আ-মিনূবিল্লা-হি ওয়া রছূলিহী ওয়া আনফিকূমিম্মা-জা‘আলাকুম মুছতাখলাফীনা ফীহি ফাল্লাযীনা আ-মানূমিনকুম ওয়া আনফাকূলাহুম আজরুন কাবীর।উচ্চারণ
আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ৭ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং ব্যয় কর ৮ সে জিনিস যার প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা তিনি তোমাদের দিয়েছেন। ৯ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও অর্থ-সম্পদ খরচ করবে ১০ তাদের জন্য বড় প্রতিদান রয়েছে। তাফহীমুল কুরআন
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান রাখ এবং আল্লাহ যে সম্পদে তোমাদেরকে প্রতিনিধি করেছেন, তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং (আল্লাহর পথে) ব্যয় করেছে, তাদের জন্য আছে মহা প্রতিদান।মুফতী তাকী উসমানী
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও ব্যয় করে তাদের জন্য আছে মহা পুরস্কার।মুজিবুর রহমান
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তিনি তোমাদেরকে যার উত্তরাধিকারী করেছেন, তা থেকে ব্যয় কর। অতএব, তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও ব্যয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে মহাপুরস্কার।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ্ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও ব্যয় করে, তাদের জন্যে আছে মহাপুরস্কার। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং তিনি তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন, তা থেকে ব্যয় কর। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে তাদের জন্য রয়েছে বিরাট প্রতিফল।আল-বায়ান
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো, আর তিনি তোমাদেরকে যার উত্তরাধিকারী করেছেন তাত্থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর । কারণ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে আর ব্যয় করে, তাদের জন্য আছে বিরাট প্রতিফল।তাইসিরুল
আল্লাহ্র ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো, এবং খরচ করো তা থেকে যা দিয়ে তিনি এতে তোমাদের উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। সুতরাং তোমাদের মধ্যের যারা ঈমান আনে ও খরচ করে, তাদের জন্য রয়েছে এক বিরাট প্রতিদান।মাওলানা জহুরুল হক
৭
অমুসলিমদের সম্বোধন করে একথা বলা হয়নি। বরং পরবর্তী গোটা বক্তব্য থেকে একথাই প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে সেই সব মুসলমানদের সম্বোধন করা হয়েছে যারা ইসলামের বাণী স্বীকার করে ঈমান গ্রহণকারীদের সাথে শামিল হয়েছিলেন। কিন্তু ঈমানের দাবী পূরণ করা এবং মু’মিনের মত জীবন পদ্ধতি গ্রহণ করা থেকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। একথা সবারই জানা যে, অমুসলিমদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেয়ার সাথে সাথেই একথা বলা যায় না, যে আল্লাহর পথে জিহাদের খাতে উদার মনে সাহায্য করো। কিংবা তাদেরকে একথাও বলা না যে, তোমাদের মধ্যে যারা বিজয় লাভের পূর্বে জিহাদ ও আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করবে তাদের মর্যাদা যারা বিজয় লাভের পরে এসে কাজ করবে তাদের চেয়ে অনেক বেশী হবে। অমুসলিমদের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে তাদের সামনে ইসলামের প্রাথমিক দাবী পেশ করা হয়ে থাকে, চূড়ান্ত দাবী নয়। এ কারণে বক্তব্যের ধারা অনুসারে এখানে آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ বলার অর্থ হচ্ছে, যে সেই সব লোক, যারা ঈমানের দাবী করে মুসলমানদের দলে শামিল হয়েছো---আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সরল মনে সত্যিকার অর্থে মেনে নাও এবং এমন কর্মপন্থা গ্রহণ করো যা নিষ্ঠাবান মু’মিনদের করা উচিত।
৮
