ওটাইটিস মিডিয়া (মধ্যকর্ণের সংক্রমণ/প্রদাহ)

Otitis Media

সব রোগ

ভূমিকা

ওটাইটিস মিডিয়া মানে মধ্যকর্ণে (ইয়ারড্রামের পেছনের ছোট প্রকোষ্ঠে) সংক্রমণ বা প্রদাহ। ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কারণে তরল জমে ব্যথা, জ্বর ও শ্রবণ কমে যেতে পারে। এটি সাধারণ “কানের ময়লা” বা বাইরের কানের সংক্রমণ (ওটাইটিস এক্সটার্না) নয়।

প্রধান তিন রূপ: তীব্র ওটাইটিস মিডিয়া (AOM)—হঠাৎ ব্যথা/জ্বর; তরলসহ ওটাইটিস মিডিয়া (OME)—সংক্রমণ ছাড়াই তরল জমা; এবং দীর্ঘস্থায়ী/বারবার ওটাইটিস মিডিয়া (COM)—৩ মাসের বেশি বা বারবার হওয়া। শিশুদের ইউস্টেশিয়ান টিউব ছোট ও অনুভূমিক হওয়ায় ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশে শীত–বসন্তে সর্দি–কাশি, ঘনবসতি, দিবাযত্ন কেন্দ্র ও ধূমপানের ধোঁয়ায় শিশুদের কানের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। নিউমোকক্কাল/ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা ও বুকের দুধ খাওয়ানো ঝুঁকি কমায়। দেরি হলে শ্রবণক্ষতি, মাস্টয়েডাইটিস বা বিরল ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিস হতে পারে।

এই পাতা সাধারণ স্বাস্থ্য শিক্ষার জন্য; ব্যক্তিগত অ্যান্টিবায়োটিক বা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়। তীব্র কানের ব্যথা, পুঁজ/রক্ত নিঃসরণ বা উচ্চ জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসক/ইএনটি দেখান।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মধ্যকর্ণে তরল জমে প্রদাহ/সংক্রমণ—শিশুদের সবচেয়ে সাধারণ; প্রাপ্তবয়স্কেও হয়।

সর্দি–অ্যালার্জি ইউস্টেশিয়ান টিউব ব্লক করে তরল জমায়; ব্যাকটেরিয়া/ভাইরাস বাড়ে।

সময়মতো চিকিৎসায় বেশিরভাগ সারে; বারবার/দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রবণ ও স্পিচ ডেভেলপমেন্ট নজরদারি জরুরি।

  • ধরন: AOM (তীব্র), OME (তরল), COM (দীর্ঘস্থায়ী/বারবার)
  • সাধারণ কারণ: ব্যাকটেরিয়া (নিউমোককাস, হিমোফিলাস), ভাইরাস, ইউস্টেশিয়ান ব্লক
  • ঝুঁকি: ৫ বছরের নিচে শিশু, ধোঁয়া, ডে কেয়ার, অ্যালার্জি/অ্যাজমা, টিকাবিহীন
  • লক্ষণ: কানের ব্যথা, জ্বর, শ্রবণ কমে যাওয়া, নিঃসরণ, শিশুতে কান্না/কান টানা
  • নির্ণয়: ওটোস্কোপি, টিমপ্যানোমেট্রি, প্রয়োজনে অডিওমেট্রি/কালচার
  • চিকিৎসা: ব্যথা নিয়ন্ত্রণ; ব্যাকটেরিয়ালে অ্যান্টিবায়োটিক; দীর্ঘ তরলে টিউব সার্জারি
  • জটিলতা: শ্রবণক্ষতি, পারফোরেটেড ড্রাম, মাস্টয়েডাইটিস, বিরলে মেনিনজাইটিস

শরীরে কী ঘটে / কীভাবে তৈরি হয়

সর্দি বা অ্যালার্জিতে ইউস্টেশিয়ান টিউব ফুলে বন্ধ হয়—মধ্যকর্ণের তরল বেরোতে পারে না। স্থবির তরলে ব্যাকটেরিয়া/ভাইরাস বাড়ে; চাপ ও প্রদাহে ইয়ারড্রাম লালচে ও ব্যথা হয়। কখনো ড্রাম ফেটে পুঁজ বেরোয়।

OME-তে সংক্রমণ ছাড়াই তরল থাকে—শ্রবণ “বোতলবন্দি” মনে হয়। বারবার সংক্রমণে ক্ষতকলা/দীর্ঘস্থায়ী ছিদ্র ও স্থায়ী শ্রবণক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।

