۞وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِيمُ لِأَبِيهِ ءَازَرَ أَتَتَّخِذُ أَصۡنَامًا ءَالِهَةً إِنِّيٓ أَرَىٰكَ وَقَوۡمَكَ فِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ

ওয়া ইযক-লা ইবর-হীমুলিআবীহি আ-ঝার আতাত্তাখিযুআসনা-মান আ-লিহাতান ইন্নীআর-কা ওয়া কাওমাকা ফী দালা-লিম মুবীন।উচ্চারণ

ইবরাহীমের ঘটনা স্মরণ করো যখন সে তাঁর পিতা আযরকে বলেছিল, “তুমি কি মূর্তিগুলোকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করছো? ৫০ আমি তো দেখছি, তুমি ও তোমার জাতি প্রকাশ্য গোমরাহীতে লিপ্ত। তাফহীমুল কুরআন

এবং (সেই সময়ের বৃত্তান্ত শোন) যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, আপনি কি মূর্তিদেরকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো দেখছি, আপনি ও আপনার সম্প্রদায় স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছেন।মুফতী তাকী উসমানী

স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম তার পিতা আযারকে বললঃ আপনি মূর্তিগুলোকে মা‘বূদ মনোনীত করেছেন? নিঃসন্দেহে আমি আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে প্রকাশ্য ভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত দেখছি।মুজিবুর রহমান

স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম পিতা আযরকে বললেনঃ তুমি কি প্রতিমা সমূহকে উপাস্য মনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

স্মরণ কর, ইব্রাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, ‘আপনি কি মূর্তিকে ইলাহ রূপে গ্রহণ করেন ? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখতেছি।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর (স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিগুলোকে ইলাহরূপে গ্রহণ করছ? নিশ্চয় আমি তোমাকে তোমার কওমকে স্পষ্ট গোমরাহীতে দেখছি’।আল-বায়ান

আর (স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম তার পিতা আজরকে বলেছিল, আপনি কি মূর্তিগুলোকে ‘ইলাহ’রূপে গ্রহণ করেছেন, আমি তো আপনাকে আর আপনার জাতিকে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত দেখছি।তাইসিরুল

আর স্মরণ করো! ইব্রাহীম বলেছিলেন তাঁর পিতৃ-পুরুষ আষারকে -- "তুমি কি মূর্তিদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ? নিঃসন্দেহ আমি তোমাকে ও তোমার গোষ্ঠীকে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।"মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৫০

এখানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঘটনাবলী উল্লেখ করে এ বিষয়টির পক্ষে সমর্থন ও সাক্ষ্য পেশ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ্‌ প্রদত্ত হেদায়াতের বদৌলতে যেভাবে আজ মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর সাথীরা শিরককে অস্বীকার করেছেন এবং সকল কৃত্রিম ইলাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একমাত্র বিশ্বজাহানের মালিক, স্রষ্টা ও প্রভু আল্লাহর সামনে আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছেন ঠিক তেমনি ইতিপূর্বে ইবরাহীম আলাইহিস সালামও করেছেন। আর যেভাবে আজ মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর ওপর যারা ঈমান এনেছেন তাদের সাথে তাদের মূর্খ ও অজ্ঞ জাতি ঝগড়া ও বিতর্ক করছে ঠিক তেমনি ইতিপূর্বে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথেও তাঁর জাতি বাক-বিতণ্ডা করেছে। উপরন্তু ইতিপূর্বে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে যে জওয়াব দিয়েছিলেন আজ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর অনুসারীদের পক্ষ থেকেও তাদের জাতির জন্য রয়েছে সেই একই জওয়াব। নূহ, ইবরাহীম ও ইবরাহীমী বংশোদ্ভুত সমস্ত নবী যে পথে চলেছেন মুহাম্মাদ ﷺ সে একই পথে চলছেন। কাজেই এখন যারা তাঁর আনুগত্য অস্বীকার করছে তাদের জেনে রাখা উচিত, তারা নবীদের পথ থেকে সরে গিয়ে গোমরাহীর পথ অবলম্বন করেছে।

এ প্রসঙ্গে আরো একটি কথা মনে রাখতে হবে। আরবের লোকেরা সাধারণভাবে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে নিজেদের নেতা ও শ্রেষ্ঠ অনুসরণীয় পূর্বপুরুষ হিসেবে স্বীকার করতো। বিশেষ করে কুরাইশ বংশের লোকদের সমস্ত আভিজাত্যবোধের মূলে ছিল তাদের ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশধর হবার এবং তাঁর নির্মিত কাবাঘরের সেবক হবার অহংকার। তাই তাদের সামনে হযরত ইবরাহীমের তাওহীদ বিশ্বাস ও শির্‌ক অস্বীকৃতি এবং মুশরিক সম্প্রদায়ের সাথে তাঁর বিতর্কের উল্লেখ করার অর্থ ছিল যে জিনিস কুরাইশদের সমস্ত আভিজাত্য গৌরবের উৎস ছিল এবং মুশরিকী ও পৌত্তলিক ধর্মের ওপর আরবের কাফের সমাজের যে পরিপূর্ণ মনস্তুষ্টি ও তৃপ্তি ছিল তা ছিনিয়ে নেয়া এবং তাদের ওপর একথা প্রমাণ করে দেয়া যে, আজ মুসলমানরা ঠিক সেখানে অবস্থান করছে যেখানে ইতিপূর্বে হযরত ইবরাহীম (আ) ছিলেন এবং তোমাদের অবস্থা এখন সেই পর্যায়ভুক্ত যে পর্যায়ে অবস্থান করছিল সেদিন হযরত ইবরাহীমের সাথে বিতর্ককারী তাঁর মূর্খ জাতি। এটা ঠিক তেমনি যেমন হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহী আলাইহির ভক্ত-অনুরক্ত ও কাদেরী বংশজাত পীরজাদাদের সামনে হযরত শায়খের আসল শিক্ষা ও তাঁর জীবনের ঘটনাবলী পেশ করে কেউ যদি প্রমাণ করে দেয় যে, যে মহান ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে তোমরা নিজেদেরকে গৌরবান্বিত মনে করো তোমাদের নিজেদের নিয়ম-রীতি ও কর্মকাণ্ড তার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং তোমাদের পীর ও মুরশিদ সারা জীবন যাদের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করেছেন তোমরা আজ সেসব গোমরাহ লোকের পথ অবলম্বন করেছো।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

