وَمَا تَفَرَّقُوٓاْ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ ٱلۡعِلۡمُ بَغۡيَۢا بَيۡنَهُمۡۚ وَلَوۡلَا كَلِمَةٞ سَبَقَتۡ مِن رَّبِّكَ إِلَىٰٓ أَجَلٖ مُّسَمّٗى لَّقُضِيَ بَيۡنَهُمۡۚ وَإِنَّ ٱلَّذِينَ أُورِثُواْ ٱلۡكِتَٰبَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ لَفِي شَكّٖ مِّنۡهُ مُرِيبٖ

ওয়ামা-তাফাররকূইল্লা-মিম বা‘দি মা-জাআহুমুল ‘ইলমুবাগইয়াম বাইনাহুম ওয়া লাওলা-কালিমাতুন ছাবাকাত মির রব্বিকা ইলাআজালিম মুছাম্মাল লাকুদিয়া বাইনাহুম ওয়া ইন্নাল্লাযীনা ঊরিছুল কিতা-বা মিম বা‘দিহিম লাফী শাক্কিম মিনহু মুরীব।উচ্চারণ

মানুষের কাছে যখন জ্ঞান এসে গিয়েছিল তারপরই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দিয়েছে। ২২ আর তা হওয়ার কারণ তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিলো। ২৩ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হবে একথা যদি তোমার রব পূর্বেই ঘোষণা না করতেন তাহলে তাদের বিবাদের চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়া হতো। ২৪ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, পূর্ববর্তীদের পরে যাদের কিতাবের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তারা সে ব্যাপারে বড় অস্বস্তিকর সন্দেহের মধ্যে পড়ে আছে। ২৫ তাফহীমুল কুরআন

এবং মানুষ তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরই কেবল পারস্পরিক শত্রুতার কারণে (দীনের ভেতর) বিভেদ সৃষ্টি করেছে। তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যদি একটি কথা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পূর্বেই স্থিরীকৃত না থাকত, তবে তাদের বিষয়ে ফায়সালা হয়ে যেত। তাদের পর যাদেরকে কিতাবের ওয়ারিশ বানানো হয়েছে, তারা এ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে পড়ে আছে।মুফতী তাকী উসমানী

তাদের নিকট জ্ঞান আসার পর শুধুমাত্র পারস্পরিক বিদ্বেষ বশতঃ তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়। এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে তোমার রবের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদের বিষয়ে ফাইসালা হয়ে যেত। তাদের পর যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে তারা কুরআন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।মুজিবুর রহমান

তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরই তারা পারস্পরিক বিভেদের কারণে মতভেদ করেছে। যদি আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকত, তবে তাদের ফয়সালা হয়ে যেত। তাদের পর যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছে, তারা অস্বস্তিকর সন্দেহে পতিত রয়েছে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এদের নিকট জ্ঞান আসার পর কেবল পারস্পরিক বিদ্বেষবশত এরা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়। এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে এদের বিষয়ে ফয়সালা হয়ে যেত। এদের পর যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে তারা তো সেই সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তারা কেবল নিজদের মধ্যকার বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করেছে; একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে তোমার রবের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদের বিষয়ে ফয়সালা হয়ে যেত। আর তাদের পরে যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছিল, তারা সে সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।আল-বায়ান

মানুষের কাছে ইলম আসার পর (বিভিন্ন অংশে) বিভক্ত হয়ে গেল নিজেদের মধ্যে বাড়াবাড়ি করার কারণে। পূর্বেই যদি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ফয়সালা মূলতবী রাখার কথা ঘোষিত না হত, তাহলে তাদের মধ্যে (পূর্বেই) ফয়সালা করে দেয়া হত। আগেকার লোকেদের পরে যারা (তাওরাত ও ইঞ্জিল এ দু’) কিতাব উত্তরাধিকার সূত্রে পাপ্ত হয়েছে, তারা অস্বস্তিকর সন্দেহে পতিত হয়েছে।তাইসিরুল

আর তারা নিজেদের কাছে জ্ঞান আসার পরেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত না যদি-না নিজেদের মধ্যে ঈর্ষা-বিদ্বেষ থাকত। আর যদি তোমার প্রভুর কাছ থেকে একটি নির্ধারিত কাল পর্যন্ত একটি বাণী ইতিপূর্বে ধার্য হয়ে না থাকত তাহলে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে হেস্তনেস্ত হয়ে যেত। আর তাঁদের পরে যারা ধর্মগ্রন্থ উত্তরাধিকার করেছিল তারা তো এটি সন্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

