إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلۡأَبۡتَرُ

ইন্না শা-নিআকা হুওয়াল আবতার।উচ্চারণ

তোমার দুশমনই শিকড় কাটা। তাফহীমুল কুরআন

নিশ্চয়ই তোমার যে শত্রু তারই শেকড় কাটা। মুফতী তাকী উসমানী

নিশ্চয়ই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীইতো নিবংর্শ।মুজিবুর রহমান

যে আপনার শত্রু, সেই তো লেজকাটা, নির্বংশ।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ।ইসলামিক ফাউন্ডেশন

নিশ্চয় তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণকারীই নির্বংশ।আল-বায়ান

(তোমার নাম-চিহ্ন কোন দিন মুছবে না, বরং) তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই নাম চিহ্নহীন- নির্মূল।তাইসিরুল

তোমার বিদ্বেষকারীই তো স্বয়ং বঞ্চিত।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

এখানে شَانِئَكَ (শা-নিআকা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল হচ্ছে شنء (শানউন)। এর মানে এমন ধরনের বিদ্বেষ ও শত্রুতা যে কারণে একজন অন্য জনের বিরুদ্ধে অসদ্ব্যবহার করতে থাকে। কুরআন মজীদের অন্য জায়গায় বলা হয়েছেঃ

وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا

“আর হে মুসলমানরা! কোন দলের প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন কোন বাড়াবাড়ি করতে উদ্বুদ্ধ না করে যার ফলে তোমরা ইনসাফ করতে সক্ষম না হও।”

কাজেই এখানে “শানিয়াকা” বলে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শত্রুতায় অন্ধ হওয়া তাঁর প্রতিও দোষারোপ করে, তাঁকে গালিগালাজ করে, তাঁকে অবমাননা করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নানান ধরনের অপবাদ দিয়ে নিজের মনের ঝাল মেটায়।

هُوَ الْأَبْتَرُ “সেই আবতার” বলা হয়েছে। অর্থাৎ সে তোমাকে আবতার বলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে নিজেই আবতার। আমি ইতিপূর্বে এ সূরার ভূমিকায় “আবতার” শব্দের কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছি। এই শব্দের মূলে রয়েছে বাতারা (بتر) এর মানে কাটা। কিন্তু এর পরিভাষিক অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। হাদীসে নামাযের যে রাকাতের সাথে অন্য কোন রাকাত পড়া হয় না তাকে বুতাইরা (بتيراء) বলা হয়। অর্থাৎ একক রাকাত। অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ

كُلُّ أَمْرٍ ذِى بَالٍ لاَ يُبْدَأُ فِيهِ بِالْحَمْدِ الله فهو ابتر

“যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আল্লাহর প্রসংশাবাণী উচ্চারণ না করে শুরু করাটা আবতার।”

অর্থাৎ তার শিকড় কাটা গেছে। সে কোন প্রতিষ্ঠা ও শক্তিমত্তা লাভ করতে পারে না। অথবা তার পরিণাম ভালো নয়। ব্যর্থ কাম ব্যক্তিকেও আবতার বলা হয়। যে ব্যক্তির কোন উপকার ও কল্যাণের আশা নেই এবং যার সাফল্যের সব আশা নির্মূল হয়ে গেছে তাকেও আবতার বলে। যার কোন ছেলে সন্তান নেই অথবা হয়ে মারা গেছে তার ব্যাপারেও আবতার শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কারণ তার অবর্তমানে তার নাম নেবার মতো কেউ থাকে না এবং মারা যাবার পর তার নাম নিশানা মুছে যার। প্রায় সমস্ত অর্থেই কুরাইশ কাফেররা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবতার বলতো। তার জবাবে আল্লাহ বলেন, হে নবী! তুমি আবতার নও বরং তোমার এ শত্রুই আবতার। এটা নিছক কোন জবাবী আক্রমণ ছিল না। বরং এটা ছিল আসলে কুরআনের বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্য থেকে একটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী। এটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়। যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় তখন লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবতার মনে করতো। তখন কেউ ধরণা করতে পারতো না যে, কুরাইশদের এ বড় বড় সরদাররা আবার কেমন করে আবতার হয়ে যাবে? তারা কেবল মক্কায়ই নয় সমগ্র দেশে খ্যাতিমান ছিল। তারা সফলকাম ছিল। তারা কেবল ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির অধিকারী ছিল না বরং সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় ছিল তাদের সহযোগী ও সাহায্যকারী দল। ব্যবসার ইজারাদার ও হজ্জের ব্যবস্থাপক হবার কারণে আরবের সকল গোত্রের সাথে ছিল তাদের সম্পর্ক। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেলো। হিজরী ৫ সনে আহযাব যুদ্ধের সময় কুরাইশরা বহু আরব ও ইহুদি গোত্র নিয়ে মদীনা আক্রমণ করলো এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবরুদ্ধ অবস্থায় শহরের চারদিক পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত হতে হলো। কিন্তু এর মাত্র তিন বছর পরে ৮ হিজরীতে রসূলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কা আক্রমণ করলেন তখন কুরাইশদের কোন সাহায্য-সহযোগিতা দানকারী ছিল না। নিতান্ত অসহায়ের মতো তাদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতে হলো। এরপর এক বছরের মধ্যে সমগ্র আরব দেশ ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের করতলগত। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল এসে তাঁর হাতে বাই’আত হচ্ছিল। ওদিকে তাঁর শত্রুরা সম্পূর্ণরূপে বন্ধু-বান্ধব ও সাহায্য-সহায়হীন হয়ে পড়েছিল। তারপর তাদের নাম-নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে এমনভাবে মুছে গেলো যে, তাদের সন্তানদের কেউ আজ বেঁচে থাকলেও তাদের কেউই আজ জানে না সে আবু জেহেল আর আবু লাহাব, আস ইবনে ওয়ায়েল বা উকবা ইবনে আবীমু’আইত ইত্যাদি ইসলামের শত্রুদের সন্তান। আর কেউ জানলেও সে নিজেকে এদের সন্তান বলে পরিচয় দিতে প্রস্তুত নয়। বিপরীতপক্ষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গের ওপর আজ সারা দুনিয়ায় দরূদ পড়া হচ্ছে। কোটি কোটি মুসলমান তাঁর সাথে সম্পর্কিত হবার কারণে গর্ব করে। লাখো লাখো লোক তাঁর সাথেই নয় বরং তাঁর পরিবার-পরিজন এমন কি তাঁর সাথীদের পরিবার-পরিজনের সাথেও সম্পর্কিত হওয়াকে গৌরবজনক মনে করে। এখানে কেউ সাইয়েদ, কেউ উলুব্বী, কেউ আব্বাসী, কেউ হাশেমী, কেউ সিদ্দিকী, কেউ ফারুকী, কেউ উসমানী, কেউ যুবাইরী এবং কেউ আনসারী। কিন্তু নামমাত্রও কোন আবু জেহেলী বা আবু লাহাবী পাওয়া যায় না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, রসূলুল্লাহ ﷺ আবতার নন বরং তাঁর শত্রুরাই আবতার।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

‘শেকড় কাটা’ কুরআন মাজীদের শব্দ হল ابتر (আবতার) শাব্দিক অর্থ, যার শেকড় কাটা। আরববাসী ‘আবতার’ শব্দটি এমন লোকের জন্য ব্যবহার করে যার বংশধারা চালু থাকে না, অর্থাৎ যার কোন পুত্র সন্তান থাকে না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল পুত্র সন্তান ইন্তেকাল করলে আস ইবনে ওয়াইল ও অন্যান্য কাফেরগণ তাঁর প্রতি কটাক্ষ করে বলতে লাগল, তিনি আবতার, তার বংশ রক্ষা হবে না। তারই জবাবে আল্লাহ তাআলা এ সূরাটি নাযিল করেছিলেন। এতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তো আপনাকে কাওছার দান করেছেন। আপনার ঔরসজাত পুত্র বেঁচে না থাকলে ক্ষতি কি? আপনার রূহানী পুত্র তো অগণ্য। তারাই আপনার নাম রাখবে এবং আপনার দীন নিয়ে এগিয়ে চলবে। ‘আবতার’ তো আপনার শত্রুগণ। মৃত্যুর পর তাদের কোন নাম-নিশানা বাকি থাকবে না। বাস্তবে তাই হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমর হয়ে আছেন ও থাকবেন। তাঁর নাম বিশ্বের সর্বত্র ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়ে থাকে। আলহামদুলিল্লাহ তাঁর পবিত্র জীবন-চরিতের চর্চা একটা জীবন্ত বিষয় হয়ে আছে। অপর দিকে যারা তাঁর নিন্দা করত, তাদেরকে কেউ চেনেও না আর কেউ তাদের নামোল্লেখ করলেও ঘৃণার ও অবজ্ঞার সাথেই করে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৩. নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ।(১)

