ইন্না-আনঝালনাইলাইকাল কিতা-বা বিলহাক্কিলিতাহকুমা বাইনান্না-ছি বিমাআর-কাল্লাহু ওয়ালা-তাকুল লিলখাইনীনা খাসীমা-।উচ্চারণ
হে নবী! ১৪০ আমি সত্য সহকারে এই কিতাব তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে সঠিক পথ দেখিয়েছেন সেই অনুযায়ী তুমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পারো। তুমি খেয়ানতকারী ও বিশ্বাস ভংগকারীদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হয়ো না। তাফহীমুল কুরআন
নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি সত্য-সম্বলিত কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে উপলব্ধি দিয়েছেন, সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে মীমাংসা করতে পার। আর তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষাবলম্বনকারী হয়ো না। #%৭৭%#মুফতী তাকী উসমানী
নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি - যেন তুমি তদনুযায়ী মানবদেরকে আদেশ প্রদান কর, যা আল্লাহ তোমাকে শিক্ষা দান করেছেন এবং তুমি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়োনা।মুজিবুর রহমান
নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আমি তো তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি আল্লাহ্ তোমাকে যা জানিয়েছেন সেই অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর আর তুমি বিশ্বাসভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক কর না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফয়সালা কর সে অনুযায়ী যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন। আর তুমি খিয়ানতকারীদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়ো না।আল-বায়ান
অবশ্যই আমি সত্য সহকারে তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যেন তুমি যা আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন, সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা কর এবং খিয়ানতকারীদের পক্ষে তর্ক করো না।তাইসিরুল
আর আল্লাহ্র কাছে পরিত্রাণ খোঁজো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হচ্ছেন পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।মাওলানা জহুরুল হক
১৪০
এই রুকূ’ এবং এর পরবর্তী রুকূ’তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। ব্যাপারটি সেই যুগেই সংঘটিত হয়। ঘটনার নায়ক হচ্ছে আনসারদের যাফর গোত্রের তা’মাহ্ বা বশীর ইবনে উবাইরিক নামক এক ব্যক্তি। সে এক আনসারির বর্ম চুরি করে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু হলে সে চোরাই মালটি এক ইহুদীর কাছে রাখে। বর্মের মালিক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ করে এবং তা’মাহকে সন্দেহ করে। কিন্তু তা’মাহ, তার ভাই বেরাদাররা এবং বনি যাফরের আরো বহু লোক নিজেদের মধ্যে একমত হয়ে সেই ইহুদীটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। ইহুদীকে জিজ্ঞেস করা হলে সে নিজের নির্দোষিতা প্রকাশ করে কিন্তু তা’মাহর পক্ষপাতিরা তার সমর্থনে খুব জোরেশোরে এগিয়ে যায়। তারা বলতে থাকেঃ এই শয়তান ইহুদী, সেতো সত্যকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করে, তার কথা কেমন করে বিশ্বাসেযাগ্য হতে পারে? বরং আমাদের কথা মেনে নেয়া উচিত কারণ আমরা মুসলমান। এই মোকাদ্দমার বাহ্যিক ধারা বিবরণীতে প্রভাবিত হয়ে নবী করীম ﷺ ইহুদীটির বিরুদ্ধে রায় দিতে এবং অভিযোগকারীকে বনী উবাইরিকের বিরুদ্ধে দোষারোপ করার জন্য সতর্ক করে দিতে প্রায় উদ্যত হয়েছিলেন। এমন সময় অহী নাযিল হয় এবং সমস্ত ব্যাপারটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে দেয়া হয়।
