وَجَآءَتۡ سَيَّارَةٞ فَأَرۡسَلُواْ وَارِدَهُمۡ فَأَدۡلَىٰ دَلۡوَهُۥۖ قَالَ يَٰبُشۡرَىٰ هَٰذَا غُلَٰمٞۚ وَأَسَرُّوهُ بِضَٰعَةٗۚ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِمَا يَعۡمَلُونَ

ওয়া জাআত ছাইইয়া-রতুন ফাআরছালূওয়া-রিদাহুম ফাআদলা-দালওয়াহূ ক-লা ইয়া-বুশর-হা-যা-গুলা-মুওঁ ওয়া আছাররূহু বিদা-‘আতাওঁ ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুম বিমা-ইয়া‘মালূন।উচ্চারণ

ওদিকে একটি কাফেলা এলো। তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে পানি নেবার জন্য পাঠালো। সে কূয়ার মধ্যে পানির ডোল নামিয়ে দিল। সে (ইউসুফকে দেখে) বলে উঠলো, “কী সুখবর! এখানে তো দেখছি একটি বালক।” তারা তাকে পণ্য দ্রব্য হিসেবে লুকিয়ে ফেললো। অথচ তারা যা কিছু করছিল সে সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত ছিলেন। তাফহীমুল কুরআন

এবং (অন্য দিকে তারা ইউসুফকে যেখানে কুয়ায় ফেলেছিল, সেখানে) একটি যাত্রীদল আসল। তারা তাদের একজন লোককে পানি আনতে পাঠাল। সে (কুয়ায়) নিজ বালতি ফেলল। (তার ভেতর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখে) সে বলে উঠল, তোমরা সুসংবাদ শোন, এ যে একটি বালক। #%১১%# অতঃপর যাত্রীদলের লোক তাকে একটি পণ্য মনে করে লুকিয়ে রাখল। আর তারা যা-কিছু করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন।মুফতী তাকী উসমানী

এক যাত্রী দল এলো, তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে তার পানির বালতি নামিয়ে দিল, সে বলে উঠলঃ কি সুখবর! এ যে এক কিশোর! অতঃপর তারা তাকে পণ্য রূপে লুকিয়ে রাখল, তারা যা করছিল সেই বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত ছিলেন।মুজিবুর রহমান

এবং একটি কাফেলা এল। অতঃপর তাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে বালতি ফেলল। বললঃ কি আনন্দের কথা। এ তো একটি কিশোর তারা তাকে পন্যদ্রব্য গণ্য করে গোপন করে ফেলল। আল্লাহ খুব জানেন যা কিছু তারা করেছিল।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এক যাত্রীদল এলো, এরা এদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে তার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলে উঠল, ‘কী সুখবর! এ যে এক কিশোর!’ এরপর এরা তাকে পণ্যরূপে লুকিয়ে রাখলো। এরা যা করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত ছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর একটি যাত্রীদল আসল এবং তারা তাদের পানি সংগ্রহকারীকে প্রেরণ করল অতঃপর সে তার বালতি ফেলল। সে বলে উঠলো, ‘কী সুখবর! এ যে একটি বালক’ এবং তারা তাকে পণ্যদ্রব্য হিসেবে গোপন করে ফেলল। আর তারা যা কিছু করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।আল-বায়ান

সেখানে একটা কাফেলা আসলো। তারা তাদের পানি সংগ্রহকারীকে পাঠালো। সে তার পানির বালতি নামিয়ে দিল। সে বলল, ‘কী খুশির খবর! এ যে দেখছি এক বালক!’ তারা তাকে পণ্য দ্রব্য জ্ঞানে লুকিয়ে দিল, আর তারা যা করছিল সে সম্পর্কে আল্লাহ খুবই অবহিত।তাইসিরুল

এদিকে ভ্রমণকারীরা এল এবং তাদের পানিওয়ালাকে পাঠাল, সে তখন তার বালতি নামিয়ে দিল। সে বললে, "কি সুখবর! এ যে একটি ছোকরা!" অতঃপর তারা তাঁকে লুকিয়ে রাখল পণ্য-দ্রব্যের মতো। আর তারা যা করেছিল সে-সন্বন্ধে আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

বর্ণিত আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কুয়ায় ফেলা হলে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তিনি তার ভেতর সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন। কুয়ার ভেতর একটি পাথর ছিল। তিনি তার উপর উঠে বসে থাকলেন। যখন যাত্রীদলের পাঠানো লোকটি কুয়ার ভেতর বালতি ফেলল, তিনি সেই বালতিতে সওয়ার হয়ে গেলেন। লোকটি বালতি টেনে তুলতেই দেখতে পেল তার ভেতর একটি বালক। অমনি সে চিৎকার করে ওঠল এবং তার মুখ থেকে ওই কথা বের হয়ে গেল, যা এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৯. আর এক যাত্রীদল আসল, অতঃপর তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে পাঠালে সে তার পানির বালতি নামিয়ে দিল। সে বলে উঠল, কী সুখবর! এ যে এক কিশোর!(১) এবং তারা তাকে পণ্যরূপে লুকিয়ে রাখল।(২) আর তারা যা করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।(৩)