(১) সাধারণতঃ যে ব্যক্তির পুত্ৰ সন্তান মারা যায়, আরবে তাকে أَبْتَر বা নির্বংশ বলা হত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত্র কাসেম অথবা ইবরাহীম যখন শৈশবেই মারা গেলেন, তখন কাফেররা তাকে নির্বংশ বলে উপহাস করত। একবার কাব ইবনে আশরাফ ইয়াহুদী সর্দার মক্কায় আগমন করল। কুরাইশের নেতারা তাকে বলল, আপনি কি মদীনাবাসীদের উত্তম ব্যক্তি ও নেতা? সে বলল, হ্যাঁ, তখন তারা বলল, আপনি কি দেখেন না এই লোকটি যে তার জাতির মধ্যে নির্বংশ সে মনে করে সে আমাদের থেকে উত্তম? অথচ আমরা, হজ ও কাবাঘরের সেবায়েত। তখন কাব ইবনে আশরাফ বলল, তোমরা তার থেকে উত্তম। তখন এ আয়াত নাযিল হয়, এতে বলা হয়, “নিশ্চয় আপনার শত্রুরাই তো নির্বংশ” আরও নাযিল হয়, আপনি কি দেখেননা তাদেরকে যাদের কিতাবের কিছু অংশ দেয়া হয়েছিল, তারা মূর্তি ও তাগুতের উপর ঈমান রাখে...”। (সূরা আন-নিসা: ৫১, ৫২, হাদীসটি বর্ণনা করেন, নাসায়ী, কিতাবুত-তাফসীর, ২/৫৬০, নং: ৭২৭, ইবনে হিব্বান ৬৫৭২)

এ আয়াতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নির্বংশ বলে যে দোষারোপ করা হতো তার জওয়াব দেয়া হয়েছে। শুধু পুত্রসন্তান না থাকার কারণে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্বংশ বলে বা তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা তার প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে বেখবর। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশগত সন্তান-সন্ততিও কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যদিও তা কন্যা-সন্তানের তরফ থেকে হয়। তাছাড়া নবীর আধ্যাতিক সন্তান অর্থাৎ উম্মত তো এত অধিকসংখ্যক হবে যে, পূর্ববর্তী সকল নবীর উম্মতের সমষ্টি অপেক্ষাও বেশী হবে। এছাড়া এ সূরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রিয় ও সম্মানিত তাও বিবৃত হয়েছে। (আদওয়াউল বায়ান)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

৩। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই হল নির্বংশ। (1)

(1) أَبتَر এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যে নির্বংশ; যার বংশধর কেউ নেই অথবা যার নাম নেওয়ার কেউ নেই। যখন নবী (সাঃ)-এর কোন ছেলে-সন্তান জীবিত থাকল না, তখন কিছু কাফের তাঁকে নির্বংশ বলতে লাগল। এই কথার উপরে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, নির্বংশ তুমি নও; বরং তোমার দুশমনরাই নির্বংশ হবে। সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁর বংশকে তাঁর কন্যার পরম্পরা দ্বারা বাকী রেখেছেন। এ ছাড়া তাঁর উম্মতও তাঁর আধ্যাত্মিক সন্তানেরই পর্যায়ভুক্ত। যাদের আধিক্য নিয়ে তিনি কিয়ামতে অন্যান্য উম্মতের উপর গর্ব করবেন। এ ছাড়াও নবী (সাঃ)-এর নাম সারা বিশ্বে বড় শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে তাঁর শত্রুদের নাম শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতাতেই লেখা পড়ে আছে। কারো অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নেই এবং কারো মুখে প্রশংসার সাথে তাদের নাম উল্লেখ হয় না।