يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ مِنۡ أَزۡوَٰجِكُمۡ وَأَوۡلَٰدِكُمۡ عَدُوّٗا لَّكُمۡ فَٱحۡذَرُوهُمۡۚ وَإِن تَعۡفُواْ وَتَصۡفَحُواْ وَتَغۡفِرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٌ

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ ইন্না মিন আঝওয়া-জিকুম ওয়া আওলা-দিকুম ‘আদুওওয়াল লাকুম ফাহযারূহুম ওয়া ইন তা‘ফূওয়া তাসফাহূওয়া তাগফিরূফাইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রহীম।উচ্চারণ

হে সেই সব লোক যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। আর যদি তোমরা ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণ করো এবং ক্ষমা করে দাও তাহলে আল্লাহ‌ অতীব ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু। ২৯ তাফহীমুল কুরআন

হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সাবধান থাক। যদি তোমরা মার্জনা কর ও উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর, তবে আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মুফতী তাকী উসমানী

হে মু’মিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেহ কেহ তোমাদের শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেক। তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ ক্রটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।মুজিবুর রহমান

হে মুমিনগণ, তোমাদের কোন কোন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। যদি মার্জনা কর, উপেক্ষা কর, এবং ক্ষমা কর, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুনাময়।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

‘হে মু’মিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু ; অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেক। তোমরা যদি এদেরকে মার্জনা কর, এদের দোষত্রুটি উপেক্ষা কর এবং এদেরকে ক্ষমা কর, তবে জেনে রাখ, আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন।* অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। আর যদি তোমরা মার্জনা কর, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমাদের স্ত্রী আর সন্তানদের মধ্যে কতক তোমাদের শত্রু। কাজেই তোমরা তাদের হতে সতর্ক হও। তোমরা যদি তাদের প্রতি ক্ষমাসুলভ আচরণ কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর, আর তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (তোমাদের সে কাজ হবে আল্লাহর নিকট পছন্দীয় কারণ) আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।তাইসিরুল

ওহে যারা ঈমান এনেছ! নিশ্চয় তোমাদের কোনো-কোনো স্ত্রীরা ও তোমাদের ছেলেমেয়েরা তোমাদের শত্রু, অতএর তাদের ক্ষেত্রে হুশিয়াঁর হও। কিন্ত যদি তোমরা মাফ করে দাও ও উপেক্ষা কর ও উদ্ধার কর, তাহলে আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

২৯

এ আয়াতের দু’টি অর্থ। একটি অর্থ অনুসারে আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে বহুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষকে তাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে, স্ত্রীদেরকে তাদের স্বামীদের পক্ষ থেকে এবং পিতা-মাতাকে তাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে যেসব কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় সেই সব পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এ আয়াতটি প্রযোজ্য। ঈমান ও সত্য সঠিক পথে চলার ক্ষেত্রে একে অপরের পুরোপুরি বন্ধু ও সহযোগী হতে পারে একজন স্বামীর এরূপ স্ত্রী, একজন স্ত্রীর এরূপ স্বামী লাভ করা এবং আকীদা-বিশ্বাস, আমল-আখলাক ও চরিত্রের দিক দিয়ে সকল সন্তান-সন্তুতিই চোখ জুড়ানোর মত হওয়া, পৃথিবীতে খুব কমই ঘটে থাকে। বরং সাধারণত দেখা যায় যে, স্বামী যদি নেককার ও ঈমানদার হয় তাহলে সে এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি লাভ করে থাকে যারা তার দ্বীনদারী, আমানতদারী এবং সততাকে নিজেদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করে। তারা চায় যে, তাদের স্বামী ও পিতা তাদের জন্য জাহান্নাম খরিদ করুক এবং হালাল ও হারামের বাছবিচার না করে যে কোন পন্থায় আরাম-আয়েশ, আমোদ-ফূর্তি এবং গোনাহ ও পাপের উপকরণ এনে দিক। কোন কোন সময় আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটে থাকে। একজন নেক্কার ঈমানদার নারীকে এমন স্বামীর পাল্লায় পড়তে হয় যে স্ত্রীর শরীয়াত অনুসারে জীবন যাপন দুই চোখে দেখতে পারে না। আর সন্তানরাও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের গোমরাহী ও দুষ্কর্ম দ্বারা মায়ের জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে। বিশেষ করে কুফর ও ঈমানের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সময় যখন একজন মানুষের ঈমান দাবী করে যে, আল্লাহ‌ এবং তাঁর দ্বীনের জন্য সেই ক্ষতি স্বীকার করবে, দেশ ছেড়ে হিজরত করবে কিংবা জিহাদে অংশগ্রহণ করে নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করবে তখন তার পথে তার স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনই সর্বপ্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার সময় বিপুল সংখ্যক মুসলমানের জন্য যে বিশেষ অবস্থা ও পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছিল এবং কোন অমুসলিম সমাজে ইসলাম গ্রহণকারী যে কোন ব্যক্তির জন্য আজও দেখা দেয় এ আয়াতটির দ্বিতীয় অর্থটি সেই বিশেষ অবস্থা ও পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। সেই সময় মক্কা মুয়াযযমা ও আরবের অন্যান্য অংশে সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো যে, একজন লোক ঈমান এনেছে কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা ঈমান আনতে প্রস্তুত নয় শুধু তাই না বরং তারা তাকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সচেষ্ট। যেসব মেয়েরা তাদের পরিবারে একাকী ইসলাম গ্রহণ করতো তাদের জন্যও ঠিক একই পরিস্থিতির উদ্ভব হতো।

