ক-লা বাসুরতুবিমা-লাম ইয়াবসুরূবিহী ফাকাবাদতুকাবদাতাম মিন আছারির রছূলি ফানাবাযতুহা-ওয়াকাযা-লিকা ছাওওয়ালাত লী নাফছী।উচ্চারণ
সে জবাব দিল, “আমি এমন জিনিস দেখেছি যা এরা দেখেনি, কাজেই আমি রসূলের পদাংক থেকে এক মুঠো তুলে নিয়েছি এবং তা নিক্ষেপ করেছি, আমার মন আমাকে এমনি ধারাই কিছু বুঝিয়েছে। ৭৩ তাফহীমুল কুরআন
সে বলল, আমি এমন একটা জিনিস দেখেছিলাম, যা অন্যদের নজরে পড়েনি। তাই আমি রাসূলের পদচিহ্ন থেকে একমুঠো তুলে নিয়েছিলাম। সেটাই আমি (বাছুরের মুখে) ফেলে দেই। #%৪৪%# আমার মন আমাকে এমনই কিছু বুঝিয়েছিল। মুফতী তাকী উসমানী
সে বললঃ আমি যা দেখেছিলাম তারা তা দেখেনি; অতঃপর আমি সেই দূতের পদচিহ্ন হতে এক মুষ্টি নিয়েছিলাম এবং আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম, আর আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিল এইরূপ করা।মুজিবুর রহমান
সে বললঃ আমি দেখলাম যা অন্যেরা দেখেনি। অতঃপর আমি সেই প্রেরিত ব্যক্তির পদচিহ্নের নীচ থেকে এক মুঠি মাটি নিয়ে নিলাম। অতঃপর আমি তা নিক্ষেপ করলাম। আমাকে আমার মন এই মন্ত্রণাই দিল।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
সে বলল, ‘আমি দেখেছিলাম যা এরা দেখে নাই, এরপর আমি সেই দূতের পদচিহ্ন হতে একমুষ্টি নিয়েছিলাম এবং আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম; আমার মন আমার জন্যে শোভন করেছিল এইরূপ করা।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
সে বলল, ‘আমি এমন কিছু দেখেছি যা ওরা দেখেনি। তারপর আমি দূতের (জিবরীলের) পায়ের চিহ্ন থেকে এক মুষ্টি মাটি নিয়েছিলাম। অতঃপর তা নিক্ষেপ করেছিলাম। আর আমার মন আমার জন্য এরূপ করাটা শোভন করেছিল’।আল-বায়ান
সে বলল, ‘আমি দেখেছি যা ওরা দেখেনি, অতঃপর আমি প্রেরিত ব্যক্তির (অর্থাৎ জিবরীলের) পদচিহ্ন থেকে এক মুঠ মাটি নিলাম, অতঃপর আমি তা নিক্ষেপ করলাম (বাছুরের প্রতিকৃতিতে)। আমার মন আমাকে এ মন্ত্রণাই দিল।’তাইসিরুল
সে বললে -- "আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখতে পায় নি, তাই আমি রসূলের পদচিহ্ন থেকে মুষ্টি-পরিমাণ মুঠোয় ধরেছিলাম, কিন্তু আমি তা বিসর্জন দিয়েছিলাম, আর আমার মন আমার জন্য এইভাবে করাটাই উপযুক্ত ঠাওরেছিল।"মাওলানা জহুরুল হক
৭৩
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় দু’টি দলের পক্ষ থেকে অদ্ভুত ধরনের টানা হেঁচড়া করা হয়েছে।
