ক-লূইয়া-শু‘আইবুআসালা-তুকা তা’মুরুকা আন নাতরুকা মা-ইয়া‘বুদুআ-বাউনাআও আন্নাফ‘আলা ফীআমওয়া-লিনা-মা-নাশাউ ইন্নাকা লাআনতাল হালীমুর রশীদ।উচ্চারণ
তারা জবাব দিলঃ “হে শো’আয়েব! তোমার নামায কি তোমাকে একথা শেখায় যে, ৯৬ আমরা এমন সমস্ত মাবুদকে পরিত্যাগ করবো যাদেরকে আমাদের বাপ-দাদারা পূজা করতো? অথবা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী খরচ করার ইখতিয়ার আমাদের থাকবে না? ৯৭ ব্যস, শুধু তুমিই রয়ে গেছো একমাত্র উচ্চ হৃদয়ের অধিকারী ও সদাচারী!” তাফহীমুল কুরআন
তারা বলল, হে শুআইব! তোমার নামায কি তোমাকে এই আদেশ করছে যে, আমাদের বাপ-দাদাগণ যাদের ইবাদত করত, আমরা তাদেরকে পরিত্যাগ করব এবং নিজেদের অর্থ-সম্পদে যা ইচ্ছা হয় তা করব না? #%৬১%# তুমি তো বড় বুদ্ধিমান ও সদাচারী লোক! #%৬২%#মুফতী তাকী উসমানী
তারা বললঃ হে শু‘আইব! তোমার ধর্মনিষ্ঠা কি তোমাকে এই শিক্ষা দিচ্ছে যে, আমরা ঐ সব উপাস্য বর্জন করি যাদের উপাসনা আমাদের পিতৃ-পুরুষরা করে আসছে? অথবা এটা বর্জন করতে বল যে, আমরা নিজেদের মালে নিজেদের ইচ্ছানুসারে ব্যবস্থা অবলম্বন করি? বাস্তবিকই তুমি হচ্ছ বড় সহিষ্ণু, সদাচারী।মুজিবুর রহমান
তারা বলল-হে শোয়ায়েব (আঃ) আপনার নামায কি আপনাকে ইহাই শিক্ষা দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব আমাদের বাপ-দাদারা যাদের উপাসনা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা ছেড়ে দেব? আপনি তো একজন খাস মহৎ ব্যক্তি ও সৎপথের পথিক।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
এরা বলল, ‘হে শু‘আয়ব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষেরা যার ‘ইবাদত করত আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে বা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও ? তুমি তো অবশ্যই সহিষ্ণু, ভাল মানুষ!’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তারা বলল, ‘হে শু‘আইব, তোমার সালাত কি তোমাকে এই নির্দেশ প্রদান করে যে, আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের ইবাদাত করত, আমরা তাদের ত্যাগ করি? অথবা আমাদের সম্পদে আমরা ইচ্ছামত যা করি তাও (ত্যাগ করি?) তুমি তো বেশ সহনশীল সুবোধ’!আল-বায়ান
তারা বলল, ‘হে শু‘আয়ব! তোমার ইবাদত কি তোমাকে এই হুকুম দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষ যার ‘ইবাদাত করত আমরা তা পরিত্যাগ করি বা আমাদের ধন-সম্পদের ব্যাপারে আমাদের ইচ্ছে (মাফিক ব্যয় করা) বর্জন করি, তুমি তো দেখছি বড়ই ধৈর্যশীল, ভাল মানুষ।’তাইসিরুল
তারা বললে -- "হে শোআইব! তোমার নামায কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে আমাদের পিতৃপুরুষরা যার উপাসনা করত তা আমাদের বর্জন করতে হবে, অথবা আমাদের ধন-সম্পদ সন্বন্ধে আমাদের যা খুশি তা করতে পারব না? তুমি তো সত্যিসত্যি সহনশীল, সদাচারী!"মাওলানা জহুরুল হক
