ওয়ামাআআল্লা-হু ‘আলা-রছূলিহী মিনহুম ফামাআওজাফ তুম আলাইহি মিন খাইলিওঁ ওয়ালা-রিক-বিওঁ ওয়ালা-কিন্নাল্লা-হা ইউছালিলতুরুছুলাহু আলা-মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লাহু ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।উচ্চারণ
আল্লাহ তা’আলা যেসব সম্পদ তাদের দখলমুক্ত করে তাঁর রসূলের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন ১১ তা এমন সম্পদ নয়, যার জন্য তোমাদের ঘোড়া বা উট পরিচালনা করতে হয়েছে। বরং আল্লাহ সবকিছুই করতে সক্ষম। ১২ তাফহীমুল কুরআন
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তাদের যে সম্পদ ‘ফায়’ হিসেবে দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা না ঘোড়া হাঁকিয়েছ, না উট, কিন্তু আল্লাহ নিজ রাসূলগণকে যার উপর ইচ্ছা আধিপত্য দান করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান।মুফতী তাকী উসমানী
আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে যে ‘ফাই’ তাঁর রাসূলকে দিয়েছেন, উহার জন্য তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি; আল্লাহতো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদের কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।মুজিবুর রহমান
আল্লাহ বনু-বনুযায়রের কাছ থেকে তাঁর রসূলকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তজ্জন্যে তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে চড়ে যুদ্ধ করনি, কিন্তু আল্লাহ যার উপর ইচ্ছা, তাঁর রসূলগণকে প্রাধান্য দান করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আল্লাহ্ ইয়াহূদীদের নিকট হতে তাঁর রাসূলকে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ কর নাই ; আল্লাহ্ তো যার ওপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করেন ; আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আল্লাহ ইয়াহুদীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায়* হিসেবে যা দিয়েছেন তোমরা তার জন্য কোন ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে অভিযান পরিচালনা করনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যাদের ওপর ইচ্ছা কতৃত্ব প্রদান করেন। আল্লাহ সকল কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।আল-বায়ান
আল্লাহ তাঁর রসূলকে তাদের কাছ থেকে যে ফায় (বিনা যুদ্ধে পাওয়া সম্পদ) দিয়েছেন তার জন্য তোমরা ঘোড়াও দৌড়াওনি, আর উটেও চড়নি, বরং আল্লাহ তাঁর রসূলগণকে যার উপর ইচ্ছে আধিপত্য দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।তাইসিরুল
আর যা-কিছু তাদের থেকে আল্লাহ্ তাঁর রসূলকে ফাও দিয়েছেন, যার জন্য তোমরা ধাওয়া করাও নি কোনো ঘোড়া, আর না কোনো উট, কিন্ত আল্লাহ্ তাঁর রসূলগণকে দখল দিয়ে থাকেন যার উপরে তিনি ইচ্ছা করে থাকেন। আর আল্লাহ্ সব-কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।মাওলানা জহুরুল হক
১১
যেসব বিষয় সম্পত্তি বনী নাযীরের মালিকানায় ছিল এবং তাদের বহিষ্কারের পর তা ইসলামী সরকারের হস্তগত হয়েছিলো এখানে সেই সব বিষয় সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে। এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনা কিভাবে করা যাবে এখান থেকে শুরু করে ১০নং আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা সেই সব কথাই বলেছেন। কোন এলাকা বিজিত হয়ে ইসলামী সরকারের দখলভুক্ত হওয়ার ঘটনা যেহেতু এটাই প্রথম এবং পরে আরো এলাকা বিজিত হতে যাচ্ছিলো তাই এ জন্য বিজয়ের শুরুতেই বিজিত ভূমি সম্পর্কে বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে ভেবে দেখার মত বিষয় হলো, আল্লাহ তা’আলা (وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ ) (যে সম্পদ তাদের দখলমুক্ত করে আল্লাহ তা’আলা তাঁর রসূলের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন) বাক্যটি ব্যবহার করেছেন। এ বাক্য থেকে স্বতঃই এ অর্থ প্রকাশ পায় যে, এই পৃথিবী এবং যেসব জিনিস এখানে পাওয়া যায় তাতে সেই সব লোকদের মূলত কোন অধিকার নেই যারা মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। তারা যদি এর ওপরে দখলকারী ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেও থাকে তাহলেও তার অবস্থা হলো বিশ্বাসঘাতক ভৃত্য কর্তৃক মনিবের বিষয়-সম্পদ কুক্ষিগত করার মত। প্রকৃতপক্ষে এসব সম্পদের হক হলো তা তার আসল মালিক আল্লাহ রব্বুল আলামীনের মর্জি অনুসারে তাঁর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করা। আর এভাবে ব্যবহার কেবল নেককার ঈমানদার বান্দারাই করতে পারে। তাই বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের পরিণতিতে যেসব সম্পদ কাফেরদের দখলমুক্ত হয়ে ঈমানদারদের করায়ত্ত হবে তার মর্যাদা হলো তার মালিক এ সম্পদ নিজের বিশ্বাসঘাতক ভৃত্যদের দখল থেকে উদ্ধার করে তাঁর আনুগত ভৃত্যদের দখলে দিয়েছেন। তাই ইসলামী আইনের পরিভাষায় এসব বিষয় সম্পদকে ‘ফাই’ (প্রত্যাবর্তিত বা ফিরিয়ে আনা সম্পদ) বলা হয়েছে।
১২
অর্থাৎ এসব সম্পদের অবস্থা ও প্রকৃতি এমন নয় যে, সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে লড়াই করে তা অর্জন করেছে। তাই এতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং এ সম্পদ তাদের মধ্যেই বণ্টন করে দিতে হবে। বরং তার প্রকৃত অবস্থা হলো, আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করে তাঁর রসূলের এবং যে আদর্শের প্রতিনিধিত্ব এ রসূল করছেন সেই আদর্শকে তাদের ওপর বিজয় দান করেছেন। অন্য কথায়, এসব সম্পদ মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হওয়া সরাসরি সেনাবাহীনির শক্তি প্রয়োগের ফল নয়। বরং এটা সেই সামগ্রিক শক্তির ফল যা আল্লাহ তাঁর রসূল, রসূলের উম্মাত এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত আদর্শকে দান করেছেন। তাই এসব সম্পদ গনীমতের সম্পদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মর্যাদা সম্পন্ন। এতে যুদ্ধরত সৈনিকদের এমন কোন অধিকার বর্তায় না যে, তা তাদের মধ্যে গনীমতের মত বণ্টন করে দিতে হবে। এভাবে শরীয়াতে ‘গনীমত’ও ‘ফাই’-এর আলাদা আলাদা বিধান দেয়া হয়েছে। সূরা আনফালের ৪১ নং আয়াতে গনীমতের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। বিধানটি হলো, গনীমতের সম্পদ পাঁচটি অংশে ভাগ করা হবে। এর চারটি অংশ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে এবং একটি অংশ বায়তুলমালে জমা দিয়ে উক্ত আয়াতে বর্ণিত খাতসমূহে খরচ করতে হবে। ফাইয়ের বিধান হলো, তা সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করা যাবে না। বরং এর সবটাই পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত খাতসমূহের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে। এই দুই ধরনের সম্পদের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ করা হয়েছেঃ (فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ ) (তোমরা তার বিরুদ্ধে নিজেদের ঘোড়া বা উট পরিচালনা কর নাই) কথাটি দ্বারা ঘোড়া বা উট পরিচালনা করার অর্থ সামরিক তৎপরতা চালানো (Warlike Operations)। সুতরাং সরাসরি এ ধরনের তৎপরতার ফলে যেসব সম্পদ হস্তগত হয়ে থাকে তা গনীমতের সম্পদ। আর যেসব সম্পদ লাভের পেছনে এ ধরনের তৎপরতা নেই তা সবই ‘ফাই’ হিসেবে গণ্য।
