1 Answers

আলহামদু লিল্লাহ। এক: নামাযের তাশাহ্‌হুদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দুরুদ পড়ার হুকুম নিয়ে আলেমগণ কয়েকটি অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: এটি নামাযের রুকন; যা আদায় করা ছাড়া নামায সহিহ হবে না। কেউ কেউ বলেছেন: এটি ওয়াজিব। তৃতীয় অভিমত: সুন্নত মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-উছাইমীন (রহঃ) তৃতীয় অভিমতটিকে অগ্রগণ্যতা প্রদান করেছেন। তিনি যাদুল মুসতাক্বনি এর ব্যাখ্যার মধ্যে বলেন: গ্রন্থাকারের ভাষ্য এর মধ্যে রয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দুরুদ পড়া। এর মধ্যে মানে শেষ তাশাহ্‌হুদের মধ্যে। এটি নামাযের দ্বাদশতম রুকন। এর দলিল হল— সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমাদেরকে শিখানো হয়েছে কিভাবে আপনাকে সালাম দিব? কিন্তু আপনার প্রতি সালাত বা দুরুদ পড়ব কিভাবে? তখন তিনি বললেন: তোমরা বল: اللَّهُمَّ صَلِّ على محمَّدٍ ، وعلى آل محمَّدٍ  (হে আল্লাহ্‌! মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন)। (বল) নির্দেশের দাবী হল আবশ্যকতা আরোপ করা। আবশ্যকতার মূল রূপ ফরয; যা ছেড়ে দিলে ইবাদতটি বাতিল হয়ে যায়। ফিকাহবিদ আলেমগণ এই মাসয়ালার দলিল এভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আপনি যদি এ হাদিসটি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করেন তাহলে আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দুরুদ পড়া (নামাযের) রুকন নয়। কেননা সাহাবায়ে কেরাম পদ্ধতি জানতে চেয়েছেন যে, কিভাবে তারা দুরুদ পাঠ করবেন? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এ দিক-নির্দেশনা দেন। তাই আমরা বলব, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: তোমরা বল আবশ্যকতা সাব্যস্ত করার জন্য নয়; বরং দিক-নির্দেশনা দান ও শিক্ষা দেয়ার জন্য। যদি এ দলিলটি ছাড়া অন্য কোন দলিল পাওয়া যায়; যা নামাযে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরুদ পড়ার নির্দেশ বহন করে তাহলে সেটাই হবে ধর্তব্য। আর যদি উল্লেখিত দলিল ছাড়া এমন কোন দলিল না পাওয়া যায় তাহলে এ দলিলটি ওয়াজিব হওয়া প্রমাণ করে না; থাকতো রুকন হওয়া প্রমাণ করবে। এ মাসয়ালায় আলেমগণ একাধিক অভিমত প্রদান করেছেন: প্রথম অভিমত: দুরুদ পড়া রুকন। এটি (হাম্বলি) মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত। অর্থাৎ দুরুদ পড়া ছাড়া নামায শুদ্ধ হবে না। দ্বিতীয় অভিমত: দুরুদ পড়া ওয়াজিব; রুকন নয়। ভুলে গেলে সাহু সেজদা দেওয়ার মাধ্যমে শোধরানো যাবে। এ মতাবলম্বীরা বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: তোমরা বল: হে আল্লাহ্‌! মুহাম্মদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন এখানে এ কথাটি নির্দেশসূচক কিংবা নির্দেশনাসূচক হওয়ার সম্ভাবনাময়। এই সম্ভাবনা থেকে যাওয়ার কারণে আমরা এ আমলটিকে রুকন হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারি না; যে রুকন ছাড়া নামায শুদ্ধ হয় না। তৃতীয় অভিমত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দুরুদ পড়া সুন্নত। ওয়াজিব নয়; রুকনও নয়। এক বর্ণনাতে এটি ইমাম আহমাদ থেকেও বর্ণিত আছে। অর্থাৎ যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দুরুদ পড়া ছেড়ে দেয় তবুও তার নামায সহিহ হবে। কেননা যারা দুরুদ পড়া ওয়াজিব কিংবা রুকন বলেছেন তারা যে দলিলগুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলো তাদের অভিমতের পক্ষে প্রত্যক্ষ দলিল নয়। আর মূল অবস্থা হল— দায়মুক্ত থাকা। যদি উল্লেখিত এই যে দলিলটি ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন সেটা ছাড়া আর কোন দলিল না থাকে তাহলে পূর্বোক্ত অভিমতগুলোর মধ্যে এটিই অগ্রগণ্য। কেননা আমরা একটা ইবাদতকে এমন কোন দলিল দিয়ে বাতিল বলতে পারি না যে দলিলের উদ্দেশ্য আবশ্যককরণ কিংবা দিক-নির্দেশনা প্রদান এ দুটো বিষয়ের সম্ভাবনাবহ।