1 Answers

ইসলামের সকল বিধিবিধান, আনুষ্ঠানিকইবাদত, সামাজিক বিধান, পারিবারিকআচরণ সংক্রান্ত প্রত্যাদেশ, রাষ্ট্রীয় ওঅর্থনৈতিক নীতিমালা, এসকল কিছুআবর্তিত ও অর্থপূর্ণ হয় একটি মূলধারণাকে কেন্দ্র করে, আরতা হচ্ছে মানুষের রব, স্রষ্টা এবং মানুষেরজীবনের প্রতিটি দিকেরবিষয়াদি সম্পর্কে বিধানদাতা মহানআল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার তাওহীদেরধারণা।বর্তমানে বাঙালী মুসলিমসমাজে তাওহীদের ধারণা শুধুইএকটি থিওরি বলা চলে। শিক্ষিত সমাজেরদিকে তাকালে আমরা দেখতে পাইযে স্কুল পর্যায়ে ছোটবেলা থেকেইছাত্রছাত্রীরা তোতাপাখির মততাওহীদের সংজ্ঞা মুখস্থ করতে থাকে।সাধারণতঃ দেখা যায় যে প্রতি ক্লাসেইমোটামুটি বই মুখস্থে’র এই করুণপ্রক্রিয়া চলতে থাকে।অপরদিকে অশিক্ষিত মানুষেরতো সে সংজ্ঞাও জানা নেই। তবে এইউভয় ক্ষেত্রেই যে ব্যাপারটি অনুপস্থিত,তা হচ্ছে জীবনে তাওহীদের বাস্তবিকপ্রয়োগ। বরং একটু লক্ষ্য করলেইদেখা যাবে যে সমাজেরসর্বস্তরে শিরকের (যা তাওহীদেওবিপরীত) ছড়াছড়ি।এবং প্রকৃতপক্ষে সমাজের অধিকাংশমানুষই কোন না কোন ভাবে শিরকেরসাথে জড়িয়ে আছে। সমাজে ধার্মিকহিসেবে পরিচিত লোকেরাও এর ব্যতিক্রমনয়। যে তাওহীদের ধারণা মুসলিমসমাজদেহেরপ্রতিটি রন্ধ্রে স্বতঃ প্রবাহমান থাকারকথা ছিল, যে তাওহীদেওধারণা প্রতিটি কাজে একজন মুসলিমের মূলপ্রেরণা এবং দিকনির্দেশনা হিসেবেনিয়ন্ত্রণ করবে জীবনের আদ্যপান্ত, সেইতাওহীদ আজ পরিণত হয়েছে শুধুই বহুলউচ্চারিত একটি বাক্যে:“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” । তাওহীদেরসারমর্ম এই বাক্যটি নিয়ত উচ্চারিত হয়এমন সব মানুষের জিহ্বায়, যারা শিরকেরগভীরে ডুবে আছে দিনরাত। সমাজের এইঅবস্থা সত্যিই আশংকাজনক, কেননা এরপরিণতি ভয়াবহ, এর পরিণতিতে পৃথিবীরজীবনে চরম দুর্দশা নেমে আসবে,তবে সেই দুর্দশা কিছুই নয়, প্রকৃতদুর্দশা সামনে আসছে, আরতা হচ্ছে আখিরাতে অর্থাৎ মৃত্যুরপরবর্তী জীবনে আল্লাহর শাস্তি,জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত অগ্নি। শিরক, এরচূড়ান্ত পর্যায়ে মানুষের সকল ভালকাজকে বিনষ্ট করে দেয়, এরচেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে যে,একজন মানুষ সারাজীবন ইবাদত করে গেলএবং মনে করল যে আখিরাতের জন্য অনেকসঞ্চয় হয়েছে, কিন্তু শিরকেরকারণে সে আখিরাতে পুনরুত্থিত হলপুণ্যের শূন্য থলে নিয়ে। শুধু তাই নয়শিরকের অপরাধে তাকে নিক্ষেপ করা হলজাহান্নামের আগুনে।তাওহীদকে যদি সঠিকভাবে উপলব্ধি করা না যায়, তবে মানুষসালাত, সাওম, যাকাত ও হাজ্জ হয়ত করবে,কিন্তু পাশাপাশি সে আল্লাহরসাথে শিরক করে চলবে অবিরত, আল্লাহসুবহানাহুওয়া তা’আলা কুরআনে পাকে তাই বলেন:“তাদের অধিকাংশইআল্লাহকে বিশ্বাস করার দাবীদার,কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তারা মুশরিক।” (সূরা্ ইউসুফ,১২ : ১০৬)তাওহীদের সুষ্ঠু ধারণা না থাকায় বহুমানুষের ইবাদত শুধুই পৌত্তলিক আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। শিরকেরভয়াবহতা উপলব্ধি করা যায় নিম্নোক্তআয়াতের মাধ্যমে:“আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরীক করারঅপরাধ অবশ্যই ক্ষমা করবেন না,কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা এরচেয়ে কম (অপরাধ)ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আন নিসা, ৪ :৪৮)এখানে আমরা তাওহীদসম্পর্কে শিখতে চেষ্টা করব, কেবলতত্ত্বীয় জ্ঞানার্জন নয়,বরং আমরা জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে তাওহীদের গুরুত্ব এবং এরসংশ্লিষ্টতার দিকে আলোকপাতকরতে চেষ্টা করব। আর আমাদের এইজ্ঞানার্জন তখনই সার্থক হয়ে উঠবে যখনআমরা আমাদের জ্ঞানকে প্রয়োগ করববাস্তব ক্ষেত্রে। আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’আলা আমাদেরকে সেই তওফীকদান করুন, “ওয়া মা তাওফিকী ইল্লাহবিল্লাহ্।”