যেসব ঈমানদার নারী ও পুরুষ এ দু’টি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন তাদের উদ্দেশ্য করে তিনটি কথা বলা হয়েছেঃ

সর্বপ্রথম তাদের এই বলে সাবধান করা হয়েছে যে, পার্থিব সম্পর্কের দিক দিয়ে যদিও তারা মানুষের অতি প্রিয়জন কিন্তু দ্বীন ও আদর্শের দিক দিয়ে এরা তোমাদের ‘দুশমন’। তারা তোমাদের সৎকাজে বাধা দেয় এবং অসৎকাজের প্রতি আকৃষ্ট করে, কিংবা তোমাদের ঈমানের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং কুফরীর পথে সহযোগিতা করে কিংবা তারা কাফেরদের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করে মুসলমানদের সামরিক গোপণ তথ্য সম্পর্কে তারা তোমাদের নিকট থেকে যাই জানতে পারে তা ইসলামের শত্রুদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। এর যে কোন পন্থায়ই তারা দুশমনী করুক না কেন তাদের দুশমনীর ধরণ ও প্রকৃতিতে অবশ্যই পার্থক্য হয়। কিন্তু সর্বাবস্থায়ই তা দুশমনী। ঈমান যদি তোমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে সেই বিচারে তাদেরকে দুশমনই মনে করতে হবে। তাদের ভালবাসায় আবদ্ধ হয়ে এ বিষয়টি কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, তোমাদের ও তাদের মধ্যে ঈমান ও কুফর বা আনুগত্য ও অবাধ্যতার প্রাচীর আড়াল করে আছে।

এরপর বলা হয়েছে যে, তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকো। অর্থাৎ তাদের পার্থিব স্বার্থের জন্য নিজেদের পরিণাম তথা আখেরাতকে বরবাদ করো না। তোমাদের অন্তরে তাদের প্রতি ভালবাসাকে এতটা প্রবল হতে দিও না যে, তারা আল্লাহ‌ ও রসূলের সাথে তোমাদের সম্পর্ক এবং ইসলামের প্রতি তোমাদের বিশ্বস্ত ও অনুগত থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের প্রতি এতটা বিশ্বাস ও আস্থা রেখো না যাতে তোমাদের অসাবধানতার কারণে মুসলমানদের দলের গোপনীয় বিষয়সমূহ তারা অবগত হয়ে যেতে পারে এবং তা দুশমনদের হাতে পৌঁছে যায়। একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদেরকে এ বিষয়টি সম্পর্কেই সাবধান করে দিয়েছেন এই বলে যে,

يُؤْتَى بِرَجُلٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالَ اَكَلَ عَيَالُهُ حَسَنَاتَهُ-

“কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে। বলা হবে, তার সন্তান-সন্তুতিরা তার সব নেকী ধ্বংস করে ফেলেছে।”

সর্বশেষ বলা হয়েছে যে, তোমরা যদি ক্ষমা ও সহনশীলতা দেখাও এবং ক্ষমা করে দাও তাহলে আল্লাহ‌ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। এর অর্থ হলো, তাদের শত্রুতা সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করা হচ্ছে শুধু এই জন্য যে, তোমরা সতর্ক থাকবে এবং নিজেদের আদর্শকে তাদের থেকে রক্ষা করার চিন্তা-ভাবনা করবে। এই সতর্কীকরণের অর্থ কখনো এ নয় যে, যা করতে বলা হলো তার চেয়ে আরো অগ্রসর হয়ে তোমরা স্ত্রী ও সন্তানদের মারতে শুরু করবে অথবা তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করবে অথবা সম্পর্ক এমন তিক্ত করে তুলবে যে, তোমাদের এবং তাদের পারিবারিক জীবন আযাবে পরিণত হবে। কারণ এরূপ করার দু’টি স্পষ্ট ক্ষতি আছে। একটি হলো, এভাবে স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির সংশোধনের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। দ্বিতীয়টি হলো, এভাবে সমাজে ইসলামের বিরুদ্ধে উল্টা খারাপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া এভাবে আশেপাশের লোকদের দৃষ্টিতে মুসলামানদের আখলাক ও চরিত্রের এমন একটি চিত্র ভেসে উঠে যাতে তারা মনে করতে শুরু করে যে, ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে সে নিজের ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য পর্যন্ত কঠোর ও বদমেজাজী হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে এ কথাটিও মনে রাখা উচিত যে, ইসলামের প্রথম যুগে মানুষ যখন সবেমাত্র মুসলমান হতো এবং যদি তাদের পিতামাতা কাফেরই থেকে যেত তাহলে একটি সমস্যা দেখা দিত এই যে, তারা তাদের সন্তানদেরকে নতুন দ্বীন পরিত্যাগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতো। তাদের জন্য আরো একটি সমস্যা দেখা দিতো তখন যখন তাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা (কিংবা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাদের স্বামী এবং সন্তানরা) কুফরকেই আঁকড়ে ধরে থাকতো এবং সত্য দ্বীনের পথ থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতো। প্রথমোক্ত পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য সূরা আনকাবূতের (১৮ আয়াত) এবং সূরা লোকমান(১৪ ও ১৫ আয়াত) --এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, দ্বীনের ব্যাপারে কখনো পিতামাতার কথা অনুসরণ করবে না। তবে পার্থিব ব্যাপারে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে। এখানে দ্বিতীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, নিজের দ্বীনকে নিজের সন্তান-সন্তুতির হাত থেকে রক্ষা করার চিন্তা অবশ্যই করবে কিন্তু তাই বলে তাদের সাথে কঠোর আচরণ করবে না। বরং নমনীয় আচরণ করো এবং ক্ষমা ও উদারতা দেখাও। (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আত তাওবা, আয়াত ২৩, ২৪; আল মুজাদালা, টীকা ৩৭; আল মুমতাহিনা, টীকা ১ থেকে ৩; আল মুনাফিকূন, টীকা ১৮)।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

যেই স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করতে উৎসাহিত করে, তারা শত্রুতুল্য। তবে তারা যদি অনুতপ্ত হয় ও তাওবা করে তবে তাদেরকে ক্ষমা করা উচিত এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা উচিত [তখন যদি তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করা হয় কিংবা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে দুনিয়ার শান্তি-শৃঙ্খলা ভেস্তে যাবে। যুক্তি-বুদ্ধি ও শরীয়তের বিচারে যতটুকু সম্ভব তাদের নির্বুদ্ধিতাকে উপেক্ষা করা ও তাদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করা চাই। যে ব্যক্তি তাদের প্রতি এরূপ মহানুভবতার পরিচয় দিবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দয়া করবেন ও তার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন। প্রকাশ থাকে যে, সব স্ত্রী ও সকল সন্তান-সন্ততিই এ রকম নয়। এমন বহু নারী আছে, যারা তাদের স্বামীদের দীন ও ঈমান হেফাজত করে এবং নেক কাজে তাদের সৎ পরামর্শক ও উত্তম সহযোগী হয়। এমনিভাবে অনেক সৌভাগ্যবান সন্তান রয়েছে, যারা তাদের পিতা-মাতার জন্য স্থায়ী পুণ্য হয়ে থাকে -অনুবাদক, তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে]।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৪. হে ঈমানদারগণ! তোমাদের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু; অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো।(১) আর যদি তোমরা তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

(১) বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, এই আয়াত সেই মুসলিমদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা হিজরতের পর মক্কায় ইসলাম গ্ৰহণ করে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হিজরত করে চলে যেতে মনস্থ করে, কিন্তু তাদের পরিবার পরিজনরা তাদেরকে হিজরত করতে বাধা দেয়। তারপর তারা যখন হিজরত করে মদীনা আসে তখন দেখতে পায় যে, লোকেরা তাদের আগেই দ্বীনের ফিকহ শিক্ষায় অগ্রণী হয়ে গেছে। তখন তাদের খুব আফসোস হয়। (তিরমিযী: ৩৩১৭) তাছাড়া সন্তান-সন্তুতির কারণে মানুষ অনেক মহৎ কাজ থেকেও বিরত হতে বাধ্য হয়।

হাদীসে এসেছে, বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা দিচ্ছিলেন, ইত্যবসরে হাসান ও হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) সেখানে উপস্থিত হলেন, তাদের গায়ে দুটি লাল রংয়ের কাপড় ছিল। তারা হাঁটছিলেন আর হোঁচট খেয়ে পড়ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এ অবস্থা দেখে মিম্বর থেকে নেমে এসে তাদেরকে তার সামনে বসালেন তারপর বললেন, আল্লাহ্‌ সত্য বলেছেন, “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান সন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ”। এ বাচ্চা দু'টিকে হাঁটার সময় হোঁচট খেতে দেখে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। ফলে আমি আমার কথা বন্ধ করে তাদেরকে উঠিয়ে নিলাম।” (তিরমিযী: ৩৭৭৪, ইবনে মাজাহ: ৩৬০০)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৪) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু,(1) অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো।(2) আর তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (জেনে রেখো যে,) নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (3)

(1) অর্থাৎ, যারা তোমাদের নেক কাজ ও আনুগত্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে, জেনে নিও তারা তোমার কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্ক্ষী নয়, বরং শত্রু।

(2) অর্থাৎ, তুমি তাদের পিছনে পড়ো না, বরং তাদেরকে তোমার পিছনে লাগাও, যাতে তারাও আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে নেয়। তুমি তাদের পিছনে পড়ে নিজের পরিণাম মন্দ করো না।

(3) এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয় যে, মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ মক্কা ছেড়ে মদীনা আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কারণ, তখন হিজরত করার নির্দেশ বড়ই তাকীদের সাথে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিরা হিজরতের পথে বাধা সৃষ্টি করে তাঁদেরকে হিজরত করতে দিল না। পরে যখন তাঁরা রসূল (সাঃ)-এর নিকট এসে পড়লেন, তখন দেখলেন যে, তাঁদের পূর্বে আসা লোকেরা ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছুই শিখে নিয়েছেন। তখন তাঁরা তাঁদের সেই স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের প্রতি রাগাম্বিত হলেন, যারা তাঁদেরকে হিজরত করতে বাধা দিয়েছিল। সুতরাং তাঁরা তাদেরকে সাজা দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। মহান আল্লাহ এই আয়াতে তাঁদেরকে মার্জনা এবং উপেক্ষা করার কথা শিক্ষা দিলেন। (সুনানে তিরমিযী সূরা তাগাবুনের তাফসীর পরিচ্ছেদ)