1 Answers
আজ থেকে দশ-বারো বছর আগে কমপিউটার নিয়ে যারা বেশির ভাগ সময় কাটাতেন তাঁরা ছিলেন প্রধানত তথ্য প্রযুক্তির লোক এবং সেই সময়টুকুর জন্য তাদেরকে বেতন-ভাতা দেওয়া হত। ইন্টারনেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কমপিউটার নিয়ে বেশির ভাগ সময় কাটায় এবং সেই সময়টুকুর জন্য নিজেরাই মুল্য পরিশোধ করে। কমপিউটার ও ইন্টারনেট আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইন্টারনেটে কী আছে - সে প্রশ্নের উত্তরের চেয়ে কী নাই - তার উত্তর দেওয়া অনেক সহজ। ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা এখন প্রায় অসম্ভব। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বানিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেউ যদি ইন্টারনেটের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ইন্টারনেটের কারণে যদি কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয় এবং সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মত ইন্টারনেটের প্রতি যদি কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে তখনই সমস্যা। ইন্টারনেট আসক্তির ব্যাপারটা প্রথমবারের মত মনোবিজ্ঞানীদের নজরে আসে ১৯৯৭ সালে Cincinnati Case-এর মাধ্যমে। Sandra Hacker নামে একজন মহিলা তাঁর তিনটি শিশু সন্তানকে অবহেলা করে ও নির্জন কামরায় আবদ্ধ রেখে দৈনিক ১২ ঘন্টারও বেশি সময় ইন্টারনেটে অতিবাহিত করতেন। এই মহিলাকে পর্যবেক্ষণ করে মনোবিজ্ঞানীদের অনেকেই সম্মত হলেন যে সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মত ইন্টারনেটেরও compulsive ক্ষমতা আছে অর্থাৎ যা একটি পর্যায়ে এসে মানুষ ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। সেই ধারণা থেকেই 'Internet Addiction' কথাটির সৃষ্টি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ইন্টারনেটেরও পরিবর্তন হচ্ছে। আসছে নতুন নতুন ফিচার, ফাংশন, কনসেপ্ট। সেই সাথে দিনদিন বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহাকারী। জরিপে দেখা গেছে যে ৫-১০% ব্যবহাকারী ইন্টারনেট আসক্ত। এর সংখ্যা যে দিনদিন বাড়ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক কথায় ইন্টারনেট আসক্তিকে প্রকাশ করা বেশ কঠিন ব্যাপার। ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে মানুষের যে ব্যাপক কৌতুহল, সার্বক্ষণিক চিন্তা, অদমনীয় ইচ্ছা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং অসংযত আচরণবোধ এসব কিছুকেই ইন্টারনেট আসক্তি বলা যায়। যে ধরনের লোকের ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি: # যারা আগে থেকেই অন্য কোন কারণে Anxietyতে ভোগছেন। # যারা বিষন্নতায় বা একাকিত্বে ভোগছেন। # যারা ড্রাগ, এলকোহল, জুয়াখেলা এবং বিকৃত যৌন রুচি ও মানসিকতায় আসক্ত। # টিনএজার - যারা রোমাঞ্চপ্রিয় ও সব কিছুতে অতি উৎসাহী। # শারীরিকভাবে যারা অলস ও ঘরকুনো। # যারা কোন কিছুকেই হালকাভাবে নিতে পারে না, সব কিছুতেই সিরিয়াস। # বাস্তব জীবনে যাদের বন্ধু-বান্ধব খুবই কম ও বিপদ-আপদে সাহায্য করার মত কেউ নেই। # যারা অসামাজিক, লাজুক এবং মানুষের সাথে মিশতে ভয় পায়। # যারা বাস্তব জীবনের সমস্যাকে এড়িয়ে চলতে চায়। Internet-Addiction2 ইন্টারনেট আসক্তির প্রধান