  • ইউস্টেশিয়ান ব্লক → তরল জমা
  • তরল + জীবাণু → তীব্র সংক্রমণ/ব্যথা
  • চাপ বাড়লে ইয়ারড্রাম ফেটে নিঃসরণ
  • বারবার/অচিকিৎসিত → দীর্ঘস্থায়ী ও শ্রবণক্ষতি

লক্ষণ ও উপসর্গ

লক্ষণ বয়স ও ধরন অনুযায়ী বদলায়; নিচেরগুলোর যেকোনোটি দেখলে মূল্যায়ন করুন:

  • কানের ব্যথা—শুয়ে বা স্পর্শে বাড়তে পারে
  • শ্রবণ কমে যাওয়া বা শব্দ আবছা মনে হওয়া
  • কান থেকে স্বচ্ছ/পুঁজযুক্ত তরল নিঃসরণ
  • জ্বর—বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে
  • শিশুতে অস্থিরতা, কান্না, ঘুম না হওয়া, কান টানা
  • ক্ষুধামন্দা—গিলতে অস্বস্তির জন্য
  • মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যের সমস্যা
  • কানে ভরা/চাপ অনুভূতি
  • সর্দি–কাশি বা অ্যালার্জির সঙ্গে শুরু
  • কানের পেছনে লালচে ফোলা (মাস্টয়েড সন্দেহ)
  • রক্তমিশ্রিত নিঃসরণ—ড্রাম ফেটে যেতে পারে
  • কথা শুনতে দেরি/শিশুর স্পিচ বিলম্ব (বারবার কেসে)

কারণ ও ঝুঁকির বিষয়

সংক্রমণ ও তরল জমার পেছনে সাধারণ কারণ ও ঝুঁকি:

  • ব্যাকটেরিয়া: স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়া, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি
  • ভাইরাস: সাধারণ সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, RSV
  • উপরের শ্বাসনালির সংক্রমণে ইউস্টেশিয়ান টিউব ব্লক
  • অ্যালার্জি (ধুলা, পরাগ, পোষা প্রাণী)—কনজেশন বাড়ায়
  • ধূমপানের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ
  • পারিবারিক ইতিহাস/জেনেটিক প্রবণতা
  • দুর্বল রোগপ্রতিরোধ (HIV, ক্যানসার থেরাপি ইত্যাদি)
  • পুষ্টিহীনতা; শিশুতে বুকের দুধ না পাওয়া
  • ডে কেয়ারে ঘন সংক্রমণের সংস্পর্শ
  • অ্যাজমা/সাইনুসাইটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ

রোগ নির্ণয় ও মূল্যায়ন

ইতিহাস ও কানের পরীক্ষাই প্রধান; প্রয়োজনে অতিরিক্ত পরীক্ষা:

  • লক্ষণের সময়কাল, সর্দি/ধোঁয়া/টিকার ইতিহাস জানা
  • ওটোস্কোপি—ইয়ারড্রাম লালচে, তরল, ছিদ্র দেখা
  • টিমপ্যানোমেট্রি—ড্রামের চলাচল ও তরল নির্ণয়
  • অডিওমেট্রি—শ্রবণক্ষতির মাত্রা
  • নিঃসরণ থাকলে কালচার—দীর্ঘস্থায়ী/প্রতিরোধী কেসে
  • গুরুতর/বারবার হলে সিটি—অ্যাবসেস/হাড়ের সংক্রমণ বাদ দিতে
  • অন্যান্য কারণ (ওটাইটিস এক্সটার্না, বিদেশী বস্তু) আলাদা করা

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা; নিজে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না:

  • ব্যথানাশক (প্যারাসিটামল/আইবুপ্রোফেন)—বয়স–ওজন অনুযায়ী নির্দেশে
  • উষ্ণ কম্প্রেস—অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে
  • ব্যাকটেরিয়াল AOM-এ অ্যামোক্সিসিলিন বা নির্দেশিত অ্যান্টিবায়োটিক
  • ভাইরালে অ্যান্টিবায়োটিক কাজে লাগে না—সহায়ক চিকিৎসাই মূল
  • প্রয়োজনে কানের ড্রপ—শুধু চিকিৎসকের নির্দেশে
  • দীর্ঘ তরল/COM-এ মাইরিংগোটমি ও টিমপ্যানোস্টমি টিউব
  • বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল; ধোঁয়া ও অ্যালার্জেন এড়ানো
  • শিশু/বয়স্কদের ডোজ ও ফলোআপ আলাদা—নির্দেশ মেনে চলুন

প্রতিরোধ, স্ব-যত্ন ও জীবনযাত্রা

সব অবস্থা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য নয়, তবে নিচের পদক্ষেপগুলো ঝুঁকি ও পুনরাবৃত্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে:

