حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحۡمُ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسۡتَقۡسِمُواْ بِٱلۡأَزۡلَٰمِۚ ذَٰلِكُمۡ فِسۡقٌۗ ٱلۡيَوۡمَ يَئِسَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِن دِينِكُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَٱخۡشَوۡنِۚ ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ فَمَنِ ٱضۡطُرَّ فِي مَخۡمَصَةٍ غَيۡرَ مُتَجَانِفٖ لِّإِثۡمٖ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ

হুররিমাত ‘আলাইকুমুল মাইতাতুওয়াদ্দামুওয়া লাহমুল খিনঝীরি ওয়ামা-উহিল্লা লিগাইরিল্লাহি বিহী ওয়াল মুনখানিকাতুওয়াল মাওকূযাতুওয়াল মুতারদ্দিইয়াতুওয়ান্নাতীহাতু ওয়ামা-আকালাছ ছাবু‘উ ইল্লা-মা যাক্কাইতুম ওয়ামা-যুবিহা ‘আলান নুসুবি ওয়া আন তাছতাকছিমূবিলআঝলা-মি যা-লিকুম ফিছকুন আল ইয়াওমা ইয়াইছাল্লাযীনা কাফারূমিন দীনিকুম ফালা-তাখশাওহুম ওয়াখশাওনি আলইয়াওমা আকমালতুলাকুম দীনাকুম ওয়া আত মামতু‘আলাইকুম নি‘মাতী ওয়া রদীতুলাকুমুল ইছলা-মা দীনান ফামানিদতুরর ফী মাখমাসাতিন গাইর মুতাজা-নিফিললিইছমিন ফাইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রহীম।উচ্চারণ

তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে মৃতজীব, রক্ত, শূকরের গোশ্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নামে যবেহকৃত জীব ১০ এবং কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে, আহত হয়ে, ওপর থেকে পড়ে গিয়ে বা ধাক্কা খেয়ে মরা অথবা কোন হিংস্র প্রাণী চিরে ফেলেছে এমন জীব, তোমরা জীবিত পেয়ে যাকে যবেহ করে দিয়েছো সেটি ছাড়া। ১১ আর যা কোন বেদীমূলে ১২ যবেহ করা হয়েছে (তাও তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে। ) ১৩ এছাড়াও শর নিক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নির্ণয় করাও তোমাদের জন্য জায়েয নয়। ১৪ এগুলো ফাসেকীর কাজ। আজ তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে কাফেররা পুরোপুরি নিরাশ হয়ে পড়েছে। কাজেই তোমরা তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো। ১৫ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি, আমার নিয়ামত তোমাদের প্রতি সম্পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি (কাজেই তোমাদের ওপর হালাল ও হারামের যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তা মেনে চলো। ) ১৬ তবে যদি কোন ব্যক্তি ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্য হয়ে ঐগুলোর মধ্য থেকে কোন একটি জিনিস খেয়ে নেয় গুনাহের প্রতি কোন আকর্ষণ ছাড়াই, তাহলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। ১৭ তাফহীমুল কুরআন

তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশত, সেই পশু যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নাম উচ্চারিত হয়েছে, শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, উপর হতে পতনে মৃত জন্তু, অন্য কোনও পশুর শিংয়ের আঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খেয়েছে এমন জন্তু, তবে (মরার আগে তোমরা) যা যবাহ করেছ তা ছাড়া এবং সেই জন্তুও (হারাম), যাকে (প্রতিমার জন্য) নিবেদনস্থলে (বেদীতে) বলি দেওয়া হয়। এবং জুয়ার তীর দ্বারা (গোশত ইত্যাদি) বণ্টন করাও (তোমাদের জন্য হারাম)। এসব বিষয় কঠিন গুনাহের কাজ। আজ কাফিরগণ তোমাদের দীনের (পরাস্ত হওয়ার) ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না। আমাকেই ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকে (চির দিনের জন্য) পছন্দ করে নিলাম। (সুতরাং এ দীনের বিধানাবলী পরিপূর্ণভাবে পালন করো)। হ্যাঁ, কেউ যদি ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়ে যায় (এবং সে কারণে কোন হারাম বস্তু খেয়ে নেয়) আর গুনাহের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে, তবে আল্লাহ নিশ্চয়ই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।মুফতী তাকী উসমানী

তোমাদের জন্য মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, কন্ঠরোধে মারা পশু, আঘাত লেগে মরে যাওয়া পশু, পতনের ফলে মৃত পশু, শৃংগাঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র জন্তুতে খাওয়া পশু হারাম করা হয়েছে; তবে যা তোমরা যবাহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা হালাল। আর যে সমস্ত পশুকে পূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয়েছে তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করাও তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। এসব কাজ পাপ। আজ কাফিরেরা তোমাদের দীনের বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করনা; শুধু আমাকেই ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসাবে মনোনীত করলাম। তবে কেহ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় আহার করতে বাধ্য হলে সেগুলি খাওয়া তার জন্য হারাম হবেনা। কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।মুজিবুর রহমান

তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চ স্থান থেকে পতনের ফলে মারা যা, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বন্টন করা হয়। এসব গোনাহর কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব যে ব্যাক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে; কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর-মাংস, আল্লাহ্ ব্যতীত অপরের নামে যবেহ্কৃত পশু আর শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃংগাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু; তবে যা তোমরা যবেহ্ করতে পেরেছ তা ব্যতীত, আর যা মূর্তি পূজার বেদীর ওপর বলি দেওয়া হয় তা ও জুয়ার তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করা-এ সব পাপকাজ। আজ কাফিররা তোমাদের দীনের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে; সুতরাং তাদেরকে ভয় কর না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দীন পূর্ণাংগ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম আর ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম। তবে কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকিয়া ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তখন আল্লাহ্ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে- তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে এবং জুয়ার তীর দ্বারা বণ্টন করা হয়, এগুলো গুনাহ। যারা কুফরী করেছে, আজ তারা তোমাদের দীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। তবে যে তীব্র ক্ষুধায় বাধ্য হবে, কোন পাপের প্রতি ঝুঁকে নয় (তাকে ক্ষমা করা হবে), নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।আল-বায়ান

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃতজন্তু, (প্রবাহিত) রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবহকৃত পশু, আর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, আঘাতে মৃত জন্তু, উপর থেকে পতনের ফলে মৃত, সংঘর্ষে মৃত আর হিংস্র জন্তুতে খাওয়া পশু- তবে জীবিত পেয়ে যা তোমরা যবহ করতে পেরেছ তা বাদে, আর যা কোন আস্তানায় (বা বেদীতে) যবহ করা হয়েছে, আর জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা (এগুলো তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে)। এসবগুলো পাপ কাজ। আজ কাফিরগণ তোমাদের দ্বীনের বিরোধিতা করার ব্যাপারে পুরোপুরি নিরাশ হয়ে গেছে, কাজেই তাদেরকে ভয় করো না, কেবল আমাকেই ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিআমাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবূল করে নিলাম। তবে কেউ পাপ করার প্রবণতা ব্যতীত ক্ষুধার জ্বালায় (নিষিদ্ধ বস্তু খেতে) বাধ্য হলে আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।তাইসিরুল

তোমাদের জন্য অবৈধ হচ্ছে -- যা নিজে মারা গেছে, আর রক্ত, আর শূকরের মাংস, আর যা যবেহ্ করা হয়েছে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য নাম নিয়ে, আর যা গলাটিপে মারা হয়েছে, আর যা ধাঁধা লাগিয়ে মারা হয়েছে, আর পড়ে গিয়ে যে মরেছে, আর যা শিঙের আঘাতে মরেছে -- তোমরা যা বৈধ করেছ তা ব্যতীত, আর যা প্রস্তরবেদীতে বলি দেয়া হয়েছে, আর যা তোমরা ভাগাভাগি করেছ তীরের লটারি খেলেচ এ সমস্তই পাপাচার। যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা আজকের দিনে তোমাদের ধর্ম সন্বন্ধে হতাশ্বাস হয়েছে, কাজেই তাদের ভয় করো না, বরং ভয় করো আমাকে। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ করলাম, আর তোমাদের উপরে আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ধর্মরূপে মনোনীত করলাম ইসলাম। অতএব যে কেউ ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়, -- পাপের দিকে ঝোঁকে পড়ে নয়, -- তবে নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হচ্ছেন পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

অর্থাৎ যে পশুর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

১০

অর্থাৎ যাকে যবেহ করার সময় আল্লাহর ছাড়া আর কারোর নাম নেয়া হয়। অথবা যাকে যবেহ করার আগে এ মর্মে নিয়ত করা হয় যে, অমুক মহাপুরুষ অথবা অমুক দেবী বা দেবতার নামে উৎসর্গীত। (সূরা বাকারার ১৭১ টীকা দেখুন)

১১

অর্থাৎ যে প্রাণীটি উপরোক্ত দুর্ঘটনাগুলোর শিকার হবার পরও মরেনি। বরং তার মধ্যে জীবনের কিছু আলামত পাওয়া যায়। তাকে যবেহ করলে তার গোশ্ত খাওয়া যেতে পারে। এ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, হালাল প্রাণীর গোশ্ত একমাত্র যবেহর মাধ্যমে হালাল হয়। একে হালাল করার আর দ্বিতীয় কোন সঠিক পথ নেই। এ ‘যবেহ’ ও ‘যাকাত’ ইসলামের একটি বিশেষ পরিভাষা। এর অর্থ হচ্ছে, গলার এতখানি অংশ কেটে দেয়া যার ফলে শরীরের সমস্ত রক্ত ভালভাবে বের হয়ে যেতে পারে। এক কোপে কেটে বা গলায় ফাঁস দিয়ে অথবা অন্য কোনভাবে প্রাণী হত্যা করলে যে ক্ষতিটা হয় তা হচ্ছে এই যে, এর ফলে রক্তের বেশীর ভাগ অংশ তার শরীরের মধ্যে আটকে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জমে গিয়ে তা গোশ্তের সাথে মিশে যায়। অন্য দিকে যবেহ করলে মস্তিকের সাথে শরীরের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় বজায় থাকে। এর ফলে প্রতিটি শিরা উপশিরা থেকে রক্ত নিংড়ে বেরিয়ে আসে। এভাবে সারা দেহের গোশ্ত রক্তশূন্য হয়ে যায়। রক্ত হারাম একথা আগেই বলা হয়েছে। কাজেই গোশ্তের পাক ও হালাল হবার জন্য অবশ্যি তার পুরোপুরি রক্তশূন্য হওয়া অপরিহার্য।

১২

আসলে ‘নুসুব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকে এমন সব স্থান বুঝায় যেগুলোকে লোকেরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর উদ্দেশ্যে বলিদান ও নজরানা পেশ করার জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। সেখানে কোন পাথর বা কাঠের মূর্তি থাক বা না থাক তাতে কিছু আসে যায় না। আমাদের ভাষায় এরই সমার্থবোধক শব্দ হচ্ছে বেদী বা ‘আস্তানা’। কোন মহাপুরুষ, কোন দেবতা বা মুশরিকী আকীদার সাথে এ স্থানটি জড়িত থাকে।

১৩

এখানে একথাটি ভালভাবে বুঝে নিতে হবে যে, পানাহারযোগ্য দ্রব্যাদির মধ্যে শরীয়াত যেগুলোকে হালাল ও হারাম বলে দিয়েছে সেগুলোর হালাল ও হারাম হবার মূল ভিত্তি তাদের ভেষজ উপকারিতা ও অনুপকারিতা নয়। বরং তাদের নৈতিক লাভ ও ক্ষতিই এর ভিত্তি। প্রাকৃতিক বিষয়গুলোকে আল্লাহ মানুষের নিজের প্রচেষ্টা, সাধনা, অনুসন্ধান ও গবেষণার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। জীব ও জড় পদার্থগুলোর মধ্যে কোনটি মানুষের দেহে সুখাদ্যের যোগান দিতে পারে এবং কোনটি খাদ্য হিসেবে তার জন্য ক্ষতিকর ও অনুপকারীর তা উদ্ভাবন ও নির্ণয় করার দায়িত্ব মানুষের নিজের ওপর বর্তায়। এসব বিষয়ে তাকে পথনির্দেশ দেবার দায়িত্ব শরীয়াত নিজের কাঁধে তুলে নেয়নি। এ দায়িত্ব যদি শরীয়াত নিজের কাঁধে তুলে নিতো তাহলে সর্বপ্রথম ‘বিষ’ হারাম বলে ঘোষণা করতো। কিন্তু আমরা দেখি কুরআন ও হাদীসের কোথাও এর অথবা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর অন্যান্য মৌলিক ও যৌগিক পদার্থের আদৌ কোন উল্লেখই নেই। শরীয়াত খাদ্যের ব্যাপারে যে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে তা হচ্ছে এই যে, কোন্ খাদ্যটি মানুষের নৈতিকতার ওপর কি প্রভাব বিস্তার করে, আত্মার পবিত্রতার জন্য কোন্ খাদ্যটি কোন্ পর্যায়ভুক্ত এবং খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতিগুলো মধ্য থেকে কোন্ পদ্ধতিটি বিশ্বাস ও প্রকৃতিগত দিক দিয়ে ভুল বা নির্ভুল? যেহেতু এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাবার সাধ্য মানুষের নেই এবং এ অনুসন্ধান চালাবার জন্য যে উপায় উপকরণের প্রয়োজন তাও মানুষের আয়ত্বের বাইরে, আর এ জন্য এসব ব্যাপারে মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল করে বসেছে, তাই শরীয়াত কেবলমাত্র এসব বিষয়েই তাকে পথনির্দেশ দেয়। যেগুলোকে সে হারাম গণ্য করেছে, সেগুলোকে হারাম করার কারণ হচ্ছে এই যে, মানুষের নৈতিক বৃত্তির ওপর সেগুলোর খারাপ প্রভাব পড়ে বা সেগুলো তাহারাত ও পবিত্রতা বিরোধী অথবা কোন খারাপ আকীদার সাথে সেগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। পক্ষান্তরে যে জিনিসগুলোকে শরীয়াত হালাল গণ্য করেছে সেগুলোর হালাল হবার কারণ হচ্ছে এই যে, উপরোল্লিখিত দোষগুলোর মধ্য থেকে কোন একটি দোষেও সেগুলো দুষ্ট নয়।