কারণগুলো: ১। কৌতুহল ও উৎসাহ - ইন্টারনেটে নতুন ব্যবহারকারীদের অনেকেই ব্যাপক উৎসাহের সাথে প্রায় সব লিঙ্কে ক্লিক করে দেখে সেখানে কী আছে। সাইট থেকে সাইটে ঘুরে ঘুরে নিত্য নতুন তথ্য-বিনোদনের আবিষ্কারে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে অনলাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। ২। তথ্য নিয়ে হিমশিম খাওয়া - ইন্টারনেট এখন সব বয়সের ও সব পেশার লোকের জন্য এক বিশাল তথ্য ভান্ডার। পেশার কারণেই হোক বা সখের কারণেই হোক নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহের নেশা একজন মানুষকে এমনভাবে পেয়ে বসে যে সে বেশিরভাগ সময় ক্রমাগত ওয়েব পেজ হাতড়িয়ে পার করে দেয়। আর এভাবেই সে নিজের অজান্তেই সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ৩। সাইবার সেক্সুয়েল আসক্তি - এ ক্ষেত্রে একজন মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য নির্ধারিত চ্যাট রুম এবং সাইবার পর্ণের প্রতি আকর্ষণ বিশেষভাবে বেড়ে যায়। তার চিন্তা-ভাবনায় স্থান করে নেয় এ ধরনের নগ্ন ও বিকৃত রুচির সাইটগুলো। সাধারণত প্রথমদিকে কৌতুহল থাকলেও বেশিরভাগ লোকই পরবর্তীতে এগুলোতে আর আকর্ষণ বোধ করে না। এসবের প্রতি কারো কৌতুহল ও আকর্ষণ যদি স্থায়ীরুপ লাভ করে তখনই সমস্যা। ৪। কম্পিউটার আসক্তি - এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কম্পিউটার গেম, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, কম্পিউটার সেটিং প্রভৃতির প্রতি আকর্ষণ আর নির্ভরতা এমন পর্যায়ে চলে আসে যে সারাক্ষণ সে ওগুলো নিয়েই সময় কাটাতে পছন্দ করে। দিনে একাধিকবার ডেস্কটপের ব্যাকগ্রাউন্ড, স্ক্রীন সেভার ইত্যাদি পরিবর্তন করছে, একই গেম বারবার দিনের পর দিন খেলার পরও বিরক্ত হচ্ছে না, প্রয়োজন থাক আর না থাক নতুন নতুন প্রোগ্রাম ইনস্টল/আনইনস্টল করছে। এধরনের লোক relax হয়ে বসে থাকতে পারে না, কমপিউটার নিয়ে কিছু একটা করতে হবেই। ৫। ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধব - ইন্টারনেটের সুবাধে দুর-দুরান্ত, দেশ-বিদেশের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালোবাসা। ব্লগ, ফোরাম, চার্টরুম, ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে একজনের সাথে আরেকজনের পরিচয় হচ্ছে, বন্ধুত্ব হচ্ছে। সে কারণে ইমেইল, অনলাইন চাটিং, ফেসবুকে বন্ধুর তালিকা দিনদিন বড় হচ্ছে। সুতরাং যতই দিন যাচ্ছে ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধবদের সিডিউল দিতে অনলাইনে সময়ের পরিমানও বাড়ছে। আবার অনেকেই আছেন ডেটিং/ফ্রেন্ডশীপ সাইটের নিয়মিত ভিজিটর বা সদস্য, যারা জীবনসঙ্গী, যৌনসঙ্গী, প্রেমিক-প্রেমিকার সন্ধানে বেশিরভাগ সময় ইন্টারনেট হাতড়িয়ে পার করে দেয়। ৬। বিকল্প বিনোদন - ইন্টারনেটকে অনেকে বিকল্প বিনোদন হিসেবে বেছে নিয়েছে। গান, ভিডিও ক্লিপ, মুভি, নাটক, গেম, টিভি, ভিডিও, লাইভ খেলাধুলা ইত্যাদি অনেক কিছু এখন ইন্টারনেটে উপভোগ করা যায়। অনেকে এগুলোর প্রতি এত বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে যে জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অবহেলা করতে শুরু করে। নতুন নতুন গান, ভিডিও, মুভি সংগ্রহের জন্য দিনরাত ইন্টারনেট হাতিয়ে বেড়াচ্ছে। যত পায় আরও