يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَوۡفُواْ بِٱلۡعُقُودِۚ أُحِلَّتۡ لَكُم بَهِيمَةُ ٱلۡأَنۡعَٰمِ إِلَّا مَا يُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ غَيۡرَ مُحِلِّي ٱلصَّيۡدِ وَأَنتُمۡ حُرُمٌۗ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ مَا يُرِيدُ

ইয়াআইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূআওফূবিল‘উকূদি উহিল্লাত লাকুম বাহীমাতুল আন‘আ-মি ইল্লা-মা-ইউতলা-‘আলাইকুম গাইর মুহিলিলসসাইদি ওয়া আনতুম হুরুমুন ইন্নাল্লা-হা ইয়াহকুমুমা-ইউরীদ।উচ্চারণ

হে ঈমানদারগণ! বন্ধনগুলো পুরোপুরি মেনে চলো। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ গৃহপালিত পশু জাতীয় সব পশুই হালাল করা হয়েছে তবে সামনে যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের জানানো হবে সেগুলো ছাড়া। কিন্তু ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করা নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ‌ যা ইচ্ছা আদেশ করেন। তাফহীমুল কুরআন

হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূরণ করো। তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে চতুষ্পদ গবাদি পশু (ও তদসদৃশ জন্তু), সেইগুলি ছাড়া যা তোমাদেরকে পড়ে শোনানো হবে, তবে তোমরা যখন ইহরাম অবস্থায় থাকবে, তখন শিকার করাকে বৈধ মনে করো না। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন আদেশ দান করেন। মুফতী তাকী উসমানী

হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের ও‘য়াদাগুলি পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। তবে যেগুলি হারাম হওয়া সম্পর্কে তোমাদের উপর পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলি এবং ইহরাম বাঁধা অবস্থায় তোমাদের শিকার করা জন্তুগুলি হালাল নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হুকুম করে থাকেন।মুজিবুর রহমান

মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ন কর। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, যা তোমাদের কাছে বিবৃত হবে তা ব্যতীত। কিন্তু এহরাম বাধাঁ অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করো না! নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা যা ইচ্ছা করেন, নির্দেশ দেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে মু’মিনগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হচ্ছে তা ব্যতীত চতুষ্পদ আন‘আম তোমাদের জন্যে হালাল করা হল, তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে বৈধ মনে করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যা ইচ্ছা আদেশ করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, তোমাদের নিকট যা বর্ণনা করা হচ্ছে তা ছাড়া। তবে ইহরাম অবস্থায় শিকারকে হালাল করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা বিধান দেন।আল-বায়ান

ওহে মু’মিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হল- সেগুলো ছাড়া যেগুলোর বিবরণ তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে, আর ইহরাম অবস্থায় শিকার করা অবৈধ। আল্লাহ যা চান হুকুম দেন।তাইসিরুল

ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের অঙ্গীকারসমূহ প্রতিপালন করো। তোমাদের জন্য বৈধ করা গেল গবাদি পশু -- তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা ব্যতীত, শিকার বিধিসংগত নয় যখন তোমরা হারামে থাকো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হুকুম করেন যা তিনি মনস্থ করেন।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

অর্থাৎ এ সূরায় তোমাদের প্রতি যে সমস্ত নীতি-নিয়ম ও বিধি-বিধান আরোপ করা হচ্ছে এবং সাধারণভাবে আল্লাহর শরীয়াত যেগুলো তোমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, সেগুলো মেনে চলো। ভূমিকা স্বরূপ এ ছোট্ট একটি বাক্যের অবতারণা করার পর এবার সে বাঁধনগুলোর বর্ণনা শুরু হচ্ছে যেগুলো মেনে নেবার হুকুম দেয়া হয়েছে।

মূল শব্দ হচ্ছে, “বাহীমাতুল আন’আম”। “আন’আম” শব্দটি বললে আরবী ভাষায় উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া বুঝায়। আর “বাহীমা” বলতে প্রত্যেক বিচরণশীল চতুষ্পদ জন্তু বুঝানো হয়। যদি আল্লাহ বলতেন, “আন’আম” তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, তাহলে এর ফলে কেবলমাত্র আরবীতে যে চারটি জন্তকে “আন’আম” বলা হয় সে চারটি জন্তুই হালাল হতো। কিন্তু আল্লাহ বলেছেনঃ গৃহপালিত পশু পর্যায়ের বিচরণশীল চতুষ্পদ প্রাণী তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। এর ফলে নির্দেশটি ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং গৃহপালিত গবাদি পশু পর্যায়ের সমস্ত বিচরণশীল চতুষ্পদ প্রাণী এর আওতায় এসে গেছে। অর্থাৎ যাদের শিকারী দাঁত নেই, যারা জান্তব খাদ্যের পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ খাদ্য খায় এবং অন্যান্য প্রাণীগত বিশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে আরবের ‘আন’আম’-এর সাথে সাদৃশ্য রাখে। এ সঙ্গে এখানে এ ইঙ্গিতও পাওয়া যায় যে, গৃহপালিত চতুষ্পদ পশুর বিপরীত ধর্মী যে সমস্ত পশুর শিকারী দাঁত আছে এবং অন্য প্রাণী শিকার করে খায়, সেসব পশু হালাল নয়। এ ইঙ্গিতটিকে সুস্পষ্ট করে হাদীসে নবী ﷺ পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, শিকারী হিংস্র প্রাণী হারাম। অনুরূপভাবে নবী ﷺ এমন সব পাখিকেও হারাম গণ্য করেছেন যাদের শিকারী পাঞ্জা আছে, অন্য প্রাণী শিকার করে খায় বা মৃত খায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেনঃ

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ كُلِّ ذِى نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ و كُلِّ ذِى مِخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ

“নবী ﷺ শিকারী দাঁত সম্পন্ন প্রত্যেকটি পশু এবং নখরধারী ও শিকারী পাঞ্জা সম্পন্ন প্রত্যেকটি পাখি আহার করতে নিষেধ করেছেন।” এর সমর্থনে অন্যান্য বহু সংখ্যক সাহাবীর হাদীসও বর্ণিত হয়েছে।

কাবাঘর যিয়ারত করার জন্য যে ফকিরী পোশাক পরা হয় তাকে বলা হয় “ইহরাম।” কাবার চারদিকে কয়েক মনযিল দূরত্বে একটি করে সীমানা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। কোন যিয়ারতকারীর নিজের সাধারণ পোশাক বদলে ইহরামের পোশাক পরিধান না করে এ সীমানাগুলো পার হয়ে এগিয়ে আসার অনুমতি নেই। এ পোশাকের মধ্যে থাকে কেবল মাত্র একটি সেলাইবিহীন লুংগী ও একটি চাদর। চাদরটি দিয়ে শরীরের ওপরের অংশ ঢাকা হয়। একে ইহরাম বলার কারণ হচ্ছে এই যে, এ পোশাক পরিধান করার সাথে সাথে মানুষের জন্য এমন অনেক কাজ হারাম হয়ে যায় যেগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় তার জন্য হালাল ছিল। যেমন ক্ষৌরকার্য করা, সুগন্ধি ব্যবহার, সবধরনের সাজসজ্জা, সৌন্দর্য চর্চা, যৌনাচার ইত্যাদি। এ অবস্থায় কোন প্রাণী হত্যা করা যাবে না, শিকার করা যাবে না এবং শিকারের খোঁজও দেয়া যাবে না। এগুলোও এ বিধিনিষেধের অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী একচ্ছত্র শাসক। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো যে কোন হুকুম দেবার পূর্ণ ইখতিয়ার রাখেন। তাঁর নির্দেশ ও বিধানের ব্যাপারে কোন প্রকার উচ্চবাচ্য করার বা আপত্তি জানানোর কোন অধিকার মানুষের নেই। তাঁর সমস্ত বিধান জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যুক্তি, ন্যায়নীতি ও কল্যাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও ঈমানদার মুসলিম যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়ানুগ ও কল্যাণকর বলেই তার আনুগত্য করে না বরং একমাত্র সর্বশক্তিমান প্রভু আল্লাহর হুকুম বলেই তার আনুগত্য করে। যে জিনিসটি তিনি হারাম করে দিয়েছেন তা কেবল তাঁর হারাম করে দেবার কারণেই হারাম হিসেবে গণ্য। আর ঠিক তেমনিভাবে যে জিনিসটি তিনি হালাল করে দিয়েছেন সেটির হালাল হবার পেছনে অন্য কোন কারণ নেই বরং যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ এসব জিনিসের মালিক তিনি নিজের দাসদের জন্য এ জিনিসটি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন বলে এটি হালাল। তাই কুরআন মজীদ সর্বোচ্চ বলিষ্ঠতা সহকারে এ মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, কোন বস্তুর হালাল ও হারাম হবার জন্য সর্বশক্তিমান প্রভু আল্লাহর অনুমোদন ও অননুমোদন ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন ভিত্তির আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। অনুরূপভাবে আল্লাহ যে কাজটিকে বৈধ গণ্য করেছেন সেটি বৈধ এবং যেটিকে অবৈধ গণ্য করেছেন সেটি অবৈধ, এছাড়া মানুষের জন্য কোন কাজের বৈধ ও অবৈধ হবার দ্বিতীয় কোন মানদণ্ড নেই।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

‘বাহীমা’ বলতে যে-কোনও চার পা বিশিষ্ট প্রাণীকে বোঝায়, কিন্তু তার মধ্যে হালাল কেবল গৃহপালিত (বা গবাদি) পশু, অর্থাৎ গরু, উট, ছাগল, ভেড়া অথবা যে-গুলো গবাদি পশুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেমন হরিণ, নীল গাই ইত্যাদি।

তাফসীরে জাকারিয়া

১. হে মুমিনগন(১)! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ(২) পূর্ণ করবে(৩)। যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হচ্ছে(৪) তা ছাড়া গৃহপালিতা(৫) চতুষ্পদ জন্তু(৬) তোমাদের জন্য হালাল করা হল, তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে বৈধ মনে করবে না(৭)। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ যা ইচ্ছে আদেশ করেন।(৮)

(১) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন শুনবে যে, আল্লাহ্ তাআলা ‘ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানু’ বা ‘হে ঈমানদারগণ’ বলছে তখন সেটাকে কান লাগিয়ে শুন। কেননা, এর মাধ্যমে কোন কল্যানের নির্দেশ আসবে বা অকল্যাণ থেকে নিষেধ করা হবে। (ইবন কাসীর)

(২) আয়াতে মুমিনগণকে ওয়াদা-অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কারণেই সূরা মায়েদার অপর নাম ‘সূরা উকুদ’ তথা ওয়াদা- অঙ্গীকারের সূরা। চুক্তি-অঙ্গীকার ও লেন-দেনের ক্ষেত্রে এ সূরাটি বিশেষ করে এর প্রথম আয়াতটি সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমর ইবন হাযমকে ঐ আমলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন এবং একটি ফরমান লিখে তাঁর হাতে অর্পণ করেন, তখন এ ফরমানের শিরোনামে উল্লেখিত আয়াতটিও লিপিবদ্ধ করে দেন। (দেখুন, নাসায়ী: ৪৮৫৬; আল খাতীবুল বাগদাদী, আল ফাকীহ ওয়াল মুতাফাককিহ হাদীস নং ৩১৮ (হাদীসটির সনদ হাসান); দেখুন, আদেল ইউসুফ আল-আযযাযীর টিকা এবং ইরউয়াউল গালীল ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা নং ১৫৮-১৬১)