একটি দলে আছেন প্রাচীন তাফসীরকারগণ এবং প্রাচীন পদ্ধতিতে তাফসীরকারীদের বৃহত্তম অংশ। তারা এর অর্থ বর্ণনা করেন, “সামেরী রসূল অর্থাৎ জিব্রীলকে যেতে দেখে নিয়েছিল এবং তাঁর পদাংক থেকে এক মুঠো মাটি উঠিয়ে নিয়েছিল। আর এই মাটি যখন বাছুরের মূর্তির মধ্যে রাখা হয়েছিল তখন তার অলৌকিক মহিমায় তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল প্রাণ স্পন্দন এবং একটি জীবন্ত বাছুরের মত হাম্বা রব তার মুখ থেকে বের হতে শুরু হয়েছিল।” অথচ সত্যিই যে এমনটি হয়েছিল তা অবশ্যি কুরআন বলছে না। কুরআন স্রেফ এতটুকু বলছে যে, হযরত মূসার প্রশ্নের জবাবে সামেরী একথা বানিয়ে বলেছিল। এ অবস্থায় আমরা বুঝতে পারছি না, মুফাসিরগণ কেমন করে একে একটি সত্য ঘটনা এবং কুরআন বর্ণিত যথার্থ সত্য মনে করে বসলেন।
দ্বিতীয় দলটি সামেরীর কথার অন্য একটি অর্থ করেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সামেরী আসলে বলেছিল, “আমি রসুল অর্থাৎ মূসার দ্বীনের মধ্যে এমন দুর্বলতা দেখেছিলাম যা অন্যেরা দেখতে পায়নি। তাই আমি একদিক থেকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু পরে তা ত্যাগ করেছিলাম।” এ ব্যাখ্যাটি সম্ভবত সর্বপ্রথম করেন আবু মুসলিম ইসফাহানী। তারপর ইমাম রাযী একে নিজের তাফসীরে উদ্ধৃত করে এর প্রতি নিজের সমর্থন প্রকাশ করেন। বর্তমানে আধুনিক তাফসীরকারদের অধিকাংশই এ অর্থটিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিন্তু তারা এ কথা ভুলে গেছেন যে, কুরআন ধাঁ ধাঁ ও হেঁয়ালির ভাষায় নাযিল হয়নি। বরং পরিষ্কার ও সাধারণের বোধগম্য সহজ-সরল আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। একজন সাধারণ আরববাসী নিজের ভাষায় প্রচলিত স্বাভাবিক বাগধারা অনুযায়ী এর বক্তব্য বুঝতে সক্ষম। আরবী ভাষায় সাধারণ প্রচলিত বাকরীতি ও দৈনন্দিন কথোপকথনের শব্দাবলী সম্পর্কে অবগত কোন ব্যক্তি কখনো একথা মেনে নিতে পারে না যে, সামেরীর এ সামেরীর এ মনোভাব প্রকাশ করার জন্য সহজ-সরল আরবী ভাষায় এমন সব শব্দ ব্যবহার করা হবে যা এ আয়াতের তাফসীরকারগণ বলেছেন। অথবা একজন সাধারণ আরবীয় একথাগুলো শুনে কখনো এমন অর্থ গ্রহণ করতে পারে না যা এ তাফসীরকারগণ বর্ণনা করেছেন। অভিধান গ্রন্থ থেকে কোন একটি শব্দের এমন একাধিক অর্থ গ্রহণ করা যা বিভিন্ন প্রবাদে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং তার মধ্য থেকে কোন একটি অর্থ নিয়ে এমন একটি বাক্যের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া যেখানে একজন সাধারণ আরব কখনোই এ শব্দটিকে এ অর্থে ব্যবহার করে না-এটাতো ভাষাজ্ঞান হতে পারে না, তবে বাগাড়ম্বর হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি নেই। ‘ফরহংগে আসেফীয়া’ নামক উর্দু অভিধান খানি অথবা ‘অক্সফোর্ড ডিকশনারী’ হাতে নিয়ে যদি কোন ব্যক্তি যথাক্রমে তাদের উর্দু ও ইংরেজী রচনাগুলো মধ্যে এ ধরনের কৃতিত্ব ফলাতে থাকেন, তাহলে সম্ভবত নিজেদের কথার দু-চারটি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনেই তাদের লেখকরা চিৎকার করে উঠবেন। সাধারণত কুরআনের এ ধরনের ব্যাখ্যা এমন সময় করা হয় যখন এক ব্যক্তি কোন আয়াতের সহজ-সরল অর্থ দেখে নিজে নিজেই একথা মনে করে থাকে যে, এখানে তো আল্লাহ তা’আলা বড়ই অসাবধান হয়ে গেছেন, এসো আমি তাঁর কথা এমনভাবে পেশ করে দিই যার ফলে তাঁর ভুলের পরদা ঢেকে যাবে এবং তাঁর বক্তব্য নিয়ে লোকদের হাসাহাসি করার সুযোগ থাকবে না।