  • নিউমোকক্কাল ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা সময়মতো
  • হাত ধোয়া; সর্দি–কাশির সংস্পর্শ কমানো
  • শিশুকে ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা
  • সম্ভব হলে প্রথম ৬ মাস শুধু বুকের দুধ
  • অ্যালার্জি/অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • বারবার সংক্রমণে ইএনটি ফলোআপ ছাড়া না থাকা

সম্ভাব্য জটিলতা

উপেক্ষা করলে, দেরিতে চিকিৎসায় বা ভুল স্ব-ওষুধে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়তে পারে:

  • দীর্ঘস্থায়ী ওটাইটিস মিডিয়া ও স্থায়ী শ্রবণক্ষতি
  • শিশুর কথা বলার দেরি
  • ইয়ারড্রামের ছিদ্র/পারফোরেশন
  • মাস্টয়েডাইটিস (কানের পেছনের হাড়ে সংক্রমণ)
  • বিরলে মেনিনজাইটিস বা মস্তিষ্কের অ্যাবসেস
  • বারবার ব্যথা ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়া

কখন ডাক্তার বা জরুরি সেবা নেবেন

নিচের অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ বা জরুরি বিভাগে যাওয়া জরুরি—অপেক্ষা করে দেখার চেয়ে নিরাপদ দিকটি বেছে নিন:

  • তীব্র কানের ব্যথা যা সাধারণ ব্যথানাশকে কমে না
  • পুঁজ বা রক্তমিশ্রিত নিঃসরণ
  • উচ্চ জ্বর (প্রায় ≥৩৯°সে.) যা কয়েকদিন থাকে
  • চিকিৎসার পরও শ্রবণ না ফেরা
  • কানের পেছনে লালচে ফোলা/ব্যথা
  • শিশুতে অতিরিক্ত অস্থিরতা, বমি, ঘাড় শক্ত—জরুরি মূল্যায়ন

দৈনন্দিন জীবনে মানিয়ে নেওয়া

অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ করুন; লক্ষণ কমলেও মাঝপথে বন্ধ করবেন না। শিশুকে শুইয়ে দুধ খাওয়ানো এড়ান—তরল ইউস্টেশিয়ানে যেতে পারে।

বারবার সংক্রমণ হলে শ্রবণ পরীক্ষা ও স্পিচ মূল্যায়ন করুন। স্কুলে শোনা কঠিন হলে শিক্ষককে জানান।

ধোঁয়ামুক্ত ঘর, অ্যালার্জেন নিয়ন্ত্রণ ও টিকা আপডেট রাখুন। টিউব লাগালে সাঁতার/পানিতে কানের সুরক্ষা নির্দেশ মেনে চলুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ওটাইটিস মিডিয়া কি নিজে থেকে সারে?

কিছু ভাইরাল/মৃদু কেস নিজে কমতে পারে; ব্যাকটেরিয়াল বা তীব্র লক্ষণে চিকিৎসা দরকার। শিশুতে দেরি করবেন না।

অ্যান্টিবায়োটিক সবসময় লাগে?

না। ভাইরালে লাগে না। ব্যাকটেরিয়াল সন্দেহ, বয়স ও তীব্রতা দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

শ্রবণ স্থায়ী নষ্ট হয় কি?

অধিকাংশ তীব্র কেসে শ্রবণ ফিরে আসে। অচিকিৎসিত/বারবার সংক্রমণে স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।

কানের টিউব কখন লাগে?

দীর্ঘস্থায়ী তরল, বারবার সংক্রমণ বা শ্রবণ/স্পিচ প্রভাব থাকলে বিবেচনা হয়—ইএনটি মূল্যায়ন করে।

বাংলাদেশে কীভাবে ঝুঁকি কমাব?

টিকা, ধোঁয়া এড়ানো, হাত ধোয়া, বুকের দুধ ও সর্দি–কাশির দ্রুত যত্ন গুরুত্বপূর্ণ।

কান টানলেই কি সংক্রমণ?

শিশুরা অস্বস্তিতে কান টানে; নিশ্চিত হতে ওটোস্কোপি দরকার—অনুমানে অ্যান্টিবায়োটিক নয়।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা

এই লেখাটি সাধারণ শিক্ষার জন্য; এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ নয়।

তীব্র ব্যথা, জ্বর বা নিঃসরণ হলে দ্রুত চিকিৎসক/ইএনটি দেখান।

আগে ধরা পড়লে জটিলতা কম ও শ্রবণ রক্ষা সহজ।