[আস্‌শারহুল মুমতি (৩/৩১০-৩১২) এ অভিমতের ভিত্তিতে দুরুদ পড়া ছাড়াই নামায শুদ্ধ হবে। দুই: আমাদের কর্তব্য এই ইমাম ও অন্য যে সকল ইমাম তারাবীর নামাযে অতিমাত্রায় তাড়াহুড়া করেন তাদেরকে নসীহত করা। কারণ এর দ্বারা তারা তাদের পেছনে যারা রয়েছেন তাদেরকে নামায পূর্ণাঙ্গ করার সুযোগ দেন না। আলেমগণ পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইমামের উচিত হল ধীরস্থিরে নামায আদায় করা; যাতে করে মুক্তাদিগণ নামাযের ওয়াজিব ও সুন্নতগুলো আদায় করতে পারে। মুসল্লিগণকে এগুলো আদায় করা থেকে বঞ্চিত করে এমন তাড়াহুড়া করা মাকরুহ। ইমাম নববী বলেন: এ পরিচ্ছেদের হাদিসগুলোর মর্ম সুস্পষ্ট (অর্থাৎ যে হাদিসগুলোতে ইমামকে নামায হালকা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে)। তা হচ্ছে— ইমামের প্রতি নামায এতটুকু হালকা করার নির্দেশ যাতে করে নামাযের সুন্নতসমূহ ও মাকাছিদসমূহ (উদ্দেশ্যসমূহ)-এ কোনরূপ ঘাটতি না ঘটে। আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা গ্রন্থে (১৪/২৪৩) এসেছে: হালকা করা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে— পূর্ণাঙ্গ (নামায)-এর ন্যূনতম মান রক্ষা করা। অর্থাৎ ওয়াজিব ও সুন্নতগুলো পালন করা। একেবারে সর্বনিম্ন মানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আবার সর্বোচ্চ মান পালন করতে যাবে না।  ইবনে আব্দুল বার্‌র বলেন: প্রত্যেক ইমামের জন্য নামায হালকা করার বিষয়টি ইজমাদ্বারা স্বীকৃত ও আলেমদের নিকট মুস্তাহাব। তবে হালকা করার মানে হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ নামাযের ন্যূনতম মান। পক্ষান্তরে, কোন একটি আমল বাদ দেয়া কিংবা আমলে ঘাটতি করা সেটা নয়…। এরপর তিনি বলেন: প্রত্যেক যে ব্যক্তি মানুষকে নামায পড়ান তার জন্য আমি পূর্ণাঙ্গ নামাযের যে শর্ত উল্লেখ করেছি সেটা রক্ষা করে নামায হালকা করা মুস্তাহাব— এ ব্যাপারে আমি আলেমদের মাঝে কোন মতভেদ আছে বলে জানি না। ইবনে কুদামা (রহঃ) আল-মুগনী গ্রন্থে (১/৩২৩) বলেন: ইমামের জন্য ক্বিরাত, তাসবীহ ও তাশাহ্‌হুদ এতটুকু ধীরস্থিরে পড়া মুস্তাহাব যাতে করে ধারণা হয় যে, পেছনে থাকা মুসল্লিদের মধ্যে যার জিহ্বা ভারী সেও এগুলো পড়তে পেরেছে। এবং রুকু-সেজদাতে এতটুকু দেরী করা যাতে করে ধারণা হয় যে, বড়, ছোট ও ভারী লোক সকলে এগুলো আদায় করতে পেরেছে। যদি তিনি এভাবে না করে নিজের উপর যতটুকু ফরয ততটুকু পালন করেন তাহলে মাকরুহ হবে; তবে নামায আদায় হয়ে যাবে। আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা গ্রন্থে (৬/২১৩) এসেছে: তাড়াহুড়া করা মাকরুহ। যে তাড়াহুড়ার কারণে মুক্তাদি তার উপর যা কিছু পালন করা সুন্নত সেগুলো আদায় করতে পারে না। যেমন- রুকু-সেজদাতে তিনবার করে তাসবীহ এবং শেষ তাশাহ্‌হুদে যা কিছু পড়া সুন্নত সেগুলো পালন করতে না পারা। শাইখ উছাইমীন (রহঃ) তাঁর রচিত রিসালা ফি আহকামিস সিয়াম, ওয়ায যাকাত ওয়াত তারাবীহ নামক পুস্তিকায় বলেন: পক্ষান্তরে কিছু কিছু লোক যে অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া করেন সেটি শরিয়ত বিরোধী। যদি এমন তাড়াহুড়া কোন একটি ওয়াজিব পালন কিংবা রুকন পালনে ঘাটতি ঘটায় তাহলে সেটা নামাযকে বাতিল করে দিবে। অনেক ইমাম তারাবীর নামাযে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করেন না। এটি ভুল। কারণ ইমাম কেবল নিজের জন্য নামায পড়ছেন না। তিনি নিজের জন্য ও অন্যদের জন্য নামায পড়ছেন। তিনি হচ্ছেন অভিভাবকের ভূমিকায়; যার কর্তব্য হচ্ছে (সকলের জন্য) তুলনামূলক যেটা ভাল সেটা করা। আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, ইমামের জন্য এতবেশি তাড়াহুড়া করা মাকরুহ যার ফলে মুক্তাদিরা তাদের উপর যা পালন করা ওয়াজিব সেগুলো পালন করতে পারেন না।[সমাপ্ত] আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ। 

8010 views