ওয়ালা- তাজ‘আল ইয়াদাকা মাগলূলাতান ইলা- ‘উনুকিকা ওয়ালা- তাবছুতহা- কুল্লাল বাছতিফাতাক‘উদা মালূমাম মাহছূর-।উচ্চারণ
(৬) নিজের হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তাকে একেবারে খোলাও ছেড়ে দিয়ো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অক্ষম হয়ে যাবে। ২৯ তাফহীমুল কুরআন
(কৃপণতাবশে) নিজের হাত ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখ না এবং (অপব্যয়ী হয়ে) তা সম্পূর্ণরূপে খুলে রেখ না, যদ্দরুণ তোমাকে নিন্দাযোগে ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়তে হবে।মুফতী তাকী উসমানী
তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়োনা; তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হবে।মুজিবুর রহমান
তুমি একেবারে ব্যয়-কুষ্ঠ হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃতি, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তুমি তোমার হস্ত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখ না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও কর না, তা হলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ে আবদ্ধ রেখো না এবং তা পুরোপুরি প্রসারিত করো না*, তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।আল-বায়ান
তোমার হাতকে তোমার গলার সাথে বেঁধে দিও না, আর তা একেবারে প্রসারিত করেও দিওনা, তা করলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।তাইসিরুল
আর তোমার হাত তোমার গলার সঙ্গে আটকে রেখো না, আর তা প্রসারিত করো না পুরো সম্প্রসারণে, পাছে তুমি বসে থাক নিন্দিত সর্বস্বান্ত হয়ে।মাওলানা জহুরুল হক
২৯
“হাত বাঁধা” একটি রূপককথা। কৃপণতা অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর “হাত খোলা ছেড়ে দেয়া’র মানে হচ্ছে, বাজে খরচ করা। ৪র্থ ধারার সাথে ৬ষ্ঠ ধারাটির এ বাক্যোংশটি মিলিয়ে পড়লে এর পরিষ্কার অর্থ এই মনে হয় যে, লোকদের মধ্যে এতটুকু ভারসাম্য হতে হবে যাতে তারা কৃপণ হয়ে অর্থের আবর্তন রুখে না দেয় এবং অপব্যয়ী হয়ে নিজের অর্থনৈতিক শক্তি ধ্বংস না করে ফেলে। এর বিপরীত পক্ষে তাদের মধ্যে ভারসাম্যের এমন সঠিক অনুভূতি থাকতে হবে যার ফলে তারা যথার্থ ব্যয় থেকে বিরত হবে না আবার অযথা ব্যয়জনিত ক্ষতিরও শিকার হবে না। অহংকার ও প্রদর্শনেচ্ছামূলক এবং লোক দেখানো খরচ, বিলাসিতা, ফাসেকী ও অশ্লীল কাজে ব্যয় এবং এমন যাবতীয় ব্যয় যা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনেও কল্যাণমূলক কাজে লাগার পরিবর্তে ধন-সম্পদ ভুল পথে নিয়োজিত করে, তা আসলে আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা এভাবে নিজেদের ধন-দৌলত খরচ করে তারা শয়তানের ভাই।
এ ধারাগুলোও নিছক নৈতিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত হেদায়াত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বরং এদিকে পরিষ্কার ইঙ্গিত করছে যে, একটি সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সমাজকে নৈতিক অনুশীলন, সামষ্টিক চাপ প্রয়োগ ও আইনগত বাধা-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে অযথা অর্থ ব্যয় থেকে বিরত রাখা উচিত। এ কারণেই পরবর্তীকালে মদীনা রাষ্ট্রে বিভিন্ন কার্যকর পদ্ধতিতে এ উভয় ধারা নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা হয়। প্রথমত, অপব্যয় ও বিলাসিতার বহু নীতি প্রথাকে আইনগতভাবে হারাম করা হয়। দ্বিতীয়ত, কৌশল অবলম্বন করে অযথা অর্থ ব্যয়ের পথ বন্ধ করা হয়। তৃতীয়ত, সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে এমন বহু রসম-রেওয়াজের বিলোপ সাধন করা হয় যেগুলোতে অপব্যয় করা হতো। তারপর রাষ্ট্রকে বিশেষ ক্ষমতা বলে এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনা বিধান জারী করে সুস্পষ্ট অপব্যয়ের ক্ষেত্রে বাধা ইখতিয়ার দেয়া হয়। এভাবে যাকাত ও সাদকার বিধানের মাধ্যমে কৃপণতার শক্তিতে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং লোকেরা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে অর্থের আবর্তনের পথ বন্ধ করে দেবে এ সম্ভাবনা ও নির্মূল করে দেয়া হয়। এসব কৌশল অবলম্বন করার সাথে সাথে সমাজে এমন একটি সাধারণ জনমত সৃষ্টি করা হয়, যা দানশীলতা ও অপব্যয়ের মধ্যকার পার্থক্য সঠিকভাবে জানতো এবং কৃপণতা ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যয়ের মধ্যে ভালভাবেই ফারাক করতে পারতো। এ জনমত কৃপণদেরকে লাঞ্ছিত করে, ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষাকারীদেরকে মর্যাদাশালী করে, অপব্যয়কারীদের নিন্দা করে এবং দানশীলদেরকে সমগ্র সমাজের খোশবুদার ফুল হিসেবে কদর করে। সে সময়ের নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের প্রভাব আজও মুসলিম সমাজে রয়েছে। আজও দুনিয়ার সব দেশেই মুসলমানরা কৃপণ ও সম্পদ পুঞ্জীভূতকারীদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখে এবং দানশীলরা আজও তাদের চোখে সম্মানার্হ ও মর্যাদা সম্পন্ন।
২৯. আর তুমি তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণরূপে মেলেও দিও না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও আফসোসকৃত হয়ে বসে পড়বে। (১)।
১. “হাত বাঁধা” কৃপণতা অর্থেব্যবহৃত হয়। আর “হাত খোলা ছেড়ে দেয়া”র মানে হচ্ছে, বাজে খরচ করা। (ইবন কাসীর) আয়াতে সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তার মধ্যস্থতায় সমগ্র উম্মতকে সম্বোধন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এমন মিতাচার শিক্ষা দেয়া, যা অপরের সাহায্যে প্রতিবন্ধকও না হয় এবং নিজের জন্যেও বিপদ ডেকে না আনে। যখনই তুমি তোমার সামর্থ্যের বাইরে হাত প্রশস্ত করবে, তখনই তুমি খরচ করার কিছু না পেয়ে বসে পড়বে। তখন তুমি ‘হাসীর’ হবে। হাসীর বলা হয় সে বাহনকে যে দুর্বল ও অপারগতার কারণে চলতে অপারগ হয়ে গেছে। (ইবন কাসীর) হাসীর এর আরেক অর্থ তিরস্কৃত হওয়া। (ফাতহুল কাদীর)
মোটকথা: কৃপণতা যেমন খারাপ গুণ, অপচয়ও তেমনি খারাপ গুণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কৃপণ ও খরচকারীর উদাহরণ হচ্ছে সে দু'জন লোকের মত। যাদের উপর লোহার দুটি বর্ম রয়েছে। যা তার দু’স্তন থেকে কণ্ঠাস্থি পর্যন্ত ব্যাপ্ত। খরচকারী যখনই খরচ করে তখনই তা প্রশস্ত হতে থাকে। এমনকি তার পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত প্ৰলম্বিত হয় এবং তার পদচিহ্ন মিটিয়ে দেয়। আর কৃপণ সে যখনই কোন খরচ করতে চায় তখনি তা সে বর্মের এক কড়া আরেক কড়ার সাথে লেগে যায়, সে যতই সেটাকে প্রশস্ত করতে চায় তা আর প্রশস্ত হয় না।” (বুখারী: ২৯১৭)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালবেলা দু'জন ফেরেশতা নাযিল হয়। তাদের একজন বলতে থাকে, আল্লাহ্! আপনি খরচকারীকে বাকী থাকার মত সম্পদ দান করুন, অপরজন বলে, আল্লাহ্! আপনি কৃপনাকে নিঃশেষ করে দিন।' (বুখারী: ১৪৪২: মুসলিম: ১০১০)
(২৯) তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না; হলে তুমি তিরস্কৃত ও অনুতপ্ত (নিঃস্ব) হয়ে পড়বে।(1)
(1) পূর্বের আয়াতে ওজর পেশ করার আদবের কথা বলা হয়েছে। এই আয়াতে ব্যয় করার আদব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আর তা হল, মানুষ এমন কৃপণও হবে না যে, নিজের ও পরিবারবর্গের প্রয়োজনেও ব্যয় করবে না। আর এমন মুক্তহস্তও হবে না যে, নিজ শক্তি ও সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য না করে বেহিসাব ব্যয় করে অপব্যয় ও নিঃস্বতার শিকার হবে। কৃপণতার ফলে মানুষ তিরস্কৃত ও নিন্দিত গণ্য হবে এবং অপব্যয়ের ফলে অবসাদগ্রস্ত ও অনুতপ্ত হবে। محسور বলা হয় এমন পশুকে যে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। অপব্যয়কারীও পরিশেষে হাত শূন্য করে বসে যায়। ‘বদ্ধমুষ্টি হয়ো না’ বা ‘নিজ হাতকে গর্দানের সাথে বেঁধে রেখো না’ অর্থঃ ব্যয়কুণ্ঠ কৃপণ হয়ো না। আর ‘একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না’ অর্থঃ অপব্যয় করো না। مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا হল لَفُّ نَشْرٍ مُرَتَّبٌ অর্থাৎ, তিরস্কার হল কৃপণতার এবং অনুতাপ হল অপব্যয়ের কুফল।