ওয়ালা-তাহিনূওয়ালা-তাহঝানূওয়া আনতুমুল আ‘লাওনা ইন কুনতুম মু’মিনীন।উচ্চারণ
মনমরা হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো। তাফহীমুল কুরআন
(হে মুসলিমগণ!) তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিত হয়ো না। তোমরা প্রকৃত মুমিন হলে তোমরাই বিজয়ী হবে। #%৬০%#মুফতী তাকী উসমানী
আর তোমরা নিরাশ হয়োনা ও বিষন্ন হয়োনা এবং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তাহলে তোমরাই বিজয়ী হবে।মুজিবুর রহমান
আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিতও হয়ো না ; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মু’মিন হও। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাক।আল-বায়ান
তোমরা হীনবল ও দুঃখিত হয়ো না, বস্তুতঃ তোমরাই জয়ী থাকবে যদি তোমরা মু’মিন হও।তাইসিরুল
অতএব দুর্বলচিত্ত হয়ো না ও অনুশোচনা করো না, কারণ তোমরাই হবে উচ্চপদস্থ যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।মাওলানা জহুরুল হক
উহুদ যুদ্ধের ঘটনা সংক্ষেপে এ রকম প্রথম দিকে মুসলিমগণ হানাদার কাফিরদের উপর জয়লাভ করেছিল এবং কাফির বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পঞ্চাশ জন তীরন্দাজ সৈন্যের একটি দলকে একটি টিলায় নিযুক্ত করেছিলেন। যাতে শত্রু বাহিনী পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে না পারে। যখন শত্রুরা পলায়ন করতে শুরু করল এবং যুদ্ধ ক্ষেত্র শূন্য হয়ে গেল, তখন সাহাবীগণ তাদের ফেলে যাওয়া মালামাল গনীমতরূপে কুড়াতে শুরু করলেন। তীরন্দাজ বাহিনী যখন দেখলেন শত্রুরা পলায়ন করেছে তখন তারা মনে করলেন, এখন আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে এবং এখন আমাদেরও গনীমত কুড়ানোর কাজে লেগে যাওয়া উচিত। তাদের নেতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাযি.) এবং তাঁর আরও কিছু সঙ্গী ঘাঁটি ত্যাগ করার বিরোধিতা করলেন এবং সকলকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, তিনি আমাদেরকে সর্বাবস্থায় এ টিলায় অবস্থানরত থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই সে স্থলে অবস্থান করাকে অর্থহীন মনে করলেন এবং তারা ঘাঁটি ত্যাগ করলেন। শত্রুরা দূর থেকে যখন দেখল, সে জায়গা খালি হয়ে গেছে এবং মুসলিমগণ গনীমতের মালামাল কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তখন তারা সে সুযোগকে কাজে লাগাল এবং ক্ষিপ্রগতিতে সেই ঘাঁটিতে হামলা চালাল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাযি.) ও তাঁর সাথীগণ তাদের সাধ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ করতে থাকলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সকলেই শহীদ হয়ে গেলেন। অতঃপর শত্রুগণ সেই টিলা থেকে নেমে আসল এবং যে সকল মুসলিম গনীমত কুড়াচ্ছিল তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালাল। তাদের এ আক্রমণ এমনই অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ছিল যে, মুসলিমদের পক্ষে তা প্রতিহত করা সম্ভব হল না। মুহূর্তের মধ্যে রণ পরিস্থিতি পাল্টে গেল। ঠিক এই সময়ে কেউ গুজব রটিয়ে দিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদ হয়ে গেছেন। এ গুজবে বহু মুসলিমের মনোবল ভেঙ্গে পড়ল। তাদের মধ্যে কতক তো ময়দান ত্যাগ করলেন এবং কতক যুদ্ধ ছেড়ে দিয়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিন্তু যে সকল উৎসর্গিতপ্রাণ সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন, তাঁর চারপাশে অবিচল থেকে মুকাবিলা করতে থাকলেন। কাফিরদের আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে, এক পর্যায়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র দাঁত শহীদ হয়ে গেল এবং মুবারক চেহারা রক্ত-রঞ্জিত হয়ে গেল। একটু পরেই অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম বুঝতে পারলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শহীদ হওয়ার খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব। তখন তাদের হুঁশ ফিরে