1 Answers

আলিয়া মাদ্রাসার শাব্দিক অর্থ উচ্চ বিদ্যালয়, মানে হাই স্কুল। আর দাখিল এই আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থারই একটা স্তর, স্কুলের হিসেবে এস.এস.সি যাকে বলা হয়। শুরুতে এই শিক্ষাটা ইংরেজদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছিল। ১৭৮০ সালে বাংলার ফোর্ট উইলিয়ামের গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক কলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে আলিয়া মাদ্রাসা কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। এখন প্রশ্ন হলো ইংরেজরা কেন এই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করল? ইসলামী শিক্ষার বিকাশ ঘটানোর জন্য নিশ্চয় নয়। এর প্রমাণ হলো, ইংরেজরা নির্বিচারে অসংখ্য মুসলিম আলেম ও ধর্মীয় শিক্ষিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করেছে। উপরোক্ত প্রশ্নের পাওয়া যায় মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমীর হাদিসের তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ বইয়ে। তিনি নিজেও ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করেছিলেন। পরে আবার সেই মাদ্রাসারই শিক্ষক হয়েছিলেন। এজন্য বোধ হয়, তার বক্তব্যে প্রান্তিকতা থাকবে না। তিনি বলেছিলেন, ইংরেজরা ভারতবর্ষে আসার পরপরই এই ভূখণ্ডের ভাষা, আইন, ঐতিহ্য বদলে ফেলতে পারে নি। তাই তাদের অনুগত আরবি ফারসি শিক্ষিত কিছু আমলার প্রয়োজন ছিল, যাদেরকে কেরানি, দলিল-দস্তাবেজের অনুবাদক ইত্যাদি পদে নিযুক্ত করা যাবে। কিন্তু হ্যাঁ এই উদ্দেশ্য তাদের পূর্ণ হয়নি। কিছুদিন পরই আইন আদালতের ভাষা হিসেবে আরবি ফারসির বদলে ইংরেজি ভাষা স্থান পায়। ফলে আলিয়া মাদ্রাসা হতে ইংরেজরা তত্ত্বাবধান উঠিয়ে নেয়। এই স্বাধীনতা পাওয়ার ফলেই আলিয়া দ্বারা যেই ধর্মীয় ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল,তা হয়নি। আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পরবর্তীকালে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়। কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি, সৈয়দ আমিমুল ইহসান মুজাদ্দেদী, আবদুর রহমান কাশগরী, মৌলানা আকরম খাঁ, মওলানা মুহিউদ্দিন খান, অধ্যাপক আখতার ফারুক, অধ্যাপক আবদুল্লাহ, শওকত উসমান (প্রসঙ্গত বলে রাখি তার ক্রীতদাসের হাসি বইটার জন্ম কিন্তু এই মাদ্রাসা থেকে আরবি শেখার দরুনই দিতে পেরেছেন), জহির রায়হান, তার ভাই শহিদুল্লাহ কায়সার, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, অধ্যাপক আবুল হাশেম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখ ব্যক্তিগণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আলিয়া মাদ্রাসাকে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারী স্বীকৃতি প্রদান করেন। ফলে সেখানে আরবি ফারসির পাশাপাশি বাঙলা, ইংরেজিসহ অন্যান্য আধুনিক বিষয়াদি স্থান পায়। বর্তমানে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য আলিয়া মাদ্রাসাগুলো হলো, ১. মাদ্রাসায়ে আলিয়া, ঢাকা, ২. ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসা পিরোজপুর ৩. দারুন নাজাত কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ৪. তামিরুল মিল্লাত প্রভৃতি। এবার আসি কওমি মাদ্রাসার আলোচনায়। কওম শব্দের অর্থ জাতি। কওমী মানে জাতীয় শিক্ষা। মুসলমান জনসাধারণের ব্যপক সহযোগিতায় এই ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হত তাই এই নাম রাখা হয়েছে। বর্তমানে কওমী মাদ্রাসা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত বেসরকারি ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে দারুল উলুম দেওবন্দ নামে। কাসেম নানুতুবী রা, এর হাতে এর প্রতিষ্ঠা। এটা ছিল আলিয়া মাদ্রাসার সম্পূর্ণ বিপরীত মরুতে অবস্থিত। আলিয়া যেখানে প্রত্যক্ষ সরকারী সহযোগিতায় শুরু হয়েছিল, সেখানে কওমী ছিল সরকার-বিরোধিতার প্রতিভূ। ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল সে। এজন্যই কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন দেওবন্দের সন্তানরা। শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি, উবাইদুল্লাহ সিন্ধী, হোসাইন আহমেদ মাদানী এই সংগ্রামের কয়েকটি নাম। তাছাড়া শিক্ষা সিলেবাসেও এটি ছিল প্রাচীন শিক্ষাধারার অনুগামী। ১৬ বছরের এই শিক্ষায় পড়ানো হত কোরান, হাদিসের পাশাপাশি আরবি, ফারসি ভাষা, ইসলামী আইন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, প্রাচীন গ্রীক তর্কবিদ্যা (মানতেক), দর্শন (ফালসাফা) ইত্যাদি। এই প্রাচীন গ্রন্থগুলো বোঝা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। তাও আবার হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি (মাখতুতা) পড়ানো হত। ফলে এসব বিষয় অনেক উচ্চাঙ্গের হলেও সবাই এর দ্বারা উপকৃত হতে পারত না। খোদ কাসেম নানুতুবী রা. এর উর্দু গ্রন্থগুলোই অনেকেই বুঝতে পারে না। বুঝতে গেলে মাথা ঘুরায়। আর যারা মেধাবী ছিল, তাদের অফুরন্ত যোগ্যতা তৈরি হত। ভারতের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতার বাগানে এই শিক্ষাপদ্ধতির অনেক ফুল ফুটেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই দিকে শূন্যতা বিরাজ করেছিল। এক দুজন অবশ্য ছিল। কিন্তু ব্যাপকভাবে এই শিক্ষায় শিক্ষিতদের দ্বারা ভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ হয়েছে। যেমন রাজনীতি, সমাজ সংস্কার, কুসংস্কারের বিরোধিতা ইত্যাদি। এদিক থেকে হাফেজ্জি হুজুর, শামসুল হক ফরিদপুরী, ফখরে বাঙাল তাজুল ইসলাম অন্যতম। এখন কওমীর এই দৈন্যদশা বিদূরিত হচ্ছে। আশির দশকের আগে দু একজন আলেম সমাজ সচেতন ছিলেন মাত্র। ফরিদুদ্দিন মাসুদ, আবু তাহের মেসবাহের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে সৈয়দ আবুল হাসান নদবী রা. এসে আলেমদেরকে সমাজ ও মাতৃভাষা সম্পর্কে সচেতন হবার উদাত্ত আহ্বান জানান। এরপর থেকে কওমী মাদ্রাসায় মাতৃভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার হাত ধরে জাগরণ শুরু হয়। এখন অনেকেই সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার জগতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর ফলাফল দেখা দেবে। এই ধারাটার প্রতি বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের কোন ধারণা হয়তো নেই তবে হ্যাঁ প্রয়াত কবি আল মাহমুদ এদেরকে গুরুত্ব দিতেন। বর্তমানেও ফরহাদ মজহার, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ ও আসাদ চৌধুরী এই ধারার প্রতি আগ্রহ ও আশা প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ কওমী মাদ্রাসার মধ্যে আছে দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ, জামিয়া শরয়িয়া মালিবাগ ইত্যাদি।

4360 views