২২

অর্থাৎ বিভেদের কারণ এ ছিল না যে, আল্লাহ‌ নবী-রসূল পাঠাননি এবং কিতাবও নাযিল করেননি, তাই সঠিক পথ না জানার কারণে মানুষ নিজেদের জন্য আলাদা আলাদা ধর্ম, চিন্তা, গোষ্ঠী ও জীবন আদর্শ আবিষ্কার করে নিয়েছে। বরং তাদের মধ্যে এই বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান আসার পর। তাই সেজন্য আল্লাহ‌ দায়ী নন, বরং সেই সব লোক নিজেরাই দায়ী যারা দ্বীনের সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধি-নিষেধ থেকে দূরে সরে গিয়ে নতুন নতুন ধর্ম ও পথ বানিয়ে নিয়েছে।

২৩

অর্থাৎ কোন প্রকার সদিচ্ছা এই মতভেদ সৃষ্টির চালিকা শক্তি ছিল না। এটা ছিল তোমাদের অভিনব ধারণা প্রকাশের আকাংখা। নিজের নাম ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা, পারস্পরিক জিদ ও একগুঁয়েমি, একে অপরকে পরাস্ত করার প্রচেষ্টা এবং সম্পদ ও মর্যাদা অর্জন প্রচেষ্টার ফল। ধূর্ত ও উচ্চাভিলাসী লোকগুলো দেখলো, আল্লাহর বান্দারা যদি সোজাসুজি আল্লাহর দ্বীন অনুসরণ করতে থাকে তাহলে একজনই মাত্র খোদা হবেন মানুষ যার সামনে মাথা নত করবে, একজন রসূল হবেন মানুষ নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে যাকে মেনে চলবে, একখানা কিতাব থাকবে যেখান থেকে মানুষ পথনিদের্শনা লাভ করবে এবং একটি পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট আকীদা-বিশ্বাস ও নির্ভেজাল বিধান থাকবে মানুষ যা অনুসরণ করতে থাকবে। এই ব্যবস্থায় তাদের নিজেদের জন্য কোন বিশেষ মর্যাদা থাকতে পারে না যে কারণে তাদের পৌরহিত্য চলবে, লোকজন তাদের পাশে ভিড় জমাবে তাদের সামনে মাথা নত করবে এবং পকেটও শূন্য করবে। এটাই সেই মূল কারণ যা নতুন নতুন আকীদা ও দর্শন, নতুন নতুন ইবাদত-পদ্ধতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং নতুন নতুন জীবনাদর্শ উদ্ভাবনের উৎসাহ যুগিয়েছে এবং আল্লাহর বান্দাদের একটি বড় অংশকে দ্বীনের সুস্পষ্ট রাজপথ থেকে সরিয়ে বিভিন্ন পথে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। তারপর এ বিক্ষিপ্ততা এসব দল-উপদলের পারস্পরিক বিতর্ক ও বিবাদ এবং ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কলহের কারণে চরম তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছে। এমনকি এ থেকে এমন রক্তপাতও ঘটেছে যেজন্য মানবেতিহাস রক্ত রঞ্জিত হয়ে চলেছে।

২৪

অর্থাৎ যারা গোমরাহী উদ্ভাবন করার এবং জেনে বুঝে তা অনুসরণ করার অপরাধে অপরাধী ছিল তাদেরকে দুনিয়াতেই আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হতো এবং শুধু সঠিক পথ অনুসরণকারীদের বাঁচিয়ে রাখা হতো যার মাধ্যমে কে ন্যায় ও সত্যের অনুসারী আর কে বাতিলের অনুসারী তা সুস্পষ্ট হয়ে যেতো। কিন্তু আল্লাহ‌ এই চূড়ান্ত ফায়সালা কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য মূলতবী করে রেখেছেন। কারণ, পৃথিবীতে এ ফায়সালা করে দেয়ার পর মানবজাতির পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যেতো।

২৫

অর্থাৎ প্রত্যেক নবী এবং তাঁর নিকট অনুসারীদের যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহর কিতাব পরবর্তী বংশধরদের কাছে পৌঁছলে তারা দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থার সাথে তা গ্রহণ করেনি, বরং তারা সে সম্পর্কে বড় সন্দেহ সংশয় এবং মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে। তাদের এ পরিস্থিতি শিকার হওয়ার অনেকগুলো কারণ ছিল। তাওরাত ও ইনজীলে ঐ সব পরিস্থিতি সম্পর্কে যেসব বিষয় বর্ণিত হয়েছে তা অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা অতি সহজেই সেই সব কারণ অনুধাবন করতে পারি। পূর্ববর্তী প্রজন্মের লোকেরা এ দু’টি গ্রন্থকে তার মূল অবস্থায় মূল রচনাশৈলী ও ভাষায় সংরক্ষিত করে পরবর্তী প্রজন্মের লোকদের কাছে পৌঁছায়নি। তার মধ্যে আল্লাহর বাণীর সাথে ব্যাখ্যা, ইতিহাস এবং জনশ্রুতিমূলক ঐতিহ্য ও ফিকাহবিদদের উদ্ভাবিত খুঁটিনাটি বিষয়সমূহের আকারে মানুষের কথাও মিশিয়ে একাকার করে দিয়েছে। এ দু’টি গ্রন্থের অনুবাদের এত অধিক মাত্রায় প্রচলন করেছে যে, মূল গ্রন্থ হারিয়ে গিয়েছে এবং কেবল তার অনুবাদই টিকে আছে। এর ঐতিহসিক প্রমাণসমূহকেও এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলেছে যে, এখন আর কেউই পুরো নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারে না তার কাছে যে কিতাব আছে পৃথিবীবাসী সেটিই হযরত মূসা বা হযরত ঈসার মাধ্যমে লাভ করেছিলো। তাছাড়া মাঝে মধ্যে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা ধর্ম, অধিবিদ্যা, দর্শন, আইন, পদার্থবিদ্যা, মনস্তত্ব এবং সমাজবিজ্ঞানের এমন সব আলোচনা করেছেন এবং চিন্তাদর্শ গড়ে তুলেছেন যার গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে মানুষের জন্য এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে যে, আঁকাবাঁকা এসব পথের মধ্যে ন্যায় ও সত্যের রাজপথ কোনটি। আল্লাহর কিতাব যেহেতু মূল ও নির্ভরযোগ্য অবস্থায় বর্তমান ছিল না তাই মানুষ নির্ভরযোগ্য এমন কোন প্রমাণের স্মরণাপন্ন হতেও পারতো না যা বাতিল থেকে হককে আলাদা করার ব্যাপারে তাদের সাহায্য করতে পারতো।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

অর্থাৎ পূর্ব থেকেই একথা স্থির রয়েছে যে, শাস্তি দিয়ে সকলকে এক সঙ্গে ধ্বংস করা হবে না; বরং অবকাশ দেওয়া হবে, যাতে কেউ চাইলে ঈমান আনতে পারে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৪. আর তাদের কাছে জ্ঞান আসার পর শুধুমাত্র পারস্পারিক বিদ্বেষবশত(১) তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়। আর এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে আপনার রবের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদের বিষয় ফয়সালা হয়ে যেত। আর তাদের পর নিশ্চয় তারা সে সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।

(১) এই মতভেদ সৃষ্টির চালিকা শক্তি ছিল নিজের নাম ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা, পারস্পরিক জিদ ও একগুয়েমি, একে অপরকে পরাস্ত করার প্রচেষ্টা এবং সম্পদ ও মর্যাদা অর্জন প্রচেষ্টার ফল। (কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৪) ওদের নিকট জ্ঞান আসার পরই পারস্পরিক বিদ্বেষবশতঃ ওরা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়।(1) এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অব্যাহতি সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের পূর্ব ঘোষণা না থাকলে ওদের বিষয়ে ফায়সালা হয়েই যেত।(2) ওদের পর যারা গ্রন্থের উত্তরাধিকারী হয়েছে, নিশ্চয় তারা এ (কুরআন) সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে। (3)

(1) অর্থাৎ, জ্ঞান অর্থাৎ হিদায়াত আসার এবং হুজ্জত কায়েম হওয়ার পর তারা মতবিরোধ ও অনৈক্যের পথ অবলম্বন করেছে। অথচ তখন মতবিরোধ করার কোনই বৈধতা অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু কেবল বিদ্বেষ, শত্রুতা এবং জিদ ও হিংসাবশতঃ তারা এ কাজ করেছে। এ থেকে কেউ কেউ ইয়াহুদী এবং কেউ কেউ মক্কার কুরাইশদেরকে বুঝিয়েছেন।

(2) অর্থাৎ, তাদের শাস্তি দানের ব্যাপারে বিলম্ব করার ফায়সালা যদি পূর্বে থেকেই হয়ে না থাকত, তবে সত্বর আযাব প্রেরণ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হত।

(3) এ থেকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে তাদের পূর্বেকার ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের পর তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী বানানো হয়। অথবা আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে; যাদের মাঝে আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করেন এবং তাদেরকে কুরআনের উত্তরাধিকারী বানান। প্রথম অর্থের দিক দিয়ে, الكتاب (গ্রন্থ) বলতে, তাওরাত ও ইঞ্জীল এবং দ্বিতীয় অর্থের দিক দিয়ে তা হবে, কুরআন।