4 Answers

বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ দাবীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও বস্তুত এর বীজ বপিত হয়েছিল বহু আগে, অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। কিন্তু পাকিস্তানের দু’টি অংশ - পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিরাজ করছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যতঃ পূর্ব পাকিস্তান অংশের বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদি বে-আইনী ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক [১] , সালাম , বরকত-সহ [২][৩] আরও অনেকে। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষাবধি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে যা বৈশ্বিক পর্যায়ে সাংবার্ষিকভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়।

3279 views

ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক শুরুটা পাকিস্তান জন্মের ১৬ দিন পরে। বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য গঠন করা হয় প্রথম ভাষা আন্দোলনের সংগঠন তমদ্দুন মজলিস। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভাষার দাবী আদায়ের লক্ষে “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাঙলা না উর্দু“ শিরোনামে প্রথম পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। বাঙলার কিছু মানুষ চাইতো এদেশের রাষ্ট্রভাষা হোক উর্দু। এতে উর্দু যারা ভালো জানে তারা লাভবান হবে, চাকরিতে সুবিধা পাবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাষার দাবী পক্ষে আদায়ের কথা বলার দুটি কারন ছিল। প্রথমটি ভাষা প্রেম। দ্বিতীয়টি উর্দু না জানলে তাদের উচ্চ পড়াশুনা সব বিফলে। তাই ভাষার জন্য আন্দোলন করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না। দুটানা অবস্থার মাঝে ১৯৪৭ সালের ১২ ডিসেম্বর এই বাঙলার বুকে বাঙলা এবং উর্দু সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষ হয়, আহত হয় বিশ জন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেফতার হলেন শেখ মুজিব রহমানসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সেদিন মিছিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একে ফজলুল হকও অংশগ্রহণ করে। আহত হয় পঞ্চাশ জনের মতো। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ জিন্নাহ প্রথম বাঙলায় আসে। জিন্নাহ পাকিস্তানের জনক। বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের অধীনে। তাই জিন্নাহ তৎকালীন বাঙলারও পিতা। দেশ জনকের প্রতি প্রথম দিকে বাঙালির ভালোবাসা ছিল বলে ধারনা করতে পারি। কিন্তু ২১ মার্চ তিনি রেসকোর্সের ভাষণে বললেন উর্দুই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। বলা যায় তখন থেকেই জিন্নাহ তার ভালোবাসায় আগুণ জ্বালিয়ে দিলো। ভাষা ছিনিয়ে নেওয়ার এই বর্বর সিদ্ধান্ত বাঙালির চোখে জিন্নাহ হয়ে উঠল আদর্শ নেতা থেকে চরম শত্রু। রেসকোর্সে ভাষণের দু’দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ একই ভুল আবার করেন। জিন্নাহ ঘোষণা দিলো “অখণ্ড পাকিস্তানের ভাষা হবে উর্দু।“ সমাবর্তন সভার মাঝেই বিরোধিতা করে উঠল ভাষা মতিন। তিনি চিৎকার দিয়ে বলনে, “না, না। তা হবে না।“ সমাবর্তন অনুষ্ঠান মঞ্চ হয়ে গেলো রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে ভাষা আন্দোলনের দাবীর ক্ষেত্র। ১৯৪৮ সালে ১৪ নভেম্বর প্রকাশ করা হয় ভাষা আন্দোলনের প্রথম মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক। আন্দোলনের মাঝে দিন- রাত চলতে থাকে। এমন সময় ১৯৪৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রস্তাব করা হয় আরবি হরফে বাঙলা লেখার জন্য। যা ছিল বাঙলা ভাষার জন্য চূড়ান্ত অপমান এবং একটি ভাষা ধ্বংসের বিচক্ষণ পক্রিয়া। দিন চলতে থাকে জুলুমের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৯ সালের ৯ জানুয়ারি “মুসলিম ছাত্রলীগ” দিনটিকে প্রথম “জুলুম দিবস” পালন করে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে, প্রতিটি ১১ মার্চ ভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ ভাষা দিবস পালনের সময় প্রথম রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই শ্লোগানে প্ল্যাকার্ড এবং পতাকা তৈরি করা হয়। ভাষার দাবী আদায়ের জন্য ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ হরতাল, ধর্মঘট, মিছিল, সমাবেশ, ১৪৪ ধারা সব লেগেই ছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতেও ১৪৪ ধারা ছিল। তাই আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি আসতে থাকে। আলোচনার শেষ রাতে ভোটে সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না। আন্দোলনে প্রথম সাড়ি নেতাদের পনের ভোটের মাঝে এগারো ভোট ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি কোন মিছিল-সমাবেশ করার বিপক্ষে। তবুও ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ৮ ফাল্গুন, বৃহস্পতিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্যাম্পাসে একত্র হতে থাকে। বেলা এগারোটায় সভা হয়। সভার মাঝেই বক্তাদের বক্তব্যে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি চলতে থাকে। সব শেষে ভাষা মতিনের জোরালো বক্তব্যে আগুণ ছড়িয়ে পড়ে। শ্লোগান উঠতে থাকতে ১৪৪ ধারা ভাঙার। তীব্র শ্লোগানে নেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন ১৪৪ ধারা ভাঙার। চারপাশে পুলিশ, তাই ছোট দল করে ক্যম্পাস থেকে বের হবার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এর মাঝেই পুলিশ কাঁদানো গ্যাস ছুড়তে থাকে। বিকাল তিনটায় আইন পরিষদের সভা ছিল। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আইন পরিষদের দিকে যেতে থাকে। পুলিশ ছাত্রদের উপর লাঠি চার্জ চালায়। ছাত্ররা ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। একসময় পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মাঝে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হয় কয়েকজন, আহত হয় ১৭জন। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত হয় শহীদ মিনার বানানোর। মেডিক্যাল নতুন বিল্ডিং তৈরির জন্য পাশেই ইট বালি ছিল তা দিয়ে রাতের মাঝেই নির্মাণ করা প্রথম শহীদ মিনার। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউরের পিতা। ২৬ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়। এরপরেও পরের বছর ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাঙা শহীদ মিনারের মানুষের ঢল নামে। ১৯৫৪-৫৫ সালে যাতে আন্দোলন করা না যায়, তার জন্য ফেব্রুয়ারির আগেই গ্রেফতার করা হয় সব আন্দোলন কর্মীদের। জমতে থাকা দ্রোহের ভয়ে অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। ভাষা আন্দোলনের অনেক বছর পর ভাষা আন্দোলন দিনটিকে ইংরেজি তারিখে কেন স্মরণ করা হয় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে উত্তরটাও খুব সহজ। পৃথিবীর পাতায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসটা রচিত হয়েছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে। বায়ান্নতে আন্দোলনের সময় নেতারা প্রচারের কাজে প্রতিবাদের দিন ঠিক করেছিল ২১শে ফেব্রুয়ারী; কোথাও ৮ই ফাল্গুন লেখা ছিল না। পরে দেখা যায় ৮ই ফাল্গুনটা বিশ্ববাসীর কাছেও পরিচিত পাবে না। তাছাড়া আন্তঃর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে হলে আন্দোলনে গ্রেগরিয়ান তারিখ লিখতে হবে। তাই আমাদের ভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৮ সালে কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যাক্তি জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে চিঠি লিখে যুক্তি দিয়ে অনুরোধ করেন ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস করার জন্য। জাতিসংঘের মহাসচিব পত্রটি গুরুত্ব দিয়েই নিলেন। ইউনস্কো দেখলো বিশ্বের মাঝে বিলুপ্ত ভাষার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বিলুপ্ত ভাষা রক্ষা এবং ভাষা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৯৯ সালে ইউনস্কোর ঘোষণা আসলো ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস।

