1 Answers

মিসনার স্পেসকে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করার যায়। ধরা যাক আপনার শোবার ঘরটিই সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। এই ঘরের বাম ও ডান পাশের দেয়ালের প্রতিটি বিন্দুই দেখতে হুবহু একই রকম। এমন দেয়ালের ক্ষেত্রে একটি মজার ঘটনা ঘটে। আপনি যদি এই ঘরের বাম দিকের দেয়াল দিয়ে হেটে বের হয়ে যেতে চান তবে আপনার নাক ভাঙ্গার পরিবর্তে ডান দিকের দেয়াল দিয়ে আবার এই ঘরেই প্রবেশ করবেন। অর্থাৎ সিলিন্ডারের দুই পাশের দেয়াল যেমন জোড়া লাগানো তেমনি এই ঘরের দেয়ালগুলোও একটির সাথে আরেকটি জোড়া লাগানো। এমন দেয়ালের একটি ভাল উদাহরন হল 2D ভিডিও গেম। আমারা যখন মোবাইলে “স্ন্যাক গেম ” খেলি তখন সাপকে এক দিকের স্কিন দিয়ে বের করে দিলে তা আবার উল্টো পাশের স্কিন দিয়ে বের হয়ে যায়। মিসনার স্পেসকেও এমন একটি সাপ খেলার স্কিন হিসেবে ভাবা যেতে পারে। তবে এই স্কিন 2D এর পরিবর্তে 3D । অর্থাৎ এই খেলায় সাপকে শুধু দেয়াল দিয়ে বের করলেই উল্টো দিক দিয়ে বের হবে না, পাশাপাশি ছাদ দিয়ে বের করে দিলেও ফ্লোর দিয়ে বের হয়ে যাবে। ঘরের ছয় দিকের বিপরীত দেয়াল সবগুলোই সমবিন্দুর দ্বারা গঠিত। ফলে এই ঘর থেকে বের হয়ে যাবার কোন উপায় নেই, যেদিক দিয়েই বের হবেন না কেন বিপরীত দিকে দিয়ে আবার ঘরেই প্রবেশ করতে হবে। আর আমাদের মহাবিশ্বও ঠিক এমনই, একটি বদ্ধ গোলকীয় ক্ষেত্র। সে অর্থে মিসনার স্পেসকে সত্যিকার অর্থেই মহাবিশ্বের একটি সরল প্রতিরুপ বলা যেতে পারে। এমন স্থানের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল- এই ঘরের দেয়ালগুলো স্বচ্ছ(transparent) । আর কোন একটি দেয়াল দিয়ে বাইরে তাকালে আপনার এই ঘরের একটি কার্বন কপি(Carbon copy) দেখতে পাবেন। আর সেই ঘরের ভিতরও আপনার নিজেও একটি কার্বন কপিকে দেখতে পাবেন। কিন্তু আপনি কখনই তার সামনের দিকটি দেখতে পাবেন না। আপনি যখনই মুখ ঘুরিয়ে ফেলবেন তখন আপনার কপিও তার মুখ ঘুরিয়ে ফেলবে। ফলে সবসময় আপনি তার পশ্চাৎ দিকটই দেখতে পাবেন। এমনকি উপরে বা নিচে তাকালেও একই ঘটনা ঘটবে। ফলে আপনার নিজের হুবহু প্রতিরুপের সাথে যোগাযোগ করাটা একদমই সম্ভব হবে না। আপনি কোনো দিকে সরে যাওয়া মাত্রই সেও আপনার বরাবরই সরে যাবে। আমাদের মহাবিশ্বের খেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। আমরা যদি কোন শক্তিশালী টেলিস্কোপের(আসল ে বাস্তবে এত শক্তিশালী টেলিস্কোপ তৈরি করা সম্ভব না) সাহায্যে সামনের দিকে তাকাই তাহলে আমরা আমাদের মাথার পেছনের অংশ দেখব। এমন হবে কারন- আমাদের মহাবিশ্বও মূলত এক ধরনের উচ্চ মাত্রিক গোলক(Hyper sphere)। ফলে সামনের দিকে তাকালে আলোক রশ্নি সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব ঘুরে আবার আমাদের চোখে এসে পৌঁছুবে। এখন ধরে নিন মিসনার স্পেসে থাকা অবস্থায় আপনার চারপাশের দেয়ালের কোন একটি সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এবার