কেরাটাইটিস (কর্নিয়ার প্রদাহ): কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

Keratitis

সব রোগ

ভূমিকা

কেরাটাইটিস মানে চোখের কর্নিয়ায় প্রদাহ। কর্নিয়া আলো ভাঁজ করে দৃষ্টির স্বচ্ছতা রাখে—এতে প্রদাহ হলে ব্যথা, লালচে ভাব, আলোর সংবেদনশীলতা ও ঝাপসা দৃষ্টি হতে পারে। কারণ সংক্রমণজাত (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, অ্যামিবা) বা অসংক্রামক (শুষ্কতা, আঘাত, ইউভি, অটোইমিউন) হতে পারে।

কন্টাক্ট লেন্সের অপরিচ্ছন্ন ব্যবহার বিশেষ ঝুঁকি—সিউডোমোনাসসহ ব্যাকটেরিয়াল কেরাটাইটিস দ্রুত খারাপ হতে পারে। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস পুনরাবৃত্ত প্রদাহ করতে পারে। বাংলাদেশে ধুলা, কৃষিকাজের উদ্ভিদ-আঘাত ও পুকুর/নদীর পানিতে লেন্স ব্যবহার ছত্রাক/অ্যাক্যানথামিবা ঝুঁকি বাড়ায়।

দেরি হলে কর্নিয়ায় ঘা, স্কার ও স্থায়ী দৃষ্টিক্ষতি হতে পারে। চোখের ব্যথায় ঘরোয়া স্টেরয়েড ড্রপ নিজে শুরু করা বিপজ্জনক—বিশেষ করে সংক্রমণে।

এই পাতা সাধারণ স্বাস্থ্য শিক্ষার জন্য; এটি ব্যক্তিগত চক্ষু পরীক্ষা বা ড্রপের নির্দেশনা নয়। তীব্র ব্যথা বা দৃষ্টি কমে গেলে অবিলম্বে চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখান।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

কেরাটাইটিস সংক্রামক বা অসংক্রামক হতে পারে। সংক্রামক রূপে দ্রুত আলসার ও পারফোরেশন ঝুঁকি থাকে; অসংক্রামকে শুষ্ক চোখ, অ্যালার্জি বা অটোইমিউন প্রদাহ ভূমিকা রাখে।

বয়স্ক, ডায়াবেটিস, রোগপ্রতিরোধ দুর্বল ও আগের চোখের আঘাত/সার্জারি থাকলে ঝুঁকি বেশি। নারীদের হরমোনজনিত শুষ্কতায় কিছু রূপ বেশি হতে পারে।

স্লিট-ল্যাম্প ও ফ্লুরোসিন স্টেইন দিয়ে দ্রুত মূল্যায়ন জরুরি; সন্দেহে কালচার নিয়ে কারণ অনুযায়ী ড্রপ শুরু হয়।

  • কর্নিয়ার প্রদাহ—দৃষ্টির জন্য জরুরি অবস্থা হতে পারে
  • কারণ: ব্যাকটেরিয়া/ভাইরাস/ছত্রাক/অ্যামিবা বা আঘাত/শুষ্কতা
  • লক্ষণ: ব্যথা, লালচে ভাব, ফটোফোবিয়া, ঝাপসা দৃষ্টি
  • কন্টাক্ট লেন্স হাইজিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
  • স্লিট-ল্যাম্প, স্টেইন, কালচার দিয়ে নির্ণয়
  • কারণভিত্তিক অ্যান্টিবায়োটিক/অ্যান্টিভাইরাল/অ্যান্টিফাঙ্গাল
  • দেরিতে স্কার ও দৃষ্টিহানি

শরীরে কী ঘটে / কীভাবে তৈরি হয়

কর্নিয়ার এপিথেলিয়াম ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্রমিত হলে প্রদাহ কোষ জমে স্বচ্ছতা কমে। ব্যাকটেরিয়া/ছত্রাক আলসার গভীর করতে পারে; হারপিসে পুনরাবৃত্ত এপিথেলিয়াল/স্ট্রোমাল প্রদাহ হয়।

অ্যাক্যানথামিবা দূষিত পানি ও লেন্সের সঙ্গে যুক্ত—চিকিৎসা জটিল ও দীর্ঘ। অটোইমিউন রোগে কর্নিয়ার পরিধিতে প্রদাহ হতে পারে।