3279 views

ভাষা আন্দোলন  বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সংগঠিত গণআন্দোলন। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে  উর্দু। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দাবি ওঠে, বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলা ভাষার এ দাবিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে। এতে ঢাকার ছাত্র ও  বুদ্ধিজীবী মহল ক্ষুব্ধ হন এবং ভাষার ব্যাপারে তাঁরা একটি চূড়ান্ত দাবিনামা প্রস্ত্তত করেন; দাবিটি হলো: পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ও সরকারি কার্যাদি পরিচালনার মাধ্যম হবে বাংলা আর কেন্দ্রীয় সরকার পর্যায়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি বাংলা ও উর্দু।


ভাষাসংক্রান্ত এই দাবিকে সামনে রেখে সর্বপ্রথম আন্দোলন সংগঠিত করে তমদ্দুন মজলিস। এর নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। ক্রমান্বয়ে অনেক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সংগঠন এই আন্দোলনে যোগ দেয় এবং একসময় তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়।



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা (১৯৫২)

অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ফোরামে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টা চলে। এতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভার আয়োজন করে। সভার পরও মিছিল-প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। এ মাসেরই শেষদিকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া। পরের বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদ সদস্যদের উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য  ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এ প্রস্তাবে সংশোধনী এনে বাংলাকেও পরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই পূর্ব পাকিস্তানের, যাদের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী  খাজা নাজিমুদ্দীন বিরোধিতা করলে এ দাবি বাতিল হয়ে যায়। এ খবর ঢাকায় পৌঁছলে ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরা বিক্ষুব্ধ হন। আজাদ-এর মতো পত্রিকাও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আনা প্রস্তাবে যারা বিরোধিতা করেছিল তাদের সমালোচনা করে। পরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন পরিচালনার জন্য একটি নতুন রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন শামসুল আলম।


ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি স্মরণীয় দিন। গণপরিষদের ভাষা-তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকেটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাখার প্রতিবাদস্বরূপ ওইদিন ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটিদের দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা। ধর্মঘটের পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই শ্লোগানসহ মিছিল করার সময় শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, অলি আহাদ,  শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুল ওয়াহেদ প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। আব্দুল মতিন, আবদুল মালেক উকিল প্রমুখ ছাত্রনেতাও উক্ত মিছিলে অংশ নেন; বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট সভা হয়। একজন পুলিশের নিকট থেকে রাইফেল ছিনিয়ে চেষ্টা করলে পুলিশের আঘাতে মোহাম্মদ তোয়াহা মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১২-১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়।


আন্দোলনের মুখে সরকারের মনোভাব কিছুটা নমনীয় হয়। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তবে চুক্তিতে তিনি অনেকগুলি শর্তের সঙ্গে একমত হলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাঁকে কোনো কিছুই মানানো যায়নি।


১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল  মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি ঢাকার দুটি সভায় বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গাতেই তিনি বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এ সময় সারা পূর্ব পাকিস্তানেই ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। জিন্নাহর বক্তব্য তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়; এর আহবায়ক ছিলেন আবদুল মতিন।

১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। এ সময় জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খান উভয়েই পরলোকগত। লিয়াকত আলী খানের জায়গায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দীন। রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুসলিম লীগের প্রতি আস্থা হারাতে থাকে। ১৯৪৯ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। পূর্ব পাকিস্তানে বঞ্চনা ও শোষণের অনুভূতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং এখানকার জনগণ ক্রমেই এই মতে বিশ্বাসী হতে শুরু করে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জায়গায় তাদের ওপরে আরোপিত হয়েছে নতুন ধরনের আরেক উপনিবেশবাদ। এ প্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায় 

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, প্রদেশের সরকারি কাজকর্মে কোন ভাষা ব্যবহূত হবে তা প্রদেশের জনগণই ঠিক করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের এক সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। এ সময় সরকার আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব পেশ করে। এর বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ( একুশে ফেব্রুয়ারি) সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে  হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