চায় - এভাবে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা অনলাইনে ব্যয় করছে যা একসময় আসক্তির পর্যায়ে চলে আসে। ৭। বাস্তব জীবনে সমস্যা - সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার এইসব দিনরাত্রি নিয়ে আমাদের জীবন। সব দুঃখ-কষ্টকে সবাই একইভাবে মোকাবেলা করতে পারে না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং পেশাগত জীবনে সমস্যা আসতে পারে। অনেকে এইসব দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যাকে ভুলে থাকার জন্য ইন্টারনেটকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়। এভাবে বাস্তব জীবনের সমস্যাকে ভুলতে গিয়ে আরও একটি সমস্যায় পতিত হয়, যার নাম 'ইন্টারনেট আসক্তি'। ৮। ভার্চুয়াল জগতে প্রচার ও সেলিব্রেটি - ইন্টারনেটে সহজে নিজেকে প্রচারের জন্য অনেক সুযোগ, যেমন নিজস্ব ওয়েবসাইট, ব্লগ, ফোরাম, চার্টরুম, ফেইসবুক ইত্যাদি। তাই অনেকে দিনরাত এইসব সাইটে সক্রিয় থাকতে চাই, অন্যান্য অনলাইন ইউজারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এরা সবসময় সব ধরনের চেষ্টা করে। এদের কার্যকলাপ ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয় ধরনের হতে পারে। এরা দৈনন্দিন জীবনের বিরাট একটি অংশ কাটিয়ে দেয় অনলাইনে। যখন অফলাইনে থাকে তখনও এরা অনলাইনের কার্যকলাপ ও চিন্তা-ভাবনায় মোহগ্রস্ত হয়ে থাকে। অনলাইনে সবাইকে তাক লাগানোর জন্য বা সেলিব্রেটি হওয়ার জন্য নিত্য নতুন আইডিয়া নিয়ে সবসময় ভাবতে থাকে, ফলে বাস্তব জীবন নিয়ে চিন্তাভাবনার আর সময় থাকে না।। ৯। প্রতারণা ও ধোকাবাজি- ইন্টারনেটে যেহেতু নিজের পরিচয় গোপন রেখে অনেক কিছু করা যায়, তাই এটা অনেকের কাছে ফন্দি-ফিকির ও প্রতারণার স্বর্গরাজ্য। অনেকে এসবের মাধ্যমে এক ধরনের আনন্দ পায়। এরা এসব উদ্দ্যেশ্যে এক ওয়েবসাইট থেকে আরেক ওয়েবসাইটে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায় এবং অনেক সময় সাইবার ক্রাইমে জড়িয়ে পড়ে। ১০। Status Update Anxiety (SUA) - ইন্টারনেটের কারণে সৃষ্ট নতুন মানসিক রোগ/সমস্যা সুয়া (SUA)। এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি তার পারিবারিক জীবন তো বটেই, বাস্তব জীবনের বন্ধুবান্ধব থেকেও বিছিন্ন হয়ে পড়ে। কেননা তার ধ্যান ধারণায় স্থান করে নেয় চ্যাট রুম, ব্লগ, ফোরাম, নিউজ গ্রুপ, ফেইসবুক, Twitter, Dopplr, My Space, Bedpost ইত্যাদির সুবাদে প্রাপ্ত ভার্চুয়াল জগতের নতুন নতুন বন্ধুবান্ধব। প্রতি মুহুর্তে ইন্টারনেটে নিজের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ঘটনা নিয়মিত অন্যদের সাথে শেয়ার করতে গিয়ে অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে এক ধরনের মানসিক চাপ। তারা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেটে প্রকাশ করতে চাই এবং অন্যদের উত্তর বা প্রতিক্রিয়া জানতে অধৈর্য হয়ে পড়ে। ফলে তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। এরা ইন্টারনেট ছাড়া বেশীক্ষণ থাকতে পারে না। ধুমপানে অভ্যস্ত লোক যেমন ধুমপান করতে না পারলে চঞ্চল, বিষন্ন অথবা উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তেমনি হয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারিদের।
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy