1 Answers
তথ্য প্রযুক্তি ও বাংলাদেশ
ভূমিকা: মানব কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানকে কাজে লাগানোর কৌশলই হলো প্রযুক্তি। আধুনিককালে মানব জীবনের সাথে প্রযুক্তি ওতপ্রাতভাবে জড়িত। তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতি মুহূর্তে আমাদের কাজে লাগে। মানুষ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য প্রযুক্তির সেবা গ্রহণ করে আসছে। যেমন- মোবাইল, টেলিফোন, কম্পিউটার, সফ্টওয়্যার, নেটওয়ার্ক, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি। তথ্য প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে যেমন অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে, তেমনি দেশ ও জাতির অগ্রগতিতে অপরিহার্য অবদান রাখছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বেকার মানুষ কর্মসংস্থানের সন্ধান পেয়েছে, আর্থনীতিক উন্নতি হয়েছে, জনশক্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি: তথ্যপ্রযুক্তি হলো তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির মিলিত ও সুশৃঙ্খল রূপ। তথ্য- প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো- কম্পিউটিং, মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স, টেলিকমিউনিকেশন, ডাটাবেস উন্নয়ন, বিনোদন, তথ্যভান্ডার, নেটওয়ার্ক, সফ্টওয়্যার উন্নয়ন, মুদ্রণ ও রিপ্রোগ্রাফিক, ডিশ অ্যান্টেনা ইত্যাদি।
তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ: আধুনিককালে বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির জয়জয়কার ধ্বনিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশও এ প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে নেই। গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ দেশব্যাপী তরুণ প্রজন্ম তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। বাংলাদেশের বিভিন্ন জরিপ সংস্থার তথ্যসূত্রে জানা যায়- গত দশ বছরে আমাদের দেশ তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে।
জাতীয় উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি: আধুনিক বিশ্বে দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশেই দিন দিন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন দেশে এখন অসংখ্য তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ক্রয়-বিক্রয়, ব্যবসায়-বাণিজ্য, ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। কম্পিউটার হার্ডওয়ার, সফ্টওয়ার, ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির দোকান দিয়ে মানুষ খুব ভালো ব্যবসাও করছে। তাছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির নানা প্রোগ্রামের ওপর মেলা প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতা, সেমিনার ইত্যাদির আয়োজনে করা হয়। আর এই জন্যই তথ্যপ্রযুক্তি দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে সরকারের অবদান : তথ্যপ্রযুক্তি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে বলে বাংলাদেশ সরকার তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের জন্য নিমোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করেছে:
১. তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ গ্রাম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করে প্রায় সারা দেশকে ডিজিটাল টেলিফোন ও ইন্টারনেটের আওতায় এনেছে।
২. বাংলাদেশ সরকার তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশে জাতীয় যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা অনুমোদন করে ঢাকার কারওয়ান বাজারে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি আইসিটি ইনকিউবেটর" স্থাপন করেছে। এটি ১০ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে অবস্থিত।
৩. বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট পণ্য বিদেশে বাজারজাতকরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার 'আইসিটি বিজনেস প্রমোশন সেন্টার স্থাপন করেছে।
৪. তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক স্থাপন করা হয়। পার্কটি ২৬৫ একর জমির ওপর অবস্থিত। এতে প্রযুক্তির বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।
৫. দেশের প্রতিটি স্কুলে সরকারি উদ্যোগে কম্পিউটার প্রদান করা হয়েছে এবং মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে কম্পিউটার শিক্ষা কোর্স প্রবর্তন করা হয়েছে। তাছাড়া কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য আইসিটি ইন্টার্নশীপ' কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
জাতীয় জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব: এক সময়কার দরিদ্র বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নিম-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে এই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এত দ্রুত জাতীয় উন্নয়নে বিপ্লব ঘটানোর সম্ভব হবে না। সুতরাং অর্থনীতি শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল ক্ষেত্রেই দ্রুতগতিতে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে নিমোক্ত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে:
আর্থিক উন্নতি: আমাদের দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে আর্থিক উন্নতির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা অর্থনীতিই পারে দেশের উন্নতির চাকা ঘোরাতে। আর্থিক উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে তথ্যপ্রযুক্তি। এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে যে দেশগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের জোয়ার বইছে তার মধ্যে ভারত শীর্ষে। এদিক থেকে বাংলাদেশ একটু পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের আর্থিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে তথ্যপ্রযুক্তি। আমাদের দেশে এখন কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে। আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সফ্টওয়্যার বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। আগামী দিনে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগে: বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়তই চলছে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা। বিশ্ব দরবারে টিকে থাকার জন্য আমাদের প্রয়োজন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কোর্স চালু করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষা কোর্স চালু করতে হবে। বিশ্বব্যাপী চাহিদার কথা বিবেচনা করে তথ্যপ্রযুক্তির নবায়ন করতে হবে। তাছাড়া সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে জ্ঞানার্জনের সুযোগ দিতে হবে এবং প্রতিটি স্কুল- কলেজে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান: আমাদের দেশে যুব-সমাজে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো বেকারত্ব। বাংলাদেশে দিন দিন বেকার সমস্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু আমাদের দেশের বেকারদের জন্য সুখবর হচ্ছে বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, ইন্টারনেট, ফেসবুক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য প্রায় দশ হাজার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আর এ সকল প্রতিষ্ঠান প্রায় লক্ষাধিক বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।
জনশক্তি উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি: একটি দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। আর সাধারণ জনগণকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তির সমৃদ্ধ জ্ঞান। তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হলেই আমাদের জনশক্তি দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হওয়া সম্ভব। আর জনশক্তি দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হলেই দেশের আর্থনীতিক উন্নতি সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে যে জাতি তথ্যপ্রযুক্তিতে যত বেশি সমৃদ্ধ সে জাতি তত বেশি উন্নত।
তথ্যপ্রযুক্তিহীন কোনা জাতিই উন্নতির শিখরে পৌছাতে পারে না। তাই বাংলাদেশের সরকারের উচিত দেশ ও জাতির উন্নয়নের উদ্দেশ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলে।
ব্যবসায়-বাণিজ্যে তথ্যপ্রযুক্তি: বর্তমান যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন ঘরে বসেই ই-মেইল, ই- কমার্স, ই-নেট ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই ব্যবসা- বাণিজ্যের খোঁজ-খবর রাখতে পারছে। আর এটা সম্ভব হচ্ছে শুধু তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে। ঘরে বসে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই মুহূর্তের মধ্যে দেশ-বিদেশে উৎপাদিত পণ্য এবং বাজার দর সম্পর্কে অবগত হতে পারছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্যের অর্ডার দেওয়া-নেওয়া হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে আমরা আর্থনীতিক দিক থেকে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারব।
উপসংহার: বর্তমান যুগে বৈজ্ঞানিকদের সবচেয়ে বিষ্ময়কর আবিষ্কার তথ্যপ্রযুক্তি। মানুষ ঘরে বসে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দূরের মানুষের সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে কেনা-বেচার কাজও করছে। তথ্যপ্রযুক্তি-বিদ্যা কাজে লাগিয়ে মানুষ বেকারত্ব দূর করতে পারছে। অনেকে ঘরে বসেই উপার্জন করতে পারছে। প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া এক মুহূর্তও চলা সম্ভব নয়। তাই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে আর্থনীতিক উন্নতিতে অবদান রাখতে হবে। বাংলাদেশের জনগণকে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে।
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy