লাকাদ আরছালনা-নূহান ইলা-কাওমিহী ফাক-লা ইয়া-কাওমি‘বুদুল্লা-হা মা-লাকুম মিন ইলা-হিন গাইরুহূ ইন্নীআখা-ফু‘আলাইকুম ‘আযা-বা ইয়াওমিন ‘আজীম।উচ্চারণ
নুহকে আমি তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠাই। ৪৭ সে বলেঃ “হে আমার স্বগোত্রীয় ভাইয়েরা! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। ৪৮ আমি তোমাদের জন্য একটি ভয়াবহ দিনের আযাবের আশঙ্কা করছি।” তাফহীমুল কুরআন
আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। #%৪০%# সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়ের লোক! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নেই। নিশ্চয়ই আমি আশংকা করি, তোমাদের উপর এক মহা দিনের শাস্তি আপতিত হবে।মুফতী তাকী উসমানী
আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদেরকে বলেছিলঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা শুধু আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই, আমি তোমাদের প্রতি এক গুরুতর দিনের শাস্তির আশংকা করছি।মুজিবুর রহমান
নিশ্চয় আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে একটি মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আমি তো নূহ্কে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট আর সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্ র ‘ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নেই। আমি তোমাদের জন্যে মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আমি তো নূহকে তার কওমের নিকট প্রেরণ করেছি। অতঃপর সে বলেছে, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই। নিশ্চয় আমি তোমাদের মহাদিনের আযাবের ভয় করছি’।আল-বায়ান
আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নাই।’ (তোমরা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে) মহাদিনে আমি তোমাদের জন্য শাস্তির আশঙ্কা করি।তাইসিরুল
আমরা অবশ্যই নূহকে পাঠিয়েছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি তখন বলেছিলেন -- "হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র উপাসনা করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য উপাস্য নেই। নিঃসন্দেহ আমি তোমাদের জন্য আশংকা করছি এক ভয়ংকর দিনের শাস্তি।"মাওলানা জহুরুল হক
৪৭
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায় থেকে এ ঐতিহাসিক বিবরণের সূচনা করা হযেছে। কারণ কুরআনের দৃষ্টিতে হযরত আদম আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের যে সৎ ও সুস্থ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে যান, তাতে প্রথম বিকৃতি দেখা দেয় হযরত নূহের যুগে এবং এরই সংশোধন ও এ জীবন ব্যবস্থাকে আবার সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য মহান আল্লাহ হযরত নূহকে পাঠান।
কুরআনের ইঙ্গিত ও বাইবেলের সুস্পষ্ট বর্ণনার পর একথা আজ নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত হয়ে গেছে যে, বর্তমান ইরাকেই হযরত নূহের সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। বেবিলনের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের অভ্যন্তরে বাইবেলের চাইতেও যে প্রাচীন লিপি পাওয়া গেছে, তা থেকেও এর সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআনে ও তাওরাতে যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, ঐ প্রাচীন লিপিতেও তদ্রুপ এক কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ঘটনাটি মুসেল-এর আশেপাশে ঘটেছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কুর্দিস্তান ও আর্মেনিয়া এলাকায় প্রাচীনকাল থেকে বংশ পরম্পরায় যেসব কিংবদন্তী চলে আসছে তা থেকেও জানা যায় যে, প্লাবনের পর হযরত নূহের নৌকা এ এলাকার কোন এক স্থানে থেমেছিল। আজো মুসেলের উত্তরে ইবনে উমর দ্বীপের আশেপাশে এবং আর্মেনিয়া সীমান্তে “আরারাত” পাহাড়ের আশেপাশে নূহ আলাইহিস সালামের বিভিন্ন নিদর্শন চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। ‘নখচীওয়ান’ শহরের অধিবাসীদের মধ্যে আজো এ প্রবাদ প্রচলিত যে, হযরত নুহ এ শহরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
নূহের প্লাবনের মত প্রায় একই ধরনের ঘটনার কথা গ্রীক, মিসর, ভারত ও চীনের প্রাচীন সাহিত্যেও পাওয়া যায়। এছাড়াও বার্মা, মালয়েশিয়া, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, অষ্ট্রেলিয়া, নিউগিনি এবং আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায়ও এ একই ধরনের কিংবদন্তী প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, এ ঘটনাটি এমন এক সময়ের সাথে সম্পর্কিত যখন সমগ্র মানব জাতির দুনিয়ার একই এলাকায় অবস্থান করতো, তারপর সেখান থেকে তাদের বংশধরেরা দুনিয়ার চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই সকল জাতি তাদের উন্মেষকালীন ইতিহাসে একটি সর্বব্যাপী প্লাবনের ঘটনা নির্দেশ করেছে। অবশ্য কালের আবর্তনে এর যথার্থ বিস্তারিত তথ্যাদি তারা বিস্মৃত হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকে নিজের চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী আসল ঘটনার গায়ে প্রলেপ লাগিয়ে এক একটা বিরাট কল্পকাহিনী তৈরী করে নিয়েছে।
