কুল মার রব্বুছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিকুল্লিলা-হু কুল আফাত্তাখাযতুম মিন দূ নিহীআওলিয়াআ লা-ইয়ামলিকূনা লিআনফুছিহিম নাফ‘আওঁ ওয়ালা-দাররন কুল হাল ইয়াছতাবিল আ‘মা-ওয়াল বাসীরু আম হাল তাছতাবিজজু লুমা-তুওয়াননূরু আম জা‘আলূলিল্লা-হি শুরকাআ খালাকূকাখাল কিহী ফাতাশা-বাহাল খালকু ‘আলাইুহিম কুল্লিলা-হু খা-লিকুকুল্লি শাইয়িওঁ ওয়া হুওয়াল ওয়া-হিদুল কাহহা-র।উচ্চারণ
এদেরকে জিজ্ঞেস করো, আকাশ ও পৃথিবীর রব কে?- বলো আল্লাহ! ২৬ তারপর এদেরকে জিজ্ঞেস করো, আসল ব্যাপার যখন এই তখন তোমরা কি তাঁকে বাদ দিয়ে এমন মাবুদদেরকে নিজেদের কার্যসম্পাদনকারী বানিয়ে নিয়েছো যারা তাদের নিজেদের জন্যও কোন লাভ ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না? বলো অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হয়ে থাকে? ২৭ আলো ও আঁধার কি এক রকম হয়? ২৮ যদি এমন না হয়, তাহলে তাদের বানানো শরীকরাও কি আল্লাহর মতো কিছু সৃষ্টি করেছে, যে কারণে তারাও সৃষ্টি ক্ষমতার অধিকারী বলে সন্দেহ হয়েছে? ২৯ - বলো, প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। তিনি একক ও সবার ওপর পরাক্রমশালী। ৩০ তাফহীমুল কুরআন
(হে নবী! কাফেরদেরকে) বল, কে তিনি, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালন করেন? বল, আল্লাহ! বল, তবুও তোমরা তাঁকে ছেড়ে এমন সব অভিভাবক গ্রহণ করলে, যাদের খোদ নিজেদেরও কোন উপকার সাধনের ক্ষমতা নেই এবং অপকার সাধনেরও না? বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? অথবা অন্ধকার ও আলো কি একই রকম হতে পারে? না-কি তারা আল্লাহর এমন সব শরীক সাব্যস্ত করেছে, যারা আল্লাহ যেমন সৃষ্টি করেন সে রকম কিছু সৃষ্টি করেছে, #%২১%# ফলে তাদের কাছে উভয়ের সৃষ্টিকার্য একই রকম মনে হচ্ছে? (কেউ যদি এ বিভ্রান্তির শিকার হয়ে থাকে, তবে তাকে) বলে দাও, কেবল আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি একাই এমন যে, তাঁর ক্ষমতা সবকিছুতে ব্যাপ্ত।মুফতী তাকী উসমানী
বলঃ কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রাব্ব? বলঃ তিনি আল্লাহ! বলঃ তাহলে কি তোমরা অভিভাবক রূপে গ্রহণ করেছ আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে, যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়? বলঃ অন্ধ ও চক্ষুস্মান কি সমান অথবা অন্ধকার ও আলো কি এক? তাহলে কি তারা আল্লাহর এমন শরীক স্থাপন করছে যারা (আল্লাহর সৃষ্টির মত) সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের মধ্যে বিভ্রাট ঘটিয়েছে? বলঃ আল্লাহ সকল কিছুর স্রষ্টা, তিনি এক, পরাক্রমশালী।মুজিবুর রহমান
জিজ্ঞেস করুন নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের পালনকর্তা কে? বলে দিনঃ আল্লাহ! বলুনঃ তবে কি তোমরা আল্লাহ ব্যতীত এমন অভিভাবক স্থির করেছ, যারা নিজেদের ভাল-মন্দের ও মালিক নয়? বলুনঃ অন্ধ চক্ষুষ্মান কি সমান হয়? অথবা কোথাও কি অন্ধকার ও আলো সমান হয়। তবে কি তারা আল্লাহর জন্য এমন অংশীদার স্থির করেছে যে, তারা কিছু সৃষ্টি করেছে, যেমন সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ? অতঃপর তাদের সৃষ্টি এরূপ বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে? বলুনঃ আল্লাহই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি একক, পরাক্রমশালী।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
বল, ‘কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক ?’ বল, ‘আল্লাহ্’। বল, ‘তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছ আল্লাহ্ র পরিবর্তে অপরকে যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয় ?’ বল, ‘অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান বা অন্ধকার ও আলো কি এক ?’ তবে কী তারা আল্লাহ্ র এমন শরীক করেছে, যারা আল্লাহ্ র সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি এদের নিকট সদৃশ মনে হয়েছে ? বল, ‘আল্লাহ্ সকল বস্তুর স্রষ্টা; তিনি এক, পরাক্রমশালী।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
বল, ‘আসমানসমূহ ও যমীনের রব কে’? বল, ‘আল্লাহ’। তুমি বল, ‘তোমরা কি তাঁকে ছাড়া এমন কিছুকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছ, যারা তাদের নিজদের কোন উপকার অথবা অপকারের মালিক না’? বল, ‘অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে? নাকি তারা আল্লাহর জন্য এমন কতগুলো শরীক নির্ধারণ করেছে, যেগুলো তাঁর সৃষ্টির তুল্য কিছু সৃষ্টি করেছে, ফলে তাদের নিকট সৃষ্টির বিষয়টি একরকম মনে হয়েছে’? বল, ‘আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি এক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর’।আল-বায়ান
বল, আকাশ ও যমীনের প্রতিপালক কে? বল, আল্লাহ। বল, তোমরা কি তাঁকে বাদ দিয়ে এমন অভিভাবক গ্রহণ করেছ যাদের নিজেদের কোন লাভ-লোকসান করার ক্ষমতা নেই। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? কিংবা অন্ধকার আর আলো কি সমান? কিংবা তারা কি আল্লাহর অংশীদার বানিয়েছে তাদেরকে যারা তাঁর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সমান মনে হয়েছে? বল, আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি এক, মহা প্রতাপশালী।তাইসিরুল
বলো -- "কে মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর প্রভু?" বল -- "আল্লাহ্।" বল, "তবে কি তোমরা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে অভিভাবক-রূপে গ্রহণ কর তাদের যারা তাদের নিজেদের জন্যে কোনো লাভ কামাতে সক্ষম নয় আর ক্ষতিসাধনেও নয়?" বলো -- "অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক-সমান অথবা অন্ধকার আর আলোক কি সমান-সমান? অথবা তারা কি আল্লাহ্র এমন অংশী দাঁড় করিয়েছে যারা তাঁর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যার ফলে সৃষ্টি তাদের কাছে সন্দেহ ঘটিয়েছে?" বল -- "আল্লাহ্ই সব-কিছুর সৃষ্টিকর্তা, আর তিনি একক, সর্বাধিনায়ক।"মাওলানা জহুরুল হক
২৬
উল্লেখ করা যেতে পারে, আল্লাহ পৃথিবী ও আকাশের রব একথা তারা নিজেরা মানতো। এ প্রশ্নের জবাবে তারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারতো না। কারণ একথা অস্বীকার করলে তাদের নিজেদের আকীদাকেই অস্বীকার করা হতো। কিন্তু নবী (সা.) এর জিজ্ঞাসার পর তারা এর জবাব পাশ কাটিয়ে যেতে চাচ্ছিল। কারণ স্বীকৃতির পর তাওহীদকে মেনে নেয়া অপরিহার্য হয়ে উঠতো এবং এরপর শিরকের জন্য আর কোন যুক্তিসঙ্গত বুনিয়াদ থাকতো না। তাই নিজেদের অবস্থানের দুর্বলতা অনুভব করেই তারা এ প্রশ্নের জবাবে নীরব হয়ে যেতো। এ কারণেই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ নবী (সা.) কে বলেন ওদেরকে জিজ্ঞেস করো পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা কে? বিশ্ব-জাহানের রব কে? কে তোমাদের রিযিক দিচ্ছেন? তারপর হুকুম দেন, তোমরা নিজেরাই বলো আল্লাহ এবং এরপর এভাবে যুক্তি পেশ করেন যে, আল্লাহই যখন এ সমস্ত কাজ করছেন তখন আর কে আছে যার তোমরা বন্দেগী করে আসছো?