তাফসীরে জাকারিয়া

৭৪. আর স্মরণ করুন(১), যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিলেন(২), আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি।(৩)

(১) পূর্ববতী আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে মুশরিকদেরকে সম্বোধন এবং প্রতিমাপূজা ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার আহবান বর্ণিত হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহে একটি বিশেষ ভঙ্গিতে এ আহবানকেই সমর্থন দান করা হয়েছে। এ ভঙ্গি স্বভাবগতভাবেই আরবদের মনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ছিলেন সমগ্র আরবের পিতামহ। তাই গোটা আরব তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সর্বদা একমত ছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর একটি তর্কযুদ্ধ উল্লেখ করা হয়েছে, যা তিনি প্রতিমাপূজা ও তারকাপূজার বিপক্ষে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে করেছিলেন এবং সবাইকে একত্ববাদের শিক্ষা দান করেছিলেন। (নাযমুদ দুরার)

(২) এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পিতা আযরকে বললেন, আপনি স্বহস্তে নির্মিত স্বীয় উপাস্য স্থির করেছেন। আমি আপনাকে এবং আপনার গোটা সম্প্রদায়কে পথভ্রষ্টতায় পতিত দেখতে পাচ্ছি। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর পিতার নাম ‘আযর’ বলেই প্রসিদ্ধ। কোনও কোনও ইতিহাসবিদ তার নাম ‘তারেখ’ উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে ‘আযর’ তার উপাধি। তবে কুরআনের বর্ণনাই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। (বাগভী)

(৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম নিজ গৃহ থেকে সত্য প্রচারের কাজ শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কেও অনুরূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, “আর আপনি নিকট আত্মীয়দেরকে শাস্তির ভয় প্রদর্শন করুন”। সূরা আশ-শু'আরা: ২১৪) সে অনুযায়ী তিনি সর্বপ্রথম সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে সত্য প্রচারের জন্য পরিবারের সদস্যদেরকে একত্রিত করেন। (আর-রাহীকুল মাখতুম) এতে বুঝা যায় যে, পরিবারের কোন সম্মানিত যদি ভ্রান্ত পথে থাকে তবে তাকে বিশুদ্ধ পথে আহবান করা সম্মানের পরিপন্থী নয়, বরং সহানুভূতি ও শুভেচ্ছার দাবী তা-ই। আরো জানা গেল যে, সত্য প্রচার ও সংশোধনের কাজ নিকটআত্মীয়দের থেকে শুরু করা নবীগণের দাওয়াত পদ্ধতি।

এছাড়া আয়াতে ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম স্বীয় পরিবার ও সম্প্রদায়কে নিজের দিকে সম্বন্ধ করার পরিবর্তে পিতাকে বলেনঃ আপনার সম্প্রদায় পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়েছে। মুশরিক স্বজনদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর পথে যে মহান ত্যাগ স্বীকার করেন, এ উক্তিতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি স্বীয় কর্মের মাধ্যমে বলে দিলেন যে, ইসলামের সম্পর্ক দ্বারাই মুসলিম জাতীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়। বংশগত ও দেশগত জাতীয়তা যদি মুসলিম জাতীয়তার পরিপন্থী হয়, তবে মুসলিম জাতীয়তার বিপরীতে সব জাতীয়তাই বর্জনীয়। কুরআনুল কারীম ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর এ ঘটনা উল্লেখ করে ভবিষ্যৎ উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছে, যেন তারা তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে।

বলা হয়েছে, “ইবরাহীম ও তার সঙ্গীরা যা করেছিলেন, তা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য উত্তম আদর্শ ও অনুকরণযোগ্য। তারা স্বীয় বংশগত ও দেশগত স্বজনদেরকে পরিস্কার বলে দিয়েছিলেন যে, আমরা তোমাদের ও তোমাদের ভ্রান্ত উপাস্যদের থেকে মুক্ত। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিহিংসা ও শক্ৰতার প্রাচীর ততদিন অবস্থিত থাকবে, যতদিন তোমরা এক আল্লাহর ইবাদতে সমবেত না হও।” (সূরা আল-মুমতাহিনাহঃ ৪)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৭৪) স্মরণ কর, ইব্রাহীম তার পিতা আযরকে(1) বলেছিল, আপনি কি মূর্তিসমূহকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।

(1) ঐতিহাসিকগণ ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার দু’টি নাম উল্লেখ করেছেন। আযর এবং তারেখ। হতে পারে দ্বিতীয় নামটি আসলে তার উপাধি। আবার কেউ বলেছেন, আযর ইবরাহীম (আঃ)-এর চাচার নাম। তবে এটা সঠিক নয়, কেননা, কুরআন আযরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা হিসাবে উল্লেখ করেছে। অতএব এটাই ঠিক।