(১) ঘটনাচক্রে একটি কাফেলা এ স্থানে এসে যায়। কোন কোন তাফসীরে বলা হয়েছেঃ এ কাফেলা সিরিয়া থেকে মিসর যাচ্ছিল। পথভুলে এ জনমানবহীন জঙ্গলে এসে উপস্থিত হয়। (কুরতুবী) তারা পানি সংগ্রহকারীকে কুপে প্রেরণ করল। লোকটি এই কুপে পৌছলেন এবং বালতি নিক্ষেপ করলেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম সর্বশক্তিমানের সাহায্য প্রত্যক্ষ করে বালতির রশি শক্ত করে ধরলেন। পানির পরিবর্তে বালতির সাথে একটি সমুজ্জ্বল মুখমণ্ডল দৃষ্টিতে ভেসে উঠল।

এ মুখমণ্ডলের ভবিষ্যত মাহাত্ম্য থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও উপস্থিত ক্ষেত্রেও অনুপম সৌন্দর্য ও গুণগত উৎকর্ষের নিদর্শনাবলী তার মাহত্ম্যের কম পরিচায়ক ছিল না। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে কুপের তলদেশ থেকে ভেসে উঠা এই অল্পবয়স্ক, অপরূপ ও বুদ্ধিদীপ্ত বালককে দেখে লোকটি সোল্লাসে চীৎকার করে উঠলঃ (يَا بُشْرَىٰ هَٰذَا غُلَامٌ) -আরে, আনন্দের কথা- এ তো বড় চমৎকার এক কিশোর বের হয়ে এসেছে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘আমি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সাথে সাক্ষাতের পর দেখলাম যে, আল্লাহ তা'আলা সমগ্র বিশ্বের রূপ-সৌন্দর্যের অর্ধেক তাকে দান করেছেন। (মুসলিমঃ ১৬২)

(২) অর্থাৎ তারা তাকে একটি পণ্যদ্রব্য মনে করে গোপন করে ফেলল। উদ্দেশ্য এই যে, শুরুতে এ কিশোরকে দেখে অবাক বিস্ময়ে চীৎকার করে উঠল; কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করে স্থির করল যে, এটা জানাজানি না হওয়া উচিত এবং গোপন করে ফেলা দরকার, যাতে একে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ লাভ করা যায়। সমগ্র কাফেলার মধ্যে এ বিষয় জানাজানি হয়ে গেলে সবাই এতে অংশীদার হয়ে যাবে। এরূপ অর্থও হতে পারে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভ্রাতারা বাস্তব ঘটনা গোপন করে তাকে পণ্যদ্রব্য করে নিল। এমতাবস্থায় আয়াতের অর্থ এই হবে যে, ইউসুফ ভ্রাতারা নিজেরাই ইউসুফকে পণ্যদ্রব্য স্থির করে বিক্রি করে দিল। (তাবারী; কুরতুবী)

(৩) অর্থাৎ তাদের সব কর্মকাণ্ড আল্লাহ্ তা'আলার জানা ছিল। উদ্দেশ্য এই যে, ইউসুফ ভ্রাতারা কি করবে এবং তাদের কাছ থেকে ক্রেতা কাফেলা কি করবে, তা সবই আল্লাহ তা'আলার জানা ছিল। তিনি তাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়ারও শক্তি রাখতেন। কিন্তু বিশেষ কোন রহস্যের কারণেই আল্লাহ তা'আলা এসব পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করেননি; বরং নিজস্ব পথে চলতে দিয়েছেন। এর মধ্যে আল্লাহ্ তা'আলা তার হাবীব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এটার প্রতি ইঙ্গিত করলেন যে, আপনার কাওম আপনার উপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে তা আমার অজানা নয়, আমি এটার প্রতিকার করতে পারি। কিন্তু আমি তাদেরকে ছাড় দেই। তারপর উত্তম পরিণাম আপনার জন্যই হবে। আর তাদের বিচার আপনিই করবেন। যেমনটি ইউসুফ আলাইহিস সালামের উপর তার ভাইদের প্রাধান্য ও বিচারের ভার পড়েছিল। (ইবন কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৯) এক যাত্রীদল এসে তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে তার পানির বালতি নামিয়ে দিল। সে বলে উঠল, কি সুখবর! এ যে এক কিশোর!(1) অতঃপর তারা তাকে পণ্যরূপে লুকিয়ে রাখল।(2) তারা যা করছিল, সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত ছিলেন। (3)