(৩) عُقُودٌ শব্দটি عقد শব্দের বহুবচন। এর শাব্দিক অর্থ বাঁধা, আবদ্ধ করা। চুক্তিতে যেহেতু দুই ব্যক্তি অথবা দুই দল আবদ্ধ হয়, এজন্য এটাকেও عقد বলা হয়েছে। এভাবে عقود এর অর্থ হয়- عهود অর্থাৎ চুক্তি ও অঙ্গীকার। (তাবারী) বস্তুত: দুই পক্ষ যদি ভবিষ্যতে কোন কাজ করা অথবা না করার বাধ্য-বাধকতায় একমত হয়ে যায়, তবে তাকেই আমরা আমাদের পরিভাষায় চুক্তি বলে অভিহিত করে থাকি। অতএব, উপরোক্ত বাক্যের সারমর্ম এই যে, পারস্পরিক চুক্তি পূর্ণ করাকে জরুরী ও অপরিহার্য মনে কর। (আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস)

তবে এ আয়াতে চুক্তি বলে কোন ধরনের চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে তফসীরবিদগণের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের কাছ থেকে ঈমান ও ইবাদত সম্পর্কিত যে সব অঙ্গীকার নিয়েছেন অথবা আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের কাছ থেকে স্বীয় নাযিলকৃত বিধি-বিধান হালাল ও হারাম সম্পর্কিত যেসব অঙ্গীকার নিয়েছেন, আয়াতে সেগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। তাফসীরকার যায়দ ইবনে আসলাম বলেনঃ এখানে ঐসব চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ পরস্পরে একে অন্যের সাথে সম্পাদন করে। যেমন, বিবাহ-শাদী ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি। মুজাহিদ, রবী, কাতাদা প্রমুখ বলেনঃ এখানে ঐসব শপথ ও অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে যা জাহেলিয়াত যুগে একজন অন্যজনের কাছ থেকে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে সম্পাদন করতো। (বাগভী)

প্রকৃতপক্ষে এ সব উক্তির মধ্যে কোন বিরোধিতা নাই। কারণ, উপরোক্ত সব চুক্তি ও অঙ্গীকারই এ শব্দের অন্তর্ভুক্ত এবং কুরআন সবগুলোই পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে। ইমাম আবুল লাইস আস-সামারকান্দী বলেনঃ চুক্তির যত প্রকার রয়েছে, সবই এ শব্দের অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরো বলেনঃ এর প্রাথমিক প্রকার তিনটি। (এক) পালনকর্তার সাথে মানুষের অঙ্গীকার। উদাহরণতঃ ঈমান ও ইবাদতের অঙ্গীকার অথবা হারাম ও হালাল মেনে চলার অঙ্গীকার। (দুই) নিজের সাথে মানুষের অঙ্গীকার। যেমন, নিজ যিম্মায় কোন বস্তুর মান্নত মানা অথবা শপথ করে কোন কাজ নিজের উপর জরুরী করে নেওয়া। (তিন) মানুষের সাথে মানুষের সম্পাদিত চুক্তি। এছাড়া সে সব চুক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত, যা দুই ব্যক্তি, দুই দল বা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত হয়। বিভিন্ন সরকারের আন্তজাতিক চুক্তি অথবা পারস্পরিক সমঝোতা, বিভিন্ন দলের পারস্পরিক অঙ্গীকার এবং দুই ব্যক্তির মধ্যকার সর্বপ্রকার লেন-দেন,বিবাহ, ব্যবসা, শেয়ার, ইজারা ইত্যাদিতে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে সব বৈধ শর্ত স্থির করা হয়, আলোচ্য আয়াতদৃষ্টে তা মেনে চলা প্রত্যেক পক্ষের অবশ্য কর্তব্য। তবে শরীআত বিরোধী শর্ত আরোপ করা এবং তা গ্রহণ করা কারও জন্যে বৈধ নয়। (তাফসীর আবুল লাইস আস-সামারকান্দী)