প্রশ্ন করা যেতে পারে, এ জিনিসগুলোর হারাম হবার কারণ আল্লাহ আমাদের বুঝাননি কেন? কারণ বুঝিয়ে দিলে তো আমরা যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারতাম। এর জবাব হচ্ছে, আমাদের পক্ষে ঐ কারণগুলো অনুধাবন করা সম্ভব নয়। যেমন রক্ত, শূকরের গোশ্ত বা মৃত জীব খেলে আমাদের নৈতিক বৃত্তিতে কোন্ ধরনের দোষ, কতটুকু এবং কি পরিমাণে দেখা দেয়, সে সম্পর্কে কোন প্রকার অনুসন্ধান চালাবার কোন ক্ষমতাই আমাদের নেই। কারণ নৈতিকতা পরিমাপ করার কোন উপকরণ আমাদের আয়ত্বাধীন নয়। ধরুন যদি এদের খারাপ প্রভাব বর্ণনা করে দেয়াও হতো, তাহলেও সংশয় পোষণকারীরা প্রায় সে একই জায়গায় থাকতেন যেখানে বর্তমানে অবস্থান করছেন। কারণ এ বর্ণনা ভুল না নির্ভুল, তা সে পরিমাপ করবে কিসের সাহায্যে? তাই মহান আল্লাহ হালাল ও হারামের সীমানা মেনে চলাকে ঈমানের ওপর নির্ভরশীল করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি মেনে নেবে যে, কুরআন আল্লাহরই কিতাব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লারই রসূল এবং আল্লাহকে সর্বজ্ঞ ও সবচেয়ে জ্ঞানী ও কুশলী বলে স্বীকার করবে সে তার নির্ধারিত সীমানা অবশ্যই মেনে চলবে। এর কারণ বোধগম্য হোক বা না হোক তার পরোয়া সে করবে না। আর যে ব্যক্তি এ মৌলিক আকীদাটির ব্যাপারেই নিসংশয় নয় তার জন্য যেসব জিনিসের ক্ষতিকর বিষয় মানুষের জ্ঞানে ধরা পড়েছে কেবল মাত্র সেগুলো থেকে দূরে থাকা এবং যেগুলোর ক্ষতিকর বিষয় মানুষের জ্ঞানে ধরা পড়তে পারেনি সেগুলোর ক্ষতি দুর্ভোগ পোহাতে থাকা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন পথ নেই।

১৪

এ আয়াতে যে জিনিসটি হারাম করা হয়েছে দুনিয়ায় তার তিনটি সংস্করণ প্রচলিত আছে। আয়াতে ঐ তিনটিকেই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

একঃ মুশরিকদের মতো করে ‘ফাল’ গ্রহণ করা। এতে কোন বিষয়ে দেব-দেবীর কাছে ভাগ্যের ফয়সালা জানার জন্য জিজ্ঞেস করা হয় অথবা গায়েবের-অজানার ও অদৃশ্যের খবর জিজ্ঞেস করা হয় বা পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসা করে নেয়া হয়। মক্কার মুশরিকরা কাবা ঘরে রক্ষিত ‘হুবল’ দেবতার মূর্তিকে এ কাজের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিল। তার দেবীমূলে সাতটি তীর রাখা হয়েছিল। সেগুলোর গায়ে বিভিন্ন শব্দ ও বাক্য খোদাই করা ছিল। কোন কাজ করার বা না করার প্রশ্নে দোদুল্যমানতা দেখা দিলে, হারানো জিনিসের সন্ধান লাভ করতে চাইলে বা হত্যা মামলার ফয়সালা জানতে চাইলে, মোট কথা যেকোনো কাজের জন্যই হুবল-এর তীর রক্ষকের কাছে যেতে হতো, সেখানে নজরানা পেশ করতে হতো এবং হুবল-এর কাছে এ মর্মে প্রার্থনা করা হতো, “আমাদের এ ব্যাপারটির ফয়সালা করে দিন।” এরপর তীর রক্ষক তার কাছে রক্ষিত তীরগুলোর সাহায্যে ‘ফাল’ বের করতো। এতে যে তীরটিই বের হয়ে আসতো, তার গায়ে লিখিত শব্দকেই হুবল-এর ফয়সালা মনে করা হতো।

দুইঃ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ফাল গ্রহণ। এক্ষেত্রে চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের মীমাংসার পরিবর্তে কোন প্রকার কুসংস্কার ও অমূলক ধারণা-কল্পনা বা কোন আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে কোন বিষয়ের মীমাংসা করা হয়। অথবা এমন সব উপায়ে ভাগ্যের অবস্থা জানবার চেষ্টা করা হয়, যেগুলো গায়েব জানার উপায় হিসেবে কোন তাত্বিক পদ্ধতিতে প্রমাণিত নয়। হস্তরেখা গণনা, নক্ষত্র গণনা, রমল করা, বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার এবং নানা ধরনের ফাল বের করা এর অন্তর্ভুক্ত।

