ইযক-লা লাহূ রব্বুহূ আছলিম ক-লা আছলামতু লি রব্বিল ‘আ-লামীন।উচ্চারণ
তার অবস্থা ছিল এই যে, যখন তার রব তাকে বললো, “মুসলিম হয়ে যাও।” ১৩০ তখনই সে বলে উঠলো, “আমি বিশ্ব-জাহানের প্রভুর ‘মুসলিম’ হয়ে গেলাম।” তাফহীমুল কুরআন
যখন তাঁর প্রতিপালক তাঁকে বললেন, ‘আনুগত্যে নতশির হও’, #%৯২%# তখন সে (সঙ্গে সঙ্গে) বলল, আমি রাব্বূল আলামীনের (প্রতিটি হুকুমের) সামনে মাথা নত করলাম।মুফতী তাকী উসমানী
যখন তার রাব্ব তাকে বলেছিলেনঃ তুমি আনুগত্য স্বীকার কর; সে বলেছিল: আমি বিশ্বজগতের রবের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম।মুজিবুর রহমান
স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেনঃ অনুগত হও। সে বললঃ আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ কর’, সে বলেছিল, ‘জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
যখন তার রব তাকে বললেন, ‘তুমি আত্মসমর্পণ কর’। সে বলল, ‘আমি সকল সৃষ্টির রবের কাছে নিজকে সমর্পণ করলাম’।আল-বায়ান
তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি আত্মসমর্পণ কর’, উত্তরে সে বলল, ‘আমি সারা জগতের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম’।তাইসিরুল
স্মরণ করো! তাঁর প্রভু তাঁকে বললেন -- “ইসলাম গ্রহণ করো!” তিনি বললেন -- “আমি সমস্ত সৃষ্টজগতের প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করছি।”মাওলানা জহুরুল হক
১৩০
মুসলিম কাকে বলে? যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগত হয়, আল্লাহকে নিজের মালিক, প্রভু ও মাবুদ হিসেবে মেনে নেয়, নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দেয় এবং দুনিয়ায় আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করে সে-ই মুসলিম। এ আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতির নাম ‘ইসলাম’। মানবজাতির সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে যেসব নবী এসেছেন এটিই ছিল তাঁদের সবার দ্বীন ও জীবন বিধান।
কুরআন মাজীদ এস্থলে ‘আনুগত্যে নতশির হওয়া’-এর জন্য ‘ইসলাম’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘ইসলাম’-এর শাব্দিক অর্থ মাথা নত করা এবং কারও পরিপূর্ণ আনুগত্য করা। আমাদের দীনের নামও ইসলাম। এ নাম এজন্যই রাখা হয়েছে যে, এর দাবী হল- মানুষ তার প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহ তাআলারই অনুগত হয়ে থাকবে। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যেহেতু শুরু থেকেই মুমিন ছিলেন, তাই এস্থলে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য তাঁকে ঈমান আনার আদেশ দেওয়া ছিল না। আর এ কারণেই ‘ইসলাম গ্রহণ কর’ তরজমা করা হয়নি। অবশ্য পরবর্তী আয়াতে সন্তানদের উদ্দেশ্যে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের যে অসিয়ত উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে ‘ইসলাম’-এর ভেতর উভয় মর্মই দাখিল; সত্য দীনের প্রতি ঈমান আনাও এবং তারপর আল্লাহ তাআলার হুকুমের প্রতি আনুগত্যও। তাই সেখানে ‘মুসলিম’ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে।
১৩১. স্মরণ করুন, যখন তার রব তাকে বলেছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ করুন’, তিনি বলেছিলেন, আমি সৃষ্টিকুলের রব-এর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।(১)
(১) আল্লাহ্ তা'আলার أسْلِم আনুগত্য গ্রহণ কর’ সম্বোধনের উত্তরে সম্বোধনেরই ভঙ্গিতে أسْلَمْتُ لَكَ ‘আমি আপনার আনুগত্য গ্রহণ করলাম’ বলা যেত। কিন্তু খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম এ ভঙ্গি ত্যাগ করে বলেছেন, (أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ) অর্থাৎ আমি সৃষ্টিকুলের রবের আনুগত্য অবলম্বন করলাম। কারণ, প্রথমতঃ এতে শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রেখে আল্লাহর স্থানোপযোগী গুণকীর্তনও করা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এ বিষয়টিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, আমি আনুগত্য অবলম্বন করে কারও প্রতি অনুগ্রহ করিনি; বরং এমনটা করাই ছিল আমার প্রতি অপরিহার্য। কারণ, তিনি রাব্বুল আলামীন বা সৃষ্টিকুলের রব। তার আনুগত্য