৪৮
কুরআন মজীদের এ স্থানে ও অন্যান্য স্থানে হযরত নূহ ও তাঁর সম্প্রদায়ের যে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এ সম্প্রদায়টি আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করতো না, তাঁর সম্পর্কে নিরেট অজ্ঞও ছিল না এবং তাঁর ইবাদাত করতেও তারা অস্বীকার করতো না। বরং তারা প্রকৃতপক্ষে যে গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল সেটি ছিল শিরক। অর্থাৎ তারা আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বে অন্যান্য সত্তাকেও শরীক করতো এবং ইবাদাত লাভের অধিকারে তাদেরকে তাঁর সাথে হিস্সাদার মনে করতো। তারপর এ মৌলিক গোমরাহী থেকে এ জাতির মধ্যে অসংখ্য ত্রুটি ও দুষ্কৃতির জন্ম নেয়। যেসব মনগড়া মাবুদকে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের অংশীদার গণ্য করা হয়েছিল, তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য জাতির মধ্যে একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্ম হয়। এ শ্রেণীটি সমস্ত ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসে। জাতিকে তারা উচ্চ শ্রেণী ও নিম্ন শ্রণীতে বিভক্ত করে। সমাজ জীবন জুলুম ও বিপর্যয়ে ভরপুর করে তোলে। নৈতিক উচ্ছৃংখলতা, চারিত্রিক নৈরাজ্য ও পাপাচারের মাধ্যমে মানবতার মূলে কুঠারাঘাত করে। এ অবস্থার পরিবর্তন করার জন্য হযরত নূহ আলাইহিস সালাম অত্যন্ত সবর, সহিষ্ণুতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে দীর্ঘকাল প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালান। কিন্তু সাধারণ মানুষকে তারা নিজেদের প্রতারনা জালে এমনভাবে আবদ্ধ করে নেয় যার ফলে সংশোধনের কোন কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। অবশেষে হযরত নূহ (আ) আল্লাহর কাছে এ মর্মে দোয়া করেনঃ "হে আল্লাহ! এ কাফেরদের একজনকেও পৃথিবীর বুকে জীবিত ছেড়ে দিয়ো না। কারণ এদের কাউকে জীবিত ছেড়ে দিলে এরা তোমার বান্দাদেরকে গোমরাহ করতে থাকবে এবং এদের বংশে যাদেরই জন্ম হবে তারাই হবে অসৎকর্মশীল, দুশ্চরিত্র ও বিশ্বাসঘাতক।” (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সুরা হুদ ৩ রুকূ, সূরা শূআরা ৬ রুকূ ও সমগ্র সূরা নূহ)।
ইসরাঈলী বর্ণনা অনুযায়ী হযরত নূহ আলাইহিস সালাম হযরত আদম আলাইহিস সালামের ওফাতের এক হাজার বছরেরও কিছু বেশি কাল পর জন্মগ্রহণ করেন। বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কিরাম এ সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। তাদের দু’জনের মধ্যে ঠিক কত কালের ব্যবধান ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানার কোনও উপায় নেই। কুরআন মাজীদ দ্বারা জানা যায়, এ দীর্ঘ কাল পরিক্রমায় মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কওমও বিভিন্ন রকম মূর্তি গড়ে নিয়েছিল। সূরা নূহে তাদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আনকাবুতে (২৯ : ১৪) আছে, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে সাড়ে নয়শ’ বছর পর্যন্ত সত্যের পথে ডেকেছিলেন। তিনি সর্বপ্রকারেই তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। সামান্য সংখ্যক ভাগ্যবান সাথী তাঁর কথায় ঈমান এনেছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল গরীব শ্রেণীর লোক। কওমের বেশির ভাগ লোকই কুফরের পথ ধরে রাখে। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম অবিরত তাদেরকে আল্লাহ তাআলার আযাব সম্পর্কে ভয় দেখাতে থাকেন, কিন্তু কোনও মতেই যখন তারা মানল না, পরিশেষে তিনি বদদোয়া করলেন। ফলে তাদেরকে এক ভয়াল বন্যায় নিমজ্জিত করা হয়। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা ও তার কওমের উপর আপতিত বন্যা সম্পর্কে সূরা হুদ (১১ : ২৫-৪৯) ও সূরা নূহে (সূরা নং ৭১) বিস্তারিত বিবরণ আসবে। তাছাড়া সূরা মুমিনুন (২৩ : ২৩), সূরা শুআরা (২৬ : ১০৫) সূরা কামারেও (৫৪ : ৯) তাদের ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। অন্যান্য স্থানে তাদের কেবল বরাত দেওয়া হয়েছে।
৫৯. অবশ্যই আমরা নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের কাছে। অতঃপর তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।
(৫৯) অবশ্যই আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম এবং সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।’