তাওহীদ শব্দের অর্থ:একত্রীকরণ, এর উৎপত্তি “ওয়াহাদা” শব্দহতে, যার অর্থ হচ্ছে একে পরিণতকরা কিংবা সংগঠিত করা। আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রসঙ্গে তাওহীদ(তাওহীদুল্লাহ) শব্দের অর্থ: মানুষের সকলকর্মে,যা কিনা প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবেআল্লাহ পাকের সাথে জড়িত, আল্লাহরএকত্বের ধারণা বজায় রাখা।তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ:রুবুবিয়্যাহ্ শব্দের উৎস হচ্ছে রব্ব শব্দটি,যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলারএকটি নাম। রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলারতাওহীদকে স্বীকারকরা মানে হচ্ছে নিম্নোক্তবিষয়গুলো স্বীকার করে নেয়া:আল্লাহ সবসময়ই অস্তিত্বশীল ছিলেন,এবং আর কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না,অত:পর তিনি সবকিছুকে অস্তিত্ব দানকরলেন।তিনিই তাঁর সৃষ্টির লালন-পালনকরে থাকেন, তবে সৃষ্টিকে তাঁরপ্রয়োজন নেই, তিনি কোনব্যাপারে সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নন।তিনিই সমগ্র সৃষ্টিজগৎএবং বিশ্বচরাচরের একমাত্র রব,সার্বভৌমত্ব তাঁরই এবং তাঁর এইসার্বভৌমত্ব খর্ব হবার ঝুঁকি নেই।তিনি সকল ক্ষমতার উৎস, তিনি অনুমোদননা করলে কোন একটি ঘটনাও সংঘটিতহতে পারে না।রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’আলার একত্বের ধারণা নিম্নোক্তআয়াতগুলোতে পাওয়া যায়:“আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন,এবং সকল কিছুই তাঁর ওপরনির্ভরশীল।” (সূরা আয যুমার, ৩৯ :৬২)“আল্লাহ তোমাদেরএবং তোমরা যা কিছু কর, তারস্রষ্টা।” (সূরা আস সাফ্ফাত, ৩৭ : ৯৬)জীবনের প্রতিটি পদে তাওহীদ আররুবুবিয়্যাহ্র গুরুত্ব:আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয় সুখ-আনন্দ, নয়ত দুঃখ ও বেদনায় পূর্ণ।প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য কল্যাণকিংবা ক্ষতি বয়ে আনে।আমরা মুসলিমরা এই হাসি এবং কান্নায়ভরা জীবনপথে চলি একটি উদ্দেশ্যকেসামনে রেখে, তা হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’আলার ইবাদতের মাধ্যমে তাঁরজান্নাতে প্রবেশ করা। কেননা আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:“আমি জ্বিন ও মানুষকে শুধুই আমারইবাদত (দাসত্বের) জন্যসৃষ্টি করেছি।” (সূরা আয যারিয়াত,৫১ : ৫৬)সাধারণতঃ মানুষ আনন্দেরমুহূর্তে উচ্ছ্বসিত হয়, দুঃখের সময়সে আফসোস করে তার দুর্ভাগ্যের জন্য।কিন্তু আল্লাহ পাক যাকে তাওহীদেরজ্ঞান দান করেন, সে জানে:“আর কোন বিপদ আল্লাহরঅনুমতি ছাড়া আপতিত হয়না।” (সূরা আত তাগাবুন, ৬৪ : ১১)সে আরও জানে:“জেনে রাখো যদি গোটামানবজাতিও তোমাকে সাহায্যকরতে উদ্যত হয়, তারা ততটুকুইকরতে সমর্থ হবে যা আল্লাহইতিমধ্যেই তোমার জন্যলিখে রেখেছেন।