২৭
অন্ধ বলে এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যার সামনে বিশ্ব-জগতের চতুর্দিক ে আল্লাহর একত্বের চিহ্ন ও প্রমাণ ছড়িয়ে আছে কিন্তু সে তার মধ্য থেকে কোন একটি জিনিসও দেখছে না। আর চক্ষুষ্মান হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি, যার দৃষ্টি বিশ্ব-জগতের প্রতিটি অনু-কণিকায় এবং প্রতিটি পত্র-পল্লবে একজন অসাধারণ কারিগরের অতুলনীয় কারিগরীর নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে। আল্লাহর এ প্রশ্নের অর্থ হচ্ছেঃ ওহে বুদ্ধিভ্রষ্টেরা। যদি তোমরা কিছুই দেখতে না পেয়ে থাকো তাহলে যাদের দেখার মতো চোখ আছে তারা কেমন করে নিজেদের চোখ বন্ধ করে নেবে? যে ব্যক্তি সত্যকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে কেমন করে দৃষ্টিশক্তিহীন লোকদের মতো আচরণ করবে এবং পথে বিপথে ঘুরে বেড়াবে?
২৮
আলো মানে সত্যজ্ঞানের আলো। নবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীরা এ সত্য জ্ঞানের আলো লাভ করেছিলেন। আর আঁধার মানে মূর্খতার আঁধার। নবীর অস্বীকারকারীরা এ আঁধারে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। প্রশ্নের অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি আলো পেয়ে গেছে সে কেন নিজের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে আঁধারের বুকে হোঁচট খেয়ে ফিরতে থাকবে? তোমাদের কাছে আলোর মর্যাদা না থাকলে না থাকতে পারে কিন্তু যে তার সন্ধান পেয়েছে, যে আলো ও আঁধারের পার্থক্য জেনে ফেলেছে এবং যে দিনের আলোয় সোজা পথ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে কেমন করে আলো ত্যাগ করে আঁধারের মধ্যে পথ হাতড়ে বেড়াতে পারে?
২৯
এ প্রশ্নের অর্থ হচ্ছে, যদি দুনিয়ার কিছু জিনিস আল্লাহ সৃষ্টি করে থাকতেন এবং কিছু জিনিস অন্যেরা সৃষ্টি করতো আর কোনটা আল্লাহর সৃষ্টি এবং কোনটা অন্যদের এ পার্থক্য করা সম্ভব না হতো তাহলে তো সত্যিই শিরকের জন্য কোন যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি হতে পারতো। কিন্তু যখন এ মুশরিকরা নিজেরাই তাদের মাবুদদের একজনও একটি তৃণ এবং একটি চুলও সৃষ্টি করেনি বলে স্বীকার করে এবং যখন তারা একথাও স্বীকার করে যে, সৃষ্টিকর্মে এ বানোয়াট ইলাহদের সামান্যতমও অংশ নেই। তখন এ বানোয়াট মাবুদদেরকে স্রষ্টার ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও অধিকারে শামিল করা হলো কিসের ভিত্তিতে?