  • এপিথেলিয়াম ভাঙা → জীবাণু/প্রদাহ ঢোকে
  • স্ট্রোমাল প্রদাহ → ঘা/স্কার
  • লেন্স + দূষিত পানি = উচ্চ ঝুঁকি
  • হারপিস = পুনরাবৃত্তি সম্ভব
  • অচিকিৎসায় পারফোরেশন/দৃষ্টিহানি

লক্ষণ ও উপসর্গ

কারণভেদে তীব্রতা আলাদা; নিচের লক্ষণ সাধারণ:

  • চোখে তীব্র বা মৃদু ব্যথা
  • লালচে ভাব ও ফোলা
  • ঝাপসা বা বিকৃত দৃষ্টি
  • আলো সহ্য না হওয়া (ফটোফোবিয়া)
  • অতিরিক্ত জল পড়া বা স্রাব
  • চোখে কিছু গেছে এমন অনুভূতি
  • হলুদ/সবুজ স্রাব (ব্যাকটেরিয়াল সন্দেহ)
  • পলকে ব্যথা বা চোখ বন্ধ রাখতে চাওয়া
  • দৃষ্টি হঠাৎ কমে যাওয়া
  • কন্টাক্ট লেন্স পরতে না পারা
  • বারবার একই চোখে প্রদাহ (হারপিস)
  • মাথাব্যথা বা চোখের চারপাশে চাপ
  • গুরুতর ক্ষেত্রে কর্নিয়ায় সাদা দাগ/আলসার দেখা

কারণ ও ঝুঁকির বিষয়

একাধিক কারণ একসঙ্গে থাকতে পারে:

  • ব্যাকটেরিয়া (সিউডোমোনাস, স্ট্যাফ আউরিয়াস)—লেন্সজনিত
  • হারপিস সিমপ্লেক্স ও অন্যান্য ভাইরাস
  • ছত্রাক—উদ্ভিদ আঘাত/রোগপ্রতিরোধ দুর্বল
  • অ্যাক্যানথামিবা—দূষিত পানি ও লেন্স
  • রাসায়নিক/ইউভি/ধুলায় জ্বালা
  • শুষ্ক চোখ ও দীর্ঘ স্ক্রিন টাইম
  • অটোইমিউন রোগ (রিউমাটয়েড, লুপাস)
  • ডায়াবেটিস, ইমিউনোসপ্রেশন
  • আগের চোখের আঘাত বা সার্জারি
  • অপরিচ্ছন্ন হাত/লেন্স হাইজিন

রোগ নির্ণয় ও মূল্যায়ন

চক্ষু বিশেষজ্ঞের স্লিট-ল্যাম্প মূল্যায়নই কেন্দ্রীয়:

  • ইতিহাস: লেন্স, আঘাত, সাঁতার/পুকুর, হারপিস
  • স্লিট-ল্যাম্প পরীক্ষা
  • ফ্লুরোসিন স্টেইন—ঘা/আলসার দেখা
  • স্রাব/কর্নিয়াল স্ক্র্যাপিং কালচার
  • প্রয়োজনে ওসিটি বা অন্য ইমেজিং
  • কনজাংটিভাইটিস/ইউভেইটিস/আবরেশন বাদ দেওয়া
  • সহগামী সিস্টেমিক রোগ মূল্যায়ন

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

কারণ অনুযায়ী জরুরি ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা; নিজে ড্রপ বাঁধাই করবেন না:

  • ব্যাকটেরিয়াল: ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক চোখের ড্রপ
  • ভাইরাল (হারপিস): অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ/ড্রপ
  • ছত্রাক: অ্যান্টিফাঙ্গাল ড্রপ বা ওরাল ওষুধ
  • অ্যাক্যানথামিবা: বিশেষ অ্যান্টি-অ্যামিবিক চিকিৎসা
  • ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও সাইক্লোপ্লেজিক (নির্দেশমতো)
  • গুরুতর ক্ষেত্রে কর্নিয়াল ট্রান্সপ্লান্ট
  • লেন্স সাময়িক বন্ধ; উষ্ণ কম্প্রেস সহায়ক হতে পারে
  • ভিটামিন এ/সি/ই ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাদ্য সহায়ক
  • শিশু/বয়স্কে ডোজ ও মনিটরিং আলাদা