আসল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাদের অধিকাংশ ময়দানে ফিরে আসলেন। অতঃপর কাফিরদেরকে আবারও পলায়ন করতে হল। কিন্তু মধ্যবর্তী এই সময়ের ভেতর সত্তরজন সাহাবী শাহাদত বরণ করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ঘটনায় সাবাহীবগণ ভীষণভাবে মর্মাহত হয়ে পড়েছিলেন। তাই কুরআন মাজীদের এ আয়াতসমূহ তাদেরকে সান্তনা দিচ্ছে যে, এটা কেবল কালের চড়াই-উতরাই। এতে হতাশ ও হতোদ্যম হওয়া উচিত নয়। সেই সঙ্গে আয়াতসমূহ এদিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে যে, সাময়িক এ পরাজয় ছিল তাদের কিছু ভুলেরই খেসারত। এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১৩৯. তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিতও হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও।(১)
(১) আলোচ্য আয়াতে মুসলিমদের হতাশ না হতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কতিপয় ক্রটি-বিচ্যুতির কারণে ওহুদের যুদ্ধে প্রথম পর্যায়ে জয়লাভ করার পর কিছুক্ষণের জন্য মুসলিমরা পরাজয় বরণ করে সত্তরজন সাহাবী শহীদ হন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহত হন। কিন্তু এ সবের পর আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন এবং শত্রুরা পিছু হটে যায়। এ সাময়িক বিপর্যয়ের কারণ ছিল তিনটি। (এক) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরন্দাজ বাহিনীর প্রতি যে নির্দেশ জারি করেছিলেন, পারস্পরিক মতভেদের কারণে তা শেষ পর্যন্ত পালিত হয়নি।
(দুই) খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মুসলিমদের মনে নৈরাশ্যের সৃষ্টি হয়। ফলে সবাই ভীত ও হতোদ্যম হয়ে পড়ে। (তিন) মদীনা শহরে অবস্থান গ্রহণ করে শক্ৰদের মোকাবেলা করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ পালনে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল, সেটাই ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুসলিমদের এ তিনটি বিচ্যুতির কারণেই তারা সাময়িক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
এ সাময়িক পরাজয় অবশেষে বিজয়ের রূপ ধারণ করেছিল সত্য; কিন্তু মুসলিম যোদ্ধারা আঘাতে জর্জরিত ছিলেন। মুসলিম বীরদের মৃতদেহছিল চোখের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও হতভাগারা আহত করে দিয়েছিলো। সর্বত্র ঘোর বিপদ ও নৈরাশ্য ছায়া বিস্তার করেছিল। মুসলিম মুজাহিদগণ স্বীয় ক্রটি-বিচ্যুতির জন্যেও বেদনায় মুষড়ে পড়েছিলেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল। (এক) অতীত ঘটনার জন্য দুঃখ ও বিষাদ। (দুই) আশঙ্কা যে, ভবিষ্যতের জন্য মুসলিমগণ যেন দুর্বল ও হতোদ্যম না হয়ে পড়ে এবং বিশ্ব-নেতৃত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ জাতি অঙ্কুরেই মনোবল হারিয়ে না ফেলে।
এ দুইটি ছিদ্রপথ বন্ধ করার জন্যে কুরআনের এ বাণীতে বলা হয় যে, ভবিষ্যতের জন্যে তোমরা দৌর্বল্য ও শৈথিল্যকে কাছে আসতে দিয়ো না এবং অতীতের জন্যেও বিমর্ষ হয়ো না। যদি তোমরা ঈমান ও বিশ্বাসের পথে সোজা হয়ে থাক এবং আল্লাহ্ তা'আলার ওয়াদার উপর ভরসা রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও আল্লাহর পথে জেহাদে অনড় থাক, তবে পরিশেষে তোমরাই জয়ী হবে। উদ্দেশ্য এই যে, অতীতে যে সব ক্রটি-বিচূতি হয়ে গেছে, তার জন্য দুঃখ ও শোক প্রকাশে সময় ও শক্তি নষ্ট না করে ভবিষ্যতে সংশোধনের চিন্তা করা দরকার। ঈমান, বিশ্বাস ও রাসূলের আনুগত্য উজ্জল ভবিষ্যতের দিশারী। এগুলো হাতছাড়া হতে দিয়ো না। পরিশেষে তোমরাই জয়ী হবে।
(১৩৯) আর তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। (1)
(1) বিগত যুদ্ধে তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য দমে যেও না এবং দুঃখও করো না। কেননা, তোমাদের মধ্যে যদি ঈমানী শক্তি বিদ্যমান থাকে, তাহলে তোমরাই হবে বিজয়ী এবং তোমরাই লাভ করবে সফলতা। এখানে মহান আল্লাহ মুসলিমদের শক্তির প্রকৃত উৎস এবং তাঁদের সফলতার মূল ভিত্তি কোথায়, সে কথা পরিষ্কার করে দিলেন। তাই তো এর পর যত যুদ্ধ হয়েছে, সেই সমূহ যুদ্ধে মুসলিমরা জয়লাভ করেছেন।