৩০
মূল আয়াতে ‘কাহ্হার’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, এমন সত্তা যিনি নিজ শক্তিতে সবার ওপর হুকুম চালান এবং সবাইকে অধীনস্ত করে রাখেন। “আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা” একথাটি এমন একটি সত্য যাকে মুশরিকরাও স্বীকার করে নিয়েছিল এবং তারা কখনো এটা অস্বীকার করেনি। “তিনি একক ও মহাপরাক্রমশালী” একথাটি হচ্ছে মুশরিকদের ঐ স্বীকৃত সত্যের অনিবার্য ফল। প্রথম সত্যটি মেনে নেবার পর কোন জ্ঞান-বৃদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে একে অস্বীকার করা সম্ভবপর নয়। কারণ যিনি প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা নিঃসন্দেহে তিনি একক, অতুলনীয় ও সাদৃশ্যবিহীন। কারণ অন্য যা কিছু আছে সবই তার সৃষ্টি। এ অবস্থায় কোন সৃষ্টি কেমন করে তার স্রষ্টার সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা বা অধিকারে তাঁর সাথে শরীক হতে পারে? এভাবে তিনি নিঃসন্দেহে মহাপরাক্রমশালীও। কারণ সৃষ্টি তার স্রষ্টার অধীন হয়ে থাকবে, এটি সৃষ্টি-ধারণার অংগীভুত। সৃষ্টির ওপর স্রষ্টার যদি পূর্ণ কর্তৃত্ব ও দখল না থাকে তাহলে তিনি সৃষ্টিকর্মই বা করবেন কেমন করে? কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্রষ্টা বলে মানে তার পক্ষে এ দু’টি বুদ্ধিবৃত্তিক ও ন্যায়ানুগ ফলশ্রুতি অস্বীকার করা সম্ভবপর হয় না। কাজেই এরপরে কোন ব্যক্তি স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির বন্দেগী করবে এবং মহাপরাক্রমশালীকে বাদ দিয়ে দুর্বল ও অধীনকে সংকট উত্তরণ করাবার জন্য আহবান জানাবে, একথা একেবারেই অযৌক্তিক প্রমাণিত হয়।
আরবের মুশরিকরা যেসব দেবতাদেরকে মাবুদ মনে করত ও তাদের পূজা-অর্চনা করত, তাদের সম্পর্কে তারা সাধারণভাবে একথা স্বীকার করত যে, জগত সৃজনে তাদের কোনও অংশীদারিত্ব নেই। বরং সারা জাহান আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন। তবে তাদের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রভুত্বের বহু ক্ষমতা তাদের উপর ন্যস্ত করেছেন। তাই তাদেরও উপাসনা করা উচিত, যাতে তারা তাদের সে ক্ষমতা আমাদের অনুকূলে ব্যবহার করে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের পক্ষে সুপারিশও করে। এ আয়াতে প্রথমত বলে দেওয়া হয়েছে, এসব মনগড়া দেবতা খোদ নিজেদেরও কোনও উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখে না। কাজেই সে অন্যদের উপকার-অপকার করবে কি করে? তারপর বলা হয়েছে, এসব দেবতা যদি আল্লাহ তাআলার মত কোন কিছু সৃষ্টি করে থাকত, তবে না হয় তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শরীক সাব্যস্ত করার কোন যুক্তি থাকত, কিন্তু না তারা বাস্তবে কোনও কিছু সৃষ্টি করেছে আর না আরববাসী এরূপ আকীদা পোষণ করত। এহেন অবস্থায় তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শরীক সাব্যস্ত করে তাদের ইবাদত-উপাসনা করার কী বৈধতা থাকতে পারে?
১৬. বলুন, কে আসমানসমূহ ও যমীনের রব? বলুন, আল্লাহ।(১) বলুন, তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছ আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়? বলুন, অন্ধ(২) ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো(৩) সমান হতে পারে? তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরীক করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সদৃশ মনে হয়েছে?(৪) বলুন, ‘আল্লাহ সকল বস্তুর স্রষ্টা(৫); আর তিনি এক, মহা প্রতাপশালী(৬)
(১) উল্লেখ করা যেতে পারে, আল্লাহ পৃথিবী ও আকাশের রব একথা তারা নিজেরা মানতো। এ প্রশ্নের জবাবে তারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারতো না। কারণ একথা অস্বীকার করলে তাদের নিজেদের আকীদাকেই অস্বীকার করা হতো। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জিজ্ঞাসার পর তারা এর জবাব পাশ কাটিয়ে যেতে চাচ্ছিল। কারণ স্বীকৃতির পর ইবাদাতের ক্ষেত্রে তাওহীদকে মেনে নেওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠতো এবং এরপর শির্কের জন্য আর কোন যুক্তিসংগত বুনিয়াদ থাকতো না। তাই নিজেদের অবস্থানের দুর্বলতা অনুভব করেই তারা এ প্রশ্নের জবাবে কিছু বলত না। এ কারণেই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা কে? বিশ্ব-জাহানের রব কে? কে তোমাদের রিযিক দিচ্ছেন? তারপর হুকুম দেন, আপনি নিজে নিজেই বলুন আল্লাহ এবং এরপর এভাবে যুক্তি পেশ করেন যে, আল্লাহই যখন এ সমস্ত কাজ করছেন তখন আর কে আছে যার তোমরা বন্দেগী করে আসছো?
