وَلَا تَقۡرَبُواْ مَالَ ٱلۡيَتِيمِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ أَشُدَّهُۥۚ وَأَوۡفُواْ ٱلۡكَيۡلَ وَٱلۡمِيزَانَ بِٱلۡقِسۡطِۖ لَا نُكَلِّفُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۖ وَإِذَا قُلۡتُمۡ فَٱعۡدِلُواْ وَلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبَىٰۖ وَبِعَهۡدِ ٱللَّهِ أَوۡفُواْۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ

ওয়ালা- তাকরবূমা-লাল ইয়াতীমি ইলা-বিল্লাতী হিয়া আহছানুহাত্তা-ইয়াবলুগা আশুদ্দাহুূ ওয়া আওফুল কাইলা ওয়াল মীঝা-না বিলকিছতি লা-নুকালিলফুনাফছান ইল্লাউছ‘আহা- ওয়া ইযা-কুলতুম ফা‘দিলূওয়া লাও ক-না যা-কুরবা- ওয়া বি‘আহদিল্লা-হি আওফূ যা-লিকুম ওয়াসসা-কুম বিহী লা‘আল্লাকুম তাযাক্কারূন।উচ্চারণ

(৬) আর তোমরা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত এতিমের সম্পদের ধারে কাছেও যেয়ো না, তবে উত্তম পদ্ধতিতে যেতে পারো। ১৩২ <br/> (৭) ওজন ও পরিমাপে পুরোপুরি ইনসাফ করো, প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর আমি ততটুকু দায়িত্বের বোঝা রাখি যতটুকু তার সামর্থ্যের মধ্যে রয়েছে। ১৩৩ <br/>(৮) যখন কথা বলো, ন্যায্য কথা বলো, চাই তা তোমার আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারই হোক না কেন। <br/>(৯) আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। ১৩৪ <br/> এ বিষয়গুলোর নির্দেশ আল্লাহ‌ তোমাদের দিয়েছেন, সম্ভবত তোমরা নসীহত গ্রহণ করবে। তাফহীমুল কুরআন

ইয়াতীম পরিপক্ক বয়সে না পৌঁছা পর্যন্ত তার সম্পদের নিকটেও যেয়ো না, তবে এমন পন্থায় (যাবে, তার পক্ষে) যা উত্তম হয় এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ানুগভাবে পরিপূর্ণ করবে। আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত কষ্ট দেই না। #%৯৩%# এবং যখন (কোনও কথা) বলবে, তখন ন্যায্য বলবে, যদিও নিকটাত্মীয়ের বিষয়ে হয়। আর আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে। #%৯৪%# আল্লাহ এসব বিষয়ে তোমাদেরকে গুরুত্বের সাথে আদেশ করেছেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। মুফতী তাকী উসমানী

আর ইয়াতীমরা বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ব্যতীত তাদের বিষয় সম্পত্তির কাছেও যেওনা, আর আদান-প্রদান, পরিমান-ওজন সঠিকভাবে করবে, আমি কারও উপর তার সাধ্যাতীত ভার (দায়িত্ব/কর্তব্য) অর্পন করিনা, আর তোমরা যখন কথা বলবে তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায়ানুগ কথা বলবে, আর আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে এসব বিষয় নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা তাঁর এ নির্দেশ ও উপদেশ গ্রহণ কর।মুজিবুর রহমান

এতীমদের ধনসম্পদের কাছেও যেয়ো না; কিন্তু উত্তম পন্থায় যে পর্যন্ত সে বয়ঃপ্রাপ্ত না হয়। ওজন ও মাপ পূর্ণ কর ন্যায় সহকারে। আমি কাউকে তার সাধ্যের অতীত কষ্ট দেই না। যখন তোমরা কথা বল, তখন সুবিচার কর, যদিও সে আত্নীয়ও হয়। আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইয়াতীম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম ব্যবস্থা ব্যতীত তোমরা তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হবে না এবং পরিমাণ ও ওজন ন্যায্যভাবে পুরাপুরি দিবে। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য বলবে-স্বজনের সম্পর্কে হলেও আর আল্লাহ্কে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এইভাবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর তোমরা ইয়াতীমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না, সুন্দর পন্থা ছাড়া। যতক্ষণ না সে পরিণত বয়সে উপনীত হয়, আর পরিমাপ ও ওযন ইনসাফের সাথে পরিপূর্ণ দেবে। আমি কাউকে তার সাধ্য ছাড়া দায়িত্ব অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ইনসাফ কর, যদিও সে আত্মীয় হয় এবং আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ কর। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।আল-বায়ান

(ইয়াতীমরা) বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্য ছাড়া ইয়াতীমদের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। পরিমাপ ও ওজন ন্যায়সঙ্গতভাবে পূর্ণ কর, আমি কোন ব্যক্তির উপর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেই না, যখন কথা বলবে তখন ইনসাফপূর্ণ কথা বলবে- নিকটাত্মীয়দের সম্পর্কে হলেও, আর আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূর্ণ কর। এসব ব্যাপারে তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।তাইসিরুল

"আর এতীমের সম্পত্তির কাছে যেও না যা শ্রেষ্ঠতর সেই উদ্দেশ্য ব্যতীত, যে পর্যন্ত না সে তার সাবালকত্বে পৌঁছে। আর পুরো মাপ ও ওজন দেবে ন্যায্যভাবে।" আমরা কোনো লোকের উপরে ভার চাপাই না যা তার ক্ষমতার অতিরিক্ত। "আর যখন তোমরা কথা বলো তখন ন্যায়নিষ্ঠ হও যদিও তা আপনজনের ব্যাপারে হয়। আর আল্লাহ্‌র ওয়াদা সম্পাদন করো। -- এইসব দিয়ে তোমাদের তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা মনোনিবেশ করো।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১৩২

অর্থাৎ এমন পদ্ধতিতে, যা হবে সর্বাধিক নিঃস্বার্থপরতা, সদুদ্দেশ্য ও এতিমের প্রতি সদিচ্ছা ও কল্যাণকামিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যার বিরুদ্ধে আল্লাহর অসন্তোষ বা মানুষের আপত্তি উত্থাপন করার কোন অবকাশই না থাকে।

১৩৩

এটি যদিও আল্লাহর শরীয়াতের একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র নীতি তবুও এটি বর্ণনার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজস্ব পরিসরে ওজন-পরিমাপ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে সততা ও ইনসাফের পরিচয় দেবার চেষ্টা করবে সে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। কিছু ভুল-চুক বা অজ্ঞাতসারে কমবেশী হয়ে গেলে সেজন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে না।

১৩৪

“আল্লাহর অঙ্গীকার” বলতে এমন অঙ্গীকার বুঝায় যা মানুষ তার সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন ইলাহর তথা আল্লাহর সাথে করে। আবার এমন অঙ্গীকারও বুঝায় যা আল্লাহর নামে বান্দার সাথে করে। একটি মানব শিশু এ আল্লাহর যমীনে মানব সমাজে চোখ মেলে তাকাবার সাথে সাথেই আল্লাহ‌ ও মানুষ এবং মানুষ ও মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে অঙ্গীকারের বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাও এ অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত।