একজন বিচারপতি হিসেবে বাহ্যিক যুক্তি প্রমাণ ও সাক্ষী সাবুদের ভিত্তিতে মোকদ্দমার মীমাংসা করা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য কোন গোনাহের কাজ ছিল না। এ ধরনের অবস্থা বিচারপতিদের সামনে আসেও। অর্থাৎ মিথ্যা প্রমাণ ও সাক্ষী সাবুদের ভিত্তিতে তাদের কাছে থেকে নিজেদের সপক্ষে রায় নিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু সে সময় ইসলাম ও কুফরের মধ্যে একটি প্রচণ্ড সংঘাত চলছিল। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি মোকদ্দমার বাহ্যিক ধারা বিবরণী শুনে সেই অনুযায়ী ইহুদীর বিরুদ্ধে ফয়সালা করে দিতেন তাহলে ইসলাম বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে এবং সমগ্র ইসলামী দল ও ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে একটি মারাত্মক শক্তিশালী নৈতিক হাতিয়ার পেয়ে যেতো। তারা প্রপাগাণ্ডা করতে থাকতোঃ আহা, যাই বলেন না কেন, এখানে হক ও ইনসাফের কোন বালাই নেই। এখানেও তো সেই একই দলপ্রীতি ও অন্ধ গোত্রপ্রীতি কাজ করছে যার বিরুদ্ধে এরা নিজেরাই প্রচার অভিযান চালিয়ে আসছে। এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য আল্লাহ বিশেষ করে এই মোকদ্দমায় হস্তক্ষেপ করেন।
এই রুকূ’তে একদিকে সেসব মুসলমানদের কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করা হয়েছে যারা নিছক অন্ধ গোত্র ও পরিবার প্রীতির কারণে অপরাধীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। অন্যদিকে সাধারণ মুসলমানদের এই মর্মে শিক্ষা দান করা হয়েছে যে, ন্যায় ও ইনসাফের প্রশ্নে কোনো প্রকার অন্ধ বিদ্বেষ ও কওম প্রীতির অবকাশ না থাকাই উচিত। নিজের দলের লোকেরা বাতিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের অযথা সমর্থন করতে হবে এবং অন্য দলের লোকেরা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের প্রতি অন্যায় করতে হবে-এ নীতি কখনো ন্যায়সঙ্গত হতেপারে না।
এ আয়াতসমূহ যদিও সাধারণ পথ-নির্দেশ সম্বলিত, কিন্তু নাযিল হয়েছে বিশেষ এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। বনু উবায়রিকের বিশর নামক এক ব্যক্তি, যে বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছিল, হযরত রিফাআ নামক এক সাহাবীর ঘর থেকে কিছু খাদ্যশস্য ও হাতিয়ার চুরি করে নিয়ে যায়। আর নেওয়ার সময় সে এই চালাকি করে যে, খাদ্যশস্য যে বস্তায় ছিল তার মুখ কিছুটা আলগা করে রাখে। ফলে রাস্তায় অল্প-অল্প গম পড়তে থাকে। এভাবে যখন এক ইয়াহুদীর বাড়ির দরজায় পৌঁছায় তখন সে বস্তার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরে আবার চোরাই হাতিয়ারও সেই ইয়াহুদীর বাড়িতে রেখে আসে, অতঃপর যখন অনুসন্ধান করা হল, তখন একে তো ইয়াহুদীর বাড়ি পর্যন্ত খাদ্যশস্য পড়ে থাকতে দেখা গেল। দ্বিতীয়ত: হাতিয়ারও তার বাড়িতেই পাওয়া গেল। তাই প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেয়াল এ দিকেই গেল যে, সেই ইয়াহুদীই চুরি করেছে। ইয়াহুদীকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, হাতিয়ার তো বিশর নামক এক ব্যক্তি আমার কাছে রেখে গেছে। কিন্তু সে যেহেতু এর সপক্ষে কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে পারছিল না, তাই তাঁর ধারণা হল সে নিজের জান বাঁচানোর জন্যই বিশরের নাম নিচ্ছে। অপর দিকে বিশরের খান্দান বনু উবায়রিকের লোকজনও বিশরের পক্ষাবলম্বন করল এবং তারা জোর দিয়ে বলল, বিশরের নয়; বরং ওই ইয়াহুদীরই শাস্তি হওয়া উচিত। এ পরিস্থিতিতেই এ আয়াত নাযিল হয় এবং এর মাধ্যমে বিশরের ধোঁকাবাজীর মুখোশ খুলে দেওয়া হয়। আর ইয়াহুদীকে সম্পূর্ণ নিরপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। বিশর যখন জানতে পারল গোমর ফাঁস হয়ে গেছে, তখন সে পালিয়ে মক্কায় চলে গেল এবং কাফিরদের সাথে মিলিত হল। সেখানেই কাফেররূপে অত্যন্ত ঘৃণিত অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। এ আয়াতসমূহের দ্বারা এক দিকে তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা উন্মোচন করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমায় ফায়সালা দানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বাতলে দেওয়া হয়। প্রথম মূলনীতি হল, যে-কোনও ফায়সালা আল্লাহ তাআলার কিতাবে প্রদত্ত বিধানাবলীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। দ্বিতীয় মূলনীতি এই যে, আল্লাহ তাআলা নিজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিভিন্ন সময়ে এমন বহু বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কুরআন মাজীদে সরাসরি যার উল্লেখ নেই। ফায়সালা দানের সময় বিচারককে তা থেকেও আলো নিতে হবে। এরই প্রতি ইঙ্গিত করে আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যাতে আল্লাহ তোমাকে যে উপলব্ধি দিয়েছেন, সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে ফায়সালা করতে পার।’ এতদদ্বারা কুরআন মাজীদের বাইরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহও যে প্রামাণ্য মর্যাদা রাখে, তার প্রতিও ইশারা করা হয়েছে। তৃতীয় মূলনীতি এই বলা হয়েছে যে, মামলা-মোকদ্দমায় যে ব্যক্তি সম্পর্কেই জানা যাবে, সে ন্যায়ের উপরে নেই, তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া ও তার উকিল হওয়া জায়েয নয়। বনু উবায়রিক বিশরের পক্ষে ওকালতি করলে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, প্রথমত এ ওকালতিই জায়েয নয়। দ্বিতীয়তঃ অভিযুক্ত ব্যক্তি এর দ্বারা বড়জোর দুনিয়ার জীবনে উপকৃত হবে। আখিরাতে তোমাদের ওকালতি তাকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারবে না।
১০৫. আমরা(১) তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করতে পারেন। আর আপনি বিশ্বাসভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক করবেন না(২)।
(১) সূরা আন-নিসার ১০৫ থেকে ১১৩ নং আয়াত এক বিশেষ ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ঘটনাটি হচ্ছে, হিজরতের প্রাথমিক যুগে সাধারণ মুসলিমদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তাদের সাধারণ খাদ্য ছিল যবের আট কিংবা খেজুর কিংবা গমের আটা। এগুলো প্রায়ই মদীনায় পাওয়া যেতো না। সিরিয়া থেকে কোন চালান এলে কেউ কেউ তা সংগ্রহ করে রাখত। রিফা'আ ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ ধরনের কিছু গমের আটা সংগ্রহ করে একটি বস্তায় রেখে দিয়েছিলেন। এ বস্তার মধ্যে কিছু অস্ত্র-শস্ত্রও রেখে একটি ছোট কক্ষে সংরক্ষিত রেখেছিলেন। মদীনাতে তখন বনু উবাইরাক গোত্রের বিশর, বশীর ও মুবাশশির নামীয় তিন লোক বিশেষ কারণে খ্যাতি লাভ করেছিল। তন্মধ্যে বশীর ছিল প্রকৃতই মুনাফিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বদনামী করে কবিতা রচনা করে অন্যের নামে চালিয়ে দিত। সেই বশীর সিধ কেটে রিফা'আ ইবন যায়েদের সে বস্তা বের করে নেয়। সকালে রিফা'আ রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যাপারটি তার ভ্রাতুষ্পপুত্র কাতাদার কাছে বিবৃত করলেন। বনু উবায়রাক বললো, সম্ভবত এটা লবীদ ইবন সাহলের কীর্তি।