৯৬
এটি আসলে একটি তিরস্কারসূচক বাক্য। যে সমাজ আল্লাহকে ভুলে গেছে এবং ফাসেকী, অশ্লীলতা ও নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপের মধ্যে ডুবে গেছে এমন প্রত্যেকটি সমাজেই এ ভাবধারা আজো মূর্ত দেখা যাবে। যেহেতু নামায দ্বীনদারীর সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে সুস্পষ্ট চিহ্ন এবং ফাসেক ও ব্যভিচারী লোকেরা নামাযকে একটি ভয়ংকর বরং সবচেয়ে মারাত্মক রোগ মনে করে থাকে তাই এ ধরনের লোকদের সমাজে নামায ইবাদাতের পরিবর্তে রোগের চিহ্ন হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। নিজেদের মধ্যে কোন ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখলে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মনে এ অনুভূতি জাগে যে, এ ব্যক্তির ওপর “দ্বীনদারীর আক্রমণ” ঘটেছে। তারপর এরা দ্বীনদারীর এ বৈশিষ্ট্যও ভালোভাবে জানে যে, এ জিনিসটি যার মধ্যে সৃষ্টি হয়ে যায় সে কেবল নিজের সৎ ও পরিচ্ছন্ন কর্মধারার ওপরই সন্তুষ্ট থাকে না বরং অন্যদেরকেও সংশোধন করার চেষ্টা করে এবং বে-দ্বীনী ও নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সমালোচনা না করে সে স্থির থাকতে পারে না। তাই নামাযের বিরুদ্ধে এদের অস্থিরতা শুধুমাত্র এ আকারে দেখা দেয় না যে, এদের এক ভাই দ্বীনদারীর মধ্যে পরিবেষ্টিত হয়ে গেছে বরং এ সঙ্গে এদের মনে সন্দেহ জাগে যে, এবার খুব শিগগির চরিত্র, নৈতিকতা ও দ্বীনদারীর ওয়াজ-নসীহত শুরু হয়ে যাবে আর এ সাথে সমাজ জীবনের প্রত্যেকটি দিকে খুঁত বের করার একটি দীর্ঘ সিলসিলার সূচনা হবে। এ কারণেই এ ধরনের সমাজে নামায সবচেয়ে বেশী ভর্ৎসনা, তিরস্কার, নিন্দা ও সমালোচনার সম্মুখীন হয়। আর নামাযী সম্পর্কে পূর্বাহ্ণে যে ধরনের আশঙ্কা করা হয়েছিল কোন নামাযী যদি ঠিক সেই পর্যায়েই অসৎকাজের সমালোচনা ও ভালো কাজ করার উপদেশ দিতে শুরু করে দেয় তাহলে তো নামাযীকে এমনভাবে দোষারোপ করা শুরু হয়ে যায় যেন সে-ই এসব আপদের উৎস।
৯৭
এ বক্তব্যটি ইসলামের মোকাবিলায় জাহেলী মতবাদের পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরছে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, আল্লাহর বন্দেগী ছাড়া বাকি অন্যান্য যাবতীয় পদ্ধতিই ভুল। এগুলো অনুসরণ করা উচিত নয়। কারণ অন্য কোন পদ্ধতির পক্ষে বুদ্ধি, জ্ঞান ও আসমানী কিতাবসমূহে কোন যুক্তি-প্রমাণ নেই। আর তাছাড়া শুধুমাত্র একটি সীমিত ধর্মীয় গণ্ডীর মধ্যে আল্লাহর বন্দেগী হওয়া উচিত নয় বরং তামাদ্দুনিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা জীবনের সকল বিভাগেই হওয়া উচিত। কারণ দুনিয়ায় মানুষের কাছে যা কিছু আছে সব আল্লাহর মালিকানাধীন। আল্লাহর ইচ্ছার গণ্ডী ভেদ করে স্বাধীনভাবে