এখানে ব্যয় করার অর্থ সাধারণ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা নয়। বরং ১০ নম্বর আয়াতের ভাষা স্পষ্টভাবে বলছে যে, এখানে এর অর্থ ঐ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামকে সমুন্নত করার যে সংগ্রাম চলছিলো সে উদ্দেশ্যে ব্যয় করা। বিশেষ করে সে সময় এমন দু’টি প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল যেজন্য ইসলামী সরকার চরমভাবে আর্থিক সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিল। এর একটি ছিল সামরিক প্রয়োজন। আর অপরটি ছিল সেসব নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য সহযোগিতা করা যারা কাফেরদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আরবের প্রতিটি অংশ থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে এসেছিলো এবং আরো আসছিলো। এ ব্যয় মেটানোর জন্য সত্যিকার মু’মিনগণ তাঁদের শক্তি ও সামর্থের চেয়ে বেশী বোঝা নিজেরা বহন করেছিল। পরবর্তী ১০, ১২, ১৮ ও ১৯ আয়াতে এজন্য তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে বহুসংখ্যক এমন স্বচ্ছল লোকও ছিল যারা কুফর ও ইসলামের এ সংঘাতকে নিছক দর্শক হয়ে দেখছিলো। যে জিনিসের প্রতি ঈমান পোষণের দাবী তারা করছিলো তার কিছু কর্তব্য ও দায়-দায়িত্ব যে তাদের প্রাণ ও সম্পদের ওপর বর্তায়, সে বিষয়ে কোন অনুভূতিই তাদের ছিল না। এ দ্বিতীয় প্রকারের লোকদেরকেই এ আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে। তাদের বলা হচ্ছে, খাঁটি মু’মিন হও এবং আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় কর।
৯
এর দু’টি অর্থ এবং দু’টি অর্থই এখানে প্রযোজ্য। একটি অর্থ হচ্ছে, তোমাদের কাছে যে সম্পদ আছে তা মূলত তোমাদের নিজের সম্পদ নয়, তা আল্লাহর দেয়া সম্পদ। তোমরা নিজেরা এর মালিক নও। আল্লাহ তাঁর নিজের প্রতিনিধি হিসেবে এ সম্পদ তোমাদের অধিকারে দিয়েছেন। অতএব, সম্পদের মূল মালিকের কাজে তা ব্যয় করতে কুণ্ঠিত ও পিছপা হয়ো না। মালিকের সম্পদ মালিকের কাজে ব্যয় করতে টালবাহানা করা প্রতিনিধির কাজ নয়। দ্বিতীয় অর্থ হলো, এ অর্থ চিরদিন তোমাদের কাছে ছিল না এবং চিরদিন তোমাদের কাছে থাকবেও না। কাল তা অন্য কিছু লোকের কাছে ছিল, আজ আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করে তা তোমাদের হাতে সোপর্দ করেছেন। আবার এমন এক সময় আসবে যখন তা তোমাদের কাছে থাকবে না। অন্য লোকেরা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবে। সাময়িক কর্তৃত্বের এ সংক্ষিপ্ত সময়ে যখন এ সম্পদ তোমাদের অধিকার ও কর্তৃত্বে থাকে তখন আল্লাহর কাজে তা খরচ করো, যাতে আখেরাতে তোমরা তার স্থায়ী প্রতিদান লাভ করতে পার। একটি হাদীসে নবী ﷺ এ কথাটিই বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বর্ণনা করেছেনঃ একবার নবীর (সা.) বাড়ীতে একটি বকরী জবাই করে তার গোশত বণ্টন করা হলো। ঘরে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ বকরীর কি অবশিষ্ট আছে? হযরত আয়েশা বললেনঃ مَا بَقِىَ إِلاَّ كَتِفُهَا “একটি হাত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।” নবী (সা.) বললেনঃ بَقِىَ كُلُّهَا غَيْرَ كَتِفِهَا “একটি হাত ছাড়া গোটা বকরীই অবশিষ্ট আছে।” অর্থাৎ আল্লাহর পথে যা ব্যয়িত হলো প্রকৃতপক্ষে সেটাই অবশিষ্ট রইলো। আরো একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলোঃ হে আল্লাহর রসূল কোন্ প্রকার দানের সওয়াব সবচেয়ে বেশী? তিনি বললেনঃ
أَنْ تَصَدَّقَ وَأَنْتَ صَحِيحٌ شَحِيحٌ ، تَخْشَى الْفَقْرَ وَتَأْمُلُ الْغِنَى ، وَلاَ تُمْهِلُ حَتَّى إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ قُلْتَ لِفُلاَنٍ كَذَا ، وَلِفُلاَنٍ كَذَا ، وَقَدْ كَانَ لِفُلاَنٍ-
“যদি তুমি এমন পরিস্থিতিতে দান করো যে, তুমি সুস্থ সবল সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে তা বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন অনুভর করছো এবং তা কোন কাজে খাটিয়ে অধিক উপার্জনের আশা করো। সে সময়ের অপেক্ষায় থেকো না যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে আর তুমি ওসিয়ত করবে যে, এটা অমুককে দিতে হবে এবং এটা অমুককে দিতে হবে। সে সময় তো এ সম্পদ অমুক অমুকের কাছেই চলে যাবে।” (বুখারী ও মুসলিম)।
অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। নবী (সা.) বলেছেনঃ
يَقُولُ ابْنُ آدَمَ مَالِى مَالِى , وَهَلْ لَكَ مِنْ مَالِكَ إِلاَّ مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ أَوْ لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ ؟ وَمَا سِوَى ذَلِكَ فَذَاهِبٌ وَتَارِكُهُ لِلنَّاسِ-
“মানুষ বলে আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তোমার সম্পদের যতটা তুমি খেয়ে নিঃশেষ করলে কিংবা পরিধান করে পুরনো করে ফেললে অথবা দান করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করলে তা ছাড়া তোমার সম্পদে তোমার আর কোন অংশ নেই। এছাড়া আর যাই আছে একদিন তা তোমার হাত থেকে চলে যাবে আর তুমি অন্যদের জন্য তা রেখে যাবে।”-(মুসলিম)
১০
এখানে পুনরায় জিহাদে অর্থ সম্পদ ব্যয় করাকে ঈমানের অনিবার্য দাবী এবং আন্তরিকতাপূর্ণ ঈমানের আবশ্যিক প্রমাণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্য কথায় যেন বলা হয়েছে প্রকৃত ও নিষ্ঠাবান মু’মিন সে-ই, যে এরূপ পরিস্থিতিতে অর্থ ব্যয় করতে টালবাহানা করে না।
ধন-দৌলতে মানুষকে প্রতিনিধি বানানোর কথা বলে দু’টি মহা সত্যের দিকে ইশারা করা হয়েছে। (এক) ধন-দৌলত যা-ই হোক না কেন, তার প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলাই। তিনিই তা সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে তা দান করেছেন তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য। তাই মানুষ এর মালিকানায় আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। মানুষ যখন এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি তখন তার কর্তব্য আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও হুকুম মোতাবেক তা ব্যয় করা। (দুই) মানুষ যে সম্পদই অর্জন করে, তা তার আগে অন্য কারও মালিকানায় থাকে। সেখান থেকে ক্রয়, উপহার বা উত্তরাধিকার সূত্রে তা তার কাছে এসেছে। এ হিসেবে সে তাতে তার প্রাক্তন মালিকের স্থলাভিষিক্ত। এর দ্বারা বোঝানো হচ্ছে, এ সম্পদ যেমন তোমার পূর্ববর্তী মালিকের কাছে স্থায়ী হয়ে থাকেনি, বরং তার কাছ থেকে তোমার কাছে চলে এসেছে, তেমনি তোমার কাছেও তা চিরদিন থাকবে না; বরং অন্য কারও হাতে চলে যাবে। যখন এ সম্পদ চিরকাল তোমার কাছে থাকার নয়, অন্য কারও না কারও কাছে অবশ্যই চলে যাবে, তখন তোমার উচিত এমন কারও কাছেই তা হস্তান্তর করা, যাকে তা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা হুকুম করেছেন।
৭. তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
(৭) আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী(1) করেছেন তা হতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার।
(1) অর্থাৎ, এই ধন এর পূর্বে অন্য কারো নিকটে ছিল। এতে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ ধন তোমার নিকটেও থাকবে না। অপর কেউ এর উত্তরাধিকারী হবে। তোমরা যদি এ মালগুলো আল্লাহর পথে ব্যয় না কর, তবে পরে যারা এগুলোর মালিক হবে, তারা আল্লাহর পথে সেগুলো ব্যয় করে তোমাদের চাইতেও বেশী সৌভাগ্য লাভ করতে পারবে। আর তারা যদি এগুলোকে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে ব্যয় করে, তবে তোমরাও অসৎকার্যে সাহায্য করার অপরাধে ধরা খেতে পার। (ইবনে কাসীর) হাদীসে এসেছে যে, ‘‘মানুষ বলে আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল প্রথমতঃ সেটা, যেটা তুমি খেয়ে শেষ করেছ। দ্বিতীয়তঃ সেটা, যেটা তুমি পরিধান করে নষ্ট করেছ এবং তৃতীয়তঃ সেটা, যেটা তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করে পরকালের জন্য সঞ্চয় করেছ। এ ছাড়া যা কিছু থাকবে, তা সবই অন্যদের ভাগে আসবে।’’ (মুসলিমঃ যুহুদ অধ্যায়, মুসনাদ আহমাদ ৪/২৪)