লবীদ ইবন সাহল তা শুনে অত্যন্ত ক্রোধাম্বিত হলেন এবং তরবার কোষমুক্ত করে বললেন, আমার উপর অপবাদ চাপানো হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পন্থায় কাতাদা ও রিফা'আ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার প্রবল ধারণা জন্মেছিল যে, এটি বনী উবাইরাকের কীর্তি। তখন কাতাদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে চুরির ঘটনা এবং তদন্তক্রমে বনু উবাইরাকের প্রতি প্রবল ধারণার কথা আলোচনা করলেন। বনু উবায়রাক সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে রিফা'আ ও কাতাদার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, শরীআতসম্মত প্রমাণ ছাড়াই তারা আমাদের নামে চুরির অপবাদ আরোপ করছে। আপনি তাদেরকে বারণ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই করলেন। কিন্তু বেশীদিন অতিবাহিত না হতেই এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়। যার মাধ্যমে সমস্ত ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে তুলে ধরা হয়।
প্রথমে আয়াতে বলা হয়েছে, আমরা তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করতে পারেন এবং বিশ্বাসঘাতকদের অর্থাৎ বনী উবাইরাক এর সমর্থনে তর্ক করবেন না। আর আপনি ধারণার বশবর্তী হয়ে সাহাবী কাতাদা ইবন নুমানকে যা বলা হয়েছে সে জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থী হোন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ বিশ্বাস ভংগকারী পাপীকে পছন্দ করেন না। তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি তাদের সংগেই আছেন রাতে যখন তারা, তিনি যা পছন্দ করেন না- এমন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং তারা যা করে তা সর্বতোভাবে আল্লাহর জানা রয়েছে।
দেখ, তোমরাই ইহ জীবনে তাদের পক্ষে বিতর্ক করছ; কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে কে তাদের পক্ষে বিতর্ক করবে অথবা কে তাদের উকিল হবে? কেউ কোন মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি যুলুম করে পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহকে সে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে। অর্থাৎ যদি তারা ক্ষমা প্রার্থী হতো তবে আল্লাহ অবশ্যই তাদের ক্ষমা করে দিতেন। আর কেউ পাপ কাজ করলে সে ওটা তার নিজের ক্ষতির জন্যই করে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। কেউ কোন দোষ বা পাপ করে পরে ওটা কোন নির্দোষ ব্যক্তি অর্থাৎ লবীদ ইবন সাহলের প্রতি আরোপ করলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলকে উদ্দেশ্য করে নাযিল করলেন, আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তাদের একদল আপনাকে পথভ্রষ্ট করতে বদ্ধপরিকর ছিল। কিন্তু তারা নিজেদের ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং আপনার কোনই ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং আপনি যা জানতেন না তা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন, আপনার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে। এ আয়াতসমূহ নাযিল হলে মূল ঘটনা স্পষ্ট হয়ে গেল। বনু উবাইরাকের কাছ থেকে অস্ত্ৰ-শস্ত্র নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিফা'আর কাছে তা ফেরৎ দিলেন। তিনি সে সমুদয় আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলেন।
এদিক বিশর মুনাফেকী অবস্থা ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে মক্কায় সুলাফা বিনতে সাদ ইবন সুমাইয়া নামীয় এক মহিলার কাছে গিয়ে সরাসরি মুর্তাদ হয়ে গেল। তখন ১১৫ নং আয়াত নাযিল হলো, যাতে হক প্রকাশিত হওয়ার পরে রাসূলের বিরুদ্ধাচারণের কারণে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। (তিরমিযী: ৩০৩৬; মুস্তাদরাকে হাকিম ৪/৩৮৫) ঘটনা যাই হোক, কুরআনের সাধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী এ ব্যাপারে প্রদত্ত নির্দেশাবলী এ ঘটনার সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতে আগমনকারী মুসলিমদের জন্য ব্যাপক। এছাড়া এসব নির্দেশের মধ্যে অনেক মৌলিক ও শাখাগত মাসআলাও রয়েছে।
(২) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি দিনে সত্তর বারেরও অধিক আল্লাহর নিকট ইস্তেগফার এবং তাওবা করে থাকি। (বুখারীঃ ৬৩০৭)
(১০৫) তোমার প্রতি সত্য সহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন সেই অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর। (1) আর তুমি বিশ্বাসঘাতকদের স্বপক্ষে বিতর্ককারী হয়ো না। (2)
(1) এই (১০৪ থেকে ১১৩ পর্যন্ত) আয়াতগুলোর শানে নুযুল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আনসারদের যাফার গোত্রের ত্বো’মা অথবা বাশীর ইবনে উবাইরিক নামক এক ব্যক্তি অপর এক আনসারীর বর্ম চুরি করে নেয়। যখন এই চুরির চর্চা হতে লাগল এবং যখন সে অনুভব করল যে, তার চুরির কথা ফাঁস হয়ে যাবে, তখন সে (চুরিকৃত) বর্মটা এক ইয়াহুদীর বাড়িতে ফেলে দিয়ে যাফার গোত্রের কিছু লোককে সাথে নিয়ে রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হল। সকলে মিলে বলল যে, বর্মটা অমুক ইয়াহুদী চুরি করেছিল। সেই ইয়াহুদীও নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ইবনে উবাইরিক বর্ম চুরি করে আমার বাড়িতে ফেলে দিয়েছিল। যাফার গোত্রের লোকেরা (ত্বো’মা অথবা বাশীর প্রভৃতি) প্রথম থেকেই সতর্ক ছিল। তারা নবী করীম (সাঃ)-কে বুঝাতে চেষ্টা করছিল যে, চোর ইয়াহুদীই; ত্বো’মার উপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। নবী করীম (সাঃ) তাদের চমৎকার ও চতুরতাপূর্ণ কথাবার্তায় প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েন এবং আনসারীকে চুরির অপবাদ থেকে মুক্ত ঘোষণা করে ইয়াহুদীকে চুরির অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করতে যাবেন, ঠিক এই সময়ই মহান আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন। এ থেকে যে বিষয়গুলো জানা গেল তা হল, প্রথমতঃ নবী করীম (সাঃ) একজন মানুষ বিধায় তিনি ভুল বোঝাবুঝির শিকার হতেন। দ্বিতীয়তঃ তিনি গায়েব তথা অদৃশ্যের জ্ঞান রাখতেন না। গায়বের খবর জানলে তিনি সত্বর তাদের প্রকৃত ব্যাপার জেনে নিতেন। তৃতীয়তঃ মহান আল্লাহ স্বীয় পয়গম্বরের হিফাযত করেন। তাই কখনোও যদি প্রকৃত ব্যাপার গুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে নবীর দ্বারা (সত্যের) বিপরীত কিছু হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছত, সঙ্গে সঙ্গেই মহান আল্লাহ সে ব্যাপারে নবীকে সতর্ক করে তাঁর সংশোধন করে দিতেন। আর এটাই হল নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার দাবী। এ এমন এক উচ্চ মর্যাদা যা আম্বিয়া ব্যতীত আর কেউ লাভ করতে পারে না।
(2) এ থেকে উবাইরিক গোত্রকেই বুঝানো হয়েছে। যারা চুরি করে নিজেদের বাকপটুতায় ইয়াহুদীকে চোর সাব্যস্ত করার প্রচেষ্টা করেছিল। পরের আয়াতেও তাদের ও তাদের সমর্থকদের ভুল আচরণকে প্রকাশ করে নবী করীম (সাঃ)-কে সতর্ক করা হচ্ছে।