এখানেও আল্লাহ তাদের সেই স্বীকারোক্তির কথা উল্লেখ করে তাদেরকে আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই এ কথার স্বীকৃতি আদায় করছেন। কেননা, তারা স্বীকার করে যে, আসমান ও যমীনের রব হচ্ছেন আল্লাহ, তিনিই আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন, এতদসত্বেও তারা আল্লাহ ছাড়া বহু অভিভাবক ইলাহ গ্রহণ করে সেগুলোর ইবাদাত করছে, অথচ ইলাহগুলো না নিজেদের কোন লাভ-ক্ষতির মালিক, না তাদের ইবাদতকারীদের। সেগুলো তাদের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। আর তাদের কোন ক্ষতিও দূর করতে পারে না। তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে, যে আল্লাহর সাথে এ সমস্ত ইলাহের ইবাদাত করে, আর যে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে, তার সাথে কাউকে শরীক করে না, আর সে তার রব প্রদত্ত স্পষ্ট আলোতে রয়েছে? (ইবন কাসীর)
(২) এখানে তিনি ঈমানদার ও কাফেরের জন্য একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। তিনি বলেন, যেভাবে অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান হতে পারে না তেমনি কাফের ও ঈমানদার সমান হতে পারে না। (বাগভী) মুমিন হক প্রত্যক্ষ করে, পক্ষান্তরে মুশরিক হক দেখে না। (কুরতুবী) অথবা এখানে অন্ধ বলে তারা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইবাদাত করতো তাদেরকে বুঝানো হয়েছে আর চক্ষুষ্মান বলে স্বয়ং আল্লাহকেই বোঝানো হয়েছে। (কুরতুবী)
(৩) আলো মানে সত্যজ্ঞানের আলো। এখানে উদ্দেশ্য ঈমান। (কুরতুবী) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর অনুসারীরা এ সত্য জ্ঞানের আলো ঈমান লাভ করেছিলেন। আর আঁধার মানে কুফরী। (কুরতুবী) কুফরীতে রয়েছে মূর্খতার আঁধার। নবীর অস্বীকারকারীরা এ আঁধারে পথ হারিয়ে ফেলেছে। সুতরাং আলো ও আঁধার কখনও সমান হতে পারে না। যে ব্যক্তি আলো পেয়ে গেছে সে কেন নিজের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে আঁধারের বুকে হোচট খেয়ে ফিরতে থাকবে?
