۞وَإِلَىٰ عَادٍ أَخَاهُمۡ هُودٗاۚ قَالَ يَٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَٰهٍ غَيۡرُهُۥٓۚ أَفَلَا تَتَّقُونَ

ওয়া ইলা-‘আ-দিন আখা-হুম হূদান ক-লা ইয়া-কাওমি‘বুদুল্লা-হা মা-লাকুম মিন ইলাহিন গাইরুহূ আফালা-তাত্তাকূন।উচ্চারণ

আর 'আদ' (জাতি) র ৫১ কাছে আমি পাঠাই তাদের ভাই হূদকে। সে বলেঃ “হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। এরপরও কি তোমরা ভুল পথে চলার ব্যাপারে সাবধান হবে না?” তাফহীমুল কুরআন

আর আদ জাতির নিকট আমি তাদের ভাই হুদকে (পাঠাই)। #%৪২%# সে বলল, হে আমার কওম! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নেই। তবুও কি তোমরা (আল্লাহকে) ভয় করবে না?মুফতী তাকী উসমানী

‘আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হুদকে (নাবী রূপে) পাঠিয়েছিলাম। সে বললঃ হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন মা‘বূদ নেই, তোমরা কি সাবধান হবেনা?মুজিবুর রহমান

আদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আদ জাতির নিকট আমি এদের ভাই হ‚দকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ র ‘ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নেই। তোমরা কি সাবধান হবে না ?’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর (প্রেরণ করলাম) আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হূদকে। সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তোমরা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না’?আল-বায়ান

আর ‘আদ জাতির কাছে (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই হূদকে। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই, তোমরা কি তাক্বওয়া অবলম্বন করবে না?’তাইসিরুল

আর 'আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হূদকে। তিনি বললেন -- "হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্‌র উপাসনা করো, তোমাদের জন্য তিনি ছাড়া অন্য উপাস্য নেই। তোমরা কি তবে ধর্মভীরুতা অবলন্বন করবে না?"মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৫১

'আদ' ছিল আরবের প্রাচীনতম জাতি। আরবের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এদের কাহিনী প্রচলিত ছিল। ছোট ছোট শিশুরাও তাদের নাম জানতো। তাদের অতীত কালের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও গৌরব গাঁথা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছিল। তারপর দুনিয়ার বুক থেকে তাদের নাম-নিশানা মুছে যাওয়াটাও প্রবাদের রূপ নিয়েছিল। আদ জাতির এ বিপুল পরিচিতির কারণেই আরবী ভাষায় প্রত্যেকটি প্রাচীন ও পুরাতন জিনিসের জন্য 'আদি' শব্দ ব্যবহার করা হয়। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষকে 'আদিয়াত' বলা হয়। যে জমির মালিক বেঁচে নেই এবং চাষাবাদকারী না থাকার কারণে যে জমি অনাবাদ পড়ে থাকে তাকে 'আদি-উল-আরদ' বলা হয়। প্রাচীন আরবী কবিতায় আমরা এ জাতির নামের ব্যবহার দেখি প্রচুর পরিমাণে। আরবের বংশধারা বিশেষজ্ঞগণও নিজেদের দেশের বিলুপ্ত জাতিদের মধ্যে সর্বপ্রথম এ জাতিটির নামোচ্চারণ করে থাকেন। হাদীসে বলা হয়েছে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বনু যহল ইবনে শাইবান গোত্রের এক ব্যক্তি আসেন। তিনি আদ জাতির এলাকার অধিবাসী ছিলেন। তিনি প্রাচীনকাল থেকে তাদের এলাকার লোকদের মধ্যে আদজাতি সম্পর্কে যেসব কিংবদন্তী চলে আসছে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনান।

কুরআনের বর্ণনা মতে এ জাতিটির আবাসস্থল ছিল 'আহকাফ' এলাকা। এ এলাকাটি হিজায, ইয়ামন ও ইয়ামামার মধ্যবর্তী 'রাবয়ুল খালী'র দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। এখন থেকে অগ্রসর হয়ে তারা ইয়ামনের পশ্চিম সমুদ্রোপকূল এবং ওমান ও হাজরা মাউত থেকে ইরাক পর্যন্ত নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিস্তৃত করেছিল। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এ জাতিটির নিদর্শনাবলী দুনিয়ার বুক থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু দক্ষিণ আরবের কোথাও কোথাও এখনো কিছু পুরাতন ধ্বংস স্তূপ দেখা যায়। সেগুলোকে আদ জাতির নিদর্শন মনে করা হয়ে থাকে। হাজরা মাউতে এক জায়গায় হযরত হূদ আলাইহিস সালামের নামে একটি কবরও পরিচিত লাভ করেছে। ১৮৩৭ খৃস্টাব্দে James R.Wellested নামক একজন ইংরেজ নৌ-সেনাপতি 'হিসনে গুরাবে' একটি পুরাতন ফলকের সন্ধান লাভ করেন। এতে হযরত হূদ আলাইহিস সালামের উল্লেখ রয়েছে। এ ফলকে উৎকীর্ণ লিপি থেকে পরিষ্কার জানা যায়, এটি হযরত হূদের শরীয়াতের অনুসারীদের লেখা ফলক। (আল আহকাফ দেখুন)।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