এ বিবৃত চিন্তা পরিহার করে যে ব্যক্তিই এ বক্তব্য পরম্পরায় এ আয়াতটি পড়বে সে সহজে বুঝতে পারবে যে, সামেরী ছিল একজন ফিতনাবাজ ব্যক্তি। সে ভালোভাবে ভেবেচিন্তে ধোকা ও প্রতারণার একটি বিরাট পরিকল্পনা তৈরী করেছিল। সে কেবল একটি সোনার বাছুর তৈরী করে যে কোন কৌশলে তার মধ্যে গো-বৎসের হামবা রব সৃষ্টি করে দেয়নি এবং সমগ্র জাতি অজ্ঞ ও নির্বোধ লোকদের প্রতারিত করেনি বরং সে আরো দুঃসাহসী হয়ে খোদ হযরত মূসা আলাইহিস সালামকেও এমটি প্রতারণাপূর্ণ গল্প শুনিয়ে দিল। সে দাবী করলো, আমি এমন কিছু দেখেছি যা অন্যেরা দেখেনি। সাথে সাথে এ গল্পও শুনিয়ে দিল যে, রসুলের পদাংকের এক মুঠো মাটিই এ কেরামতি দেখিয়েছে। রসূল বলে সে জিব্রীলকেও নির্দেশ করতে পরে, যেমন প্রাচীন তাফসীরকারগণ মনে করেছেন। কিন্তু যদি একথা মনে করা হয় যে, রসূল শব্দটি বলে সে হযরত মূসাকে নির্দেশ করেছে, তাহলে এটা তার আর একটা প্রতারণা। সে এভাবে হযরত মূসাকে মানসিক উৎকোচ দিতে চাচ্ছিল, যাতে তিনি এটাকে তাঁর নিজের পদাংকের অলৌকিকতা মনে করে গর্বিত হন এবং নিজের অন্যান্য কেরামতির প্রচারণার জন্য সামেরীর প্রতারণা হিসেবেই পেশ করছে, নিজের পক্ষ থেকে প্রকৃত ঘটনা হিসেবে পেশ করছে না। তাই এতে এমন দূষণীয় কিছু ঘটেনি যে, তা প্রক্ষালনের জন্য অভিধান গ্রন্থগুলোর সাহায্যে অযথা বাগাড়ম্বর করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। বরং পরবর্তী বাক্যগুলোতে হযরত মূসা যেভাবে তাকে ধিক্কার ও অভিশাপ দিয়েছেন এবং তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছেন তা থেকে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, তার বানানো এ প্রতারণাপূর্ণ গল্প শোনার সাথে সাথেই তিনি তা তার মুখের উপর ছুঁড়ে মেরেছিলেন।
‘রাসূলের পদচিহ্ন’ বলে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের পদচিহ্ন বোঝানো হয়েছে। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কাফেলায় হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামও ছিলেন। মুফাসসিরগণ সাধারণভাবে এ আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন যে, হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মানব বেশে একটি ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। সামেরী লক্ষ্য করেছিল, তাঁর ঘোড়ার পা যেখানেই পড়ে সেখানে জীবনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। সামেরী উপলব্ধি করল ঘোড়ার পা ফেলার স্থানে সঞ্জিবনী শক্তি আছে এবং এ শক্তিকে কাজে লাগানো যেতে পারে। অর্থাৎ, নিষ্প্রাণ কোন বস্তুতে এ মাটি প্রয়োগ করলে তাতে