এসব কর্মসূচির আয়োজন চলার সময় সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আবুল হাশিমের (১৯০৫-৭৪) সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে কিনা এ প্রশ্নে সভায় দ্বিমত দেখা দেয় তবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সঙ্কল্পে অটুট থাকে।

পরদিন সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাংশে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। সভা শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকসহ উপাচার্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন। তবে ছাত্র নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে আবদুল মতিন এবং গাজীউল হক নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়। ছাত্ররা পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাঁদের উপর লাঠিচার্জ করে, ছাত্রীরাও এ আক্রমন থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্রছাত্রীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে  রফিক উদ্দিন আহমদ,  আবদুল জববার,  আবুল বরকত (রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ শ্রেণীর ছাত্র) নিহত হয়। বহু আহতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে সেক্রেটারিয়েটের পিয়ন আবদুস সালাম মারা যায়। অহিউল্লাহ্ নামে আট/নয় বছরের এক কিশোরও সেদিন নিহত হয়।


এ সময় গণপরিষদের অধিবেশন বসার প্রস্ত্ততি চলছিল। পুলিশের গুলি চালানোর খবর পেয়ে গণপরিষদ সদস্য মওলানা তর্কবাগীশ এবং বিরোধী দলের সদস্যসহ আরও কয়েকজন সভাকক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী  নূরুল আমীন বাংলা ভাষার দাবির বিরোধিতা অব্যাহত রেখে বক্তব্য দেন।


পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছিল গণবিক্ষোভ ও পুলিশি নির্যাতনের দিন। জনতা নিহতদের গায়েবানা জানাজার  নামায পড়ে ও শোকমিছিল বের করে। মিছিলের উপর পুলিশ ও মিলিটারি পুনরায় লাঠি, গুলি ও বেয়োনেট চালায়। এতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন শহীদ হন এবং অনেকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা যে স্থানে গুলির আঘাতে নিহত হয় সেখানে ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে এই অস্থায়ী নির্মাণের জায়গায় একটি কংক্রীটের স্থাপনা নির্মিত হয়।


গণপরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিল পাস করে। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন অব্যাহত ছিল। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনুমোদনের মাধ্যমে এই আন্দোলন তার লক্ষ্য অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬) এক পর্যায়ে এর সদস্য ফরিদপুরের আদেলউদ্দিন আহমদের (১৯১৩-১৯৮১) দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব অনুযবাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।


১৯৫২ সালের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য বাঙালিদের সেই আত্মত্যাগকে স্মরণ করে দিনটি উদ্যাপন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। 

Source : banglapedia

3279 views

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল ইং, ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বাং, বৃহস্পতিবার

পূর্ব ইতিহাস


১৯৪৭ সালের ১৪/১৫ আগস্ট ইংরেজ মস্তিষ্কপ্রসূত দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত হয় ভারতবর্ষ। জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ- পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান।

জন্মলগ্ন থেকেই বাঙালিপ্রধান পূর্ব পাকিস্তানের শোষক, নির্যাতক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পশ্চিম পাকিস্তান।

হাজার বছর ধরেই ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় বঙ্গভূমির জনগণের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও…

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভাষণকালে কায়েদে আজম মোহম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, “উর্দু, এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।”

তার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে গোটা বাংলা।

তৎকালীন বহুভাষিক রাষ্ট্র পাকিস্তানে বিভিন্ন অঞ্চলে মাতৃভাষাভিত্তিক পরিসংখ্যানমতে,