আদ ছিল আরবদের প্রাথমিক যুগের একটি জাতি। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আনুমানিক দু’ হাজার বছর পূর্বে ইয়ামানের হাজরামাওত অঞ্চলে তাদের বসবাস ছিল। দৈহিক শক্তি ও পাথর-ছেদনশিল্পে তাদের বিশেষ খ্যাতি ছিল। কালক্রমে তারা মূর্তি বানিয়ে তার পূজা শুরু করে দেয়। দৈহিক শক্তির কারণেও তারা মদমত্ত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে হযরত হুদ আলাইহিস সালামকে তাদের কাছে নবী বানিয়ে পাঠানো হল। তিনি অত্যন্ত দরদের সাথে নিজ কওমকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এবং তাদের সামনে তাওহীদের শিক্ষা পেশ করে আল্লাহ তাআলার শোকরগোজার বান্দা হওয়ার আহ্বান জানালেন। কিন্তু সৎ স্বভাবের সামান্য কিছু লোক ছাড়া বাকি সকলে তার কথা প্রত্যাখ্যান করল। এ অবস্থায় প্রথমে তাদেরকে খরায় আক্রান্ত করা হল। হযরত হুদ আলাইহিস সালাম তাদেরকে বললেন, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তোমাদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে। এখনও যদি তোমরা তোমাদের অসৎ কর্ম ছেড়ে দাও, তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করবেন (১১ : ৫২)। কিন্তু কওমের উপর এ কথার কোন আছর হল না। উত্তরোত্তর তারা কুফর ও শিরকের পথেই এগিয়ে চলল। পরিশেষে তাদের প্রতি প্রচণ্ড ঝড়-ঝঞ্ঝা পাঠানো হল। এ আযাব একাধারে আট দিন তাদের উপর প্রবাহিত থাকল এবং তাতে গোটা কওম ধ্বংস হয়ে গেল। এ জাতির ঘটনা আলোচ্য সূরা ছাড়াও সূরা হুদ (১১ : ৫০-৮৯), সূরা মুমিনুন (২৩ : ৩২), সূরা শুআরা (২৬ : ১২৪), সূরা হা-মীম-সাজদা (৪১ : ১৫), সূরা আহকাফ (৪৬ : ২১), সূরা কামার (৫৪ : ১৮), সূরা হাক্কা (৬৯ : ৬) ও সূরা ফাজরে (৮৯ : ৬) বর্ণিত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ এসব সূরায় তাদের ঘটনার বিভিন্ন দিক বিস্তারিত আসবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৬৫. আর আদ(১) জাতির নিকট তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। তোমরা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না?(২)

(১) ‘আদ’ ছিল আরবের প্রাচীনতম জাতি। ‘আদ’ প্রকৃতপক্ষে নূহ আলাইহিস সালামের পুত্র সামের বংশধরের এক ব্যক্তির নাম। তার বংশধর ও গোটা সম্প্রদায় ‘আদ’ নামে খ্যাত হয়ে গেছে। কুরআনুল কারীমে আদের সাথে কোথাও ‘আদে উলা’ বা ‘প্রথম আদ’ এবং কোথাও আদ ইরাম শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, ‘আদ’ সম্প্রদায়কে ‘ইরাম’ও বলা হয় এবং প্রথম আদের বিপরীতে কোন দ্বিতীয় ‘আদও রয়েছে। এ সম্পর্কে তাফসীরবিদ ও ইতিহাসবিদদের উক্তি বিভিন্ন রূপ। অধিক প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, দ্বিতীয় আদ হলো সামূদ জাতি। এ বক্তব্যের সারমর্ম এই যে, আদ ও সামূদ উভয়ই ইরামের দুশাখা। এক শাখাকে প্রথম আদ এবং অপর শাখাকে সামূদ অথবা দ্বিতীয় আদ বলা হয়। ইরাম শব্দটি আদ ও সামূদ উভয়ের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। (তাফসীর ইবন কাসীর; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