একটি মজার ঘটনা ঘটবে। আপনার ঘরের ডান পাশের দেয়াল যদি আপনার দিকে ঘন্টায় দুই কিলোমিটার বেগে আপনার দিকে আসতে থাকে আর আপনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য যদি বাম দিকের দেয়াল দিয়ে বেরিয়ে যেতে চান তাহলেই শুরু হবে এক অদ্ভত ঘটনা। কেননা, আপনি বাম দিকের দেয়াল দিয়ে বেরিয়ে গেলে আবার ডান দিকের দেয়াল দিয়ে এই ঘরেই প্রবেশ করবেন। ফলে আপনার গতির সাথে এখন অতিরিক্ত ২ কিলোমিটার অতিরিক্ত গতি যোগ হবে। ফলে আপনার গতি হয়ে যাবে ৪ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। এখন আপনি যতবার দেয়াল ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করতে থাকেবন ততবারই আপনার গতির সাথে ২ কিলোমিটার অতিরিক্ত গতি যোগ হতে থাকবে। ফলে এই গতি ৬,৮,১০ এভাবে বাড়তে বাড়তে আলোর বেগের কাছাকাছি চলে যাবে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ক্রান্তি বিন্দু অতিক্রম করার পর আপনার গতি এত বৃদ্ধিপাবে যে আপনি অতীতে চলে যেতে থাকবেন। এমনকি আপনি ইচ্ছে করলে সেই মহাবিশ্বের স্থান- কালের যেকোনো বিন্দুতে চলে যেতে পারবেন। এমনকি আপনার জন্মেরও পূর্বে ! হকিং মিসনার স্পেসের সব বৈশিষ্ট্য খুব সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করেন। তার বিশ্লেষণে দেখা গেল যে, গানিতিকভাবে ভাবলে এই ঘরের বিপরীত দিকের দেয়ালগুলো মূলত ওয়ার্মহোলের মুখ। এরপর তিনি গতানুগতিক পদার্থবিদ্যা ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স দুটোর সাহায্যেই প্রমান করে দেখান যে এই মিসনার স্পেস মূলত অস্থায়ী। একটি আলোক রশি যখন এই মিসনার স্পেসে প্রবেশ করবে তখন তা ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকবে। ফলে আলোর ব্লু শিফট(Blue shift) দেখা দেবে। এর ফলে একসময় এই শক্তিমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে অসীমের দিকে যেতে থাকবে; যা এক কথায় অসম্ভব। অন্যভাবে বলা যায়- এভাবে আলোর শক্তি এতটাই বৃদ্ধি করবে যে ঘরটি এই প্রবল মহাকর্ষের প্রভাবে নিজের ভেতর চুপসে যাবে , ফলে ওয়ার্মহোলটিও ধ্বংস হয়ে যাবে। এর দ্বারা হকিং বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেউ যখন মিসনার স্পেসের ওয়ার্মহোলের ভিতর দিয়ে ভ্রমন করতে চেস্টা করবে তখন ওয়ার্মহোলটি আর টিকে থাকেব না। তার গননায় দেখা যায়- এক্ষেত্রে এনার্জি মোমেন্টাম টেনসরের ( energy momentum tensor) মান হয়ে পড়বে অসীম। কোন স্থানের ভর ও শক্তির পরিমান কত হবে তা এই এনার্জি মোমেন্টাম টেনসরের সাহায্যে জানা যায়। আর এর মান অসীম হওয়াটা সম্ভব না। অর্থাৎ হকিং বলতে বলতে চেয়েছেন- এমন কোন ওয়ার্মহোল দিয়ে ভ্রমন করা সম্ভব না। যেহেতু এমন কোন ওয়ার্মহোল দিয়ে ভ্রমন করতে গেলে কোয়ান্টাম বিকিরনের প্রভাব (quantum radiation effects ) অসীম পর্যন্ত চলে যাবে, তাই এই বিষয়টিকে হকিং টাইম ট্র্যাভেলের জন্য চরম আঘাত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। হকিং