, অন্তরে বাড়তি চিন্তা-ভাবনা ইচছাকৃতভাবে উপস্থিত না করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও স্থিরতা থাকা; অনর্থক নড়াচড়া না করা। বিশেষতঃ এমন নড়াচড়া, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে নিষিদ্ধ করেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সালাতের সময় আল্লাহ তা'আলা বান্দার প্রতি সৰ্বক্ষণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন যতক্ষণ না সে অন্য কোন দিকে দৃষ্টি না দেয়। তারপর যখন সে অন্য কোন দিকে মনোনিবেশ করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার দিকে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। (ইবনে মাজাহঃ ১০২৩)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(২) যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র। (1)

(1) خُشُوع অর্থ আন্তরিক ও বাহ্যিক (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে) একাগ্রতা ও নিবিষ্টতা। অন্তরের একাগ্রতা হল, নামাযের অবস্থায় ইচ্ছাকৃত খেয়াল, কল্পনাবিহার ও যাবতীয় চিন্তা (সুচিন্তা, কুচিন্তা ও দুশ্চিন্তা) হতে হৃদয়কে মুক্ত রাখা এবং আল্লাহর মহত্ত্ব ও মহিমা তাতে চিত্রিত করার চেষ্ট করা। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের একাগ্রতা হল এদিক ওদিক না তাকানো, মুদ্রাদোষজনিত কোন ফালতু নড়া-চড়া না করা, চুল-কাপড় ঠিক-ঠাক না করা। বরং এমন ভয়-ভীতি, কাকুতি-মিনতি ও বিনয়ের এমন ভাব প্রকাশ পাওয়া উচিত, যেমন কোন রাজা-বাদশা বা মহান কোন ব্যক্তিত্বের নিকট গিয়ে প্রকাশ হয়ে থাকে।