কোন একটি জিনিসও মানুষ ব্যবহার করার অধিকার রাখে না। এর মোকাবিলায় জাহেলী মতবাদ হচ্ছে, বাপ-দাদা থেকে যে পদ্ধতি চলে আসছে মানুষের তারই অনুসারী হওয়া উচিত। এর অনুসরণের জন্য এছাড়া আর অতিরিক্ত কোন যুক্তি প্রমাণের প্রয়োজন নেই যে, এটা বাপ-দাদাদের পদ্ধতি। তাছাড়া শুধুমাত্র পূজা-অর্চনার সাথে দ্বীন ও ধর্মের সম্পর্ক রয়েছে। আর আমাদের জীবনের সাধারণ পার্থিব বিষয়াবলীর ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা দরকার, যেভাবে ইচ্ছা আমরা সেভাবে কাজ করতে পারি।
এ থেকে একথাও আন্দাজ করা যেতে পারে যে, জীবনকে ধর্মীয় ও পার্থিব এ দু’ভাগে ভাগ করার চিন্তা আজকের কোন নতুন চিন্তা নয় বরং আজ থেকে তিন সাড়ে তিন হাজার বছর আগে হযরত শো’আয়েব আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ও এ বিভক্তির ওপর ঠিক তেমনিই জোর দিয়েছিল যেমন আজকের যুগে পাশ্চাত্যবাসীরা এবং তাদের পাচ্য দেশীয় শাগরিদবৃন্দ জোর দিচ্ছেন। এটা আসলে কোন “নতুন আলো” বা “প্রগতি” নয় যা “মানসিক উন্নয়নে”র কারণে মানুষ আজ লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। বরং এটা সেই একই পুরাতন অন্ধকার ও পশ্চাৎপদ চিন্তা যা হাজার হাজার বছর আগের জাহেলিয়াতের মধ্যেও আজকের মতো একই আকারে বিরাজমান ছিল। এর সাথে ইসলামের সংঘাত আজকের নয়, অনেক পুরাতন।
এটা হচ্ছে পুঁজিবাদী মানসিকতা যে, আমার হস্তগত সম্পদে আমার একচ্ছত্র অধিকার। কাজেই তাতে আমার যা-ইচ্ছা তাই করার এখতিয়ার রয়েছে। এতে কারও বাধা দেওয়ার কোনও হক নেই। এর বিপরীতে কুরআন মাজীদের ইরশাদ হল, অর্থ-সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তাআলার। অবশ্য তিনি নিজ অনুগ্রহে মানুষকে তাতে সাময়িক মালিকানা দান করেছেন (দেখুন সূরা ইয়াসীন ৩৬ : ৭১)। সুতরাং এ মালিকানায় নিজ ইচ্ছামত বিধি-নিষেধ আরোপ করার (দ্র. সূরা কাসাস ২৮ : ৭৭) এবং যেখানে ভালো মনে করেন ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার তাঁর রয়েছে (সূরা নূর ২৪ : ৩৩)। আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় এজন্য, যাতে প্রত্যেকে নিজ অর্থ-সম্পদের আয়-ব্যয় সুষ্ঠু-সঠিক পন্থায় সম্পন্ন করে। ফলে আর্থ-সামাজিক জীবনে প্রত্যেকে সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে। কেউ কারও প্রতি জুলুম করতে পারবে না এবং সকলের মধ্যে ইনসাফের সাথে অর্থ-সম্পদ বণ্টিত হবে। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য দ্র. (মূলঃ) হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কৃত ‘ইসলামের অর্থ-বণ্টন ব্যবস্থা’।
৮৭. তারা বলল, হে শু'আইব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যার ইবাদাত করত আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও?(১) তুমি তো বেশ সহিষ্ণু, সুবোধ!