তেমনি যদি গোটা মানবজাতিতোমার কোন ক্ষতিসাধন করার জন্যএকত্রিত হয়, তারা তোমারক্ষতি হিসেবে ততটুকুইকরতে পারবে যা আল্লাহ আগেইতোমার জন্য লিখে রেখেছেন।” (ইব্ন্আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস)ফলে সে বুঝতে পারে যে যদিও কারওমাধ্যমেই তার কোন ক্ষতি হয়েছে, কিন্তুসেটা আল্লাহ্রই সিদ্ধান্ত। কেন? কারণআল্লাহ ক্ষতিরদ্বারা মানুষকে পরীক্ষা করে দেখতে চানযে সে ধৈর্য্য ধারণ করে কিনা:“নিশ্চয়ই আমরা তোমাদেরকে ভয়,ক্ষুধার যন্ত্রণা, সম্পদ ও জীবনেরএবং ফসলের ক্ষতিরদ্বারা পরীক্ষা করব, অতএবযারা ধৈর্য্যশীল, তাদের সুসংবাদদাও।” (সূরা আল বাকারাহ, ২ : ১৫৫)সবরকারীদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ্পাক বলেছেন:“যারা সবরকারী, তারাই তাদেরপুরস্কার পায় অগণিত।” (সূরা আযযুমার, ৩৯ : ১০)আনাস (রা) এর রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ্(সা) বলেছেন:কিয়ামতের দিন ইনসাফেরদাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে।দাতাগণ আসলে তাদের দান খয়রাতওজন করে সে হিসাবে পূর্ণ সওয়াবদান করা হবে। এমনিভাবে নামায,হাজ্জ্ব ইত্যাদি ইবাদতকারীদেরইবাদত মেপে তাদেরকে প্রতিদানদেয়া হবে। অতঃপর বিপদে-আপদে সবরকারীরা আগমনকরলে তাদের জন্য কোন ওজন ও মাপহবে না, বরং তাদেরকে অপরিমিত ওঅগণিত সওয়াব দেওয়া হবে।কেননা আল্লাহ পাক বলেছেন:“যারা সবরকারী, তারাই তাদেরপুরস্কার পায় অগণিত।” (সূরা আযযুমার, ৩৯ : ১০) ফলে যাদের পার্থিবজীবন সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে অতিবাহিতহয়েছে, তারা বাসনা প্রকাশকরবে – হায়, দুনিয়াতে আমাদেরদেহ কাঁচিরসাহায্যে কাটা হলে (ভাল হত) আজআমরাও সবরের এমনি প্রতিদানপেতাম!ইমাম মালিক (রহঃ) এ আয়াতে “সাবিরুন”এর অর্থ নিয়েছেন,যারা দুনিয়াতে বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টে সবর করে। কারও মতে এর অর্থপাপকাজ থেকে সংযমকারী।আবার আল্লাহ পাকের নিয়ন্ত্রণেরবাইরে কিছু ঘটে না, তাওহীদী এ ধারণারফলে মানুষ কষ্টের অবস্থাতেও আল্লাহরসিদ্ধান্তের ওপর আস্থা স্থাপনকরে স্বস্তি লাভ করে, কারণ সে জানে:“হতে পারে তোমরা এমনকিছুকে অপছন্দ করছযা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের জন্যকল্যাণকর অথবা এমন কিছুকে পছন্দকরছ যা ক্ষতিকর, কিন্তু আল্লাহজানেন (কোনটি তোমার জন্য উত্তম), এবং তোমরা জান না।”(সূরা আল বাকারাহ, ২ : ২১৬)এভাবে তাওহীদের এইধারণা মানুষকে শেখায় যে সে যেনসাধ্যমত চেষ্টা করার পর, ফলাফলের উপরসন্তুষ্ট থাকে, কেননা এ ফলাফল আল্লাহপাকের ইচ্ছাধীন, এবং তিনি তাঁর বান্দারপ্রতি লক্ষ্য রেখেই তা নির্ধারণকরে থাকেন। তাই যদি দেখা যায়যে একজন মুসলিম তাঁর জীবন নিয়ে সন্তুষ্টনয়, অথবা সে নিজেরঅবস্থা নিয়ে মানুষের কাছে অভিযোগকরছে, তবে বুঝতে হবে তার তাওহীদেরচেতনায় গলদ রয়েছে, কিংবা সে একথা বুঝে উঠতে পারে নি, যে আল্লাহ পাকপ্রতিটি মুহূর্তে আমাদের প্রতি লক্ষ্যরাখছেন, এবং আমাদের জীবনেরখুঁটিনাটি পর্যন্ত তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যান না:“এবং আপনার পালনকর্তা ভুলে যাননা।” (সূরা মারইয়াম, ১৯ : ৬৪)‘দূর কি ঝামেলায় পড়লাম!’, ‘কেন যে আমারকপালে এইসব জুটে!’, ‘সকাল থেকেইকুফা লেগে আছে!’, ‘আমারই কেন সবসময়ঠকতে হয়!’ – এ জাতীয় বিরক্তিসূচকউক্তি মুসলিমদেরকে একেবারেই পরিহারকরতে হবে, কারণ হয় এসব উক্তির অর্থদাঁড়ায় যে জাগতিক ব্যাপারে আল্লাহরকোন ভূমিকা নেই, যা তাওহীদ আররুবুবিয়্যাহ্র ধারণার পরিপন্থী, আর নয়ত এসবউক্তির দ্বারা আল্লাহ্রপ্রতি বিরক্তি প্রকাশ করা হয়, যা একপ্রকার অকৃতজ্ঞতা এবং বিরাট ধৃষ্টতা।রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে শিরক্ আমাদেরসমাজে বিভিন্ন রূপে সংঘটিত হয়,

3712 views