কুল লাও ক-না মা‘আহূ আ-লিহাতুনকামা- ইয়াকূ লূনা ইযাল্লাব তাগাও ইলাযিল‘আরশি ছাবীলা-।উচ্চারণ
হে মুহাম্মাদ! এদেরকে বলো, যদি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহও থাকতো যেমন এরা বলে, তাহলে সে আরশের মালিকের জায়গায় পৌঁছে যাবার জন্য নিশ্চয়ই চেষ্টা করতো। ৪৭ তাফহীমুল কুরআন
বলে দাও, আল্লাহর সঙ্গে যদি আরও ইলাহ থাকত, যেমন তোমরা বলছ তবে তারা আরশ-অধিপতি (প্রকৃত ইলাহের)-এর উপর প্রভাব বিস্তারের কোন পথ খুঁজত। #%২৯%#মুফতী তাকী উসমানী
বলঃ তাদের কথা মত যদি তাঁর সাথে আরও মা‘বূদ থাকত তাহলে তারা আরশ অধিপতির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় অন্বেষন করত।মুজিবুর রহমান
বলুনঃ তাদের কথামত যদি তাঁর সাথে অন্যান্য উপাস্য থাকত; তবে তারা আরশের মালিক পর্যন্ত পৌছার পথ অন্বেষন করত।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
বল, ‘যদি তাঁর সঙ্গে আরও ইলাহ্ থাকত যেমন এরা বলে, তবে তারা আরশ-অধিপতির প্রতিদ্বন্দি¡তা করার উপায় অনে¦ষণ করত।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
বল, ‘তাঁর সাথে যদি আরো উপাস্য থাকত, যেমন তারা বলে, তবে তারা আরশের অধিপতি পর্যন্ত পৌঁছার পথ তালাশ করত’।আল-বায়ান
বল- তাঁর সঙ্গে যদি আরো ইলাহ থাকত যেমন তারা বলে, তাহলে তারা অবশ্যই আরশের মালিকের নিকট পৌঁছার জন্য পথের সন্ধান করত।তাইসিরুল
বলো -- "তারা যেমন বলে তাঁর সঙ্গে যদি তেমন আরো উপাস্য থাকত তবে তারা আরশের অধিপতির প্রতি পথ খোঁজতো।"মাওলানা জহুরুল হক
৪৭
অর্থাৎ সে নিজেই আরশের মালিক হবার চেষ্টা করতো। কারণ অনেকগুলো সত্তা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে শরীক হলে সেখানে অনিবার্যভাবে দু’টি অবস্থার সৃষ্টি হবে। এক, তারা সবাই হবে প্রত্যেকের জায়গায় স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ইলাহ। দুই, তাদের একজন হবে আসল ইলাহ আর বাদবাকি সবাই হবে তার বান্দা এবং সে তাদেরকে নিজের প্রভুত্ব কর্তৃত্বের কিছু অংশ সোপর্দ করবে। প্রথম অবস্থাটিতে কোনক্রমেই এসব স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী ইলাহর পক্ষে সবসময় সব ব্যাপারে পরস্পরের ইচ্ছা ও সংকল্পের প্রতি আনুকূল্য বজায় রেখে এ অনন্ত অসীম বিশ্বলোকের আইন-শৃংখলা ব্যবস্থা এতো পরিপূর্ণ ঐক্য, সামঞ্জস্য, সমতা ও ভারসাম্য সহকারে পরিচালনা করা সম্ভবপর ছিল না। তাদের পরিকল্পনা ও সংকল্পের প্রতি পদে পদেই সংঘর্ষ বাধা ছিল অনিবার্য। প্রত্যেকেই যখন দেখতো অন্য ইলাহদের সাথে আনুকুল্য ছাড়া তার প্রভুত্ব চলছে না তখন সে একাই সমগ্র বিশ্ব-জাহানের একচ্ছত্র মালিক হয়ে যাবার চেষ্টা করতো। আর দ্বিতীয় অবস্থা সম্পর্কে বলা যায়, বান্দার সত্তা প্রভুত্বের ক্ষমতা তো দূরের কথা প্রভুত্বের সামান্যতম ভাবকল্প ও স্পর্শ-গন্ধ ধারণ করার ক্ষমতাও রাখে না। যদি কোথাও কোন সৃষ্টির দিকে সামান্যতম প্রভুত্ব কর্তৃত্ব স্থানান্তরিত করে দেয়া হতো তাহলে তার পায়া ভারি হয়ে যেতো, আর সামান্য ক্ষণের জন্যও সে বান্দা হয়ে থাকতে রাজী হতো না এবং তখনি সে বিশ্ব-জাহানের ইলাহ হয়ে যাবার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করে দিতো।