প্রথম অঙ্গীকার ও চুক্তি দু’টি হয় সচেতন ও ইচ্ছাকৃত। অন্যদিকে তৃতীয়টি হয় একটি প্রাকৃতিক ও স্বভাবজাত (Natural Contact) অঙ্গীকার ও চুক্তি। এ তৃতীয় চুক্তিটি সম্পাদনে মানুষের ইচ্ছা ও সংকল্পের কোন হাত না থাকলেও পরিপূর্ণ মর্যাদা সম্পন্ন হবার দিক দিয়ে প্রথম দু’টির তুলনায় এটি কোন অংশে খাটো নয়। আল্লাহ‌ মানুষকে যে অস্তিত্ব দান করেছেন, তাকে যে শারীরিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি দান করেছেন, তাকে দেহের অভ্যন্তরে যে যন্ত্রপাতি ও কলকব্জা দান করেছেন, যমীনে তার জন্য সৃষ্ট উপায়-উপকরণ ও জীবিকা ব্যবহারের যে ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রাকৃতিক বিধি-ব্যবস্থার মাধ্যমে জীবন যাপনের যে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হয় তা থেকে লাভবান হবার যে সুযোগ তাকে দিয়েছেন-এসবগুলোই স্বতস্ফূর্ত ও স্বাভাবিকভাবে তার ওপর আল্লাহর কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। অনুরূপভাবে মানব শিশুর একটি মানব জননীর পেটে তার রক্তে প্রতিপালিত হওয়া, একটি পিতার পরিশ্রমলব্ধ কুটীরে জন্মগ্রহণ করা এবং একটি সমাজবদ্ধ অঙ্গনে অসংখ্য সংগঠন সংস্থা থেকে বিভিন্ন প্রকারে সাহায্য-সহায়তা লাভ করার কারণে মর্যাদা ও গুরুত্বের ক্রমানুসারে তার ওপর বহু ব্যক্তি ও সমাজ সংস্থার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর সাথে মানুষের এবং মানুষের সাথে মানুষের কৃত এই অঙ্গীকার অবশ্যি কোন কাগজে লিখিত হয়নি ঠিকই কিন্তু তার সমগ্র সত্তা এ চুক্তি ও অঙ্গীকারের ফসল। এ চুক্তি ও অঙ্গীকারের দিকে সূরা বাকারার ২৭ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ফাসেক হচ্ছে তারা যারা “আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করার পর তা ভেঙে ফেলে, আল্লাহ‌ যাকে সংযুক্ত করার হুকুম দিয়েছেন তাকে কেটে ফেলে এবং যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে।” পরবর্তী পর্যায়ে সূরা আ’রাফের ১৭২ আয়াতেও এরই উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সৃষ্টির আদি পর্বে আল্লাহ‌ আদমের পিঠ থেকে তার সন্তানদের বের করে তাদেরকে এ মর্মে সাক্ষ্য দিতে বলেছিলেন-আমি কি তোমাদের রব নই? এর জবাবে তারা স্বীকৃতি দিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ আমরা এর সাক্ষী।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

বেচা-কেনার সময় পরিমাপ ও ওজন যাতে ঠিক ঠিক হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা অবশ্য কর্তব্য, তবে আল্লাহ তাআলা এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এ ব্যাপারে সাধ্যের বাইরে কিছু করার প্রয়োজন নেই। কেননা তিনি বান্দার পক্ষে যা রক্ষা করা সম্ভব নয়, সে রকম কোন হুকুম দিয়ে বান্দাকে কষ্টে ফেলেন না। বান্দার যতটুকু করার সাধ্য আছে, ততটুকু পরিমাণ আদেশই তিনি তাকে করেছেন। কাজেই চেষ্টা থাকা চাই যাতে মাপ ঠিক-ঠাক হয়, কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও সামান্য কিছু হেরফের থেকে গেলে তাতে দোষ নেই। কেননা তা থেকে বাঁচা অতি কঠিন।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৫২. আর ইয়াতীম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম ব্যবস্থা ছাড়া তোমরা তার সম্পত্তির ধারে-কাছেও যাবে না(১) এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দেবে(২)। আমরা কাউকেও তার সাধ্যের চেয়ে বেশী ভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য বলবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও(৩) এবং আল্লাহকে দেয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করবে(৪)। এভাবে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।

(১) ষষ্ঠ হারাম ইয়াতীমের ধন-সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করাঃ এ আয়াতে ইয়াতীমের ধন-সম্পদ যে ভক্ষণ করা হারাম, সে সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “ইয়াতীমের মালের কাছেও যেও না; কিন্তু উত্তম পন্থায়, যে পর্যন্ত না সে বলেগ হয়ে যায়”। এখানে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ইয়াতীম শিশুদের অভিভাবককে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, তারা যেন ইয়াতীমদের সম্পদকে আগুন মনে করে এবং অবৈধভাবে তা খাওয়া ও নেয়ার ব্যাপারে নিকটবর্তীও না হয়। অন্য এক আয়াতে অনুরূপ ভাষায়ই বলা হয়েছে যে, “যারা ইয়াতীমদের মাল অন্যায় ও অবৈধভাবে ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুণ ভর্তি করে।” (সূরা আন-নিসা: ১০) তবে ইয়াতীমের মাল সংরক্ষণ করা এবং স্বভাবতঃ লোকসানের আশঙ্কা নেই- এরূপ কারবারে নিয়োগ করে তা বৃদ্ধি করা উত্তম ও জরুরী পন্থা। ইয়াতীমদের অভিভাবকদের এ পস্থা অবলম্বন করা উচিত। (কুরতুবী)