তিনঃ জুয়া ধরনের যাবতীয় খেলা ও কাজ। যেখানে অধিকার, কর্মমূলক অবদান ও বুদ্ধিবৃত্তিক ফায়সালার মাধ্যমে বস্তু বন্টনের পদ্ধতি গ্রহণ না করে নিছক কোন ঘটনা-ক্রমিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে বস্তু বণ্টন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যেমন, লটারীতে ঘটনাক্রমে অমুক ব্যক্তির নাম উঠেছে, কাজেই হাজার হাজার ব্যক্তির পকেট থেকে বের হয়ে আসা টাকা তার একার পকেটে চলে যাবে। অথবা তাত্বিক দিক দিয়ে কোন একটি ধাঁধাঁর একাধিক উত্তর হতে পারে কিন্তু পুরস্কারটি পাবে একমাত্র সেই ব্যক্তি যার উত্তর কোন যুক্তিসঙ্গত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নয় বরং নিছক ঘটনাক্রমে ধাঁধাঁ প্রতিযোগিতা পরিচালকের সিন্ধুকে রক্ষিত উত্তরটির সাথে মিলে যাবে।

এ তিন ধরনের ফাল গ্রহণ ও অনুমানভিত্তিক লটারী করাকে হারাম ঘোষণা করার পর ইসলাম ‘কুরআ’ নিক্ষেপ বা লটারী করার একমাত্র সহজ-সরল পদ্ধতিটিকেই বৈধ গণ্য করেছে। এ পদ্ধতিতে দু’টি সমান বৈধ কাজের বা দু’টি সমপর্যায়ের অধিকারের মধ্যে ফয়সালা করার প্রশ্ন দেখা দেয়। যেমন, একটি জিনিসের ওপর দু’ব্যক্তির অধিকার সবদিক দিয়ে একদম সমান এবং ফায়সালাকারীর জন্য দু’জনের কাউকে অগ্রাধিকার দেবার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই আর তাদের দু’জনের মধ্য থেকে কোন একজন নিজের অধিকার প্রত্যাহার করতেও প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় তাদের সম্মতিক্রমে লটারীর মাধ্যমে ফয়সালা করা যেতে পারে অথবা দু’টি একই ধরনের সঠিক ও জায়েয কাজ। যুক্তির মাধ্যমে তাদের কোন একটিকে অগ্রাধিকার দেবার ব্যাপারে এক ব্যক্তি দোটানায় পেড়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রয়োজন হলে লটারী করা যেতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে যখন দু’জন সমান হকদারের মধ্যে একজনকে প্রাধান্য দেবার প্রশ্ন দেখা দিতো এবং তাঁর আশংকা হতো যে, তিনি একজনকে প্রাধান্য দিলে তা অন্যজনের মনোকষ্টের কারণ হবে তখন তিনি সাধারণত এ পদ্ধতিটি অবলম্বন করতেন।

১৫

‘আজ’ বলতে কোন বিশেষ দিন, ক্ষণ বা তারিখ বুঝানো হয়নি বরং যে যুগে ও সময়ে এ আয়াত নাযিল হয় সেই সময়কালকে বুঝানো হয়েছে। আমাদের ভাষায়ও ‘আজ’ শব্দটি একইভাবে সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

“তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে কাফেররা পুরোপুরি নিরাশ হয়ে পড়েছে।”-অর্থাৎ তোমাদের দ্বীন এখন একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে এবং সে তার নিজস্ব শাসন ও কর্তৃত্ব ক্ষমতার জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কাফেররা এতদিন তার পথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছিল। কিন্তু এখন তারা এ দ্বীনকে ধ্বংস করার এবং তোমাদেরকে আবার জাহেলিয়াতের অন্ধকার গর্ভে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়েছে। “কাজেই তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো।” অর্থাৎ এ দ্বীনের বিধান এবং এর হেদায়াত কার্যকর করার ব্যাপারে এখন তোমাদের আর কোন কাফের শক্তির প্রভাব, পরাক্রম, প্রতিবন্ধকতা, প্রাধান্য ও হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হতে হবে না। এখন আর মানুষকে ভয় করার কোন কারণ নেই। তোমাদের এখন আল্লাহকে ভয় করা উচিত। আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ব্যাপারে এখন যদি তোমরা কোন ত্রুটি করো তাহলে এ জন্য তোমাদের কাছে এমন কোন ওজর থাকবে না যার ভিত্তিতে তোমাদের সাথে কোমল ব্যবহার করা যেতে পারে। এখন আর শরীয়াতের বিরুদ্ধাচরণের অর্থ এ হবে না যে, এ ব্যাপারে তোমরা অন্যদের প্রভাবে বাধ্য হয়ে এমনটি করেছো। বরং এর পরিষ্কার অর্থ হবে, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করতে চাও না।

১৬

দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেবার অর্থই হচ্ছে তাকে একটি স্বতন্ত্র চিন্তা ও কর্ম ব্যবস্থা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছে। তার মধ্যে জীবনের সমস্ত প্রশ্নের নীতিগত বা বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়। হেদায়াত ও পথনির্দেশ লাভ করার জন্য এখন আর কোন অবস্থায়ই তার বাইরে যাবার প্রয়োজন নেই। নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দেবার অর্থ হচ্ছে এই যে, তোমরা আমার আনুগত্য ও বন্দেগী করার যে অঙ্গীকার করেছিল তাকে যেহেতু তোমরা নিজেদের প্রচেষ্টা ও কর্মের মাধ্যমে সত্য ও আন্তরিক অঙ্গীকার হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছো, তাই আমি তাকে গ্রহণ করে নিয়েছি এবং তোমাদেরকে কার্যত এমন অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছি যে, এখন তোমাদের গলায় প্রকৃতপক্ষে আমার ছাড়া আর কারোর আনুগত্য ও বন্দেগীর শৃংখল নেই। এখন আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যেমন তোমরা আমার মুসলিম (আনুগত্যকারী) ঠিক তেমনি কর্মজীবনেও আমার ছাড়া আর কারোর মুসলিম (আনুগত্যকারী) হয়ে থাকতে তোমরা কোনত্রুমেই বাধ্য নও। এ অনুগ্রহগুলোর কথা উচ্চারণ করার পর মহান আল্লাহ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু এ বাক পদ্ধতি থেকে একথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে ওঠে, যেন এখানে আল্লাহ বলতে চাচ্ছেন, আমি যখন তোমাদের ওপর এ অনুগ্রহগুলো করেছি তখন এর দাবী হচ্ছে, এখন আমার আইনের সীমার মধ্যে অবস্থান করার ব্যাপারে তোমাদের পক্ষ থেকে যেন আর কোন ত্রুটি দেখা না দেয়।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়, এ আয়াতটি বিদায় হজ্জের সময় ১০ হিজরীতে নাযিল হয়েছিল। কিন্তু যে বক্তব্যের ধারাবাহিকতার সাথে এর সম্পর্ক তা ৬ হিজরীতে হোদাইবিয়া চুক্তির সমসাময়িক কালের। বর্ণনা রীতির কারণে বাক্য দু’টি পরস্পর এমনভাবে মিশে গেছে যার ফলে কোন ক্রমেই ধারণা করা যাবে না যে, শুরুতে এ বাক্যগুলো ছাড়াই এ ধারবাহিক বক্তব্যটি নাযিল হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে এ বাক্যগুলো নাযিল হবার পর তা এখানে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য প্রকৃত ব্যাপার একমাত্র আল্লাহই জানেন, তবে আমার অনুমান, প্রথম এ আয়াতটি এ একই প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছিল। তাই লোকেরা তখন এর আসল গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। পরে যখন সমগ্র আরব ভূখণ্ড বিজিত হল এবং ইসলাম শক্তি অর্জন করে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে গেলো তখন মহান আল্লাহ পুনর্বার এ বাক্য তাঁর নবীর প্রতি নাযিল করেন এবং এটি ঘোষণা করে দেবার নির্দেশ জারি করেন।