(1) وارد (পানি সংগ্রাহক) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যে কাফেলা বা যাত্রীদলের জন্য পানি ইত্যাদির ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে কাফেলার আগে আগে যাত্রা করে; যাতে উপযুক্ত স্থানে কাফেলা থাকার ব্যবস্থা হয়। উক্ত পানি সংগ্রাহক যখন কূপের নিকট এল ও পানি উঠানোর জন্য বালতি নিচে নামাল, তখন ইউসুফ (আঃ) তার দড়ি ধরে নিলেন। পানি সংগ্রাহক একটি সুদর্শন শিশু দেখে তাঁকে উপরে টেনে তুলল এবং অতি আনন্দিত হল।

(2) بضاعة বাণিজ্যের পণ্যকে বলা হয়। أسروه (লুকিয়ে রাখল) এর فاعل (কর্তা) কে? অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যবসার পণ্য হিসাবে কে লুকিয়ে রেখেছিল? এতে মতভেদ আছে। হাফেয ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত কর্মের কর্তা ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদেরকে ধরেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, যখন বালতির সাথে ইউসুফ (আঃ) কূপ থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন সেখানে তাঁর ভাইরাও উপস্থিত ছিলেন। তারপরেও তাঁরা প্রকৃত ঘটনা লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা এ কথা বলেননি যে, এটা আমাদের ভাই। আর ইউসুফ (আঃ)ও হত্যার ভয়ে তাঁরা যে তাঁর ভাই এ কথা প্রকাশ করেননি। বরং তাঁর ভায়েরা তাঁকে বিক্রির পণ্য বললেও তিনি নিশ্চুপ থাকলেন এবং নিজেকে বিক্রি হওয়াটাই পছন্দ করলেন। সুতরাং সেই পানি সংগ্রাহক কাফেলার লোকদেরকে সুসংবাদ শুনালো যে, একটি ছেলে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই কথা পূর্ব আলোচনার সাথে মিলে না। (বরং খাপছাড়া মনে হয়।) এর বিপরীত ইমাম শওকানী (রঃ) أسروه শব্দটির কর্তা পানি সংগ্রাহক ও তার সাথীদেরকে ধরে বলেছেন যে, তারা এ কথা প্রকাশ করেনি যে, এই ছেলেটি কূপে পাওয়া গেছে। কারণ তা প্রকাশ করলে কাফেলার সমস্ত লোকই ঐ ‘‘বাণিজ্যিক পণ্যে’’ শরীক হয়ে যেত। বরং কাফেলার লোকদের নিকট গিয়ে এ কথা বলল যে, কূপের মালিক তাদেরকে এই ছেলেটি মিশরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করার জন্য দিয়েছে। কিন্তু সব থেকে উত্তম উক্তি হল এই যে, কাফেলার লোকরা ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যবসাপণ্য গণ্য করে লুকিয়ে নিয়েছিল, যাতে তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা তাঁর খোঁজে এখানে এসে না যায় এবং বিনা মূল্যে তাকে ফিরিয়ে দিতে না হয়। কারণ কূপে একজন ছেলে পাওয়া যাওয়া, এই কথাই প্রমাণ করে যে, সে কোন স্থানীয় কোন বাসিন্দা হবে এবং খেলাধূলা করতে করতে কূপে পড়ে গিয়ে থাকবে।

(3) অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে যা কিছু ঘটছিল, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। তার পরেও আল্লাহ তাআলা এত কিছু এই জন্য হতে দিলেন, যাতে আল্লাহর লিখিত ভাগ্য বাস্তবায়িত হয়। তাছাড়া এতে নবী (সাঃ) এর জন্য সান্ত্বনা রয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বর (সাঃ)-কে জানাচ্ছেন যে, তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা অবশ্যই তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং আমি তা থেকে তাদেরকে বিরত রাখার ক্ষমতাও রাখি। কিন্তু আমি তাদেরকে সেইরূপ ঢিল দিচ্ছি, যেরূপ ইউসুফের ভাইদেরকে ঢিল দিয়েছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি ইউসুফকে মিসরের রাজ-সিংহাসনে বসিয়েছিলাম এবং তার ভাইদেরকে অক্ষম ও অসহায় করে তার দরবারে উপস্থিত করেছিলাম। হে নবী! এমন এক সময় আসবে, যখন তোমারও এরূপ মাথা উঁচু হবে এবং এই কুরায়েশ দলপতিরা তোমার ভ্রূর ইঙ্গিত ও মুখের কথার অপেক্ষায় থাকবে। সুতরাং মক্কা বিজয়ের দিন উক্ত অবস্থা অতি সত্ত্বর এসে গিয়েছিল।