আলোচ্য আয়াতে এরপর ইয়াতীমের মাল সংরক্ষণের সীমা বর্ণনা করা হয়েছে, “সে বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত।” অর্থাৎ বয়োঃপ্রাপ্ত হয়ে গেলে অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। অতঃপর তার মাল তার কাছে সমর্পণ করতে হবে। أَشُدَّ শব্দের প্রকৃত অর্থ শক্তি। আলেমগণের মতে বয়োঃপ্রাপ্ত হলেই এর সূচনা হয়। বালক-বালিকার মধ্যে বয়োঃপ্রাপ্তির লক্ষণ দেখা দিলে, তাদের মধ্যে নিজের মালের রক্ষণা-বেক্ষণ এবং শুদ্ধ খাতে ব্যয় করার যোগ্যতা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। যোগ্যতা দেখলে বয়োঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে তার ধন-সম্পদ তার হাতে সমর্পণ করতে হবে। (কুরতুবী)

(২) সপ্তম হারাম ওজন ও মাপে ক্রটি করাঃ এ আয়াতে সপ্তম নির্দেশ ওজন ও মাপ ন্যায়ভাবে পূর্ণ করা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। ন্যায়ভাবে বলার উদ্দেশ্য এই যে, যে ওজন করে দেবে, সে প্রতিপক্ষকে কম দেবে না এবং প্রতিপক্ষ নিজ প্রাপ্যের চাইতে বেশী নেবে না। দ্রব্য আদান-প্রদানে ওজন ও মাপে কম-বেশী করাকে কুরআন কঠোর হারাম সাব্যস্ত করেছে। যারা এর বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের জন্য সূরা আল-মুতাফফিফীনে কঠোর শাস্তিবাণী বর্ণিত হয়েছে।

মুফাসসির আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ ‘ওজন ও মাপ এমন একটি কাজ যে, এতে অন্যায় আচরণ করে তোমাদের পূর্বে অনেক উম্মত আল্লাহর আযাবে পতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। (কুরতুবী; ইবন কাসীর; আদ-দুররুল মানসূর) আলোচ্য আয়াতে এরপর বলা হয়েছে, “আমরা কোন ব্যক্তিকে তার সাধ্যাতিরিক্ত কাজের নির্দেশ দেই না।” এর অর্থ এরূপও হতে পারে যে, সাধ্যমত পুরোপুরি ওজন করো, তারপরও যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজনে কমবেশী হয়ে যায়, তবে তা মাফ। কেননা, এটা তার শক্তি ও সাধ্যের বাইরে। (কুরতুবী; ইবন কাসীর; সা’দী)

(৩) অষ্টম নির্দেশ ন্যায় ও সুবিচারের বিপরীত করা হারামঃ বলা হয়েছে, “তোমরা যখন কথা বলবে, তখন ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে, যদি সে আত্মীয়ও হয়”। এখানে বিশেষ কোন কথার উল্লেখ নাই। তাই সাধারণ মুফাসসিরীনগণের মতে সব রকম কথাই এর অন্তর্ভুক্ত। কোন ব্যাপারে সাক্ষ্য হোক কিংবা বিচারকের ফয়সালা হোক অথবা পারস্পরিক বিভিন্ন প্রকার কথাবার্তাই হোক- সব ক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায় ন্যায় ও সত্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে কথা বলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (কুরতুবী)

মোকাদ্দমার সাক্ষ্য কিংবা ফয়সালার ক্ষেত্রে ন্যায় ও সত্য কায়েম রাখার অর্থ এই যে, ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে যা জানা আছে, নিজের পক্ষ থেকে কমবেশী না করে তা পরিস্কার বলে দেয়া- অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে কোন কথা না বলা এবং এতে কারো উপকার কিংবা কারো অপকারের ভ্রক্ষেপ না করা। মোকাদ্দামার ফয়সালার সাক্ষীদেরকে শরীআতের নীতি অনুযায়ী যাচাই করার পর তাদের সাক্ষ্য ও অন্যান্য সূত্র দ্বারা যা প্রমাণিত হয়, তাই ফয়সালা করা। সাক্ষ্য ও ফয়সালায় কারো বন্ধুত্ব ও ভালবাসা এবং কারো শক্রতা ও বিরোধিতা সত্য বলার পথে অন্তরায় না হওয়া উচিত। আত্মীয়তা বা অনাত্মীয় যেই হোক না কেন ন্যায় ও সত্যকে কোন অবস্থাতেই হাতছাড়া না করা। (কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর; সা’দী; আইসারুত তাফসীর; মুয়াস্‌সার)

