রুদ্দূহা-‘আলাইইয়া ফাতাফিকা মাছহাম বিছছূকিওয়াল আ‘না-ক।উচ্চারণ
তখন (সে হুকুম দিল) তাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো তারপর তাদের পায়ের গোছায় ও ঘাড়ে হাত বুলাতে লাগলো। ৩৫ তাফহীমুল কুরআন
(অনন্তর সে বলল,) ওগুলোকে আমার কাছে ফিরিয়ে আন। অতঃপর সে (তাদের) পায়ের গোছা ও ঘাড়ে হাত বুলাতে লাগল। #%১৮%#মুফতী তাকী উসমানী
ওগুলোকে পুনরায় আমার সামনে নিয়ে এসো। অতঃপর সে ওগুলোর পা ও গলদেশ ছেদন করতে লাগল।মুজিবুর রহমান
এগুলোকে আমার কাছে ফিরিয়ে আন। অতঃপর সে তাদের পা ও গলদেশ ছেদন করতে শুরু করল।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
‘এইগুলিকে পুনরায় আমার সামনে আনয়ন কর।’ এরপর সে এদের পদ ও গলদেশ ছেদন করতে লাগল।ইসলামিক ফাউন্ডেশন
এগুলো আমার কাছে ফিরিয়ে আন। অতঃপর সে এগুলোকে পা ও গলদেশ দিয়ে যবেহ করা শুরু করল।*আল-বায়ান
(সে তার সন্ধ্যাকালীন ‘ইবাদাত সম্পন্ন করে (বলল) ওগুলোকে আমার কাছে আবার এনে হাজির কর। তখন সে তাদের পায়ে ও গলায় হাত বুলাতে লাগল।তাইসিরুল
"ওদের আমার কাছে নিয়ে এসো।" তখন তিনি পা ও ঘাড় মালিশ করতে লাগলেন।মাওলানা জহুরুল হক
৩৫
এ আয়াতগুলোর অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় তাফসীরকারগণের মধ্যে বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে।
একটি দল এগুলোর অর্থ বর্ণনা করে বলেনঃ হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম ঘোড়া দেখাশুনা ও তাদের দৌড় প্রতিযোগিতায় এতবেশী মশগুল হয়ে পড়েছিলেন যার ফলে আসরের নামাযের কথা ভুলে গিয়েছিলেন। অথবা কারো কারো কথা মেনে নিজের কোন বিশেষ ওযীফা পড়তে ভুলে গিয়েছিলেন। এ ওয়ীফাটি তিনি পাঠ করতেন আসর ও মাগরিবের নামাযের মাঝামাঝি সময়। কিন্তু সেদিন সূর্য ডুবে গিয়েছিল অথচ তিনি নামায পড়তে বা ওযীফা পাঠ করতে পারেনি। ফলে তিনি হুকুম দিলেনঃ ঘোড়াগুলো ফিরিয়ে আনো। আর সেগুলো ফিরে আসার পর হযরত সুলাইমান (আ) তরবারির আঘাতে সেগুলোকে হত্যা করতে বা অন্য কথায় আল্লাহর জন্য কুরবানী করতে লাগলেন। কারণ, সেগুলো তাঁকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছিল। এ ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে এ আয়াতগুলোর অনুবাদ এভাবে করা হয়েছেঃ “তখন সে বললো, আমি এ সম্পদের প্রতি আসক্তি এত বেশী পছন্দ করেছি যার ফলে আমার রবের স্মরণ (আসরের নামায বা বিশেষ ওযীফা) থেকে গাফেল হয়ে গেছি, এমনকি (সূর্য পশ্চিমাকাশের অন্তরালে) লুকিয়ে পড়েছে। (তখন সে হুকুম দিল) ফিরিয়ে আনো ঐ (ঘোড়া) গুলোকে। (আর যখন সেগুলো ফিরে এলো) তখন তাদের পায়ের গোছায় ও ঘাড়ে (তরবারির) হাত চালিয়ে দিল।” এ ব্যাখ্যাটি কোন কোন খ্যাতিমান তাফসীরকারের দেয়া হলেও এটি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য নয়। কারণ, এখানে তাফসীরকারকে নিজের পক্ষ থেকে তিনটি কথা বাড়াতে হয়, যেগুলোর কোন উৎস ও ভিত্তি নেই। প্রথমত তিনি ধরে নেন, হযরত সুলাইমানের আসরের নামায বা এ সময় তিনি যে একটি বিশেষ ওযীফা পড়তেন তেমন কোন ওযীফা এ কাজে মশগুল থাকার কারণে ছুটে গিয়েছিল। অথচ কুরআনের শব্দাবলী হচ্ছে কেবলমাত্রঃ
إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبَّ الْخَيْرِ عَنْ ذِكْرِ رَبِّي
এ শব্দগুলোর অনুবাদ তো এভাবেও করা যেতে পারে যে, “আমি এ সম্পদ এত বেশী পছন্দ করে ফেলেছি, যার ফলে আমার রবের স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে পড়েছি।” কিন্তু এর মধ্যে আসরের নামায বা কোন বিশেষ ওযীফার অর্থ গ্রহণ করার কোন প্রসঙ্গ বা পূর্বসূত্র নেই। দ্বিতীয়ত তারা এটাও ধরে নেন যে, সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। অথচ সেখানে সূর্যের কোন কথা বলা হয়নি। বরং حَتَّى تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ শব্দাবলী পড়ার পর মানুষের চিন্তা স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে পেছনের আয়াতে উল্লেখিত الصَّافِنَاتُ الْجِيَادُ এর দিকে। তৃতীয়ত, এটাও ধরে নেন যে, হযরত সুলাইমান ঘোড়াগুলোর পায়ের গোড়ায় ও ঘাড়ে খালি হাত বুলাননি বরং তলোয়ারসহ হাত বুলান। অথচ কুরআনে مَسْحًا بِالسيف শব্দ বলা হয়নি এবং এখানে এমন কোন প্রসঙ্গ বা পর্বসূত্রও নেই যার ভিত্তিতে হাত বুলানোকে তরবারিসহ হাত বুলানো অর্থে গ্রহণ করা যেতে পারে। কুরআনের ব্যাখ্যা করার এ পদ্ধতির সাথে আমি নীতিগতভাবে ভিন্নমত পোষণ করি। আমার মতে কুরআনের শব্দাবলীর বাইরে অন্য অর্থ গ্রহণ করা কেবলমাত্র চারটি অবস্থায়ই সঠিক হতে পারে। এক, কুরআনের বাক্যের মধ্যেই তার জন্য কোন পূর্বসূত্র বা প্রসঙ্গ থাকবে। দুই, কুরআনের অন্য কোন জায়গায় তার প্রতি কোন ইঙ্গিত থাকবে। তিন . কোন সহীহ হাদীসে এ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। অথবা চার, তার অন্য কোন নির্ভরযোগ্য উৎস থাকবে। যেমন ইতিহাসের বিষয় হলে ইতিহাসে এ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওযা যেতে হবে। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের বিষয় হলে নির্ভরযোগ্য তাত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে হবে। আর শরীয়াতের বিধানের বিষয় হলো ইসলামী ফিকহের উৎস এর ব্যাখ্যা পেশ করবে। যেখানে এর মধ্য থেকে কোন একটি বিষয়ও থাকবে না সেখানে নিছক নিজস্বভাবে একটি কিসসা রচনা করে কুরআনের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া আমার মতে সঠিক নয়।
একটি দল উপরোক্ত অনুবাদ ও ব্যাখ্যার সামান্য বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেন, حَتَّى تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ এবং رُبُّوهَا عَلىّ উভয়ের মধ্যে যে সর্বনাম রয়েছে সেটি হচ্ছে সূর্য। অর্থাৎ যখন আসরের নামায ছুটে গেলো এবং সূর্য অস্তমিত হলো তখন হযরত সুলাইমান (আ) বিশ্ব-জাহান পরিচালনায় নিযুক্ত কর্মকর্তাগণকে অর্থাৎ ফেরেশতাগণকে বললেন, সূর্যকে ফিরিয়ে আনো, যাতে আসরের সময় ফিরে আসে এবং আমি নামায পড়তে পারি। এর ফলে সূর্য ফিরে এলো এবং তিনি নামায পড়ে নিলেন। কিন্তু এ ব্যাখ্যাটি ওপরের ব্যাখ্যাটির চাইতেও আরো বেশী অগ্রহণযোগ্য। এজন্য নয় যে, আল্লাহ সূর্যকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম নন বরং এজন্য যে, আল্লাহ আদৌ এর কোন উল্লেখই করেননি। বরং হযরত সুলাইমানের জন্য যদি এত বড় মু’জিযার প্রকাশ ঘটতো তাহলে অবশ্যই তা উল্লেখযোগ্য হওয়া উচিত ছিল। এর আরো একটি কারণ এই যে, সূর্যের অস্তমিত হয়ে তারপর আবার ফিরে আসা এমন একটি অসাধারণ ঘটনা যে, যদি সত্যিই তা ঘটে থাকতো তাহলে দুনিয়ার ইতিহাসে তা কখনো অনুল্লেখিত থাকতো না। এ ব্যাখ্যার সপক্ষে তাঁরা কতিপয় হাদীস পেশ করেও একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, সূর্যের অস্তমিত হয়ে পুনর্বার ফিরে আসার ঘটনা মাত্র একবার ঘটেনি বরং কয়েকবার এ ঘটনা ঘটেছে। মি’রাজের ঘটনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। খন্দকের যুদ্ধের সময়ও নবী করীমের ﷺ জন্য তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। আর হযরত আলীর (রা) জন্যও ফিরিয়ে আনা হয় যখন নবী (সা) তাঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিলেন এবং তাঁর আসরের নামায কাযা হয়ে গিয়েছিল। নবী করীম ﷺ সূর্যকে ফিরিয়ে আনার দোয়া করেন এবং তা ফিরে আসে। কিন্তু যে ব্যাখ্যার সমর্থনে এ হাদীসগুলো বর্ণনা করা হয়েছে এগুলো থেকে তার সপক্ষে প্রমাণ পেশ করা তার চাইতেও দুর্বল। হযরত আলী সম্পর্কে যে হাদীস বর্ণনা করা হয়ে থাকে তার সকল বর্ণনা পরম্পরা ও বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে ইবনে তাইমিয়া একে বনোয়াট ও জাল হাদীস প্রমাণ করেছেন। ইমাম আহমাদ বলেন, এর কোন ভিত্তি নেই। ইবনে জাওযী বলেন, নিঃসন্দেহে এটি জাল হাদীস। খন্দকের যুদ্ধের সময় সূর্যকে ফিরিয়ে আনার হাদীসটিও অনেক মুহাদ্দিসের মতে যঈফ এবং অনেকের মতে বানোয়াট। অন্যদিকে মি’রাজের হাদীসের আসল ব্যাপারটি হচ্ছে, যখন নবী করীম ﷺ মক্কার কাফেরদের কাছে মি’রাজের রাতের অবস্থা বর্ণনা করছিলেন তখন কাফেররা তাঁর কাছে প্রমাণ চাইলো। তিনি বললেন, বাইতুল মাকদিসের পথে অমুক জায়গায় একটি কাফেলার দেখা পেয়েছিলাম এবং তাদের সাথে অমুক ঘটনা ঘটেছিল। কাফেররা জিজ্ঞেস করলো, সে কাফেলাটি কবে মক্কায় পৌঁছবে? তিনি জবাব দিলেন, অমুক দিন। যখন সেদিনটি এলো কুরাইশরা সারদিন কাফেলার অপেক্ষা করতে লাগলো, এমনকি সন্ধ্যা হয়ে গেলো। তখন নবী (সা.) দোয়া করলেন যেন সূর্য ততক্ষণ পর্যন্ত অস্তমিত না হয় যতক্ষণ কাফেলা না এসে যায়। কাজেই দেখা গেলো সূর্য ডুবার আগে তারা পৌঁছে গেছে। এ ঘটনাটিকে কোন কোন বর্ণনাকারী এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সেদিন দিনের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এবং এই বাড়তি সময় পর্যন্ত সূর্য দাঁড়িয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের হাদীস এত বড় অস্বাভাবিক ঘটনার প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে কি? যেমন আমি আগেই বলে এসেছি, সূর্যের ফিরে আসা বা ঘণ্টা খানিক আটকে থাকা কোন সাধারণ ঘটনা নয়।
এ ধরনের ঘটনা যদি সত্যিই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকতো তাহলে সারা দুনিয়ায় হৈ চৈ পড়ে যেতো। দু-চারটে খবরে ওয়াহিদের (যে হাদীসের বর্ণনাকারী কোন স্তরে মাত্র একজন) মধ্যে তার আলোচনা কেমন করে সীমাবদ্ধ থাকতো?