যে বিশ্ব-জাহানের পৃথিবী ও আকাশের সমস্ত শক্তি মিলে একসাথে কাজ না করলে গমের একটি দানা এবং ঘাসের একটি পাতা পর্যন্তও উৎপন্ন হতে পারে না তার সম্পর্কে শুধুমাত্র একজন নিরেট মূর্খ ও স্থুলবুদ্ধিসম্পন্ন লোকই একথা চিন্তা করতে পারে যে, একাধিক স্বাধীন বা অর্ধ স্বাধীন ইলাহ তার শাসন কার্য পরিচালনা করছে। অন্যথায় যে ব্যক্তিই এ ব্যবস্থার মেজাজ ও প্রকৃতি বুঝবার জন্য সামান্যতম চেষ্টাও করেছে সে এ সিদ্ধান্তে না পৌঁছে থাকতে পারে না যে, এখানে শুধুমাত্র একজনেরই প্রভুত্ব চলছে এবং তাঁর সাথে অন্য কারোর কোন পর্যায়েই কোন প্রকারের শরীক হবার আদৌ কোন সম্ভাবনা নেই।
এটা তাওহীদের পক্ষে ও শিরকের বিরুদ্ধে এমন এক দলীল, যা যে-কারও পক্ষেই বোঝা সহজ। দলীলটির সারমর্ম হল, ইলাহ এমন কোনও সত্তাকেই বলা যায়, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান, যে- কোনও রকমের কাজ করার ক্ষমতা যার আছে এবং যিনি কারও অধীন হবেন না। বিশ্বজগতে আল্লাহ তাআলা ছাড়া আরও ইলাহ থাকলে, প্রত্যেকেই এ গুণের অধিকারী হত। ফলে প্রত্যেকেই অন্যের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হত এবং প্রত্যেকেরই ক্ষমতা হত পরিপূর্ণ। আর সেক্ষেত্রে সব ইলাহ মিলে আরশ অধিপতি ইলাহের উপর প্রভাবও বিস্তার করতে সক্ষম হত। যদি বলা হয়, আল্লাহর উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা তাদের নেই, বরং তারা আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্বাধীন, তবে তারা কেমন ইলাহ হল? এর দ্বারা প্রমাণ হয়ে যায় প্রকৃত ইলাহ একজনই। তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নয়।
৪২. বলুন, যদি তাঁর সাথে আরও ইলাহ্ থাকত যেমন তারা বলে, তবে তারা ‘আরশ-অধিপতির (নৈকট্য লাভের) উপায় খুঁজে বেড়াত।(১)
১. এ আয়াতের দুটি অর্থ করা হয়ে থাকেঃ
এক. যদি আল্লাহর সাথে আরো অনেক ইলাহ থাকত। তবে তারা আরশের অধিপতির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হতো। যেমনিভাবে দুনিয়ার রাজা-বাদশারা করে থাকে। (ফাতহুল কাদীর) এ অর্থটি ইমাম শাওকানী প্রাধান্য দিয়েছেন।
দুই. আয়াতের আরেকটি অর্থ হলো, যদি আল্লাহর সাথে আরও ইলাহ থাকত, তবে তারা তাদের অক্ষমতা জেনে আরশের অধিপতি সত্যিকারের ইলাহ আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় ব্যস্ত হয়ে পড়ত। (ইবন কাসীর) এ শেষোক্ত অর্থটিই সঠিক। ইমাম ইবন কাসীর। এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটি শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা ও ইবনুল কাইয়্যেমও প্রাধান্য দিয়েছেন। (দেখুন, আল-ফাতাওয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ; মাজমু ফাতাওয়া: ১৬/১২২-১২৪, ৫৭৭; ইবনুল কাইয়্যেম, আল-জাওয়াবুল কাফী: ২০৩; আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালাহ: ২/৪৬২) কারণ প্রথমত, এখানে (إِلَىٰ ذِي الْعَرْشِ) আরশের অধিপতির দিকে বলা হয়েছে عَلٰى ذِي الْعَرْشِ আরশের অধিপতির বিপক্ষে বলা হয়নি। আর আরবী ভাষায় إِلى শব্দটি নৈকট্যের অর্থেই ব্যবহার হয়। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, (اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ) (সূরা আল-মায়িদাহঃ ৩৫) পক্ষান্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য عَلٰى শব্দটি ব্যবহার হয়। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, (فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا) (সূরা আন-নিসাঃ ৩৪)
দ্বিতীয়ত, এ অর্থের সমর্থনে এ সূরারই ৫৭ নং আয়াত প্রমাণবিহ। সেখানে বলা হয়েছে, তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে, তার দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আপনার রবের শাস্তি ভয়াবহ।” এতে করে বুঝা গেল যে, এখানে এ আয়াতের অর্থ হবে এই যে, যদি তারা যেভাবে বলে সেভাবে সেখানে আরো ইলাহ থাকত তবে সে বানানো ইলাহগুলো নিজেদের অক্ষমতা সম্যক বুঝতে পেরে প্রকৃত ইলাহ রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তা’আলার প্রতি নৈকট্য লাভের আশায় ধাবিত হতো।
এ অর্থের সমর্থনে তৃতীয় আরেকটি প্রমাণ আমরা পাই এ কথা থেকেও যে কাফেরগণ কখনও এ কথা দাবী করেনি যে, তাদের ইলাহাগণ আল্লাহ্ তা'আলার প্রতিদ্বন্দ্বী বরং তারা সবসময় বলে আসছে যে, “আমরা তো কেবল তাদেরকে আল্লাহর কাছে নৈকট্য লাভে সুপারিশকারী হিসেবেই ইবাদত করে থাকি”। (সূরা আয-যুমারঃ ৩) এখানেও আয়াতে বলা হয়েছে, “যেমনটি তারা বলে”। আর তারা কখনো তাদের মা’বুদাদেরকে আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ঘোষণা করেনি। এ দ্বিতীয় তাফসীরটি প্রখ্যাত তাফসীরবিদ কাতাদা রাহেমাহুল্লাহ থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।
(৪২) বল, তাদের কথামত যদি তাঁর সাথে আরো উপাস্য থাকত, তবে তারা আরশ অধিপতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার উপায় অন্বেষণ করত। (1)
(1) এর একটি অর্থ হল এই যে, যেভাবে একজন বাদশাহ অন্য বাদশাহর উপর সসৈন্যে আক্রমণ করে তার উপর বিজয় ও আধিপত্য অর্জন করার চেষ্টা করে, ঠিক এইভাবে এই দ্বিতীয় উপাস্যও আল্লাহর উপর জয়যুক্ত হওয়ার পথ অন্বেষণ করত। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ রকম হয়নি। অথচ বহু শতাব্দী ধরে এই উপাস্যগুলোর পূজা হয়ে আসছে। যার অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্যই নেই। কোন ক্ষমতাবান সত্তাই নেই। কোন ইষ্টানিষ্টের মালিক নেই। দ্বিতীয় অর্থ হল, তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে নিত এবং এই মুশরিকরা যারা এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, এদের মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে, এদেরকেও এই উপাস্যগুলো আল্লাহর নৈকট্য দান করত।