(৪) নবম নির্দেশঃ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করাঃ বলা হয়েছে, “আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর”। এ অঙ্গীকারের দাবী হল এই যে, পালনকর্তার কোন নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। তিনি যে কাজের আদেশ দেন, তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি যে কাজে নিষেধ করেন, তার কাছেও যাওয়া যাবে না এবং সন্দেহযুক্ত কাজ থেকেও বাঁচতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পুরোপুরি আনুগত্য করতে হবে। এছাড়া এর অর্থ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত বিশেষ বিশেষ অঙ্গীকারও হতে পারে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূলদের মুখে যে সমস্ত অঙ্গীকারের ঘোষণা দিয়েছেন সেগুলো পূর্ণ করা। আল্লাহ বলেন, “হে বনী আদম! আমি কি তোমাদের থেকে এ অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শক্র?” (সূরা ইয়াসীন: ৬০) আরও বলেন, “আর তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করে যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর।” (সূরা আন-নাহ্‌ল: ৯১)

অনুরূপভাবে মানুষের মধ্যকার পরস্পর যে সমস্ত অঙ্গীকার হয়ে থাকে সেগুলোই উদ্দেশ্য। (সা’দী) আল্লাহ তা'আলা বলেন, “আর প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূর্ণ করবে।” (সূরা আল-বাকারাহঃ ১৭৭) মোটকথা, এ নবম নির্দেশটি গণনার দিক দিয়ে নবম হলেও স্বরূপের দিক দিয়ে শরীআতের যাবতীয় আদেশ নিষেধের মধ্যে পরিব্যপ্ত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৫২) পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না(1) এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ভাবে পুরাপুরি প্রদান কর।(2) আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না।(3) আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।

(1) যে ইয়াতীমের দেখা-শোনার দায়িত্ব তোমাদের উপর আসবে, তার সর্বপ্রকার কল্যাণ কামনা করা তোমাদের উপর ফরয। আর এই কল্যাণ কামনা করার দাবী হল যে, সে যে মাল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়েছে, চাহে তা স্থাবর হোক অথবা অস্থাবর, সে নিজে তা সংরক্ষণ করার যোগ্যতা রাখে না, কাজেই তার এই মালকে সেই পর্যন্ত পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে হিফাযত করবে, যে পর্যন্ত না সে সাবালকত্বের এবং ভাল-মন্দ বুঝার মত বয়সে পৌঁছে যায়। এ রকম যেন না হয় যে, দেখা-শোনার দায়িত্ব গ্রহণের নামে তার ভাল-মন্দ বোধ জ্ঞান আসার পূর্বেই তার সমস্ত মালকে নিঃশেষ করে দাও।

(2) ওজনে ও মাপে কম করা, নেওয়ার সময় পুরো মেপে নেওয়া, কিন্তু দেওয়ার সময় এ রকম না করে দাঁড়ি মেরে অপরকে কম দেওয়া হল অতি নীচ এবং জঘন্য চরিত্রের কাজ। শুআইব (আঃ)-এর জাতির মধ্যে চারিত্রিক এই রোগই বিদ্যমান ছিল, যা তাদের ধ্বংসের কারণসমূহের মূল ও প্রধান কারণ ছিল।

(3) এখানে এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল, যে কথাগুলোর উপর তাকীদ করলাম, সেগুলো এমন নয় যে, তার উপর আমল করা বড়ই কষ্টকর। যদি এমন হত, তাহলে আমি তার নির্দেশই দিতাম না। কারণ, সাধ্যের ঊর্ধ্বে আমি কারো উপর দায়িত্ব চাপাই না। কাজেই যদি আখেরাতের মুক্তি এবং দুনিয়াতেও সম্মান লাভে ধন্য হতে চাও, তবে আল্লাহর এই বিধানগুলোর উপর আমল কর এবং সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।