1 Answers
ওয়াক্ফ মানে মূল সম্পত্তি আবদ্ধ রেখে এর উপকার আল্লাহ্র রাস্তায় দান করা। এখানে মূল দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে যে সম্পত্তি মূলকে আবদ্ধ রেখে এর দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়; যেমন- ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ক্ষেতখামার ইত্যাদি। এখানে উপকার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- সে মূল সম্পত্তি থেকে লব্ধ আয়; যেমন- ফল, ভাড়া, ঘরে বসবাস করা ইত্যাদি। ইসলামে ওয়াকফের বিধান হচ্ছে এটি একটি নেকীর কাজ ও মুস্তাহাব। দলিল হচ্ছে সহিহ হাদিস। উমর (রাঃ) বলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমি খায়বারে এমন একটি সম্পদ পেয়েছি যে সম্পদের চেয়ে দামী কোন সম্পদ আমি কখনও পাইনি। আপনি এ সম্পদের বিষয়ে আমাকে কী নির্দেশ দেন? তিনি বলেন: যদি আপনি মূল সম্পত্তিকে আবদ্ধ করে (ওয়াকফ করে) সদকা করে দিন। কিন্তু মূলটা বিক্রি করা যাবে না, হেবা করা যাবে না এবং মিরাছ হিসেবে মালিক হওয়া যাবে না। তখন উমর (রাঃ) এ সম্পদ গরীব-মিসকীন, আত্মীয়-স্বজন, দাসমুক্তি, আল্লাহ্র রাস্তা, পথিক ও মেহমানের জন্য সদকা করে দেন।[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] সহিহ মুসলিম এসেছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যখন কোন বনী আদম মারা যায় তখন তার আমল স্থগিত হয়ে যায়; কেবল তিনটি আমল ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া কিংবা এমন ইলম; যে ইলম দিয়ে তার মৃত্যুর পরেও উপকৃত হওয়া যায় কিংবা নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। জাবের (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে যারই সক্ষমতা ছিল তিনি ওয়াক্ফ করে গেছেন। কুরতুবী বলেন: বিশেষতঃ সেতু ও মসজিদ ওয়াক্ফ করার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোন মতভেদ নেই; অন্য ক্ষেত্রে মতভেদ আছে। ওয়াক্ফকারীর ক্ষেত্রে শর্ত হল: প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন ও বুঝদার হওয়ার মাধ্যমে লেনদেন করার উপযুক্ত হওয়া। কারণ নাবালগ, নির্বোধ ও ক্রীতদাস কর্তৃক সম্পাদিত ওয়াকফ সহিহ নয়। ওয়াক্ফ দুটো বিষয়ের মাধ্যমে সংঘটিত হয়: ১। ওয়াকফ করার নির্দেশবহ কথার মাধ্যমে; যেমন এভাবে বলা যে, আমি এ স্থানটি ওয়াকফ করলাম কিংবা এ স্থানকে মসজিদ বানালাম। ২। মানুষের প্রচলনে ওয়াকফ করা বুঝায় এমন কোন কর্মের মাধ্যমে; যেমন- কেউ তার ঘরকে মসজিদ বানাল এবং মানুষকে সে স্থানে নামায আদায় করার সাধারণ অনুমতি দিল কিংবা তার জমিকে কবরস্থান বানাল এবং মানুষকে সে কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি দিল। ওয়াকফ নির্দেশক শব্দাবলী দুই প্রকার: প্রথম প্রকার: প্রত্যক্ষ অর্থজ্ঞাপক শব্দাবলী; যেমন এভাবে বলা যে, وقفتُ (আমি ওয়াকফ করলাম) حبستُ (আমি আবদ্ধ করলাম), سبلتُ (আমি আল্লাহ্র রাস্তায় দিয়ে দিলাম) ইত্যাদি। এ শব্দগুলোকে প্রত্যক্ষ শব্দ বলার কারণ হলো যেহেতু এ শব্দগুলো (আরবীতে) ওয়াকফ ছাড়া অন্য কোন অর্থ বুঝায় না। তাই যখনই এমন কোন শব্দযোগে বলা হবে তখন সেটি ওয়াকফ হিসেবে সাব্যস্ত হবে; এর সাথে অন্য কোন কথা যুক্ত করার দরকার হবে না। দ্বিতীয় প্রকার: পরোক্ষ অর্থজ্ঞাপক শব্দাবলী: যেমন এভাবে বলা যে, تصدقتُ (আমি দান করলাম), حرمتُ (আমি এর সুবিধা গ্রহণ থেকে নিজেকে নিষিদ্ধ করলাম), أبدت (আমি এটি চিরতরে আল্লাহ্র রাস্তায় দিলাম) ইত্যাদি পরোক্ষ অর্থজ্ঞাপক শব্দ। এ শব্দগুলোকে পরোক্ষ শব্দ বলার কারণ হলো যেহেতু এ শব্দগুলো দ্বারা ওয়াকফ করা যেমন বুঝায় তেমনি অন্য অর্থও বুঝায়। তাই কেউ যদি এ ধরণের কোন একটি শব্দ উচ্চারণ করে তখন শর্ত হচ্ছে এর সাথে ওয়াকফের নিয়ত করা কিংবা এর সাথে কোন একটি প্রত্যক্ষ শব্দ কিংবা অবশিষ্ট পরোক্ষ শব্দাবলীর কোন একটি উচ্চারণ করা। প্রত্যক্ষ শব্দাবলী যোগ করে বলার পদ্ধতি হচ্ছে এভাবে: تصدقت بكذا صدقة موقوفة أو محبسة أو مسبلة أو محرمة أو مؤبدة (আমি অমুক সম্পদ দান করলাম ওয়াকফ হিসেবে কিংবা আবদ্ধকরণ হিসেবে কিংবা আল্লাহ্র রাস্তায় দিয়ে দেওয়া হিসেবে কিংবা নিজের জন্য এর উপযোগ নিষিদ্ধকরণ হিসেবে কিংবা স্থায়ী দান হিসেবে)। আর ওয়াকফের পরোক্ষ অর্থজ্ঞাপক শব্দ যোগ করে বলার পদ্ধতি হচ্ছে এভাবে বলা: تصدقتُ بكذا صدقة لا تباع ولا تورث (আমি অমুক সম্পদ এভাবে দান করলাম যে, এটি বিক্রি করা যাবে না, ওয়ারিশ হওয়া যাবে না)। ওয়াকফ সহিহ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: ১। ওয়াকফকারী লেনদেন করার উপযুক্ত হওয়া; যেমনটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২। ওয়াকফকৃত সম্পত্তির মূলকে অটুট রেখে এর থেকে অব্যাহতভাবে উপকৃত হওয়া যায় এমন হওয়া। যে জিনিসের মূল অটুট থাকে না এমন জিনিস ওয়াকফ করা যায় না; যেমন- খাবার। ৩। ওয়াকফকৃত সম্পত্তি নির্দিষ্ট হওয়া। তাই কোন অনির্দিষ্ট সম্পত্তি ওয়াকফ করা সহিহ নয়। যেমন- কেউ যদি বলে যে, আমি আমার কোন একটি দাসকে কিংবা আমার কোন একটি বাড়ীকে ওয়াকফ করলাম। ৪। ওয়াকফ নেকীর কাজে হতে হবে; যেমন- মসজিদ, সেতু, মিসকীন, পানির উৎস, ইলমী কিতাবপত্র, আত্মীয়স্বজন। কেননা ওয়াকফ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্র নৈকট্য হাছিল। নেকী নয় এমন খাতে ওয়াকফ করা সহিহ নয়। যেমন- কাফেরদের উপাসনালয়ের জন্য ওয়াকফ করা, নাস্তিক্যবাদী পুস্তকের জন্য ওয়াকফ করা, মাজারে বাতি জ্বালানো কিংবা সুগন্ধি দেওয়ার জন্য ওয়াকফ করা কিংবা মাজারের রক্ষকদের জন্য ওয়াকফ করা। কেননা এগুলো হচ্ছে গুনাহের কাজ, শিরক ও কুফরের কাজে সহযোগিতা করা। ৫। নির্দিষ্ট কারো জন্য ওয়াকফ করলে সে ওয়াকফ সঠিক হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে ঐ ওয়াকফ সম্পত্তির উপর সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। যেহেতু কারো জন্য ওয়াকফ করা মানে তাকে মালিক বানিয়ে দেওয়া। তাই যে ব্যক্তি মালিক হতে পারে না তার জন্য ওয়াকফ করা সহিহ নয়; যেমন মৃত ব্যক্তি বা পশু। ৬। ওয়াকফ সহিহ হওয়ার জন্য অবিলম্বে কার্যকরযোগ্য হওয়া শর্ত। তাই নির্দিষ্ট সময়কেন্দ্রিক ওয়াকফ কিংবা বিশেষ কিছুর সাথে সম্পৃক্ত করে ওয়াকফ করা সহিহ নয়। তবে কেউ যদি তার মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত করে ওয়াকফ করে তাহলে সহিহ হবে। যেমন কেউ বলল যে, আমি যদি মারা যাই তাহলে আমার ঘরটি গরীবদের জন্য ওয়াকফ। যেহেতু আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, উমর (রাঃ) ওসিয়ত করে গেছেন যদি আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে সামগ (তার একটি জমি) সদকা। এ বিষয়টি সবাই জেনেছে। কিন্তু কেউ এর বিরোধিতা করেননি। সুতরাং এটি ইজমা (সর্বসম্মত অভিমত)। মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত ওয়াকফ সম্পদের এক তৃতীয়াংশ দিয়ে করা যাবে। কারণ তা ওসিয়তের পর্যায়ভুক্ত।