১৭

সূরা বাকারার ১৭২ টীকা দেখুন।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এটা জাহেলী যুগের একটা রেওয়াজ। তারা যৌথভাবে উট যবাহের পর বিশেষ পন্থার লটারীর মাধ্যমে তার গোশত বণ্টন করত। তারা বিভিন্ন তীরে বিভিন্ন অংশের নাম লিখে তা একটা থলিতে রেখে দিত। তারপর যার নামে যেই অংশ বের হত তাকে সেই পরিমাণ গোশত দেওয়া হত। কোনও কোনও তীরে কিছুই লেখা থাকত না। সেই তীর যার নামে বের হত, সে গোশত থেকে বঞ্চিত হত। এভাবে আরও একটা রীতি ছিল যে, কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে তীর দ্বারা তা নির্ণয় করা হত। তীরে যা লেখা থাকত তা পালন করাকে অপরিহার্য মনে করা হত। কুরআন মাজীদের এ আয়াত এই যাবতীয় বিষয়কে অবৈধ ঘোষণা করছে। প্রথম পদ্ধতিটি তো জুয়া, আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে গায়েবী ইলমের দাবী করা হয় কিংবা যুক্তিসঙ্গত কোনও কারণ ছাড়াই কোনও একটা বিষয়কে অবশ্য পালনীয় সাব্যস্ত করা হয়। কেউ কেউ পবিত্র এ আয়াতটির তরজমা করেছেন ‘তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করাও (তোমাদের জন্য হারাম)’। এর দ্বারা দ্বিতীয় পন্থার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। আয়াতের শব্দাবলীর ভেতর এ তরজমারও অবকাশ আছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৩. তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু(১), রক্ত(২), শূকরের গোস্ত(৩), আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা পশু(৪), গলা চিপে মারা যাওয়া জন্তু(৫), প্রহারে মারা যাওয়া জন্তু(৬), উপর থেকে পড়ে মারা যাওয়া জন্তু(৭), অন্যপ্রাণীর শিং এর আঘাতে মারা যাওয়া জন্তু(৮) এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু(৯); তবে যা তোমরা যবেহ করতে পেরেছ তা ছাড়া(১০), আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলী দেয়া হয় তা(১১) এবং জুয়ার তীর দিয়ে ভাগ নির্ণয় করা(১২), এসব পাপ কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে(১৩); কাজেই তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম(১৪), আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম(১৫)। অতঃপর কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

(১) আলোচ্য আয়াতে কয়েকটি জিনিস হারাম করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তন্মধ্যে প্রথম হারাম বস্তু হিসেবে বলা হয়েছে, মৃত জিনিস। এখানে মৃত বলে ঐ জন্তু বুঝানো হয়েছে, যা যবেহ্ ব্যতীত কোন রোগে অথবা স্বাভাবিকভাবে মরে যায়। এধরনের মৃত জন্তুর গোস্ত চিকিৎসা-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও মানুষের জন্যে ক্ষতিকর। তবে হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই প্রকার মৃতকে এ বিধানের বাইরে রেখেছেন, একটি মৃত মাছ ও অপরটি মৃত টিড্ডী। (মুসনাদে আহমদঃ ২/৯৭, ইবন মাজাহঃ ৩৩১৪)

(২) আয়াতে বর্ণিত দ্বিতীয় হারাম বস্তু হচ্ছে রক্ত। কুরআনের অন্য আয়াতে (أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا) বা ‘প্রবাহিত রক্ত’। (সূরা আল-আন’আম: ১৬৫) বলায় বুঝা যায় যে, যে রক্ত প্রবাহিত হয়, তাই হারাম। সুতরাং কলিজা ও প্লীহা রক্ত হওয়া সত্ত্বেও হারাম নয়। পূর্বোক্ত যে হাদীসে মাছ ও টিড্ডীর কথা বলা হয়েছে, তাতেই কলিজা ও প্লীহা হালাল হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

(৩) আয়াতে বর্ণিত তৃতীয় হারাম বস্তু হচ্ছে, শুকরের গোস্ত। গোস্ত বলে তার সম্পূর্ণ দেহ বুঝানো হয়েছে। চর্বি ইত্যাদিও এর অন্তর্ভুক্ত। (ইবন কাসীর)

(৪) আয়াতে বর্ণিত চতুর্থ হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু যা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়। যদি যবেহ্ করার সময়ও অন্যের নাম নেয়া হয়, তবে তা খোলাখুলি শির্ক। এরূপ জন্তু সর্বসম্মতভাবে মৃতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আরবের মুশরেকরা মূর্তিদের নামে যবেহ করত। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে কোন কোন মুখ লোক পীর-ফকীরের নামে যবেহ করে। যদিও যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে; কিন্তু জন্তুটি যেহেতু অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে জবেহ বা কুরবানী করা হয়, তাই এ সব জন্তুও আয়াত দৃষ্টে হারাম।

(৫) আয়াতে বর্ণিত পঞ্চম হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু যাকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে অথবা নিজেই কোন জাল ইত্যাদিতে আবদ্ধ অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে গেছে। (ইবন কাসীর)

(৬) আয়াতে বর্ণিত ষষ্ঠ হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু, যা লাঠি অথবা পাথর ইত্যাদির প্রচন্ড আঘাতে নিহত হয়। যদি নিক্ষিপ্ত তীরের ধারাল অংশ শিকারের গায়ে না লাগে এবং তীরের আঘাতে শিকার নিহত হয়, তবে সে শিকারও এর অন্তর্ভুক্ত এবং হারাম। (ইবন কাসীর)

(৭) আয়াতে বর্ণিত সপ্তম হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু, যা কোন পাহাড়, টিলা, উঁচু দালানের উপর থেকে অথবা কুপে পড়ে মরে যায়। এমনিভাবে কোন পাখিকে তীর নিক্ষেপ করার পর যদি সেটি পানিতে পড়ে যায়, তবে তা খাওয়াও নিষিদ্ধ। কারণ, এখানেও পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। (ইবন কাসীর)

(৮) আয়াতে বর্ণিত অষ্টম হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু, যা কোন সংঘর্ষে নিহত হয়। যেমন রেলগাড়ী, মোটর ইত্যাদির নীচে এসে মরে যায় অথবা কোন জন্তুর শিং-এর আঘাতে মরে যায়। (ইবন কাসীর)

(৯) আয়াতে বর্ণিত নবম হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু, যেটি কোন হিংস্র জন্তুর কামড়ে মরে যায়। (ইবন কাসীর) এগুলো ছাড়াও হাদীসে অন্যান্য আরো কয়েক ধরনের প্রাণী হারাম করা হয়েছে।

(১০) উপরোক্ত নয় প্রকার হারাম জন্তুর বর্ণনা করার পর একটি ব্যতিক্রম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, (إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ) অর্থাৎ এসব জন্তুর মধ্যে কোনটিকে জীবিত অবস্থায় পাওয়ার পর যবেহ করতে পারলে হালাল হয়ে যাবে। এ ব্যতিক্রম প্রথমোক্ত চার প্রকার জন্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে না। কেননা, মৃত ও রক্তকে যবেহ্ করার সম্ভাবনা নাই এবং শূকর এবং আল্লাহ ব্যতিত অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত জন্তু সত্তার দিক দিয়েই হারাম। এ দুটোকে যাবেহ্ করা না করা উভয়ই সমান। এ কারণে আলেমগণ এ বিষয়ে একমত যে, এ ব্যতিক্রম প্রথমোক্ত চারটি পরবর্তী পাঁচটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। অতএব আয়াতের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, শেষোক্ত এ পাঁচ প্রকার জন্তুর মধ্যে যদি জীবনের স্পন্দন অনুভব করা যায় এবং তদবস্থায়ই বিসমিল্লাহ বলে যবেহ করে দেয়া হয়, তবে এগুলো খাওয়া হালাল হবে। (ইবনে কাসীর)

(১১) আয়াতে বর্ণিত দশম হারাম বস্তু হচ্ছে, ঐ জন্তু, যাকে নুছুবের উপর যবেহ্ করা হয়। নুছুব ঐ প্রস্তর বা বেদীকে বলা হয়, যা কাবা গৃহের আশেপাশে স্থাপিত ছিল। জাহেলিয়াত যুগে আরবরা এদের উপাসনা করত এবং এদের উদ্দেশ্যে জন্তু কোরবানী করত। একে তারা ইবাদত বলে গণ্য করত। জাহেলিয়াত যুগের আরবরা উপরোক্ত সব প্রকার জন্তুর গোস্ত ভক্ষণে অভ্যস্ত ছিল। আল্লাহ তা'আলা এগুলোকে হারাম করেছেন। (ইবন কাসীর) বর্তমানেও যদি কোথাও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য উৎসর্গ করার কোন বেদী বা কবর অথবা এ জাতীয় কিছু থাকে এবং সেখানে কেউ কোন কিছু যবেহ করে, তবে তাও হারাম হবে।

(১২) আয়াতে উল্লেখিত একাদশ হারাম বস্তুটি হচ্ছে, ‘ইস্তেকসাম বিল আযলাম’। যার অর্থ তীরের দ্বারা বন্টণকৃত বস্তু। أزْلَامٌ শব্দটি زَلَمٌ এর বহুবচন। এর অর্থ ঐ তীর, যা জাহেলিয়াত যুগে ভাগ্য পরীক্ষার জন্যে নির্ধারত ছিল। এ কাজের জন্যে সাতটি তীর ছিল। তন্মধ্যে একটিতে نعم (হ্যাঁ), একটিতে لا (না) এবং অন্যগুলোতে অন্য শব্দ লিখিত ছিল। এ তীরগুলো কা'বাগৃহের খাদেমের কাছে থাকত। কেউ নিজ ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলে অথবা কোন কাজ করার পূর্বে তা উপকারী হবে না অপকারী, তা জানতে চাইলে সে কাবার খাদেমের কাছে পৌছে একশত মুদ্রা উপটৌকন দিত। খাদেম তূন থেকে একটি একটি করে তীর বের করত। ‘হ্যাঁ’ শব্দ বিশিষ্ট তীর বের হয়ে আসলে মনে করা হত যে, কাজটি উপকারী। পক্ষান্তরে ‘না’ শব্দ বিশিষ্ট তীর বের হলে তারা বুঝে নিত যে, কাজটি করা ঠিক হবে না। হারাম জন্তুসমূহের বর্ণনা প্রসঙ্গে এ বিষয়টি উল্লেখ করার কারণ এই যে, তারা এ তীরগুলো জন্তুসমূহের গোস্ত বন্টনেও ব্যবহার করত। কয়েকজন শরীক হয়ে উট ইত্যাদি যবেহ করে ত গোস্ত প্রাপ্য অংশ অনুযায়ী বন্টন না করে এসব জুয়ার তীরের সাহায্যে বন্টন করত। ফলে কেউ সম্পূর্ণ বঞ্চিত, কেউ প্রাপ্য অংশের চাইতে কম এবং কেউ অনেক বেশী গোস্ত পেয়ে যেত। এ কারণে হারাম জন্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গে এ হারাম বন্টন পদ্ধতিও বর্ণনা করা হয়েছে। (ইবন কাসীর)

আলেমগণ বলেন, ভবিষ্যৎ অবস্থা এবং অদৃশ্য বিষয় জানার যেসব পন্থা প্রচলিত আছে; যেমন ভবিষ্যৎ কথন বিদ্যা, হস্তরেখা বিদ্যা, ইত্যাদি সব اسْتِقْسَام بالأزْلَامِ এর অন্তর্ভুক্ত এবং হারাম। اسْتِقْسَام بالأزْلَامِ শব্দটি কখনও জুয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যাতে গুটিকা নিক্ষেপ অথবা লটারীর নিয়মে অধিকার নির্ধারণ করা হয়। আল্লাহ তা'আলা একে مَيْسر নাম দিয়ে হারাম ও নিষিদ্ধ করেছে। মোটকথা এ জাতীয় বস্তু দ্বারা কোন কিছু নির্ধারণ করা হারাম। (ফাতহুল কাদীর)