মুফাসসিরগণের তৃতীয় দলটি এ আয়াতগুলোর এমন অর্থ গ্রহণ করেন যা একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি এর শব্দগুলো পড়ে এ থেকে গ্রহণ করতে পারে। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী ঘটনা কেবলমাত্র এতটুকুঃ হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের সামনে যখন উন্নত ধরনের ভাল জাতের ঘোড়ার একটি পাল পেশ করা হলো তখন তিনি বললেন, অহংকার বা আত্মম্ভরিতা করার জন্য অথবা শুধুমাত্র আত্মস্বার্থের খাতিরে এ সম্পদ আমার কাছে প্রিয় নয়। বরং এসব জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণকে আমি আমার রবের কালেমা বুলন্দ করার জন্য পছন্দ করে থাকি। তারপর তিনি সে ঘোড়াগুলোর দৌড় করালেন এমনকি সেগুলো দৃষ্টি বাইরে চলে গেলো। এরপর তিনি সেগুলো ফেরত আনালেন। সেগুলো ফেরত আসার পর ইবনে আব্বাসের বক্তব্য অনুযায়ীঃ
جعل يمسح اعراف الخيل وعراقيبها حبالها
“তিনি তাদের পায়ের গোছায় ও ঘাড়ে আদর করে হাত বুলাতে লাগলেন” আমাদের মতে এ ব্যাখ্যাটিই সঠিক। কারণ কুরআন মজীদের শব্দাবলীর সাথে এটি পূর্ণ সামঞ্জস্য রাখে এবং অর্থকে পূর্ণতা দান করার জন্য এর মধ্যে এমন কোন কথা বাড়িয়ে বলতে হয় না যা কুরআনে নেই, কোন সহীহ হাদীসে নেই এবং বনী ইসরাঈলের ইতিহাসেও নেই।
এ প্রসঙ্গে একথাটিও সামনে থাকা উচিত যে, আল্লাহ হযরত সুলাইমানের পক্ষে এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেনঃ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ (নিজের রবের দিকে বেশী বেশী ফিরে আসা ব্যক্তিই হচ্ছে সর্বোত্তম বান্দা) এর প্রশংসা বাণী উচ্চারণ করার অব্যবহিত পরেই করেছেন।
এ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, আসলে একথা বলাই এখানে উদ্দেশ্য ছিল যে, দেখো, সে আমার কত ভাল বান্দা ছিল, বাদশাহীর সাজ সরঞ্জাম তার কাছে পছন্দনীয় ছিল দুনিয়ার খাতিরে নয় বরং আমার জন্য, নিজের পরাক্রান্ত অশ্ববাহিনী দেখে দুনিয়াদার ও বৈষয়িক ভোগ লালসায় মত্ত শাসনকর্তাদের মতো সে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেনি বরং সে সময়ও তার মনোজগতে ভেসে উঠেছে আমারই স্মৃতি।
জিহাদের জন্য যে উৎকৃষ্ট প্রজাতির ঘোড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেগুলো দ্বারা তাঁর রাজ-ক্ষমতার জৌলুসও প্রকাশ পাচ্ছিল, একদিন সেগুলো তাঁর সামনে পেশ করা হল। কিন্তু সেই জমকালো দৃশ্য দেখে যে তিনি আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গেলেন এমন নয়; বরং তিনি বললেন, আমি তো এগুলোকে ভালোবাসি আল্লাহরই জন্য। এজন্য নয় যে, এর দ্বারা আমার ক্ষমতার গৌরব প্রকাশ পাচ্ছে। এগুলো তো সংগ্রহই করা হয়েছে জিহাদের জন্য আর জিহাদ করা হয় আল্লাহ তাআলার ভালোবাসায়। অতঃপর ঘোড়াগুলো এগুতে এগুতে তাঁর চোখের আড়ালে চলে গেল। তিনি সেগুলোকে আবারও তার সামনে আনতে বললেন। এবার তিনি সেগুলোর পায়ের গোছা ও গর্দানে আদর বুলিয়ে দিলেন। কুরআন মাজীদ এ ঘটনাটি উল্লেখ করে মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছে যে, দুনিয়ার ধন-দৌলত অর্জিত হলে সেজন্য আল্লাহর শোকর আদায় করা উচিত। এমন যেন না হয় যে, তার মোহ ব্যক্তিকে গর্বিত করে তুলল এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দিল; বরং বিনয়ের সাথে তাকে এমন কাজেই ব্যবহার করা চাই, যা হবে আল্লাহ তাআলার আদেশ মোতাবেক। আয়াতের উপরিউক্ত তাফসীর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে এবং এটা আয়াতের শব্দাবলীরও বেশি কাছাকাছি। ইবনে জারির (রহ.) ইমাম রাযী (রহ.) প্রমুখ এ তাফসীরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। মুফাসসিরদের একটি বড় দল আয়াতের আরও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং সে ব্যাখ্যাই বেশি প্রসিদ্ধ। তার সারমর্ম নিম্নরূপ ঘোড়াগুলি দেখতে দেখতে তাঁর নামায কাযা হয়ে গিয়েছিল, যে কারণে তাঁর খুব আফসোস হল। তিনি বলে উঠলেন, দেখা যাচ্ছে, এই অর্থ-সম্পদের মহব্বত আমাকে আল্লাহ তাআলার মহব্বত থেকে গাফেল করে দিয়েছে। কাজেই তিনি ঘোড়াগুলিকে আবার তাঁর সামনে আনতে বললেন। এবার তিনি সেগুলো কুরবানী করে দিতে মনস্থ করলেন এবং সে উদ্দেশ্যে তরবারি দ্বারা তাদের পায়ের গোছা ও গর্দান কাটা রে দিলেন। এ তাফসীর অনুযায়ী আয়াতের তরজমা করতে হবে এ রকম, ‘যখন তার সামনে উৎকৃষ্ট প্রজাতির ভালো-ভালো ঘোড়া পেশ করা হল, তখন তিনি বললেন, এই ধন-দৌলতের ভালোবাসা আমাকে আল্লাহর মহব্বত থেকে গাফেল করে দিয়েছে। পরিশেষে ঘোড়াগুলি যখন তার চোখের আড়ালে চলে গেল, তখন তিনি বললেন, সেগুলো ফিরিয়ে আন। তারপর তিনি সেগুলোর পায়ের গোছা ও গর্দানে (তরবারি দ্বারা) হাত চালাতে লাগলেন’।
৩৩. এগুলোকে আমার কাছে ফিরিয়ে আন। তারপর তিনি ওগুলোর পা এবং গলা ছেদন করতে লাগলেন।(১)
(১) আলোচ্য ৩০–৩৩ নং আয়াতসমূহে সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার প্রসিদ্ধ বিবরণের সারমর্ম এই যে, সুলাইমান আলাইহিস সালাম অশ্বরাজি পরিদর্শনে এমনভাবে মগ্ন হয়ে পড়েন যে, আসরের সালাত আদায়ের নিয়মিত সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তার প্রতিকার করেন। এখন প্রশ্ন হলো, কিভাবে তিনি সে প্রতিকার করেছিলেন? কুরআন বলছে, (فَطَفِقَ مَسْحًا بِالسُّوقِ وَالْأَعْنَاقِ) এর অর্থ বর্ণনায় বিভিন্ন মত রয়েছে,
এক. তিনি সমস্ত অশ্ব যবেহ করে দেন। কেননা, এগুলোর কারণেই আল্লাহর স্মরণ বিঘ্নিত হয়েছিল। এ সালাত নফল হলেও কোন আপত্তির কারণ নেই। কেননা, নবী-রাসূলগণ এতটুকু ক্ষতিও পুরণ করার চেষ্টা করে থাকেন। পক্ষান্তরে তা ফরয সালাত হলে ভুলে যাওয়ার কারণে তা কাযা হতে পারে। এতে কোন গোনাহ হয় না। কিন্তু সুলাইমান আলাইহিস সালাম তার উচ্চ মর্যাদার পরিপ্রেক্ষিতে এরও প্ৰতিকার করেছেন। এ তাফসীরটি কয়েকজন তাফসীরবিদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। হাফেয ইবন কাসীরের ন্যায় অনুসন্ধানী আলেমও এই তাফসীরকে অগ্ৰাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু এতে সন্দেহ হয় যে, অশ্বরাজি আল্লাহ প্রদত্ত একটি পুরস্কার ছিল। নিজের সম্পদকে এভাবে বিনষ্ট করা একজন নবীর পক্ষে শোভা পায় না। কোন কোন তাফসীরবিদ এর জওয়াবে বলেন যে, এ অশ্বরাজি সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছিল। তার শরীআতে গরু, ছাগল ও উটের ন্যায় অশ্ব কোরবানী করাও বৈধ ছিল। তাই তিনি অশ্বরাজি বিনষ্ট করেননি; বরং আল্লাহর নামে কোরবানী করেছেন।
দুই. আলোচ্য আয়াতের আরও একটি তাফসীর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে। তাতে ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে বর্ণনা করা হয়েছে। এই তফসীরের সারমর্ম এই যে, সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর সামনে জেহাদের জন্যে তৈরি অশ্বরাজি পরিদর্শনের নিমিত্তে পেশ করা হলে সেগুলো দেখে তিনি খুব আনন্দিত হন। সাথে সাথে তিনি বললেনঃ এই অশ্বরাজির প্রতি আমার যে মহব্বত ও মনের টান, তা পার্থিব মহব্বতের কারণে নয়; বরং আমার পালকর্তার স্মরণের কারণেই। কারণ, এগুলো জেহাদের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। জেহাদ একটি উচ্চস্তরের ইবাদত। ইতিমধ্যে অশ্বরাজির দল তার দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে গেল। তিনি আদেশ দিলেনঃ এগুলোকে আবার আমার সামনে উপস্থিত কর। সে মতে পুনরায় উপস্থিত করা হলে তিনি অশ্বরাজির গলদেশে ও পায়ে আদর করে হাত বুলালেন। প্রাচীন তাফসীরবিদগণের মধ্যে হাফেয ইবনে জরীর, তাবারী, ইমাম রাযী প্রমুখ এ তাফসীরকেই অগ্ৰাধিকার দিয়েছেন। কেননা, এই তাফসীর অনুযায়ী সম্পদ নষ্ট করার সন্দেহ হয় না। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যে উভয় তাফসীরের অবকাশ আছে।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহর স্মরণে শৈথিল্য হলে নিজের উপর শাস্তি নির্ধারণ করা ধর্মীয় মর্যাদাবোধের দাবী। কোন সময় আল্লাহর স্মরণে শৈথিল্য হয়ে গেলে নিজেকে শাস্তি দেয়ার জন্যে কোন মুবাহ (অনুমোদিত) কাজ থেকে বঞ্চিত করে দেয়া জায়েয। কোন সৎকাজের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্যে নিজের উপর এ ধরনের শাস্তি নির্ধারণ করা আত্মশুদ্ধির একটি ব্যবস্থা। এ ঘটনা থেকে এর বৈধতা বরং পছন্দনীয়তা জানা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার আবু জাহম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাকে একটি শামী চাদর উপহার দেন। চাদরটি ছিল কারুকার্যখচিত। তিনি চাদর পরিধান করে সালাত পড়লেন এবং ফিরে এসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, চাদরটি আবু জাহামের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দাও। কেননা, সালাতে আমার দৃষ্টি এর কারুকার্যের উপর পড়ে গিয়েছিল এবং আমার মনোনিবেশে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ৷ (বুখারী: ৩৭৩, মুসলীম: ১৭৬) হাদীসে আরও এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “তুমি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করতে গিয়ে যা-ই ত্যাগ করবে আল্লাহ তার থেকে উত্তম বস্তু তোমাকে দিবে।” (মুসনাদে আহমাদ: ৫/৭৮, ৭৯, ৩৬৩) (দেখুন: কুরতুবী)