(৪)  যা বর্ণিত হচ্ছে বলে যা বোঝানো হয়েছে, তা এখানে বর্ণিত হয় নি। পরবর্তী ৩ নং আয়াতে সেটার বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। (আদওয়াউল বায়ান)

(৫) আয়াতে বর্ণিত أنعام শব্দটি نعم এর বহুবচন। এর অর্থ পালিত পশু। যেমন- উট, গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি। সূরা আল-আন'আমে এদের আটটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে। এদের সবাইকে أنعام বলা হয়। এখন আয়াতের অর্থ দাঁড়িয়েছে এই যে, গৃহপালিত পশু আট প্রকার তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, عقود শব্দ বলে যাবতীয় চুক্তি-অঙ্গীকার বুঝানো হয়েছে। তন্মধ্যে একটি ছিল ঐ অঙ্গীকার, যা আল্লাহ তা'আলা হালাল ও হারাম মেনে চলার ব্যাপারে বান্দার কাছ থেকে নিয়েছেন। আলোচ্য বাক্যে এই বিশেষ অঙ্গীকারটিই বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্যে উট, ছাগল, গরু, মহিষ ইত্যাদিকে হালাল করে দিয়েছেন। শরীআতের নিয়ম অনুযায়ী তোমরা এগুলোকে যবেহ করে খেতে পার। (কুরতুবী)

(৬) এখানে সব ধরনের জন্তু বুঝানো হয়নি। বরং সুনির্দিষ্ট কিছু জন্তু বোঝানো হয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে بَهِيمَةٌ যেসব জীব-জন্তুকে সাধারণভাবে নির্বোধ মনে করা হয়, সেগুলোকে بَهِيمَةٌ বলা হয়। কেননা, মানুষ অভ্যাসগতভাবে তাদের ভাষা বুঝে না। ফলে তাদের বক্তব্য مُبْهَم তথা অস্পষ্ট থেকে যায়। এখানে ‘বাহীমা’ বলে কোন কোন সাহাবীর মতে, জবাইকৃত প্রাণীর উদরে যে বাচ্ছা পাওয়া যায় সেটাকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসীরে কুরতুবী; সা’দী, বাগভী; ফাতহুল কাদীর)

(৭) ইহরাম অবস্থায় শিকার করতে নিষেধ করার মাধ্যমে এটাও উদ্দেশ্য হতে পারে যে, পূর্বে বর্ণিত ‘বাহীমাতুল আন’আম’ বলতে সে সমস্ত প্রাণীকেও বোঝাবে, যেগুলোকে সাধারণত শিকার করা হয়। যেমন, হরিণ, বন্য গরু, খরগোশ ইত্যাদি। কারণ, ইহরাম অবস্থায় শিকার করা হারাম হওয়ার অর্থ স্বাভাবিক অবস্থায় হালাল হওয়া। (সা’দী)

(৮) আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী একচ্ছত্র শাসক। তিনি নিজের ইচ্ছেমত যে কোন হুকুম দেয়ার পূর্ণ ইখতিয়ার রাখেন। কাতাদা বলেন, তিনি তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে যা ইচ্ছে বিধান প্রদানের অধিকারী। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য যা ইচ্ছা তা বর্ণনা করেন, ফরয নির্ধারিত করেন, সীমা ঠিক করে দেন। আনুগত্যের নির্দেশ দেন ও অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেন। (আত-তাফসীরুস সহীহ) তার সমস্ত বিধান জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যুক্তি, ন্যায়-নীতি ও কল্যাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও ঈমানদার শুধু এ জন্যই তার আনুগত্য করে না; বরং একমাত্র সর্বশক্তিমান প্রভু আল্লাহর হুকুম বলেই তার আনুগত্য করে। তাই কোন বস্তুর হালাল ও হারাম হবার জন্য আল্লাহর অনুমোদন ও অননুমোদন ছাড়া আর দ্বিতীয় ভিত্তির আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। তারপরও সেগুলোতে অনেক হেকমত নিহিত থাকে। যেমন তোমাদেরকে তিনি অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ, এতে রয়েছে তোমাদের স্বার্থ। আর এর বিপরীত হলে, তোমাদের স্বার্থহানী হবে। তোমাদের জন্য কিছু প্রাণী হালাল করেছেন সম্পূর্ণ দয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। আবার কিছু প্রাণী থেকে নিষেধ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে মুক্ত রাখার জন্য। অনুরূপভাবে তোমাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিষেধ করেছেন, তার সম্মান রক্ষার্থে। (সা'দী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।(1) যে সব জন্তুর কথা তোমাদের উপর পাঠ করা হচ্ছে(2) তা ছাড়া (ক্ষুরবিশিষ্ট) চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য বৈধ করা হল,(3) তবে ইহরাম অবস্থায় শিকারকে বৈধ মনে করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ নিজ ইচ্ছামত আদেশ প্রদান করে থাকেন।