‘গনীমত’ ও ‘ফাই’ এর মোটামুটি যে অর্থ এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে ইসলামের ফকীহগণ তা আরো স্পস্ট করে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ গণীমাত হলো সেই সব অস্থাবর সম্পদ যা সামরিক তৎপরতা চালানোর সময় শত্রু সেনাদের নিকট থেকে লাভ করা গিয়েছে। এসব ছাড়া শত্রু এলাকার ভূমি, ঘরবাড়ী এবং অন্যান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গনীমতের সংজ্ঞায় পড়ে না। এ ব্যাখ্যার উৎস হলো হযরত উমরের (রা.) সেই পত্র যা তিনি ইরাক বিজয়ের পর হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাসকে লিখেছিলেন। তাতে তিনি বলেছেনঃ ( فَانْظُرْ مَا اَجْلَبُوْا بِهِ عَلَيْكَ فِى الْعَسْكَرِ مِنْ كَرَاعِ اَوْمَالِ فَاقْسِمْهُ بَيْنَ مَنْ حَضَرَ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ وَاتْرَكِ الْارْضِيْنَ وَالْانْهَارْ لِعُمَّالِهَا لِيَكُونَ ذَالِكَ فِى اَعْطِيَاتِ الْمُسْلِمِيْنَ- )
“সেনাবাহিনীর লোকজন যেসব ধন-সম্পদ তোমাদের কাছে কুড়িয়ে আনবে তা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দাও। আর ভূমি ও সেচ খালে যেসব লোক কাজ করে ভূমি ও সেচ খাল তাদের জন্য রেখে দাও যাতে তার আয় মুসলমানদের বেতন ভাতা ও বৃত্তি দেয়ার কাজে লাগে।” (কিতাবুল খারাজ, আবু ইউসূফ, পৃষ্ঠা ২৪; কিতাবুল আমওয়াল, আবু উবায়েদ, পৃষ্ঠা ৫৯; কিতাবুল খারাজ, ইয়াহইয়া ইবনে আদম, পৃষ্ঠা ২৭, ২৮৪৮)
এ কারণে হাসান বসরী বলেনঃ শত্রুর শিবির থেকে যা হস্তগত হবে তা সেই সব সৈন্যদের হক যারা তা দখল করেছে। কিন্তু ভূমি সব মুসলমানদের জন্য। (ইয়াহইয়া ইবনে আদম ২৭) ইমাম আবু ইউসূফ বলেনঃ “শত্রুসেনাদের কাছ থেকে যেসব জিনিস মুসলমানদের হস্তগত হবে এবং যেসব দ্রব্য, অস্ত্রশস্ত্র ও জীবজন্তু তারা কুড়িয়ে ক্যাম্পে আনবে তাহলো গনীমত। এর মধ্য থেকে এক-পঞ্চমাংশ আলাদা করে রেখে অবশিষ্ট চার অংশ সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।” (কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা ১৮) ইয়াহইয়া ইবনে আদমও এ মত পোষণ করেন এবং তা তিনি তাঁর গ্রন্থ কিতাবুল খারাজে বর্ণনা করেছেন। (পৃষ্ঠা ২৭) যে জিনিসটি ‘গনীমতের ও ফাই’ এ পার্থক্য আরো স্পষ্ট করে তুলে ধরে তা হলো, নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ শেষে গনীমতের সম্পদ বণ্টন এবং বিজিত এলাকা যথারীতি ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সায়েব ইবনে আকরা, নামক এক ব্যক্তি দুর্গের অভ্যন্তরে দু’টি থলী ভর্তি মণি মুক্তা কুড়িয়ে পান। এতে তার মনে খটকা সৃষ্টি হয় যে, তা ‘গনীমত’না ‘ফাই’? গনিমাত হলে তা সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। আর ‘ফাই’ হলে তা বায়তুলমালে জমা হওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত তিনি মদীনায় হাজির হলেন এবং বিষয়টি হযরত উমরের (রা.) সামনে পেশ করলেন। হযরত উমর (রা.) ফয়সালা করলেন যে, তা বিক্রি করে অর্থ বায়তুলমালে জমা দিতে হবে। এ থেকে জানা গেল যে, শুধু এমন সব অস্থাবর সম্পদ গনীমত হিসেবে গণ্য হবে যা যুদ্ধের সময় সৈন্যদের হস্তগত হবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রাপ্ত অস্থাবর সম্পদ স্থাবর সম্পদের মতই ‘ফাই’ হিসেবে গণ্য হয়। এ ঘটনাটি উল্লেখ করে ইমাম আবু উবায়েদ লিখছেনঃ ( مَا نِيْلَ مِنْ اَهْلِ الشِّرِكْ عُنْوَةً قَسْرًا وَالْحَرْبُ قَائِمَةٌ فَهُوَ الْغَنِيْمَةُ- وَمَانِيْلَ مِنْهُمْ بَعْدَ مَا تَضَعُ الْحَرْبُ اَوْ زَارَهَا وَتَصِيْرُ الدَّارُ دَارَ الْاِسْلَامِ- فَهُوَ فِىءٌ يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَامَّا وَلَا خُمُسَ فِيْهِ- )
“যুদ্ধ চলাকালে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যেসব সম্পদ শত্রুর কাছ থেকে হস্তগত হবে তা গনীমত। আর যুদ্ধ শেষে দেশ দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হওয়ার পর যেসব সম্পদ হস্তগত হবে তা ‘ফাই’ হিসেবে পরিগণিত হবে। এ সম্পদ দারুল ইসলামের অধিবাসীদের কল্যাণ কাজে লাগা উচিত। তাতে এক-পঞ্চমাংশ নির্দিষ্ট হবে না।” (কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা ২৫৪)
গনীমতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত ও নির্দিষ্ট করার পর কাফেরদের কাছ থেকে মুসলমানদের হস্তগত হওয়া যেসব সম্পদ, বিষয়-সম্পত্তি ও জায়গা-জমি অবশিষ্ট থাকে তা প্রধান দু’টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক, লড়াই করে হস্তগত করা সম্পদ ইসলামী ফিকাহের পরিভাষায় যাকে শক্তি বলে দখলকৃত দেশ বা অঞ্চল বলা হয়। দুই, সন্ধির ফলে যা মুসলমানদের হস্তগত হবে। এ সন্ধি মুসলমানদের সামরিক শক্তির প্রভাব, দাপট কিংবা ভীতির কারণে হলেও। বাহুবলে হস্তগত না হয়ে অন্য কোনভাবে হস্তগত হওয়া সম্পদও এরই মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম ফকীহদের মধ্যে যা কিছু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা প্রথম প্রকারের সম্পদ সম্পর্কে হয়েছে। অর্থাৎ তার সঠিক শরয়ী মর্যাদা কি? কেননা, তা ( فما او خفتم عليه من خيل ولاركاب )-এর সংজ্ঞায় পড়ে না। এরপর থাকে দ্বিতীয় প্রকার সম্পদ। এ প্রকারের সম্পদ সম্পর্কে সর্বসম্মত মত হলো, তা ‘ফাই’হিসেবে গণ্য। কারণ এর বিধান কুরআন মজিদে স্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে। পরে আমরা প্রথম প্রকারের সম্পদের শরয়ী মর্যাদা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
বিনা যুদ্ধে শত্রুপক্ষ যে মালামাল ছেড়ে যায় তাকে ‘ফায়’ বলে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ নাজীরের ইয়াহুদীদেরকে তাদের মালামাল সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। কাজেই তাদের পক্ষে যা-কিছু নেওয়া সম্ভব ছিল তা নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জমি-জমা তো নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই তা ছেড়ে গেল। এ জমি-জমাই ‘ফায়’ রূপে মুসলিমদের হস্তগত হয়। আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে তাঁর এই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি মুসলিমদেরকে এ সম্পদ সম্পূর্ণ বিনা মেহনতে দান করেছেন। এটা অর্জন করার জন্য তাদের কোনরূপ যুদ্ধ-বিগ্রহ করতে হয়নি। আয়াতে যে ঘোড়া ও উট হাঁকানোর কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা যুদ্ধ-কার্যক্রম বোঝানো উদ্দেশ্য। অতঃপর ‘ফায়’-এর মালামাল কাদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে, পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার তালিকা প্রদান করেছেন।
৬. আর আল্লাহ ইয়াহুদীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যে ‘ফায়’ দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি(১); বরং আল্লাহ যার উপর ইচ্ছে তাঁর রাসূলগণকে কর্তৃত্ব দান করেন; আর আল্লাহ্ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
(১) আয়াতে বর্ণিত أفاء শব্দটি فيء থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ, প্রত্যাবর্তন করানো। যুদ্ধ ও জিহাদ ব্যতীত কাফেরদের কাছ থেকে অর্জিত সকল প্রকার ধন-সম্পদকেই “ফায়” বলা হত। (ইবন কাসীর) সে হিসেবে আলোচ্য আয়াতের সারমর্ম এই যে, যে ধনসম্পদ যুদ্ধ ও জিহাদ ব্যতিরেকে অর্জিত হয়েছে, তা মুজাহিদ ও যোদ্ধাদের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের আইনানুযায়ী বন্টন করা হবে না বরং তা পুরোপুরিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এখতিয়ারে থাকবে। তিনি যাকে যতটুকু ইচ্ছা! করবেন দেবেন, অথবা নিজের জন্যে রাখবেন। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “বনু নাদীর এর সম্পদ ছিল এমন সম্পদ যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের করায়ত্ব করে দিয়েছিলেন। যাতে মুসলিমদের কোন ঘোড়া বা উটের ব্যবহার লাগেনি। অর্থাৎ যুদ্ধ করতে হয়নি। সুতরাং তা ছিল বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পদ। তিনি এটা থেকে তার পরিবারের বাৎসরিক খোরাকির ব্যবস্থা করতেন। বাকী যা থাকত তা যোদ্ধাস্ত্র ও আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ হিসেবে থাকত। (বুখারী: ৪৮৮৫, মুসলিম: ১৭৫৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ তা’আলা ‘ফায়’ তাঁর রাসূলের হাতে দিয়ে দিয়েছেন। তারপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু (وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَىٰ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ) এ আয়াত পাঠ করে বললেন, এতে ‘ফায়’ বিশেষভাবে রাসূলকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তবে তোমাদেরকে বাদ দিয়ে তিনি নিজে সেটা নিয়ে নেননি। তোমাদের উপর নিজেকে প্রাধান্য দেননি। (বুখারী: ৩০৯৩)
(৬) আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে (বিনা যুদ্ধে) যে সম্পদ তাঁর রসূলকে দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়া ছুটাওনি এবং উটও নয়। কিন্তু আল্লাহ যার উপর ইচ্ছা তাঁর রসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করেন।(1) আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
(1) বানু-নায্বীরের এই এলাকা যা মুসলিমদের দখলে এসেছিল, তা মদীনা হতে তিন-চার মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিল। অর্থাৎ, মুসলিমদেরকে তার জন্য সুদীর্ঘ সফর করার প্রয়োজন হয়নি এবং এর জন্য মুসলিমদেরকে উট ও ঘোড়া দৌড়াতে হয়নি। অনুরূপ যুদ্ধ করারও প্রয়োজন পড়েনি। বরং সন্ধির মাধ্যমে এই এলাকা জয় হয়ে যায়। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর রসূল (সাঃ)-কে বিনা যুদ্ধেই তাদের উপর জয়যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর এই জন্য এখান থেকে প্রাপ্ত মালকে ‘মালে ফাই’ গণ্য করা হয়। এই মালের বিধান গনীমতের মালের বিধান থেকে আলাদা। অর্থাৎ, فَيْءٌ সেই মালকে বলা হয়, যা বিনা যুদ্ধে শত্রুপক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে যায় অথবা যা সন্ধির মাধ্যমে লাভ হয়। পক্ষান্তরে যে মাল দস্তরমত যুদ্ধ করে জয়যুক্ত হয়ে অর্জিত হয় তাকে ‘মালে গনীমত’ বলা হয়।