প্রতিরোধ, স্ব-যত্ন ও জীবনযাত্রা

সব অবস্থা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য নয়, তবে নিচের পদক্ষেপগুলো ঝুঁকি ও পুনরাবৃত্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে:

  • লেন্স ধরার আগে হাত ধোয়া; সাঁতার/জাকুজিতে লেন্স না পরা
  • লেন্স কেস ও সলিউশন নিয়মিত পরিবর্তন
  • ইউভি সানগ্লাস; ধুলা/রাসায়নিক থেকে চোখ রক্ষা
  • নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা
  • শুষ্ক চোখে কৃত্রিম অশ্রু (প্রিজারভেটিভ-ফ্রি প্রয়োজনে)
  • চোখ ঘষা বন্ধ
  • টিকা ও সাধারণ সংক্রমণ প্রতিরোধ মেনে চলা

সম্ভাব্য জটিলতা

উপেক্ষা করলে, দেরিতে চিকিৎসায় বা ভুল স্ব-ওষুধে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়তে পারে:

  • কর্নিয়াল স্কার ও স্থায়ী ঝাপসা দৃষ্টি
  • কর্নিয়াল আলসার/পারফোরেশন
  • দৃষ্টিহানি বা অন্ধত্বের ঝুঁকি
  • পুনরাবৃত্ত সংক্রমণ
  • দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা ও ফটোফোবিয়া
  • সার্জারি/গ্রাফটের প্রয়োজন

কখন ডাক্তার বা জরুরি সেবা নেবেন

নিচের অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ বা জরুরি বিভাগে যাওয়া জরুরি—অপেক্ষা করে দেখার চেয়ে নিরাপদ দিকটি বেছে নিন:

  • তীব্র চোখের ব্যথা না কমলে
  • হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া
  • অবিরাম লালচে ভাব/ফোলা
  • হলুদ বা সবুজ স্রাব
  • ঘরোয়া চিকিৎসায় অবস্থা খারাপ
  • লেন্স ব্যবহারকারীর নতুন ব্যথা/ঝাপসা

দৈনন্দিন জীবনে মানিয়ে নেওয়া

ড্রপের সময়সূচি মিনিট/ঘণ্টা হিসেবে মেনে চলুন; মাঝপথে থামবেন না। সংক্রমণ সেরে যাওয়া পর্যন্ত লেন্স এড়ান।

উজ্জ্বল আলোয় সানগ্লাস ব্যবহার করুন; স্ক্রিন বিরতি নিন। অন্যের তোয়ালে/আই ড্রপ শেয়ার করবেন না।

হারপিস ইতিহাস থাকলে সতর্ক লক্ষণ জেনে রাখুন এবং দ্রুত ফলোআপ রাখুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

কেরাটাইটিস কি সংক্রামক?

হারপিসজনিত রূপ সক্রিয় সময়ে ছড়াতে পারে। ব্যাকটেরিয়াল/ফাঙ্গাল সাধারণত ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি কম ছড়ায়, তবে হাইজিন জরুরি।

দৃষ্টি চলে যেতে পারে কি?

অচিকিৎসিত/দেরিতে স্কার ও দৃষ্টিহানি হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসায় অনেকের ভালো ফল হয়।

কন্টাক্ট লেন্স কি ফেলে দিতে হবে?

লক্ষণ থাকলে অবিলম্বে বন্ধ করুন এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নিয়ে আবার শুরু করবেন না।

স্টেরয়েড ড্রপ নিজে ব্যবহার করা যায়?

না—সংক্রমণে ক্ষতি বাড়তে পারে। শুধু চিকিৎসকের নির্দেশে।

শিশুদেরও হয় কি?

হ্যাঁ—আঘাত বা সংক্রমণে। লক্ষণ দেখলে দ্রুত দেখান।

কখন জরুরি?

তীব্র ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টি কমা, পুঁজযুক্ত স্রাব বা দ্রুত অবনতি হলে অবিলম্বে জরুরি চক্ষু সেবা নিন।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা

এই লেখাটি সাধারণ শিক্ষার জন্য; এটি ব্যক্তিগত চক্ষু চিকিৎসার বিকল্প নয়।

কর্নিয়ার প্রদাহ দেরি সহ্য করে না—আগাম মূল্যায়ন দৃষ্টি বাঁচায়।

লেন্স হাইজিন ও চোখের সুরক্ষা প্রতিদিনের অভ্যাস করুন।