(১৩) অর্থাৎ অদ্য কাফেররা তোমাদের দ্বীনকে পরাভূত করার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে। কাজেই তোমরা তাদেরকে আর ভয় করো না। তবে আল্লাহকে ভয় কর। এ আয়াতাংশ যখন নাযিল হয়, তখন মক্কা এবং প্রায় সমগ্র আরব মুসলিমদের করতলগত ছিল। সমগ্র আরব উপত্যকায় ইসলামী বিধি-বিধান প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। তাই বলা হয়েছেঃ ইতিপূর্বে কাফেররা মুসলিমদের সংখ্যা ও শক্তি অপেক্ষাকৃত কম দেখে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করতো। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে এরূপ দুঃসাহস ও বল-ভরসা নাই।

এ কারণে মুসলিমরা তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে স্বীয় রবের আনুগত্য ও ইবাদতে মনোনিবেশ করুক। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আরব উপদ্বীপে মুসল্লীরা শয়তানের ইবাদত করবে এ ব্যাপারে সে নিরাশ হয়েছে, তবে সে তাদের মধ্যে গণ্ডগোল লাগিয়ে রাখতে পারবে।” (বুখারী: ১১৬২; আবু দাউদ: ১৫৩৮; তিরমিযী: ৪৮০; ইবন মাজাহ ১৩৮৩)। কোন কোন মুফাসসির বলেন, কাফেরদের নিরাশ হওয়ার অর্থ, তারা তোমাদের মত হবে এবং তোমাদের কর্মকাণ্ড তাদের মত হবে এ ব্যাপারে তারা নিরাশ হয়েছে, কারণ, তোমাদের গুণাগুণ তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। (ইবনে কাসীর)

(১৪) দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেবার অর্থই হচ্ছে এর মধ্যে জীবনের সমস্ত প্রশ্নের নীতিগত ও বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়। হেদায়াত ও পথনির্দেশ লাভ করার জন্য এখন আর কোন অবস্থায়ই তার বাইরে যাবার প্রয়োজন নাই। সুতরাং এ নবীর পরে কোন নবী নেই। এ শরীআতের পরে কোন শরীআত নেই। এ শরীআতে যা যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে সত্য ও ইনসাফপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, “সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রব-এর বাণী পরিপূর্ণ। তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই।” (সূরা আল-আন’আম: ১১৫) (ইবন কাসীর)

(১৫) আয়াতের এ অংশটি নাযিলের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আরাফার দিন। এ দিনটি পূর্ণ বৎসরের মধ্যে সর্বোত্তম দিন। ঘটনাক্রমে এ দিনটি পড়েছিল শুক্রবারে। এর শ্ৰেষ্ঠত্বও সর্বজনবিদিত। স্থানটি হচ্ছে ময়দানে-আরাফাত। এ স্থানটিই আরাফার দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত নাযিল হওয়ার বিশেষ স্থান। সময় আছরের পর-যা সাধারণ দিনগুলোতেও বরকতময় সময়। বিশেষতঃ শুক্রবার দিনে। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, এ দিনের এ সময়েই দোআ কবুলের মূহুর্তটি ঘনিয়ে আসে। আরাফার দিনে আরও বেশী বৈশিষ্ট্য সহকারে দোআ কবুলের সময়। হজ্জের জন্যে মুসলিমদের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ ঐতিহাসিক সমাবেশ। প্রায় দেড় লক্ষ সাহাবায়ে-কেরাম উপস্থিত। রাহমাতুল্লিল-আলামীন সাহাবায়ে-কেরামের সাথে আরাফার সে বিখ্যাত পাহাড়ের নীচে স্বীয় উষ্ট্রী আদ্ববার পিঠে সওয়ার। সবাই হজ্জের প্রধান রোকন অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানরত। এসব শ্রেষ্ঠত্ব, বরকত ও রহমতের ছত্রছায়ায় উল্লেখিত পবিত্র আয়াতটি নাযিল হয়। (দেখুন, তিরমিযীঃ ৩০৪৪)

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ এ আয়াত কুরআনের শেষ দিকের আয়াত। এরপর বিধি-বিধান সম্পর্কিত আর কোন আয়াত নাযিল হয়নি। বলা হয় যে, শুধু উৎসাহ প্রদান ও ভীতি প্রদর্শনমূলক কয়েকখানি আয়াত-এর পর নাযিল হয়েছে। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র একাশি দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন। কেননা, দশম হিজরীর ৯ই যিলহজ্জ তারিখে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত পান। (ইবন কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৩) তোমাদের জন্য হারাম (অবৈধ) করা হয়েছে মৃত পশু, রক্ত ও শূকর-গোশত, আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত পশু,(1) শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু,(2) ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু,(3) পতনে মৃত জন্তু,(4) শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু(5) এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু;(6) তবে তোমরা যা যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা ছাড়া।(7) আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় তা(8) এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা,(9) এ সব পাপকার্য। আজ অবিশ্বাসীগণ তোমাদের ধর্মের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। তবে যদি কেউ ক্ষুধার তাড়নায় (নিষিদ্ধ জিনিষ খেতে) বাধ্য হয়; কিন্তু ইচ্ছা করে পাপের দিকে ঝুঁকে না, তাহলে (তার জন্য) আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (10)

(1) এখান থেকে ঐ সমস্ত নিষিদ্ধ বা হারামকৃত (পশুর) ব্যাপারে আলোচনা শুরু হচ্ছে, যার ইঙ্গিত সূরার প্রারম্ভে দেওয়া হয়েছে। আয়াতের এই অংশটুকু সূরা বাক্বারাতে উল্লেখ হয়েছে। (দেখুন আয়াত নং ১৭৩)

(2) যাকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে অথবা নিজেই কোনভাবে ফাঁস লাগা অবস্থায় শবাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে, উভয় অবস্থায় এই মৃত (পশু ভক্ষণ) করা হারাম।

(3) অর্থাৎ, পাথর অথবা লাঠি অথবা অন্য কোন জিনিস দ্বারা আঘাত করার কারণে বিনা যবেহতে মারা গেছে। জাহেলী যুগে এই সমস্ত পশুকে (হালাল মনে করে) ভক্ষণ করা হত। ইসলামী শরীয়তে তা নিষেধ করে দেওয়া হয়ছে। বন্দুকের শিকার; বন্দুক দ্বারা শিকার করা হয়েছে এমন পশুর ব্যাপারে উলামাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম শাওকানী (রঃ) বন্দুক দ্বারা শিকার করা পশুর ব্যাপারে একটি হাদীস থেকে প্রমাণ উল্লেখ করে তা হালাল বলেছেন। অর্থাৎ (শিকারী) যদি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে গুলি ছুঁড়ে এবং যবেহ করার পূর্বেই শিকার মারা যায়, তাহলে তাঁর মতানুসারে তা ভক্ষণ করা বৈধ। (ফাতহুল ক্বাদীর) (অন্য মতে, যে বন্দুকের গুলি শিকারের দেহ ভেদ করে যায়, চামড়া কেটে ফেলে রক্তপাত ঘটায় সে বন্দুকের শিকার হালাল। পক্ষান্তরে ভেদ না করে কেবল আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে তা খাওয়া বৈধ নয়।) (সিলসিলাহ সহীহাহ ৫/৫১১)