(৪) এ প্রশ্নের অর্থ হচ্ছে, যদি দুনিয়ার কিছু জিনিস আল্লাহ সৃষ্টি করে থাকতেন এবং কিছু জিনিস অন্য মাখলুকরা সৃষ্টি করতো আর কোনটা আল্লাহর সৃষ্টি এবং কোনটা অন্যদের এ পার্থক্য করা সম্ভব না হতো তাহলে তো সত্যিই শিরকের জন্য কোন যুক্তিসংগত ভিত্তি হতে পারতো। কিন্তু ব্যাপারটি এ রকম নয়। (দেখুন, ইবন কাসীর) কারণ, তাঁর হুবহু যেমন কিছু নেই তেমনি তার মতও কিছু নেই। তার কোন সমকক্ষ নেই, তাঁর অনুরূপ কেউ নেই, তার কোন মন্ত্রী-সাহায্যকারী নেই, তাঁর কোন সন্তান নেই, আর না আছে তাঁর কোন সঙ্গিনী। আল্লাহর মর্যাদা এ সমস্ত বিষয়াদি থেকে বহু উর্ধ্বে। এ মুশরিকরা নিজেরাই স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, এ সমস্ত মাবুদ যাদের ইবাদাত তারা করছে সেগুলো আল্লাহরই বান্দা, তাঁরই সৃষ্ট, যেমন তারা তাদের শির্কী তালবিয়াতে বলতঃ হাজির, তাঁর কোন শরীক নেই, তবে সে শরীক, যার কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে, আল্লাহর কর্তৃত্ব সে শরীকের কাছে নেই। যেমন আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে। (সূরা আয-যুমার: ৩)
তারা যেহেতু এ ধরণের বিশ্বাস করে থাকে তাই আল্লাহ্ সেটা অস্বীকার করে বলেছেন যে, তার অনুমতি ব্যতীত কেউ নেই যে, সুপারিশ করবে। আর যাকে অনুমতি দেয়া হয় সে ছাড়া আল্লাহর কাছে কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। (সূরা সাবাঃ ২৩) আরও বলেন, “আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গুণে রেখেছেন এবং কিয়ামতের দিন তাদের সবাই তার কাছে আসবে একাকী অবস্থায়। (সূরা মারইয়াম: ৯৩–৯৫) সুতরাং এসবই যখন বান্দা ও দাস, তখন বিনা দলীল-প্রমাণে শুধু মতের উপর নির্ভরশীল হয়ে একে অপরের ইবাদত কেন করবে? তারপর আল্লাহ্ তাঁর রাসূলদের সবাইকে প্রথমজন থেকে শেষজন পর্যন্ত সবাইকে এথেকে সাবধান করে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করতে নিষেধ করার জন্যই পাঠিয়েছেন। ফলে তারা তার রাসূলদের উপর মিথ্যারোপ করল এবং তাদের বিরোধিতায় লিপ্ত হলো, তাই তাদের উপর শাস্তির বাণী যথাযথ ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে গেল। “আর আপনার রব কারও উপর যুলুম করেন না” (সূরা আল-কাহাফঃ ৪৯) (ইবন কাসীর)
(৫) কেননা, কোন বস্তু নিজে নিজেকে সৃষ্টি করেছে সেটা অসম্ভব ব্যাপার। আবার সৃষ্ট কোন কিছু স্রষ্টা ছাড়া এসেছে সেটাও অসম্ভব। তাতে বুঝা গেল যে, একজন স্রষ্টা অবশ্যই আছেন। সৃষ্টিতে যার কোন শরীক থাকতে পারে না। কেননা, তিনি এক ও দাপুটে। আল্লাহ ব্যতীত আর কারও জন্য একক ও মহাদাপুটে গুণ সাব্যস্ত করা যায় না। সৃষ্টিকুল এবং প্রতিটি সৃষ্টির উপরই কোন না কোন নিয়ন্ত্রণকারী দাপট দেখানোর মত সৃষ্টি রয়েছে। তারপর তারও উপর রয়েছে আরেক নিয়ন্ত্রণকারী। কিন্তু তার উপর রয়েছেন সেই মহা দাপুটে সর্বনিয়ন্ত্রণকারী একক সত্তা। সুতরাং দাপট ও তাওহীদ একটি অপরটিকে বাধ্য করে। যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। এভাবে বিবেকের শক্তিশালী দলীল দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে আহবান করে তাদের কেউই সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না। আর এভাবেই তাদের ইবাদাত বাতিল প্রমাণিত হলো। (সা'দী)