(1) ‘عقود’ এটা ‘عقد’ এর বহুবচন। যার আভিধানিক অর্থ গিরা লাগানো। এ শব্দ কোন বস্তু (দড়ি, সূতা, চুল ইত্যাদি)-তে গিরা বাঁধার অর্থেও ব্যবহার হয়; যেমন অঙ্গীকার ও চুক্তি করার অর্থেও ব্যবহার হয়। এখানে এর অর্থ, আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান যা মানুষের উপর আরোপ করা হয়েছে। অনুরূপ লোকেরা ব্যবহারিক জীবনে নিজেদের মধ্যে যে অঙ্গীকার ও চুক্তি করে, তাকেও বুঝানো হয়েছে। উভয়ই পালন ও পূর্ণ করা আবশ্যিক।

(2) بهيمة চতুষ্পদ জন্তুকে বলা হয়। بهم ـ إبهام ধাতু থেকে এর উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন, এদের বাকশক্তি, জ্ঞান ও বোধশক্তিতে যেহেতু إبهام (রুদ্ধতা) আছে, তার জন্য এদেরকে بهيمة বলা হয়েছে। أَنْعاَمٌ উট, গরু, ছাগল ও ভেঁড়া বা দুম্বাকে বলা হয়। কেননা এদের গতি ও চালচলনে نعومة (নম্রতা) থাকে। بهيمة الأنعام (চতুষ্পদ জন্তু) নর ও মাদী মিলে আট প্রকার; যা সূরা আনআম ১৪৩নং আয়াতে বিস্তারিত আকারে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া যে সব পশুকে অহ্শী, জংলী, বন্য বা বুনো বলা হয়; যেমন হরিণ, নীল গাই ইত্যাদি, যেগুলো সাধারণতঃ শিকার করা হয়, সেগুলোও বৈধ। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় এগুলো ও অন্যান্য পাখী শিকার করা নিষেধ। সুন্নাহতে বর্ণিত নীতি অনুসারে যে পশু শিকারী দাঁতবিশিষ্ট এবং যে পাখী শিকারী নখবিশিষ্ট নয় তা হালাল। যেমন সূরা বাক্বারার ১৭৩নং আয়াতের টীকায় এর বিস্তারিত বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। শিকারী দাঁতবিশিষ্ট পশু বলতে সেই পশু উদ্দিষ্ট, যে তার শিকারী বা ছেদক দাঁত দ্বারা শিকার ধরে ও ফেড়ে খায়; যেমন বাঘ (সিংহ, চিতা, নেকড়ে), কুকুর প্রভৃতি। আর শিকারী নখবিশিষ্ট পাখী বলতে সেই পাখী উদ্দিষ্ট, যে তার ধারালো নখর দ্বারা শিকার ধরে; যেমন শকুনি, বাজ, ঈগল, চিল, কাক ইত্যাদি।

(3) এর বিস্তারিত বিবরণ ৩নং আয়াতে আসছে।