না করে বিশ্ব তথা বিশ্ববাসীর কোনই গত্যন্তর নেই। যে আনুগত্য অবলম্বন করে, সে স্বীয় কর্তব্য পালন করে লাভবান হয়। এতে আরও জানা যায় যে, মিল্লাতে ইবরাহিমীর মৌলনীতির যথার্থ স্বরূপও এক ‘ইসলাম’ শব্দের মধ্যেই নিহিত- যার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দ্বীনের সারমর্মও তাই। ঐসব পরীক্ষার সারমর্মও তাই, যাতে উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর এ দোস্ত মর্যাদার উচ্চতর শিখরে পৌছেছেন। ইসলাম তথা আল্লাহর আনুগত্যের খাতিরেই সমগ্র সৃষ্টি। এরই জন্য নবীগণ প্রেরিত হয়েছিলেন এবং আসমানী গ্রন্থসমূহ নাযিল করা হয়েছে। এতে আরও বোঝা যায় যে, ইসলামই সমস্ত নবীর অভিন্ন দ্বীন এবং ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু। আদম 'আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত আগমনকারী সমস্ত রাসূল ইসলামের দিকেই মানুষকে আহবান করেছেন এবং তারা এরই ভিত্তিতে নিজ নিজ উম্মতকে পরিচালনা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে মিল্লাতে ইবরাহিমীর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তিনি তার দ্বীনের নাম ‘ইসলাম’ রেখেছিলেন এবং স্বীয় উম্মতকে ‘উম্মতে মুসলিমাহ’ নামে অভিহিত করেছিলেন।
তিনি দো'আ প্রসংগে বলেছিলেনঃ “হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে (ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমুস সালাম) মুসলিম (অর্থাৎ আনুগত্যশীল) করুন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকেও একদলকে আনুগত্যকারী করুন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের প্রতি অসীয়ত প্রসংগে বলেছিলেনঃ তোমরা মুসলিম হওয়া ছাড়া অন্য কোন দ্বীনের উপর মৃত্যু বরণ করো না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর পর তারই প্রস্তাবক্রমে মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত এ বিশেষ নাম লাভ করেছে। ফলে এ উম্মতের নাম হয়েছে মুসলিম। এ উম্মতের দ্বীনও ‘মিল্লাতে ইসলামিয়াহ’ নামে অভিহিত।
কুরআনে বলা হয়েছেঃ “এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীন। তিনিই ইতিপূর্বে তোমাদের ‘মুসলিম’ নামকরণ করেছেন এবং এতেও (অর্থাৎ কুরআনেও) এ নামই রাখা হয়েছে”। (সূরা আল-হাজ্বঃ ৭৮) দ্বীনের কথা বলতে গিয়ে ইয়াহুদী, নাসারা ও আরব-এর মুশরিকরাও বলে যে, তারা ইবরাহিমী দ্বীনের অনুসারী, কিন্তু এসব তাদের ভুল ধারণা অথবা মিথ্যা দাবী মাত্র। বাস্তবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত দ্বীনই ইবরাহিমী দ্বীনের অনুরূপ। মোটকথা, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যত রাসূল আগমন করেছেন এবং যত আসমানী গ্রন্থ ও শরীআত নাযিল হয়েছে, সে সবগুলোর প্রাণ হচ্ছে ইসলাম তথা আল্লাহর আনুগত্য।
এ আনুগত্যের সারমর্ম হলো রিপুর কামনা-বাসনার বিপরীতে আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য এবং স্বেচ্ছাচারিতার অনুসরণ ত্যাগ করে হিদায়াতের অনুসরণ। পরিতাপের বিষয়, আজ ইসলামের নাম উচ্চারণকারী লক্ষ লক্ষ মুসলিম এ সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ। তারা দ্বীনের নামেও স্বীয় কামনা-বাসনারই অনুসরণ করতে চায়। কুরআন ও হাদীসের এমন ব্যাখ্যাই তাদের কাছে পছন্দ, যা তাদের কামনা-বাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা শরীআতের পরিচ্ছদকে টেনে বাহ্যদৃষ্টিতে শরীআতের অনুসরণ করছে বলেই মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা কামনারই অনুসরণ। গাফেলরা জানে না যে, এসব অপকৌশল ও অপব্যাখ্যার দ্বারা সৃষ্টিকে প্রতারিত করা গেলেও স্রষ্টাকে ধোঁকা দেয়া সম্ভব নয়; তার জ্ঞান প্রতিটি অণু-পরমাণুতে পরিব্যপ্ত। তিনি মনের গোপন ইচ্ছা ও ভেদ পর্যন্ত দেখেন ও জানেন। তার কাছে খাঁটি আনুগত্য ছাড়া কোন কিছুই গ্রহণীয় নয়। (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন)
১৩১। তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ কর।’ সে বলেছিল, ‘বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আত্ম-সমর্পণ করলাম।’ (1)
(1) এই মহত্ত্ব ও মর্যাদা তিনি লাভ করেছিলেন, যেহেতু তিনি দৃষ্টান্তহীন অনুসরণ ও আনুগত্যের নমুনা পেশ করেছিলেন।