(৩৩) এইগুলিকে পুনরায় আমার সম্মুখে আনো।’ অতঃপর সে ওগুলির পা ও গর্দান ছেদন করতে লাগল। (1)
(1) এই অনুবাদের পরিপ্রেক্ষিতে أَحْبَبْتُ (ভালোবেসে ফেলেছি) এর অর্থ آثَرْتُ (প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছি) আর عَنْ এখানে عَلى এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। (এর দ্বিতীয় অনুবাদ হলঃ আমি তো আমার প্রতিপালকের স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে সম্পদ-প্রীতিতে মগ্ন হয়ে পড়েছি।) আর تَوَارَتْ এর স্ত্রীলিঙ্গ কর্তৃকারক হল شَمْسٌ (সূর্য), যা আয়াতে পূর্বে উল্লিখিত হয়নি; কিন্তু বাগধারায় তা অনুমেয়। এই তফসীরের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব আয়াতের (مَسْحًا بِالسُّوْقِ وَالْاَعْنَاقِ) এর অর্থও হবে যবেহ করা অর্থাৎ উদ্দেশ্য مَسْحًا بِالسَّيْفِ ।
সারমর্ম এই যে, অশ্বরাজি পরিদর্শন করতে গিয়ে সুলাইমান (আঃ) আসর নামাযের সময় অতিবাহিত করে ফেলেন অথবা তখন তিনি যে অযীফা করতেন তা ছুটে যায়। যার জন্য তিনি অনুতপ্ত হলেন এবং বলতে লাগলেন যে, আমি অশ্বরাজির মহব্বতে এমন মগ্ন হয়ে গেছি যে, সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল এবং আমি আল্লাহর স্মরণ, নামায বা অযীফা থেকে অমনোযোগী হয়ে থেকে গেলাম। সুতরাং তার প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তিনি সমস্ত অশ্বরাজি আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করে দিয়েছিলেন। ইমাম শাওকানী ও ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত তফসীরকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কোন কোন তফসীরবিদ এর আলাদা তফসীর করেছেন। তাঁদের তফসীর অনুযায়ী عَنْ أَجَلٌ এর অর্থে ব্যবহূত হয়েছে। ِأي: لأَجَلِ ذِكْرِ رَبِّيْ অর্থাৎ আমার পালনকর্তার স্মরণের উদ্দেশ্যেই আমি এই অশ্বরাজির প্রতি মহব্বত রাখি। কারণ তার দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ হয়। অতঃপর তিনি অশ্বরাজিকে দৌড়ালেন। সুতরাং তারা তাঁর দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে গেল। তিনি এগুলোকে পুনরায় সামনে উপস্থিত করার আদেশ দিলেন। তাঁর নিকট পুনরায় উপস্থিত করা হলে তিনি মহব্বতের সাথে তাদের গর্দানে ও পায়ে হাত বুলাতে লাগলেন। خَيْرٌ শব্দটি কুরআনে সম্পদের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখানে এই শব্দটি অশ্বরাজির অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। تَوَارَتْ শব্দের কর্তৃকারক অশ্বরাজি বলা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী (রঃ) এই দ্বিতীয় তফসীরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং এই তফসীরই বিভিন্ন দিক দিয়ে সহীহ মনে হচ্ছে। আর আল্লাহই ভালো জানেন।