কুরআনের বর্ণনা মতে এ জাতিটির আবাসস্থল ছিল ‘আহকাফ’ এলাকা। এ এলাকাটি হিজায, ইয়ামন ও ইয়ামামার মধ্যবর্তী ‘রুবয়ুল খালী’র দক্ষিন পশ্চিমে অবস্থিত। এখান থেকে অগ্রসর হয়ে তারা ইয়ামানের পশ্চিম সমুদ্রোপকূল এবং ওমান ও হাদরামাউত থেকে ইরাক পর্যন্ত নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিস্তৃত করেছিল। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এ জাতিটির নিদর্শণাবলী দুনিয়ার বুক থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু দক্ষিন আরবের কোথাও কোথাও এখনো কিছু পুরাতন ধ্বংসস্তুপ দেখা যায়। সেগুলোকে আদ জাতির নিদর্শন মনে করা হয়ে থাকে।

(২) আল্লাহ্ তা'আলাই তাদের হেদায়াতের জন্য হুদ আলাইহিস সালামকে নবীরূপে প্রেরণ করেন। তিনি আদ জাতিকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে একত্ববাদের অনুসরণ করতে এবং অত্যাচার উৎপীড়ন ত্যাগ করে ন্যায় ও সুবিচারের পথ ধরতে আদেশ করেন। কিন্তু তারা স্বীয় ধনৈশ্বর্যের মোহে মত্ত হয়ে তার আদেশ অমান্য করে। তারা শক্তিমত্ত হয়ে বলে বসলঃ “আমাদের চাইতে শক্তিশালী কে?” (সূরা ফুসসিলাত: ১৫) এর পরিণতিতে তাদের উপর প্রথম আযাব নাযিল হয় এবং তিন বছর পর্যন্ত উপর্যুপরি বৃষ্টি বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত্র শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যায়। বাগান জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। কিন্তু এতদস্বত্ত্বেও তারা শির্ক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করল না। অতঃপর আট দিন সাত রাত্রি পর্যন্ত তাদের উপর প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আযাব সওয়ার হয়।

ফলে তাদের অবশিষ্ট বাগবাগিচা ও দালানকোঠা মাটির সাথে মিশে যায়। মানুষ ও জীব-জন্তু শূন্যে উড়তে থাকে। অতঃপর উপুড় হয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। এভাবে আদ জাতিকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়। তাই বলা হয়েছেঃ “আমরা মিথ্যারোপকারীদের বংশ কেটে দিয়েছি”। হুদ 'আলাইহিস সালামের আদেশ অমান্য করা এবং কুফর ও শির্কে লিপ্ত থাকার কারণে সঙ্গীদেরকে আল্লাহ রক্ষা করেন। হুদ আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীরা আযাব থেকে মুক্তি পেলেন। (বিস্তারিত ঘটনা দেখুন, ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর)

আদ জাতির উপর ঘূর্ণিঝড়ের আকারে আযাব আসা কুরআনুল কারীমে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত রয়েছে। সুরা আল-মুমিনুনে নূহ আলাইহিস সালামের কাহিনী উল্লেখ করার পর বলা হয়েছেঃ “অতঃপর আমি তাদের পরে আরো একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি।” বাহ্যতঃ এরাই হচ্ছে ‘আদ’ জাতি। পরে এ সম্প্রদায়ের কাজকর্ম ও কথাবার্তা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছেঃ একটি বিকট শব্দ তাদেরকে পাকড়াও করল। এ আয়াতের ভিত্তিতে কোন কোন তাফসীরবিদ বলেনঃ “আদ জাতির উপর বিকট ধরনের শব্দের আযাব এসেছিল। কিন্তু উভয় মতের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। এটা সম্ভব যে, বিকট শব্দ ও ঘূর্ণিঝড় উভয়টিই হয়েছিল। (তাফসীর ইবন কাসীর ৫/৪৭৪; সূরা আল-মুমিনুনের ৪১ নং আয়াতের তাফসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৬৫) আ’দ জাতির নিকট ওদের ভ্রাতা হূদকে পাঠিয়েছিলাম।(1) সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর। তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই, তোমরা কি সাবধান হবে না?’

(1) এই আ’দ সম্প্রদায় হল প্রথম আ’দ। যাদের বাসস্থান ইয়ামানের বালুময় পাহাড়ে ছিল। আর শক্তি-সামর্থ্যে তারা ছিল অতুলনীয়। তাদের নিকট হূদ (আঃ) নবী হয়ে এসেছিলেন, যিনি তাদেরই মধ্যেকার একজন ছিলেন।