1 Answers

আমার উত্তর পড়ে অনেকেই অবাক হবেন, কেননা সত্য আসলেই খুব অবাক করা ব্যাপার। ১। প্রকৃতির নিয়মে মানুষসহ সকল প্রাণী স্বভাবতঃই চরম দরিদ্র। একটূ খাবারের জন্য অন্য প্রাণীকে খুন করতে হয়, আর মরণ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষুধার জ্বালায় সদা অস্থির থাকতে হয়। খাবারের খোঁজেই সারা দিন কেটে যায়। মানুষ শিকারী প্রাণী হিসাবে প্রকৃতিতে অন্য প্রাণীকে হত্যা করে কোন রকম নিজের প্রাণ বাঁচায়। নিজ পরিবার বা গোত্রের বাইরের মানুষ ধরতে পারলে দাস বানিয়ে রাখে, ধর্ষণ করে বা খুন করে, আর পরাজিত লোকের সব সম্পত্তি কেড়ে নেয়। ২। প্রকৃতির নিয়ম অমান্য করার মত বুদ্ধি মানুষের আছে। প্রকৃতির নিয়মে মানুষ বা শিয়াল যদি মুরগি ধরতে পারে, সাথে সাথে মেরে কাঁচা চিবিয়ে খায়ঃ এটাই প্রকৃতির বিধান। কিন্তু আনুমানিক ২০ হাজার বছর আগে একটা মানুষ ঠিক করল যে সে মুরগিকে মেরে খেয়ে না ফেলে বরং মুরগিকে বাঁচাবে আর নিজে খাবার যোগার করে খাওয়াবে। মুরগি ডিম দিবার পর সে ডিম না খেয়ে মুরগিকে দিল সেগুলি থেকে বাচ্চা ফুটাতে। আবার বাচ্চা না খেয়ে সেগুলি পালন করে বড় করল। কিন্তু মুরগি যখন বুড়া হয়ে যায় আর ডিম পাড়তে পারেনা, তখন সে মুরগিকে একটা দীর্ঘ সফল জীবনের শেষে জবাই করে খায়। এইভাবে সে গরু-ছাগল পুষে, পালন করে। এই বুদ্ধির দ্বারা সে যে মুরগির জন্ম হবারই কথা ছিলনা (কারণ তার নানি মুরগিকেই মেরে খেয়ে ফেলার কথা ছিলো) তার জন্মের সহায় হয়েছে, যার বেঁচে থাকার কথা ছিলো না তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রকৃতির বিধানে বাংলাদেশে শুন্যগরু থাকার কথাঃ কারণ বর্ষাকালের প্রবল বন্যায় একটা গরুও বেঁচে থাকার উপায় নাইঃ তিন মাস ধরে না খেয়ে পানিতে দাঁড়িয়ে গরু বাঁচে না। কিন্তু সেখানে এখন ২ কোটিরও বেশি গরু আছে, কারণ মানুষ তাদেরকে বন্যামুক্ত শুকনা জায়গায় রেখে খাবার যোগার করে খাওয়ায়। ৩। প্রকৃতিতে যে প্রান্তরে ঘাস জন্ম হয়, সেখানে মানুষের বাস করার প্রশ্নই উঠেনা, কারণ মানুষ ঘাস খায়না, ঘাসের দানাও তার খাবার ছিলো না। তৃণভুমিতে শিম্পাঞ্জি, গরিলা আর ওরাংউটাং ছেড়ে দেখেন, কেউ ঘাস খাবেনা আর বাঁচবে না। মানুষের প্রাকৃতিক বাসভুমি ছিল বন, যেখানে গরিলা-শিম্পাঞ্জি-ওরাংউটাংদের মত তারাও ফরমুল খোঁজে বার করে খেতো আর সুযোগ পেলে টুকিটাকি প্রাণী মেরে খেতো। কিন্তু মানুষ প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে প্রান্তরে হাজির হলো গরু-ছাগল-ভেড়া ইত্যাদি পুষতে আর তার পরে বন্যাপ্লাবিত অঞ্চলে ফসলের বীজ ছিটিয়ে দিয়ে ফসল হলে সেটা খেতে শিখল। মাত্র দশ হাজার বছর আগে মানুষ ঘাসের উৎপাদন শুরু করে আর ঘাসের দানা খেতে আরম্ভ করে। কৃষি মানে প্রকৃতির নিয়ম ভেঙ্গে যে ফসল হবার কথা নয়, তাকেই ফলানো। ৪। প্রকৃতির বিধানে বাতাস বয়ে যাবে, তাতে কোন প্রাণীর কিচ্ছু লাভ নেই। কিন্তু মানুষ পাল উড়িয়ে বাতাসের গতিকে আটক করে তাতে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল নৌকা, আর বাতাসকে বাধ্য করলো তার নৌকা টেনে নিয়ে যেতে। পরিবেশবাদীদলের বিশ্বাস মানুষ প্রকৃতির উপর জবর হামলা করেছে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু আসলে মানুষ প্রকৃতিকে উন্নত করেছেঃ বাচ্চা মুরগিকে শিয়ালের মুখে থেকে বাঁচিয়ে মুরগির সংখ্যা বাড়িয়েছে, জীবন লম্বা করে দিয়েছে। যে ঘাসের দানা কেউ খেত না, সে দানাকে নিজের খাবার করে নিয়েছে; যে নৌকা প্রকৃতির বাপের সাধ্য ছিলোনা বানায় সেই নৌকা বানিয়েছে। মানুষের পাখা নেই, তার তো উড়ার কথা নয়, কিন্তু বিমানযন্ত্র বানিয়ে সে সকল পাখীর চেয়ে বেশি বেগে অনেক আরামে অনেক দূর উড়ে যায়। ৫। প্রকৃতিতে সারা দুনিয়ায় মাত্র ২৫০০০ লোক কোন রকমে মরি মরে করে বেঁচে ছিলো প্রায় ১৮০,০০০ বছর ধরে। মানুষের অন্য সকল প্রজাতি খাবারের অভাবে মরেই গেছে, বিলুপ্ত হয়েছে। প্রকৃতি মানুষের বিলুপ্তির জন্যই তৈরি ছিল, আর ২০ হাজার বছর আগের সেই পাগলামি (পশু-পক্ষী পালন) শুরু না হলে এতো দিনে মানুষ বিলুপ্ত হবারই কথা ছিল। মানুষ কিছু একটা করেছে যার জন্য সে বিলুপ্ত হয়নি। ৬। ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি আর গরিলাদের মত পশুই ছিল যারা, একদিন প্রকৃতির নিয়ম ভেঙ্গে প্রকৃতিকে বশে এনে প্রকৃতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তারা মানুষ হয়ে উঠল। যেদিন পরস্পরকে খুন করে একে অন্যের মালামাল লুট করে নেবার বদল তারা পরস্পরের কাছে থেকে মালামাল কিনে নেবার বুদ্ধি আবিষ্কার করল, সেদিন থেকে সৃষ্টি হল পাশবিক ইকোলজির জায়গায় মানবিক ইকোনোমি। এই কথাটা এতোই বড় যে এটা মেনে নিলে প্রচলিত ইকোনোমিক্সের কিচ্ছুই আর টিঁকে না। ৭। অর্থনীতি শাস্ত্রের যে কথা সবার জানা দরকার (আসলে সবাই সেটা জানেও) তা হলো যে কেড়ে আনার চেয়ে কিনে আনার খরচ কম, কেননা কেড়ে আনতে গেলে যে পরিমাণ মার খেতে হয়, তাতে পুষায় না। ৮। অর্থশস্ত্রের তিনটা মূল কথা হলো এইঃ প্রথমেই মানুষের আছে কেনা-বেচার স্বাধীনতা, যেটা থাকায় সে যা নিজে বানাতে বেশি খরচ হয় তা অন্যের কাছ থেকে কম খরচে কিনে আনতে পারে, আর নিজে যেটা কম খরচে বানাতে পারে সেটা অ্ন্যের কাছে লাভে বেচতে পারে। দ্বিতীয় সূত্রটা হল মানুষ যত মূল্যের জিনিস কিনবে তত মূল্যের পরিশোধ দিবে, যাকে বলা যায় মূল্যসমতার সুত্র বা বিধি। আপনি ১০০ টাকা দামের টি-শার্ট কিনলে ১০০ টাকাই দেবেন, কম নয়, বেশি নয়। আর তিন নম্বর সূত্রটা হলো পারস্পরিকতাঃ আপনি যদি করিমের কাছ থেকে কলা কিনেন, তাহলে কলার দাম করিমকেই দেবেন, অন্য কাউকে নয়, আর আপনি যদি ক্রেতা হন, দামটা আপনিই দিবেন, অন্য কেউ দিবেনা। যে মাল কিনেছে সেই মালের দাম দেবে, আর যে বিক্রি করেছে সেই দাম পাবে। ৯। অর্থশাস্ত্রের সব কিছুই বলা হয়ে গেছে। একটা ইকোনোমিতে যা কিছু ঘটে তার সবকিছুই কেনাবেচার স্বাধীনতা, মূল্যসমতা, আর পারস্পরিকতা এই তিন বিধি অনুসারে ঘটে। তার ব্যখ্যা বিশ্লেষণ জানতে হলে আমার এই লেখাটা পড়ে দেখুনঃ খুব টাইট করে লেখা, কিন্তু এতে আসলে সবই বলা আছে । তার চেয়ে বিস্তারিত করে বলা আছে আমার বইয়ে, যা বিনা মূল্যে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়েছি বলে সেটা রয়ে গেছে মূল্যহীন।

8833 views Answered

Related Questions

Next steps