3 Answers
(((( বর্তমানে সেরা পুষ্টিকর খাদ্য হলো ভেস্টিজ স্পিরুলিনা )))) অনেক অনুজীবকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় । এরকম একটি অনুজীবের কথা আজকে বলবো । এর নাম স্পিরুলিনা (Spirulina) । স্পিরুলিনা হলো অতি ক্ষুদ্র নীলাভ সবুজ শৈবাল । এটি সাধারণত পানিতে জন্মে । সামুদ্রিক শৈবাল নামেই এর বেশি পরিচিতি । বর্তমানে কৃত্রিম জলাধারে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন হচ্ছে । জানা যায়, আফ্রিকার ‘শাদ’ নামক হ্রদ এলাকায় উপজাতীয়দের কাছে এটি অতি পরিচিত। তারা প্রায় ১০০ বছর ধরে স্পিরুলিনা খেয়ে আসছে। তারা এ সবুজ খাদ্যকে ‘দিহে’ বলে থাকে । একবার ইউরোপের কিছু গবেষক আফ্রিকার এক এলাকায় গিয়েছিলেন গবেষণার জন্য কিছু ডাটা সংগ্রহ করতে । গবেষকরা দেখতে পেলেন এলাকার লোকজন বেশ স্বাস্থ্যবান এবং সুস্থ । তারা কিছুটা আশ্চর্যই হলেন । কারণ সেখানে এমন কোন পুষ্টিযুক্ত খাবার ছিলোনা যা খেয়ে স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ থাকা সম্ভব । এরপর গবেষকরা তাদের খাবার তালিকা ঘেঁটে এমন কিছু খুঁজে পেলেন যা মানুষকে সুস্থ ও সবল রাখে । সেটা এমন কিছুনা । সেটা হলো সবুজ শ্যাওলা বা স্পিরুলিনা । যেটা আমাদের দেশে খালবিলে জন্মে । বিজ্ঞানীরা চারদশকেরও আগে এই আশ্চর্য পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও রোগ প্রতিরোধক স্পিরুলিনাকে পরিচিত করেছেন । যার ফলে বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের মানুষ নিয়মিত এটি খাচ্ছে । এটি খাদ্য হিসেবে শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিকরও বটে । স্পিরুলিনাকে প্রোটিনের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যায় । শুষ্ক স্পিরুলিনাতে রয়েছে ৬০%-৭০% অত্যন্ত উচ্চ শ্রেণীর কোলেষ্টেরল মুক্ত প্রোটিন যা মানবদেহের ভারসাম্যতায় অপরিহার্য্য পুষ্টির উৎস। প্রোটিন ছাড়াও এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, লৌহ, প্রয়োজনীয় ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, বিটা ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৬, ভিটামিন কে এবং ভিটামিন ডি। প্রতি ১০০ গ্রাম স্পিরুলিনায় প্রায় ৩৭৪ কিলোক্যালরি শক্তি রয়েছে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন স্পিরুলিনাকে খাদ্যের বিকল্প হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে । সাধারণ খাদ্য হিসেবে তো বটেই নানা রোগ নিরাময়ে মুল্যবান ভেষজ হিসেবে দেশে- বিদেশে স্পিরুলিনার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। স্পিরুলিনাতে আছে উচ্চমাত্রার GLA যা মাতৃদুগ্ধ ও স্পিরুলিনা ছাড়া অন্য কোন খাদ্যে উচ্চমাত্রায় পাওয়া যায় না। GLA (Gama Linolenic Acid) ক্ষতিকারক LDL Cholesterol কমায়। যার ফলে হৃদরোগ, ব্রেনস্ট্রোক-এর ঝুকি হ্রাস পায় এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়াও স্পিরুলিনাতে রয়েছে উচ্চমাত্রার বিটা ক্যারোটিন এবং আরো ১০টি ক্যারোটেনয়েডের বিপুল ভান্ডার যা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ও টিউমার-এর বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্থ করে । স্পিরুলিনা দেহের অন্ত্রে Lactobacillus-এর সংখ্যা বৃদ্ধি করে যা হজম শক্তি বৃদ্ধি, রোগ জীবানু থেকে রক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা এইডস প্রতিরোধে সহায়ক । স্পিরুলিনা ইনস্যুলিন উৎপাদনকারী প্যানক্রিয়াসের নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে (B-Cell) ধীরে ধীরে পুনঃজীবিত করে তোলে। তাই ইনস্যুলিন হরমোন নিঃসরনে সাহায্য করার কারনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকে। জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের জন্য এটিকে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য বলে সুপারিশ করেছে । জার্মানি ও ভারত থেকে প্রকাশিত জার্নালে দেখা যায়, সামান্য কয়েকগ্রাম স্পিরুলিনা সেবনে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, মানুষের হজম শক্তি বাড়ায় এমনকি চোখের রোগের সংক্রমণ হ্রাস পায়। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে স্পিরুলিনা নির্যাস এইচআইভি ভাইরাসের ক্রিয়ার গতি মন্থর করে । ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে স্পিরুলিনাকে আগামী দিনের সেরা খাদ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয় । আমাদের জন্য আশার কথা হলো এই স্পিরুলিনা দিন দিন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে । এছাড়াও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) থেকে প্রকাশিত জার্নালে দেখা যায় [Bangladesh J. Sci. Ind. Res. 41(3-4), 227- 234, 2006] বাংলাদেশের জলবায়ু স্পিরুলিনা উৎপাদনে জন্য বেশ সহায়ক এবং এদেশের আবহাওয়ায় সারাবছর বিপুল পরিমান স্পিরুলিনা চাষ করা সম্ভব । বাংলাদেশে BCSIR এর ফর্মুলা ও তত্ত্বাবধানে শৈবাল স্পিরুলিনা থেকে বিশেষ উপায়ে ট্যাবলেটও বর্তমানে তৈরী করা হচ্ছে । যা থেকেও উপরোক্ত পুস্টিগুন পাওয়া সম্ভব । সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ডাক্তার এবং BCSIR -এর বিজ্ঞানীরা ৬০ জন রোগীর উপর স্পিরুলিনা নিয়ে গবেষণা চালান । গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ৯-১০ গ্রাম করে স্পিরুলিনা খাওয়ালে ৪-৬ মাস পর রোগীর আর্সেনিকজনিত চর্মরোগ (আর্সেনিকোসিস) সম্পূর্ণরূপে উপশম হয়। পরিশেষে বলবো স্পিরুলিনা একটি শক্তিবর্ধক সম্পূরক খাদ্য । পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন স্পিরুলিনা নিয়মিত সেবন করলে যেমন দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয় তেমনি আমাদের অজান্তেই অনেক দুরারোগ্য রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে ।