وَكَذَٰلِكَ نُصَرِّفُ ٱلۡأٓيَٰتِ وَلِيَقُولُواْ دَرَسۡتَ وَلِنُبَيِّنَهُۥ لِقَوۡمٖ يَعۡلَمُونَ

ওয়া কাযা-লিকা নুসাররিফুলআ-য়া-তি ওয়ালিইয়াকূ লূ দারছতা ওয়া লিনুবাইয়িনাহূ লিকাওমিইঁ ইয়া‘লামূন।উচ্চারণ

এভাবে আমার আয়াত আমি বার বার বিভিন্ন পদ্ধতিতে বর্ণনা করে থাকি। এ জন্য বর্ণনা করি যাতে এরা বলে, তুমি কারোর কাছ শিখে এসেছো এবং যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের কাছে প্রকৃত সত্যকে উজ্জ্বল করে তুলে ধরতে চাই। ৭০ তাফহীমুল কুরআন

এভাবেই আমি নিদর্শনাবলী বিভিন্ন প্রকারে বিবৃত করে থাকি, (যাতে তুমি তা মানুষের কাছে পৌঁছাও) এবং পরিশেষে তারা বলে, তুমি (কারও কাছে) শিক্ষা লাভ করেছ; #%৫২%# আর যারা জ্ঞানকে কাজে লাগায়, তাদের জন্য আমি সত্যকে সুস্পষ্ট করে দেই।মুফতী তাকী উসমানী

এ রূপেই আমি নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করি, যেন লোকেরা না বলে - তুমি কারও নিকট থেকে পাঠ করে নিয়েছ, আর যেন আমি একে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য প্রকাশ করে দিই।মুজিবুর রহমান

এমনি ভাবে আমি নিদর্শনাবলী ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বর্ণনা করি যাতে তারা না বলে যে, আপনি তো পড়ে নিয়েছেন এবং যাতে আমি একে সুধীবৃন্দের জন্যে খুব পরিব্যক্ত করে দেই।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি এভাবে নিদর্শনাবলী বিভিন্ন প্রকারে বিবৃত করি। ফলে, ওরা বলে, ‘তুমি পড়ে নিয়েছ ?’ কিন্তু আমি তো সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর এভাবেই আমি নানাভাবে আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি এবং যাতে তারা বলে, তুমি পাঠ করেছ এবং আমি যাতে বর্ণনা করি, এ কুরআন এমন কওমের জন্য যারা জানে।আল-বায়ান

এভাবেই আমি নিদর্শনগুলোকে বার বার নানাভাবে বর্ননা করি। যার ফলে তারা (অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা) বলে, তুমি (এসব কথা অন্যের কাছ থেকে) শিখে নিয়েছ, বস্তুত আমি জ্ঞানী লোকদের জন্য তা সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করি।তাইসিরুল

আর এইভাবে আমরা নির্দেশাবলী নানাভাবে বর্ণনা করি, আর যেন তারা বলতে পারে,"তুমি পাঠ করেছ", আর যেন আমরা এটি সুস্পষ্ট করতে পারি তেমন লোকদের কাছে যারা জানে।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৭০

সূরা বাকারার তৃতীয় রুকূ’তে যে কথা বলা হয়েছে সে একই কথা এখানেও বলা হয়েছে। অর্থাৎ মশা, মাকড়শা ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীট পতংগের উপমা শুনে এগুলোর মাধ্যমে যে মহাসত্য উদঘাটন করা হয়েছে সত্য সন্ধানীরা তার নাগাল পেয়ে যায়। কিন্তু অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতার রোগে যারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছে তারা বিদ্রূপের সূরে বলতে থাকে, আল্লাহর কালামে এ তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসগুলোর উল্লেখের কী প্রয়োজন হতে পারে! এ বিষয়বস্তুটিকে এখানে অন্য একভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে একথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর এ কালামটি লোকদের জন্য একটি পরীক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে এর মাধ্যমে খাঁটি ও অখাঁটি মানুষের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়ে যাচ্ছে। একদল লোক এ কালাম শুনে বা পড়ে এর উদ্দেশ্য ও মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং এর মধ্যে যেসব জ্ঞান ও উপদেশের কথা বলা হয়েছে তা থেকে লাভবান হয়। অন্যদিকে এগুলো শুনার পর আর একদল লোকের চিন্তা কালামের মূল বক্তব্যের দিকে না গিয়ে আর এক ভিন্নধর্মী অনুসন্ধানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তারা অনুসন্ধান করতে থাকে, এ নিরক্ষর ব্যক্তি এ ধরনের রচনা আনলো কোথা থেকে? আর যেহেতু বিরোধিতাসুলভ বিদ্বেষে তাদের অন্তর আগে থেকে আচ্ছন্ন থাকে, তাই একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হবার সম্ভাবনা বাদ দিয়ে বাকি সকল প্রকার সম্ভাবনাই তাদের মনে উঁকি দিতে থাকে। এগুলোকে তারা এমনভাবে বর্ণনা করতে থাকে যেন মনে হয় তারা এ কিতাবের উৎস সন্ধানে সফলকাম হয়ে গেছে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এ কালাম রচনা করেছেন এরূপ কথা হঠকারী স্বভাবের কাফিররা পর্যন্ত বলতে লজ্জাবোধ করত। কেননা তারা তাঁর রীতি-নীতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানত এবং এটাও জানত যে, তিনি উম্মী ছিলেন, তাঁর পক্ষে নিজে কোনও বই-পুস্তক পড়ে এরূপ কালাম রচনা করা সম্ভব নয়। তাই তারা বলত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা কারও থেকে শিক্ষা করেছেন এবং একে আল্লাহর কালাম নামে অভিহিত করে মানুষের সামনে পেশ করছেন। কিন্তু কার কাছে শিক্ষা করেছেন, তা তারা বলতে পারত না। কখনও তারা এক ‘কর্মকার’-এর নাম বলত। সূরা নাহলে তা রদ করা হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১০৫. আর এভাবেই আমরা নানাভাবে আয়াতসমূহ বিবৃত করি(১) এবং যাতে তারা বলে, আপনি পড়ে - নিয়েছেন(২), আর যাতে আমরা এটাকে(৩) সুস্পষ্টভাবে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য বর্ণনা করি।(৪)

(১) অর্থাৎ এভাবেই আমরা আমাদের আয়াতসমূহকে বিশদভাবে বর্ণনা করি, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। (জালালাইন)

(২) এর মর্ম এই যে, হেদায়াতের সব সাজ-সরঞ্জাম, মু'জিযা, অনুপম প্রমাণাদি- যেমন, কুরআন- একজন নিরক্ষরের মুখ দিয়ে এমন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সত্য প্রকাশ করা, যা ব্যক্ত করতে জগতের সব দার্শনিক পর্যন্ত অক্ষম এবং এমন অলঙ্কারপূর্ণ কালাম উচ্চারিত হওয়া, যার সমতুল্য কালাম রচনা করার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সমস্ত জিন ও মানুষকে চ্যালেঞ্জ করার পরও সারা বিশ্ব অক্ষমতা প্রকাশ করেছে- সত্য দর্শনের এসব সরঞ্জাম দেখে যে কোন হটকারী অবিশ্বাসীরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য নিদ্বিধায় মেনে নেয়া উচিত ছিল, কিন্তু যাদের অন্তরে বক্রতা বিদ্যমান ছিল, তারা বলতে থাকে, এসব জ্ঞান-বিজ্ঞান তুমি কারো কাছ থেকে অধ্যয়ন করে নিয়েছ। এটা ছিল কাফেরদের নিত্য-মন্তব্যের একটি। তারা এ ধরনের মন্তব্য করেই যাচ্ছিল।

অন্য আয়াতেও এটা বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ বলেন, “আমরা অবশ্যই জানি যে, তারা বলে, তাকে তো শুধু একজন মানুষ শিক্ষা দেয়।” তারা যার প্রতি এটাকে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য ঝুঁকছে তার ভাষা তো আরবী নয়; কিন্তু কুরআনের ভাষা স্পষ্ট আরবী ভাষা। (সূরা আন-নাহ্‌ল: ১০৩) আল্লাহ আরও বলেন, “অতঃপর সে বলল, “এটা তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত জাদু ভিন্ন আর কিছু নয়, ‘এ তো মানুষেরই কথা’। অচিরেই আমি তাকে দগ্ধ করব সাকার এ।” (আল-মুদ্দাসসির ২৪-২৬) তিনি আরও বলেন, কাফেররা বলে, এটা মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়, সে এটা রটনা করেছে এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে। সুতরাং অবশ্যই কাফেররা যুলুম ও মিথ্যা নিয়ে এসেছে।” তারা আরও বলে, এগুলো তো সে কালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; তারপর এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার কাছে পাঠ করা হয়। “বলুন, এটা তিনিই নাযিল করেছেন যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সমুদয় রহস্য জানেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আল-ফুরকান: ৪-৬) (আদওয়াউল বায়ান)