এর এই সমাধান প্রকাশ পাবার বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক আলোচনা চলে। কেউ পক্ষে, তো কেউ বিপক্ষে। কয়েকজন বিজ্ঞানী মিলে হকিং এর সমাধানের বেশ কিছু সমস্যা তুলে ধরেন। তারা ওয়ার্ম হোলের আকার ও অন্যান্য প্যাটামিটার পরিবর্তন করে এমনকি হকিং এর সমাধান থেকেই স্থায়ী ওয়ার্মহোলের জন্য একটি মডেল তৈরি করে ফেলেন। তারা ওয়ার্ম হোল সমাধানের এনার্জি মোমেন্টাম টেনসরের বিষয়টি পরিক্ষা করে দেখেন যে- কিছু ক্ষেত্রে ওয়ার্ম হোল অস্থায়ী হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা স্থায়ী হবে। রাশিয়ান পদার্থবিদ সার্জেই ক্রাসনিকভ বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্ম হোল পরীক্ষা করে দেখেন। তার পরীক্ষায় দেখা যায় “এমন কোন একটি প্রমানও নেই যা থেকে বলা যায় যে টাইম মেশিন তৈরি করা সম্ভব না বা এটি অস্থায়ী হবে ”। ক্রাসনিকভের এই গবেষণা পদার্থবিদদের মধ্যে টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে নতুন করে কাজ করার উদ্দীপনা ফিরিয়ে এনেছিল। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের Li-Xin Li তো হকিং প্রস্তাবিত এন্টি-ক্রোনলজি প্রোটেকশন কঞ্জেকচার(Anti- chronology protection conjecture ) প্রস্তাব করে বসেন। হকিং যেমন ক্রোনলজি প্রোটেকশন কঞ্জেকচারের মাধ্যমে টাইম ট্র্যাভেলকে একদম বাতিল করে দিতে চেয়েছিলেন, তেমনি লি- জিন লি তার এন্টি-ক্রোনলজি প্রোটেকশন কঞ্জেকচারের মাধ্যমে দেখালেন যে “ পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোন নিয়মের অস্তিত্ব নেই যা টাইম ট্রেভেলের ধারনাকে বাতিল করে দেয় ” । ১৯৯৮ সালে হকিং তার প্রস্তাবনা থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তিনি লিখেন , “এনার্জি মোমেন্টাম টেনসর কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতীত ভ্রমনের ক্রিয়াকে বাতিল করতে পারে না, আর ক্রোনলজি প্রোটেকশনও করতে পারে না ”। তিনি আরও বলেন, তার মানে এই নয় যে টাইম ট্র্যাভেল একদম নিশ্চিতভাবে সম্ভব, এর অর্থ হল- এই সম্পর্কে আমরা এখনো সবকিছু ভালভাবে জানি না । হকিং এর প্রস্তাবনার এই দুর্দিনে ম্যাথিও ভিসার তার ক্রোনলজি প্রোটেকশনকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন। ম্যাথিউ এর মতে – ক্রোনলজি প্রোটেকশনের ব্যার্থতার অর্থ এমন কিছু না যে তার জন্য টাইম ট্র্যাভেলের সমর্থকরা সঠিক প্রমানিত হয়েছেন। এর দ্বারা শুধু এটুকুই বোঝা যায় যে- টাইম ট্র্যাভেলের বিষয়টি ভালমত জানার জন্য আমাদের আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। মহাকর্ষের জন্য একটি কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিস্কার না করা পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে টাইম ট্র্যাভেল সম্পর্কে হকিং এর মত এখন অনেক বদলেছে। তার মতে এটি অসম্ভব নয়, তবে এটা বাস্তবে করাটা হয়তো সম্ভব না।

2580 views