জৈব বৈশিষ্ট্য সঞ্চার হতে পারে। সুতরাং সে একমুঠো মাটি নিয়ে বাছুরের মূর্তিতে ঢুকিয়ে দিল। ফলে তার থেকে হাম্বা-রব বের হতে লাগল। কিন্তু কোন কোন মুফাসসির, যেমন হযরত মাওলানা হক্কানী (রহ.) তাঁর ‘তাফসীরে হক্কানী’-তে (৩ খণ্ড, ২৭২-২৭৩) বলেন, সামেরীর এ বিবৃতি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। আসলে বাছুরের থেকে আওয়াজ বের হচ্ছিল বাতাস চলাচলের কারণে। কুরআন মাজীদ নিজে যেহেতু এ সম্পর্কে কোন ব্যাখ্যা প্রদান করেনি এবং সহীহ হাদীসেও এ সম্পর্কে কিছু পাওয়া যায় না আবার এটা জানার উপর দীনী জরুরী কোন বিষয়ও নির্ভরশীল নয়, তাই বাছুরটির রহস্য সন্ধানের পেছনে না পড়ে বিষয়টাকে আল্লাহ তাআলার উপর ন্যস্ত করাই শ্রেয় যে, তিনি ভালো জানেন সেটির কী রহস্য।
৯৬. সে বলল, আমি যা দেখেছিলাম তারা তা দেখেনি, তারপর আমি সে দূতের পদচিহ্ন হতে একমুঠি মাটি নিয়েছিলাম। তারপর আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম(১); আর আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিল এরূপ করা।
(১) অর্থাৎ “আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখেনি” এখানে জিবরীল ফিরিশতাকে বোঝানো হয়েছে। তাকে দেখার ঘটনা সম্পর্কে এক বর্ণনা এই যে, যেদিন মূসা আলাইহিস সালাম-এর মু'জিযায় নদীতে রাস্তা হয়ে যায়, বনী-ইসরাঈল এই রাস্তা দিয়ে সমুদ্র পার হয়ে যায় এবং ফিরআউনী সৈন্য বাহিনী সাগরে নিমজ্জিত হয়, সেদিন জিবরীল ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। সামেরীর মনে শয়তান একথা জাগ্রত করে দেয় যে, জিবরীলের ঘোড়ার পা যেখানে পড়ে, সেখানকার মাটিতে জীবনের বিশেষ প্রভাব থাকবে। তুমি এই মাটি তুলে নাও। সে পদচিহ্নের মাটি তুলে নিল। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর রেওয়ায়েতে একথা বর্ণিত হয়েছেঃ সামেরীর মনে আপনা-আপনি জাগল যে, পদচিহ্নের মাটি যে বস্তুর উপর নিক্ষেপ করে বলা হবে যে, অমুক বস্তু হয়ে যা, তা তাই হয়ে যাবে। সুতরাং সে সে সমস্ত অলঙ্কারের মধ্যে এ মাটি তাতে নিক্ষেপ করে। ফলে তাতে শব্দ হতে থাকে। (ইবন কাসীর)
(৯৬) সে বলল, ‘আমি দেখলাম যা ওরা দেখেনি। অতঃপর আমি দূত (জিবরীল)এর পদচিহ্ন হতে একমুষ্ঠি ধূলা নিলাম এবং তা আমি (বাছুরের উপর) নিক্ষেপ করলাম।(1) আমার মন আমার জন্য এরূপ করা শোভন করল।’
(1) অধিকাংশ মুফাসসিরগণ الرَّسُول (দূত) বলতে জিবরীল (আঃ)-কেই বুঝিয়েছেন। আর এর অর্থ বলেছেন যে, সামেরী জিবরীলের ঘোড়া পার হতে দেখল এবং তার পায়ের নিচের কিছু মাটি নিজের কাছে রেখে নিল। যার মধ্যে কিছু অলৌকিক প্রভাব বিদ্যমান ছিল। সে সেই মাটিকে গলিত অলংকার বা বাছুর এর ভিতর ভরে দিল; যার ফলে ওর ভিতর হতে এক ধরনের আওয়াজ বের হতে শুরু হল। আর তা তাদের ভ্রষ্টতা ও ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়াল।