(৩) এখানে এটা বলে কুরআন উদ্দেশ্য হতে পারে। (ফাতহুল কাদীর) অনুরূপভাবে পূর্বোক্ত আয়াতসমূহে যে হক প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে তাও হতে পারে। উদ্দেশ্য এই যে, আমাদের নানাভাবে বর্ণনা পদ্ধতি দ্বারা যারা জানে তারা হককে জানতে পারবে, সেটা গ্রহণ করতে পারবে, সে হকের অনুসরণ করতে পারবে। আর তারা হচ্ছে, মুমিনরা যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার উপর যা নাযিল হয়েছে সে সবের উপর ঈমান আনয়ন করেছিল। (মুয়াসসার)

(৪) অর্থাৎ সঠিক বুদ্ধিমান ও সুস্থ জ্ঞানীদের জন্য এ বর্ণনা উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। মোটকথা এই যে, হেদায়াতের সরঞ্জাম সবার সামনেই রাখা হয়েছে। কিন্তু কুটিল ব্যক্তিরা এর দ্বারা উপকৃত হয়নি। পক্ষান্তরে সুস্থ জ্ঞানী মনীষীরা এর মাধ্যমে সত্যের পথ প্রদর্শক হয়ে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলা হয়েছে, কে মানে আর কে মানে না- তা আপনার দেখার বিষয় নয়। আপনি স্বয়ং ঐ পথ অনুসরণ করুন, যা অনুসরণ করার জন্য আপনার রব-এর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি ওহী আগমন করেছে। এর প্রধান বিষয় হচ্ছে এ বিশ্বাস যে, আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই। এ ওহী প্রচারের নির্দেশও রয়েছে। এর উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে মুশরিকদের জন্য পরিতাপ করবেন না যে, তারা কেন গ্রহণ করল না।

এর কারণ এটাই ব্যক্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহ যদি সৃষ্টিগতভাবে ইচ্ছা করতেন যে, সবাই মুসলিম হয়ে যাক, তবে কেউ শির্ক করতে পারতো না। কিন্তু তাদের দুষ্কৃতির কারণে তিনি ইচ্ছা করেননি, বরং তাদেরকে শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। তাই শাস্তির সরঞ্জামও সরবরাহ করে দিয়েছেন। এমতাবস্থায় আপনি তাদেরকে কিরূপে মুসলিম করতে পারেন? আপনি এ ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন কেন, আমি আপনাকে তাদের সংরক্ষক নিযুক্ত করিনি এবং আপনি এসব কাজকর্মের কারণে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমার পক্ষ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্তও নন। কাজেই তাদের কাজকর্মের ব্যাপারে আপনার উদ্বিগ্ন না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। (দেখুন, আল-মানার)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১০৫) আর এভাবে আমি নিদর্শনাবলী বিভিন্ন প্রকারে বিবৃত করি। যাতে অবিশ্বাসীরা বলে, ‘তুমি এ (পূর্ববর্তী কিতাব) অধ্যয়ন করে বলছ’(1) এবং যাতে আমি তা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করি।

(1) অর্থাৎ, আমি তাওহীদ এবং তার দলীলাদিকে এমনভাবে পরিষ্কার ভাষায় বিভিন্ন আকারে বর্ণনা করি যে, তা দেখে মুশরিকরা বলে, মুহাম্মাদ (সাঃ) কোথাও থেকে পড়ে এবং শিখে এসেছে। যেমন, অন্যত্র বলেন, {وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا إِفْكٌ افْتَرَاهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ آخَرُونَ فَقَدْ جَاءُوا ظُلْمًا وَزُورًا * وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكْتَتَبَهَا} ‘‘কাফেররা বলে, এটা মিথ্যা বৈ আর কিছুই নয়, যা সে উদ্ভাবন করেছে এবং অন্য লোকেরা তাকে সাহায্য করেছে। অবশ্যই তারা অবিচার ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলে, এগুলো তো পূর্বকালের রূপকথা, যা সে লিখে রেখেছে।’’ (সূরা ফুরকানঃ ৪-৫) অথচ ব্যাপার এটা নয়, যা তারা মনে করে বা দাবী করে, বরং এই বর্ণনার উদ্দেশ্য হল বিবেকবান লোকদের জন্য পরিষ্কার আকারে ব্যাখ্যা করা, যাতে তাদের উপর হুজ্জত পরিপূর্ণ হয়ে যায়।