(১) এত কিছু শোনার পরেও তার কওমের লোকেরা পূর্ববর্তী বর্বর পাপিষ্ঠদের ন্যায় একই জবাব দিল। তারা নবীর আহবানকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর নবীকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে বললঃ আপনার নামায কি আপনাকে শিখায় যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পুজা ছেড়ে দেই, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যার পুজা করে আসছে। আর আমাদের ধন-সম্পদকে নিজেদের ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারী না থাকি? কোনটা হালাল কোনটা হারাম তা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে করে সব কাজ করতে হবে? শু'আইব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সারাদেশে প্রসিদ্ধ ছিল যে, তিনি অধিকাংশ সময় নামায ও নফল এবাদতে মগ্ন থাকেন। (কুরতুবী) তাই তারা তার মূল্যবান নীতি বাক্যসমূহকে বিদ্রপ করে বলতো- আপনার নামায কি আপনাকে এসব কথাবার্তা শিক্ষা দিচ্ছে? হাসান বসরী বলেন, অবশ্যই তার সালাত তাকে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্যের ইবাদত করতে নিষেধ করছে। (ইবন কাসীর)
তাদের এসব মন্তব্য দ্বারা বুঝা যায় যে, এরা দ্বীনকে শুধু কতিপয় আচার-আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করতো। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ধর্মকে কোন দখল দিত না। তারা মনে করত, প্রত্যেকে নিজ নিজ ধন-সম্পদ যেমন খুশী তেমন ভোগ দখল করতে পারে, এ ক্ষেত্রে কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা ধর্মের কাজ নয়। (মুহাম্মাদ আল-মাক্কী: আত-তাইসীর ফী আহাদীসিত তাফসীর ৩/১৩৯) সুফিয়ান আস-সাওরী বলেন, তারা এটা বলেছিল যাকাত দেয়া থেকে বিরত থাকতে। (ইবন কাসীর)
এ থেকে একথাও আন্দাজ করা যেতে পারে যে, জীবনকে ধর্মীয় ও পার্থিব এ দু’ভাগে ভাগ করার চিন্তা আজকের কোন নতুন চিন্তা নয় বরং আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে শু'আইব আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ও এ বিভক্তির উপর ঠিক তেমনিই জোর দিয়েছিল যেমন আজকের যুগে পাশ্চাত্যবাসীরা এবং তাদের প্রাচ্যদেশীয় শিষ্যবৃন্দ জোর দিচ্ছেন।
(৮৭) তারা বলল, ‘হে শুআইব! তোমার ধর্মনিষ্ঠা(1) কি তোমাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্য বর্জন করি, যাদের উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষরা করে আসছে? অথবা আমাদের নিজেদের মালে নিজেদের ইচ্ছানুসারে আচরণ বর্জন করি।(2) তুমি তো বড় সহিষ্ণু, সদাচারী! (3)
(1) صلوةٌ শব্দের অর্থ হল, ইবাদত, ধর্মনিষ্ঠা অথবা তেলাঅত।
(2) কোন কোন মুফাসসিরের নিকট এর অর্থ যাকাত ও সাদকা, সকল আসমানী কিতাবে তার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর আদেশকৃত যাকাত বের করা, আল্লাহর অবাধ্যদের উপর বড় কঠিন হয় এবং তারা ভাবে যে, যেখানে আমরা নিজ পরিশ্রম ও ক্ষমতাবলে সম্পদ উপার্জন করি, সেখানে তা খরচ করা বা না করাতে আমাদের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে কেন? এবং তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বের করার জন্য আমাদেরকে কেন বাধ্য করা হবে? অনুরূপ ইনকাম ও ব্যবসা ইত্যাদিতে হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধতার নিষেধাজ্ঞাও এ সকল লোকদের উপর বড় কষ্টকর হয়। সম্ভবত ওজনে ও পরিমাপে কম দেওয়া থেকে নিষেধ করাকেও তারা নিজ সম্পদের ব্যাপারে অনুচিত হস্তক্ষেপ ভেবেছে এবং এই শব্দে তা অস্বীকার করেছে। এর উভয় ভাবার্থই সঠিক।
(3) শুআইব (আঃ)-কে তারা বিদ্রূপ স্বরূপ উক্ত ব্যাক্য বলেছিল।