বাংলায় কথা বলে প্রায় ৫৪% জন

পাঞ্জাবিতে প্রায় ২৭% জন

উর্দুতে প্রায় ৬% জন

পশতুতে প্রায় ৬% জন

হিন্দিতে প্রায় ৫% জন

ইংরেজিতে প্রায় ২% জন

গণ-আজাদী লীগ : ভাষার দাবীতে সোচ্চার

১৯৪৭ সালে জুন মাসের শেষ দিকে ঢাকায় গঠিত হয় আদর্শভিত্তিক একটি ক্ষুদ্র সংগঠন : গণ-আজাদী লীগ [East Pakistan Peoples’ Freedom League] প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান আহ্বায়ক : কমরুদ্দীন আহমেদ

পরবর্তীতে যোগ দেন প্রখ্যাত বামপন্হী নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ, মোহম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখ। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা, নামে বাঙালি ও কার্যত বাঙালির শত্রু খাজা নাজিমউদ্দীনের যাবতীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনতিক কর্মকান্ড প্রতিরোধ করা। ভাষার দাবীতে গণ-আজাদী লীগের মেনিফেস্টোতে বলা হয়-

মাতৃভাষার সাহায্যে শিক্ষাদান করিতে হইবে।

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাকে দেশের যথোপযোগী করিবার জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্হা করিতে হইবে। বাংলা হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।

তমদ্দুন মজলিস : ভাষার দাবীতে ঐক্যবদ্ধ

১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মলাভ করে সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস। এটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান, অধ্যাপক ও ছাত্রদের সম্মিলিত উদ্যোগের ফসল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ছিলেন এর প্রধান।

১৫ সেপ্টেম্বর তারা একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন- ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা- বাংলা না উর্দু?’ এখানে ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাব করা হয়-

১.বাংলা ভাষাই হবে

ক. পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন

খ. পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা

গ. পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা

২.পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি- বাংলা ও উর্দু

৩.ক. বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাবিভাগের প্রথম ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা একশ জনই এ ভাষা শিক্ষা করবেন।

খ. পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা। যারা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকুরি ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত হবেন, তারাই শুধু ও ভাষা শিক্ষা করবেন। ইহা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫ হইতে ১০ জন শিক্ষা করলেও চলবে। মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণীতে এই ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেওয়া হবে।

গ. ইংরেজি হবে পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। পাকিস্তানের কর্মচারী হিসেবে যারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকুরি করবেন বা যারা উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষায় নিয়োজিত হবেন তারাই শুধু ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানে হাজারকরা ১ জনের বেশি কখনো হবে না। ঠিক একই নীতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলিতে ওখানের (স্হানীয় ভাষার দাবী না উঠলে) উর্দু হবে প্রথম ভাষা, বাংলা দ্বিতীয় ভাষা আর ইংরেজি তৃতীয় ভাষার স্হান অধিকার করবে।

৪.শাসনকাজ ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধার জন্য আপাততঃ ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকাজ চলবে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনানুযায়ী বাংলা ভাষার সংস্কার করতে হবে। দেশের শক্তির যাতে অপচয় না হয় এবং যে ভাষায় দেশের জনগণ সহজে অল্প সময়ে লিখতে, শিখতে ও বলতে পারে, সে ভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা। এই অকাট্য যুক্তিই উপরোক্ত প্রস্তাবের প্রধান ভিত্তি। না হলে ইংজে সাম্রাজ্যবাদ যেমন জনগণের মত না নিয়ে বা তাদের অসুবিধার দিকে না লক্ষ্য রেখে ইংরেজিকে জোর করে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল- শুধু কিংবা বাংলাকে সমস্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করলে ঠিক সেই সাম্রাজ্যবাদী যৌক্তিক নীতিরই অনুসরণ করা হবে। অথচ এই অবজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক প্রচেষ্টাই আজ কোন কোন মহলে দেখা দিয়েছে। ইহা সত্যিই বড় লজ্জাকর ও দুর্বল মনের অভিব্যক্তি। একে সর্বপ্রকারে বাধা দিতে হবে। এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এরই সূচনা হিসেবে আমরা কয়েকজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের প্রবন্ধ প্রকাশ করছি এবং সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেককে এই আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি

3279 views

Related Questions