ইয়াওমা ইয়াজমা‘উকুম লিইয়াওমিল জাম‘ই যা-লিকা ইয়াওমুত্তাগা-বুন ওয়া মাইঁ ইউ’মিম বিল্লা-হি ওয়া ইয়া‘মাল সা-লিহাইঁ ইউকাফফির ‘আনহু ছাইয়িআ-তিহী ওয়া ইউদখিলহু জান্না-তিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু খা-লিদীনা ফীহা-আবাদা- যা-লিকাল ফাওঝুল ‘আজীম।উচ্চারণ
(এ বিষয়ে তোমরা টের পাবে সেইদিন। যখন একত্র করার দিন তোমাদের সবাইকে তিনি একত্র করবেন। ১৯ সেদিনটি হবে তোমাদের পরস্পরের হার-জিতের দিন। ২০ যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করে ২১ আল্লাহ তা’আলা তার গোনাহ মুছে ফেলবেন আর তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে ঝরণা বইতে থাকবে। এসব লোক চিরস্থায়ীভাবে সেখানে থাকবে। এটাই বড় সফলতা তাফহীমুল কুরআন
(দ্বিতীয় জীবন হবে সেই দিন), যে দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন একত্রীকরণের দিনে। সেটা কিছু লোক কর্তৃক অন্যদেরকে আক্ষেপে ফেলার দিন। আর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার নিচে নহর প্রবাহিত থাকবে। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য।মুফতী তাকী উসমানী
স্মরণ কর, যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিনে, সেদিন হবে লাভ লোকসানের দিন। যে ব্যক্তি আল্লাহয় বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহা সাফল্য।মুজিবুর রহমান
সেদিন অর্থাৎ, সমাবেশের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। এ দিন হার-জিতের দিন। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তার পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। যার তলদেশে নির্ঝরিনীসমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল বসবাস করবে। এটাই মহাসাফল্য।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
স্মরণ কর, যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিবসে সেদিন হবে লাভ-লোকসানের দিন। যে ব্যক্তি আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে; যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহাসাফল্য। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
স্মরণ কর, যেদিন সমাবেশ দিবসের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তোমাদের সমবেত করবেন, ঐ দিনই হচ্ছে লাভ-ক্ষতির দিন। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপসমূহ মোচন করে দিবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়, তথায় তারা স্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।আল-বায়ান
যখন একত্র করার দিন তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, সে দিনটি হবে তোমাদের হার জিতের দিন। যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে আর সৎ কাজ করবে, আল্লাহ তার পাপ মোচন করে দিবেন, আর তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন যার নীচ দিয়ে নির্ঝরিণী প্রবাহিত। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল সর্বকাল। এটাই মহা সাফল্য।তাইসিরুল
সেইদিন তিনি তোমাদের সমবেত করবেন জমায়েৎ করার দিনের জন্যে -- এইটিই মোহ-অপসারণের দিন। আর যে কেউ আল্লাহ্তে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তিনি তার থেকে তার সব পাপ মোচন করে দেবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন স্বর্গোউদ্যানসমূহে যাদের নিচে দিয়ে বয়ে চলেছে ঝরনারাজি, সেখানে তারা অবস্থান করবে চিরকাল। এইটি এক বিরাট সাফল্য।মাওলানা জহুরুল হক
১৯
সমবেত হওয়ার দিন অর্থ কিয়ামতের দিন। আর সবাইকে একত্র করার অর্থ সৃষ্টির শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে যত মানুষ জন্ম লাভ করেছে তাদের সবাইকে একই সময়ে জীবিত করে একত্রিত করা। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টি আরো খোলাসা করে বলা হয়েছে। যেমনঃ সূরা হূদে বলা হয়েছেঃ
ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ
“সেটি এমন এক দিন যেদিনে সব মানুষকে একত্রিত করা হবে। আর সেদিন যা কিছু হবে সবার চোখের সামনে হবে।” (আয়াত ১০৩)
সূরা ওয়া’কিয়ায় বলা হয়েছে
قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ - لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ
“তাদের বলো, পূর্বে অতিবাহিত এবং পরে আগমনকারী সমস্ত মানুষকে একটি নির্দিষ্ট দিনে অবশ্যই একত্রিত করা হবে।” (আয়াত ৪৯, ৫০)
২০
মূল আয়াতে يَوْمُ التَّغَابُنِ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ শব্দটির অর্থ এত ব্যাপক যে, কোন ভাষারই একটি মাত্র শব্দে বা বাক্যে এর অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কুরআন মজীদের মধ্যেও কিয়ামতের যতগুলো নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে সম্ভবত এ নামটিই সর্বাধিক অর্থপূর্ণ। তাই এর অর্থ ও তাৎপর্য বুঝার জন্য কিছুটা ব্যাখ্যা অপরিহার্য।
تغابن শব্দটির উৎপত্তি عبن শব্দ থেকে। এর উচ্চারণ عبن এবং غبن উভয়ই। غبن উচ্চারণটি বেশীর ভাগ কেনাবেচা এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং غبن সিদ্ধান্ত ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। আবার কোন কোন সময় এর বিপরীত অর্থ বুঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হয়। আরবী অভিধানে শব্দটির কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে যেমনঃ غبنوا خير الناقة “তাদের উট কোথায় গিয়েছে তার হদিস তাদের নেই।” غَبَنَ فُلَانُا فِى الْبَيْعِ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সে অমুক ব্যক্তিকে ধোঁকা দিয়েছে।” غَبَنَ فُلَانًا “সে অমুক ব্যক্তিকে কম দিয়েছে।” غَبَنْتُ مِنْ حَقِّى عِنْدَفُلَانٍ “অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে অধিকার আদায়ের ব্যাপারে ভুল হয়ে গিয়েছে।” غبين বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার ধীশক্তির অভাব আছে এবং যার মতামত ও সিদ্ধান্ত দুর্বল। প্রতারিত ব্যক্তিকে مغبون বলা হয়। الغبن , الغفلة , النسيان , فوت الحظ , ان يبخس صاحبك فى معاملة بينك وبينه لضرب من الاخفاء- ।
غبن অর্থ “অসাবধানতা-অসতর্কতা, ভুল-ত্রুটি, নিজের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির অপর কোন ব্যক্তির ক্ষতি করা। “ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে ধোঁকা দিচ্ছে দেখে ইমাম হাসান বসরী (র) বললেনঃ هذا يغبن عقلك “এ ব্যক্তি তোমাকে বোকা বানাচ্ছে।”
غبن ধাতু থেকে যখন তাগাবুন শব্দ গঠন করা হয় তখন তাতে দুই বা দুইয়ের অধিক ব্যক্তির মধ্যে প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি সংঘটিত হওয়ার অর্থ সৃষ্টি হয়। تغابن অর্থ কিছু লোক কর্তৃক কিছু লোকের সাথে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণার আচরণ করা। অথবা এক ব্যক্তি কর্তৃক আরেক ব্যক্তির ক্ষতি করা এবং অপর ব্যক্তির তার হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অথবা একজনের অংশ অন্যজনের পেয়ে যাওয়া এবং নিজের অংশ থেকে সেই ব্যক্তির বঞ্চিত থেকে যাওয়া অথবা কিছু লোকের অপর কিছু লোকের অসতর্ক দুর্বল মতামত ও সিদ্ধান্তের অধিকারী হওয়া।
এই প্রেক্ষাপটে এখন এই বিষয়টি চিন্তা করে দেখুন যে, আলোচ্য আয়াতে কিয়ামত সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ذالك يوم التغابن “সেটি হবে تغابن --এর দিন।” এ বাক্য থেকে স্বতঃই এ অর্থ প্রকাশ পায় যে, পৃথিবীতে তো রাতদিন হরহামেশা تغابن হচ্ছেই। কিন্তু তা কেবল বাহ্যিক ও দৃষ্টি প্রলুব্ধকারী তাগাবুন, প্রকৃত ও বাস্তব تغابن নয়। প্রকৃত تغابن হবে কিয়ামতের দিন। সেখানে যাওয়ার পর জানা যাবে কে সত্যি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কে লাভবান হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কে কার অংশ লাভ করেছে, আর কে তার নিজের অংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কে ধোঁকায় পড়েছে আর কে অত্যন্ত সতর্ক ও বিচক্ষণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কে তার জীবন রূপ পূঁজির সবটাই একটা ভুল কারবারে বিনিয়োগ করে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে এবং সে তার সব শক্তি, যোগ্যতা, চেষ্টা-সাধনা, অর্থ-সম্পদ আর সময়কে লাভজনক কারবারে খাটিয়ে সবটুকু মুনাফা লুটে নিয়েছে। অথচ প্রথমোক্ত ব্যক্তি যদি পৃথিবীর প্রকৃত অবস্থা বুঝার ব্যাপারে ধোঁকায় না পড়তো তাহলে সেও ঐ রকম মুনাফা অর্জন করতে পারতো।
মুফাসসিরগণ يوم التغابن কথাটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এর কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন। এসব অর্থের সবগুলোই যথার্থ ও সঠিক এবং তা এর প্রকৃত অর্থের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করে। কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন যে, দোযখীরা জান্নাতের বাসিন্দাদের মত কাজ-কর্ম করে জান্নাতে গেলে সেখানে তারা যে অংশ লাভ করতো সেদিন তা জান্নাতবাসীগণ লাভ করবে। আর জান্নাতবাসীগণ যদি দুনিয়ায় দোযখীদের মত কাজকর্ম করে আসতেন তাহলে দোযখের যে অংশ তারা পেতেন তা সেদিন দোযখীদের অংশে পড়বে। ইমাম বুখরী (র) বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরাইরা থেকে কিতাবুর রিকাক অধ্যায়ে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন সেটি এ ব্যাখ্যার সমর্থন করে। উক্ত হাদীসে নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তিই জান্নাতে যাবে তাকে সেই জায়গাটা দেখানো হবে, দুনিয়ায় খারাপ, কাজকর্ম করে গেলে যা সে দোযখে পেতো। উদ্দেশ্য যাতে সে আরো বেশী শোকর গুজার বা কৃতজ্ঞ হয়। আর যে ব্যক্তিই দোযখে যাবে তাকেও বেহেশতের সেই স্থানটি দেখানো হবে যা সে দুনিয়ায় ভাল কাজ করে আসলে লাভ করতো। যাতে সে আরো বেশী অনুতপ্ত হয়।
অপর কিছু সংখ্যক মুফাসসির বলেন, সেদিন অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীর ততটা নেকী ছিনিয়ে নেবে যতটা তার অত্যাচারের সামান হবে। কিংবা অত্যাচারিতের ঠিক ততটা গোনাহ অত্যাচারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে যা তার হক বা অধিকারের সমান হবে। কারণ কিয়ামতের দিন কারো কাছে কোন প্রকার অর্থ-সম্পদ বা সোনা রূপা থাকবে না। যা দিয়ে সে অত্যাচারিতকে ক্ষতিপূরণ দেবে বা জরিমানা আদায় করবে। মানুষের আমলসমূহই হবে সেখানে একমাত্র বিনিময়যোগ্য মুদ্রা। এ কারণে যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কারো প্রতি জুলুম করেছে সে মজলুমের অধিকার কেবল এভাবে আদায় করতে পারবে যে, তার নিজের যতটুকু নেকী আছে তা থেকেই আর্থিক দণ্ড দেবে অথবা মজলূমের গোনাহর কিছু অংশ নিজের ওপর চাপিয়ে নিয়ে তার দণ্ড ভোগ করবে। কিছু সংখ্যক হাদীসে রসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এ বিষয়টিও বর্ণিত হয়েছে। বুখারী হাদীস গ্রন্থের কিতাবুর রিকাকে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সা.) বলেছেনঃ যে ব্যক্তিই কাউকে জুলুম করে তার গোনাহের বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে রেখেছে তার উচিত এ পৃথিবীতে অবস্থানকালেই তা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া। কারণ আখেরাতে টাকা পয়সা বা অর্থ-সম্পদের কোন কারবার থাকবে না। সেখানে তার নেকী থেকে মজলুমকে দেয়া হবে। অথবা তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণে নেকীও যদি না থাকে তাহলে মজলুমের কিছু গোনাহ তার ওপর অর্পণ করা হবে। অনুরূপ মুসনাদে আহমাদে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উনায়েস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সা.) বলেছেনঃ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জান্নাতবাসী জান্নাতে যেতে পারবে না এবং কোন দোযখবাসী দোযখে যাবে না যতক্ষণ না সে দুনিয়ায় কারো ওপর তার কৃত জুলুমের বদলা বা ক্ষতিপূরণ দেবে। এমনকি একটি থাপ্পড়ের ক্ষতিপূরণ পর্যন্তও দিতে হবে। “আমরা বললাম, এই ক্ষতিপূরণ কিভাবে দেয়া হবে? কেননা কিয়ামতের দিন তো আমরা নিস্ব ও নিসম্বল থাকবো।” নবী (সা.) বললেনঃ নিজের আমলের নেক কাজ ও বদ কাজ দ্বারা এই ক্ষতিপূরণ করতে হবে। মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার নবী (সা.) তাঁর মজলিসে লোকদের জিজ্ঞেস করলেনঃ দরিদ্র এবং অভাবী কে তা কি তোমরা জান? লোকজন বলে উঠল, আমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই দরিদ্র যার অর্থ-সম্পদ কিছুই নেই। তিনি বললেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি যে নামায, রোযা ও যাকাত আদায় করে কিয়ামতের দিন হাজির হবে। কিন্তু এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, দুনিয়ায় কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ আরোপ করেছিল, কারো অর্থ-সম্পদ মেরে খেয়েছিল, কারো রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং কাউকে মারপিট করে এসেছিল। সুতরাং তার নেকীসমূহ নিয়ে ঐসব অত্যাচারিতদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে।” কিন্তু তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য যখন তার কোন নেকী আর অবশিষ্ট থাকবে না তখন তাদের কিছু কিছু গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। মুসলিম ও আবু দাউদ হযরত বুরাইদা থেকে আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসে আছে, নবী (সা.) বলেছেনঃ “কোন জিহাদকারীর অনুপস্থিতিতে কেউ যদি তার স্ত্রী ও পরিবারের লোকদের ব্যাপারে খিয়ানত বা বিশ্বাস ভঙ্গ করে তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে ঐ মুজাহিদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলা হবে, তার ভাল কাজের যতটা ইচ্ছা তুমি নিয়ে নাও। এরপর নবী (সা.) আমাদের দিকে ফিরে বললেনঃ, “এ ব্যাপারে তোমরা কি মনে করো? অর্থাৎ তোমরা কি মনে করো যে, এরপর সে তার জন্য কোন নেক কাজ অবশিষ্ট রাখবে?”
আরো কিছু সংখ্যক মুফাসসির বলেছেন যে, تغابن শব্দটি বেশীর ভাগ ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। আর কাফের ও মু’মিনগণ তাদের দুনিয়ার জীবনে যে আচরণ ও নীতি অনুসরণ করে থাকে কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে সেই আচরণকে তেজারত বা ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মু’মিন যদি নাফরমানির পথ পরিত্যাগ করে আনুগত্যের পথ অনুসরণ করে এবং নিজের জানমাল ও চেষ্টা-সাধনা আল্লাহর পথে নিয়োজিত করে তাহলে সে যেন লোকসানজনক ব্যবসায় ছেড়ে এমন এক ব্যবসায়ে তার পুঁজি খাটাচ্ছে যা অবশেষে লাভজনক হবে এবং মুনাফা দেবে। আর একজন কাফের যখন আনুগত্যের পথ বর্জন করে নাফরমানি ও বিদ্রোহের পথে নিজের সবকিছু নিয়োজিত করে তখন সে এমন একজন ব্যবসায়ীর মত হয়ে যায়, যে হিদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহী খরিদ করে। পরিণামে সে এর লোকসান ভোগ করবে। এই উভয় কাজের লাভক্ষতি কেবল কিয়ামতের দিনই প্রকাশ পাবে। দুনিয়ার জীবনে মু’মিন হয়তো কেবল ক্ষতিগ্রন্থ হতে থাকবে এবং কাফের বিপুলভাবে লাভবান থাকবে। কিন্তু আখেরাতে জানা যাবে সত্যিকার অর্থে লাভজনক কারবার কে করেছে আর ক্ষতিকর কারবার কে করেছে। কুরআন মজীদে বহু সংখ্যক স্থানে এ বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ নির্ম্নবর্ণিত আয়াতগুলো দেখুন আল বাকারাহ আয়াত, ১৬, ১৭৫, ২০৭; আলে ইমরান, আয়াত ৭৭, ১৭৭; আন নিসা, ৭৪; আত তাওবা, ১১১; আন নাহল, ৯৫; ফাতের, ২৯; আস সাফ, ১০।
تغابن বা হারজিতের আরো একটি অবস্থা হলো, মানুষ পৃথিবীতে কুফরী, পাপাচার এবং জুলুম ও নাফরমানির কাজে একান্ত নির্বিকারচিত্তে পরস্পরকে সহযোগিতা করে আসছে। তাদের পরস্পরের মধ্যে গভীর ভালবাসা এবং বন্ধুত্ব আছে বলেও তাদের আস্থা রয়েছে। চরিত্রহীন পরিবারের লোকজন, গোমরাহী বিস্তারকারী নেতৃবর্গ ও তাদের অনুসারীরা, চোর ও ডাকাতদের দল, ঘুষখোর ও জালেম কর্মচারীদের গাঁটছড়া বাঁধা, বেঈমান ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং জমিদার গোষ্ঠী, গোমরাহী, দুষ্কর্ম ও নোংরামির প্রসারকামী দলসমূহ এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আকারে জুলুম ও বিপর্যয়ের ঝাণ্ডাবাহী সরকার ও জাতিসমূহের সবারই পারস্পরিক যোগসাজশ এই আস্থার ওপরই প্রতিষ্ঠিত। তাদের প্রত্যেকের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী ব্যক্তিরা মনে করে তারা একে অপরের নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে অত্যন্ত কার্যকর সহযোগিতা বিদ্যমান। কিন্তু তারা যখন আখেরাতে পৌঁছবে তখন অকস্মাৎ এ বিষয়টি তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, তারা সবাই মারাত্মকভাবে প্রতারিত হয়েছে। তখন প্রত্যেকই একথা উপলব্ধি করবে যে, যাকে সে তার সর্বোত্তম বাপ, ভাই, স্ত্রী, স্বামী, ছেলে, মেয়ে, বন্ধু, নেতা, পীর, মুরীদ, অথবা সহযোগী ও সাহায্যকারী মনে করে আসছিল প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই তার জঘন্যতম শত্রু। সব রকমের আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক ও ভালবাসা শত্রুতায় পর্যবসিত হবে। সবাই একে অপরকে গালি দিতে থাকবে, একে অপরকে লানত করতে থাকবে। আর প্রত্যেকেই তার কৃত অপরাধের বেশীর ভাগ দায়-দায়িত্ব অপরের ওপর চাপিয়ে তাকে কঠোরতর শাস্তি দিতে চাইবে। এ কথাটিও কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। নীচে উল্লেখিত আয়াতসমূহে এর কিছু উদাহরণ দেখা যেতে পারে। আল বাকারাহ, ১৬৭; আল আরাফ, ৩৭ থেকে ৩৯; ইবরাহীম, ২১-২২; আল মু’মিন, ১০১; আল আনকাবুত, ১২-১৩, ২৫; লোকমান, ৩৩; আল আহযাব, ৬৭-৬৮; সাবা, ৩১ থেকে ৩৩; ফাতের, ১৮; আস সাফফাত, ২৭ থেকে ৩৩; সাদ, ৫৯ থেকে ৬১; হামীম আস সাজদা, ২৯; আয যুখরুফ, ৬৭; আদ দুখান, ৪১; আল মাআরিজ, ১০ থেকে ১৪; আবাসা, ৩৪ থেকে ৩৭।
২১
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ শুধু এ কথা মেনে নেয়া যে, আল্লাহ আছেন। বরং তার অর্থ হলো আল্লাহ নিজে, তাঁর রসূল এবং কিতাবের মাধ্যমে যেভাবে ঈমান আনতে বলেছেন সেভাবে ঈমান আনা। এর মধ্যে রিসালাত ও কিতাবের প্রতি ঈমান আনাও আপনা থেকেই অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে মানুষ যে কাজকে নেকীর কাজ মনে করে অথবা মানুষের নিজের গড়ে নেয়া নৈতিক মানদণ্ড অনুসারে যেসব কাজ করে, নেকীর কাজ বলতে সেসব কাজকেও বুঝায় না। বরং এর দ্বারা বুঝায় এমন সব কাজ-কর্ম যা আল্লাহর দেয়া আইন মোতাবেক করা হয়। তাই পরবর্তী আয়াতসমূহে যেসব শুভ ফলাফল ও পরিণামের কথা বলা হয়েছে রসূল ও কিতাবের মাধ্যম ছাড়া আল্লাহকে মানার ও নেক কাজ করার ফলাফল এবং পরিণামও তাই হবে কারো এমন ভুল ধারণা পোষণ করা উচিত নয়। যে ব্যক্তিই বুঝে শুনে কুরআন অধ্যয়ন করবে তার কাছে এ বিষয়টি গোপন থাকবে না যে, কুরআনের দৃষ্টিতে এ ধরণের কোন ঈমানের নাম আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং কোন কাজের নাম নেক কাজ আদৌ নয়।
কুরআন মাজীদে এখানে تغابن (তাগাবুন) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ একে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, আক্ষেপে ফেলা। কিয়ামতকে ‘তাগাবুনের দিন’ বলা হয়েছে এ কারণে যে, সে দিন যারা জান্নাতে যাবে তাদেরকে দেখে জাহান্নামীরা আক্ষেপ করে বলবে, আহা! আমরা যদি দুনিয়ায়- জান্নাতীদের মত আমল করতাম, তবে আজ আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হত না, আমরাও তাদের মত জান্নাতের নি‘আমত লাভ করতে পারতাম। হযরত শাহ আবদুল কাদের (রহ.) এর তরজমা করেছেন ‘হারজিতের দিন’। এর দ্বারা বক্তব্য বিষয় সংক্ষেপে পরিষ্কার হয়ে যায়।
৯. স্মরণ করুন, যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিনে সেদিন হবে লোকসানের দিন।(১) আর যে আল্লাহর উপর ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে তিনি তার পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহাসাফল্য।
(১) যেদিন আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত করবেন একত্রিত করার দিবসে। এই দিনটি হবে লোকসানের। (لِيَوْمِ الْجَمْعِ) বা একত্রিত হওয়ার দিবস ও (يَوْمُ التَّغَابُنِ) লোকসানের দিবস- এই উভয়টি কেয়ামতের নাম। একত্রিত হওয়ার দিন এ কারণে যে, সেদিন পূৰ্ববতী ও পরবর্তী সকল জিন এবং মানবকে হিসাব-নিকাশের জন্যে একত্রিত করা হবে। (ইবন কাসীর) পক্ষান্তরে التَّغَابُن শব্দটি غبن থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ লোকসান। আর্থিক লোকসান এবং মত ও বুদ্ধির লোকসান উভয়কে غبن বলা হয়। تَغَابُن শব্দটি আভিধানিক দিক দিয়ে দুই তরফা কাজের জন্যে বলা হয়, অর্থাৎ একজন অন্যজনের এবং অন্যজন তার লোকসান করবে, অথবা তার লোকসান প্রকাশ করবে।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “যে ব্যক্তির কাছে কারও কোন পাওনা থাকে, তার উচিত দুনিয়াতেই তা পরিশোধ করে অথবা মাফ করিয়ে নিয়ে মুক্ত হয়ে যাওয়া। নতুবা কেয়ামতের দিন দিরহাম ও দীনার থাকবে না। কারও কোন দাবি থাকলে তা সে ব্যক্তির সৎকর্ম দিয়ে পরিশোধ করা হবে। সৎকর্ম শেষ হয়ে গেলে পাওনাদারের গোনাহ প্রাপ্য পরিমাণে তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে।” (বুখারী: ২৪৪৯)
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা ও অন্যান্য তফসীরবিদ কেয়ামতকে লোকসানের দিবস বলার উপরোক্ত কারণই বর্ণনা করেছেন। আবার অনেকের মতে সেদিন কেবল কাফের, পাপাচারী ও হতভাগাই লোকসান অনুভব করবে না; বরং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণও এভাবে লোকসান অনুভব করবে যে, হায়! আমরা যদি আরও বেশি সৎকর্ম করতাম, তবে জান্নাতের সুউচ্চ মর্তবা লাভ করতাম। সেদিন প্রত্যেকেই জীবনের সেই সময়ের জন্যে পরিতাপ করবে; যা অযথা ব্যয় করেছে। হাদীসে আছে, “যে ব্যক্তি কোন মজলিসে বসে এবং সমগ্র মজলিসে আল্লাহকে স্মরণ না করে, কেয়ামতের দিন সেই মজলিস তার জন্য পরিতাপের কারণ হবে।” (৪৮৫৮)
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, “কোন জান্নাতী জান্নাতে প্রবেশের পর তাকে জাহান্নামে তার জন্য যে জায়গা রাখা হয়েছিল তা দেখানো হবে। ফলে তার কৃতজ্ঞতা বেড়ে যাবে, পক্ষান্তরে কোন জাহান্নামী জাহান্নামে প্রবেশ করলে তাকে জান্নাতে তার জন্য যে স্থান ছিল তা দেখানো হবে, ফলে তার আফসোস বেড়ে যাবে।” (বুখারী: ৬৫৬৯)
(৯) (স্মরণ কর,) যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিবসে(1) সেদিন হবে হার-জিতের দিন।(2) যে ব্যক্তি আল্লাহকে বিশ্বাস করবে এবং সৎকর্ম করবে, তিনি তার পাপরাশি মোচন করবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহা সাফল্য।
(1) কিয়ামতকে (সমাবেশ-দিবস বা একত্রিত হওয়ার দিন) এই কারণে বলা হয় যে, সেদিন পূর্বাপর সকলেই একই ময়দানে একত্রিত হবে। ফিরিশতা ডাক পাড়লে সকলেই তাঁর ডাকের শব্দ শুনতে পাবে। প্রত্যেকের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেননা, মধ্যে কোন জিনিসের আড়াল থাকবে না। যেমন অন্যত্র বলেছেন, ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌمَشْهُودٌأَيْ: إِذَا كَانَ الأَمْرُ هَكَذَا فَصَدِّقُوْا بِاللهِ الجَمْع ‘‘এটা এমন একদিন, যেদিন সব মানুষই সমবেত হবে, সেদিনটি হাজিরের দিন।’’ (সূরা হুদ ১০৩ আয়াত) قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ* لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ অর্থাৎ, বল, অবশ্যই পূর্ববর্তিগণ ও পরবর্তিগণ; সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে। (সূরা ওয়াক্বিআহ ৪৯-৫০ আয়াত)
(2) অর্থাৎ, একটি দল তো সাফল্য লাভ করবে আর একটি দল হবে ব্যর্থ। হকপন্থীরা বাতিলপন্থীদের উপর, ঈমানদাররা কাফেরদের উপর এবং আনুগত্যশীলরা অবাধ্যজনদের উপর জয়লাভ করবে। ঈমানদারদের সব থেকে বড় জিত এই হবে যে, তাঁরা জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং সেখানে সেই বাসস্থানগুলোও তাঁদের অধিকারে চলে আসবে, যেগুলো জাহান্নামীদের জন্য ছিল, যদি তারা জাহান্নামে যাওয়ার মত কাজ না করত। আর জাহান্নামীদের সব চেয়ে বড় হার হল, তাদের জাহান্নামে প্রবেশ করা। জাহান্নামীরা ভালকে মন্দ দ্বারা, উৎকৃষ্ট জিনিসকে নিকৃষ্ট জিনিস দ্বারা এবং নিয়ামতসমূহকে আযাব দ্বারা পরিবর্তন করে নিয়েছে। غَبن অর্থ নোকসান ও ক্ষতি। অর্থাৎ, নোকসানের দিন। সেদিন কাফেরদের তো নোকসানের অনুভূতি হবেই, ঈমানদাররাও এই দিক দিয়ে নোকসান অনুভব করবেন যে, তাঁরা আরো অধিক সৎকর্ম করে আরো বেশী মর্যাদা কেন অর্জন করলেন না।