(৬) মূল আয়াতে ‘কাহ্হার’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, এমন সত্তা যিনি নিজ শক্তিতে সবার উপর হুকুম চালান এবং সবাইকে অধীনস্ত করে রাখেন। যার ইচ্ছার কাছে সমস্ত ইচ্ছাকারী হার মানে। (কুরতুবী) “আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা” একথাটি এমন সত্য যাকে মুশরিকরাও স্বীকার করে নিয়েছিল এবং তারা কখনো এটা অস্বীকার করেনি। “তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী বা মহা দাপুটে” এটি হচ্ছে মুশরিকদের ঐ স্বীকৃত সত্যের অনিবাৰ্য ফল। কারণ যিনি প্রত্যেকটি জিনিসের স্রষ্টা নিঃসন্দেহে তিনি এক, অতুলনীয় ও সাদৃশ্যবিহীন। কারণ অন্য যা কিছু আছে সবই তাঁর সৃষ্টি।
এ অবস্থায় কোন সৃষ্টি কেমন করে তার স্রষ্টার সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা বা অধিকার তথা ইবাদতে তাঁর সাথে শরীক হতে পারে? এভাবে তিনি নিঃসন্দেহে মহাপরাক্রমশালীও। কারণ সৃষ্টি তার স্রষ্টার অধীন হয়ে থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্রষ্টা বলে মানে তার পক্ষে স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির বন্দেগী করা এবং মহাপরাক্রমশালী সর্বনিয়ন্ত্রক আল্লাহকে বাদ দিয়ে দুর্বল ও অধীনকে সংকট উত্তরণ করাবার জন্য আহবান করা একেবারেই অযৌক্তিক প্রমাণিত হলো। (দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালাহ ২/৪৬৪–৪৬৫; মাদারিজুস সালেকীন ১/৪১৪)
(১৬) বল, ‘কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক?’ বল, ‘তিনি আল্লাহ।’(1) বল, ‘তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে, যারা নিজেদের লাভ ও ক্ষতির মালিক নয়?’(2) বল, ‘অন্ধ ও চক্ষুষমান কি সমান অথবা অন্ধকার ও আলো কি এক?’(3) অথবা তারা কি আল্লাহর এমন শরীক স্থাপন করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যার কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে তালগোল খেয়ে গেছে? বল, ‘আল্লাহ সকল বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনিই অদ্বিতীয়,(4) পরাক্রমশালী।’
(1) এখানে নবী (সাঃ)-এর জবানে স্বীকারোক্তি রয়েছে, কিন্তু কুরআনের অন্যান্য স্থানে স্পষ্ট রয়েছে যে, মুশরিকদের জবাবও এটাই ছিল।
(2) অর্থাৎ যখন তোমরা স্বীকার করছ যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি অন্যের অংশীদারিত¸ ছাড়া সকল ক্ষমতা ও এখতিয়ারের মালিক, তাহলে এর পরও কেন তোমরা তাঁকে ছেড়ে এমন সৃষ্টিদেরকে অভিভাবক, বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক মনে করছ, যারা নিজেদের লাভ-ক্ষতিরও এখতিয়ার রাখে না।
(3) অর্থাৎ, যেমন দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান সমান হতে পারে না, তেমনি তওহীদবাদী ও মুশরিক (অংশীবাদী) সমান হতে পারে না। কেননা তওহীদবাদীর হৃদয় তওহীদের জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় থাকে, পক্ষান্তরে মুশরিক তা হতে বঞ্চিত থাকে। একত্ববাদীর দৃষ্টিশক্তি রয়েছে, সে তওহীদের জ্যোতি দেখতে পায়। পক্ষান্তরে অংশীবাদী তওহীদের জ্যোতি দেখতে পায় না, কেননা সে অন্ধ। অনুরূপ যেমন অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে না, তেমনি এক আল্লাহর ইবাদতকারী; যার হৃদয় ঈমানী জ্যোতিতে পরিপূর্ণ এবং মুশরিক; যার হৃদয় অজ্ঞতা ও কুসংস্কার তথা অলীক বিশ্বএর অন্ধকারে বিচরণ করে, উভয়ে সমান হতে পারে না।
(4) অর্থাৎ এমন কথা নয় যে, তারা তালগোল বা সন্দেহের শিকার হয়েছে, বরং তারা মানে যে, প্রত্যেক বস্তুর সৃষ্টিকর্তা শুধুমাত্র মহান আল্লাহই।