(4) (ঐ পশু) যে কোনভাবে পড়ে অথবা কেউ পাহাড় বা অন্য কোন উঁচু জায়গা থেকে ধাক্কা মারার কারণে পড়ে গিয়ে মারা যায়।

(5) نطيحة , منطوحة ঐ পশুকে বলা হয়; যাকে অন্য পশু শিং দ্বারা ধাক্কা মেরেছে বা শিং-লড়ায়ে বিনা যবাইয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

(6) অর্থাৎ সিংহ, চিতা ও নেকড়ে বাঘ ইত্যাদি (শিকারী বা ছেদক দাঁতবিশিষ্ট) হিংস্রজন্তু যদি কোন শিকারকে নিজে খাওয়ার উদ্দেশ্যে ধরার ফলে মৃত্যু হয়েছে (এমন পশু)। জাহেলী যুগে এই ধরণের মৃত জানোয়ার খাওয়া হত। (কিন্ত ইসলাম এই ধরণের মৃত পশু খাওয়া হারাম করে দিয়েছে।)

(7) অধিকাংশ মুফাসসিরগণের নিকটে এই ব্যতিক্রম পূর্বে উল্লিখিত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তুর ব্যাপারে। অর্থাৎ, ব্যতিক্রম হল, যদি ঐ সকল পশুকে তোমরা এমন অবস্থায় পাও যে, তার মৃত্যু হয়নি; এখনো জীবিত আছে, তারপর তাকে শরয়ী পদ্ধতিতে যবেহ কর, তাহলে তোমাদের জন্য (ঐ পশু) খাওয়া বৈধ হবে। জীবিত থাকার চিহ্ন হল, যবেহ করার সময় যেন তার হাত-পা নড়ে ওঠে। কিন্তু ছুরি চালানোর সময় যদি এই অবস্থা না হয়, তাহলে জানতে হবে সে পশুটি মৃত। যবেহর শরয়ী পদ্ধতি হল, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ধারালো ছুরি দ্বারা এমনভাবে তার গলায় পেঁচাতে হবে যেন তার সমস্ত মোটা শিরাগুলি কেটে যায়। যবেহ ছাড়াও শরীয়তে ‘নহর’ করা বৈধ; যার পদ্ধতি হল, পশু দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সিনায় ছুরি (বা বর্শা) দ্বারা আঘাত করতে হবে; যাতে তার কণ্ঠনালী ও রক্তবাহী বিশেষ শিরা কেটে যায় এবং সমস্ত রক্ত প্রবাহিত হয়ে যায়।

(8) মুশরিকগণ তাদের পূজ্যপ্রতিমার নিকটে পাথর বা অন্য কিছু স্থাপন করে একটি নির্দিষ্ট জায়গা বানিয়ে নিত; যাকে نصب (বেদী, থান বা আস্তানা) বলা হত। আর সেই স্থানে মানত ও নযর মানা পশু ঐ পূজ্যপ্রতিমার নামে বলি দিত। অর্থাৎ, এটি {وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللهِ} (গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবেহ) এরই একটি ধরন। সুতরাং এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আস্তানা, কবরস্থান ও দর্গায় গিয়ে লোকেরা নিজের মনষ্কামনা পূরণ করার জন্য এবং কবরস্থ বুযুর্গের সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য যে পশু (মুরগী, ছাগল ইত্যাদি) যবেহ বা উৎসর্গ করে কিংবা পোলাও বা (সিন্নি, মিঠাই) খাবার বণ্টন করে, তা ভক্ষণ করা হারাম। আর এ সব আল্লাহর বাণীঃ {وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ} এর শামিল।

(9) {وَأَن تَسْتَقْسِمُواْ بِالأَزْلاَمِ} এই অংশের দুটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে ; (ক) তীরের মাধ্যমে বণ্টন করা (খ) তীরের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করা। প্রথম অর্থের ব্যাপারে বলা হয় যে, জুয়া ইত্যাদিতে যবেহকৃত পশুর গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে উক্ত তীর (লটারী হিসাবে) ব্যবহার করা হত। যার ফলে কেউ প্রাপ্য অংশের চাইতে বেশী পেত, আবার কেউ সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হত। দ্বিতীয় অর্থের ব্যাপারে বলা হয় যে, বিশেষ তীর হত, তারা কোন কর্মের প্রারম্ভে তার মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করত। তারা তিন ধরণের তীর তৈরী করে রেখেছিল। তার মধ্যে একটিতে (افْعَلْ ) অর্থাৎ ‘কর’ এবং দ্বিতীয়টিতে (لاَ تَفْعَلْ ) অর্থাৎ ‘করো না’ লিখা থাকত। আর তৃতীয়টিতে কোন কিছু লেখা থাকত না। ভাগ্য পরীক্ষার সময় যদি প্রথম তীরটি (যাতে ‘কর’ লেখা আছে) বের হত, তাহলে তারা সে কর্মটি সম্পাদন করত, যদি দ্বিতীয় তীরটি (যাতে ‘করো না’ লেখা আছে) বের হত, তাহলে তারা সে কর্মটি সম্পাদন করত না, আর যদি তৃতীয় তীরটি (যাতে কোন কিছু লেখা থাকত না) বের হত, তাহলে তারা পুনরায় ভাগ্য পরীক্ষা করত। আর এটাও এক ধরণের গণকের কাজ এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনারই একটি চিত্র মাত্র। এই জন্য (ইসলামে) একে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। استقسام এর অর্থ হল, ভাগ্য পরীক্ষা করা।

(10) এখানে ক্ষুধার শেষ পর্যায়ের অবস্থায় উল্লিখিত হারাম খাদ্য ভক্ষণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ, তবে তাতে যেন আল্লাহর অবাধ্যাচরণ উদ্দেশ্য না হয় এবং সীমালঙ্ঘন করা না হয়। অর্থাৎ প্রাণ বাঁচানোর জন্য যতটুকু প্রয়োজন শুধুমাত্র ততটুকু ছাড়া বেশী যেন ভক্ষণ করা না হয়।