إِنَّا عَرَضۡنَا ٱلۡأَمَانَةَ عَلَى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَٱلۡجِبَالِ فَأَبَيۡنَ أَن يَحۡمِلۡنَهَا وَأَشۡفَقۡنَ مِنۡهَا وَحَمَلَهَا ٱلۡإِنسَٰنُۖ إِنَّهُۥ كَانَ ظَلُومٗا جَهُولٗا

ইন্না-‘আরদনাল আমা-নাতা ‘আলাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিওয়াল জিবা-লি ফাআবাইনা আইঁ ইয়াহমিলনাহা-ওয়া আশফাকনা মিনহা-ওয়া হামালাহাল ইনছা-নু ইন্নাহূক-না জালূমান জাহূলা-।উচ্চারণ

আমি এ আমানতকে আকাশসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতরাজির ওপর পেশ করি, তারা একে বহন করতে রাজি হয়নি এবং তা থেকে ভীত হয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ একে বহন করেছে, নিঃসন্দেহে সে বড় জালেম ও অজ্ঞ। ১২০ তাফহীমুল কুরআন

আমি আমানত পেশ করেছিলাম আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল ও তাতে শঙ্কিত হল আর তা বহন করে নিল মানুষ। #%৫৫%# বস্তুত সে ঘোর জালেম, ঘোর অজ্ঞ। #%৫৬%#মুফতী তাকী উসমানী

আমিতো আসমান, যমীন ও পবর্তমালার প্রতি এই আমানত অর্পণ করেছিলাম, তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং ওতে শংকিত হল, কিন্তু মানুষ ওটা বহন করল; সেতো অতিশয় যালিম, অতিশয় অজ্ঞ।মুজিবুর রহমান

আমি আকাশ পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হল; কিন্তু মানুষ তা বহণ করল। নিশ্চয় সে জালেম-অজ্ঞ।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছিলাম, এরা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে শংকিত হল, কিন্তু মানুষ তা বহন করল ; সে তো অতিশয় জালিম, অতিশয় অজ্ঞ। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

নিশ্চয় আমি আসমানসমূহ, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত পেশ করেছি, অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছে এবং এতে ভীত হয়েছে। আর মানুষ তা বহন করেছে। নিশ্চয় সে ছিল অতিশয় যালিম, একান্তই অজ্ঞ।আল-বায়ান

আমি আসমান, যমীন ও পর্বতের প্রতি (ইসলামের বোঝা বহন করার) আমানাত পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানাল, তারা তাতে আশংকিত হল, কিন্তু মানুষ সে দায়িত্ব নিল। সে বড়ই অন্যায়কারী, বড়ই অজ্ঞ।তাইসিরুল

নিঃসন্দেহ আমরা আমানত অর্পণ করেছিলাম মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ও পর্বতমালার উপরে, কাজেই তারা এটি অমান্য করতে অস্বীকার করেছিল এবং এতে ভয় করছিল, কিন্তু মানুষ এটিকে অস্বীকার করছে। নিঃসন্দেহে সে হচ্ছে অত্যন্ত অন্যায়াচারী, বড়ই অজ্ঞ, --মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১২০

বক্তব্য শেষ করতে গিয়ে আল্লাহ‌ মানুষকে এ চেতনা দান করতে চান যে, দুনিয়ায় সে কোন্ ধরনের মর্যাদার অধিকারী এবং এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থেকে যদি সে দুনিয়ার জীবনকে নিছক একটি খেলা মনে করে নিশ্চিন্তে ভুল নীতি অবলম্বন করে, তাহলে কিভাবে স্বহস্তে নিজের ভবিষ্যত নষ্ট করে।

এ স্থানে “আমানত” অর্থ সেই “খিলাফতই” যা কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে মানুষকে দুনিয়ায় দান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ‌ মানুষকে আনুগত্য ও অবাধ্যতার যে স্বাধীনতা দান করেছেন এবং এ স্বাধীনতা ব্যবহার করার জন্য তাকে অসংখ্য সৃষ্টির ওপর যে কর্তৃত্ব ক্ষমতা দিয়েছেন। তার অনিবার্য ফল স্বরূপ মানুষ নিজেই নিজের স্বেচ্ছাকৃত কাজের জন্য দায়ী গণ্য হবে এবং নিজের সঠিক কর্মধারার বিনিময়ে পুরস্কার এবং অন্যায় কাজের বিনিময়ে শাস্তির অধিকারী হবে। এসব ক্ষমতা যেহেতু মানুষ নিজেই অর্জন করেনি বরং আল্লাহ‌ তাকে দিয়েছেন এবং এগুলোর সঠিক ও অন্যায় ব্যবহারের দরুন তাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে, তাই কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে এগুলোকে খিলাফত শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এখানে এগুলোর জন্য আমানত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

এ আমানত কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্বল সে ধারণা দেবার জন্য আল্লাহ‌ বলেন, আকাশ ও পৃথিবী তাদের সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব এবং পাহাড় তার বিশাল ও বিপুলায়তন দেহাবয়ব ও গম্ভীরতা সত্ত্বেও তা বহন করার শক্তি ও হিম্মত রাখতো না কিন্তু দূর্বল দেহাবয়বের অধিকারী মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতম প্রাণের ওপর এ ভারী বোঝা উঠিয়ে নিয়েছে।

পৃথিবী ও আকাশের সামনে আমানতের বোঝা পেশ করা এবং তাদের তা উঠাতে অস্বীকার করা এবং ভীত হওয়ার ব্যাপারটি হতে পারে শাব্দিক অর্থেই সংঘটিত হয়েছে। আবার এও হতে পারে যে, একথাটি রূপকের ভাষায় বলা হয়েছে। নিজের সৃষ্টির সাথে আল্লাহর যে সম্পর্ক রয়েছে তা আমরা জানতেও পারি না এবং বুঝতেও পারি না। পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য ও পাহাড় যেভাবে আমাদের কাছে বোবা, কালা ও প্রাণহীন, আল্লাহর কাছেও যে তারা ঠিক তেমনি হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আল্লাহ‌ নিজের প্রত্যেক সৃষ্টির সাথে কথা বলতে পারেন এবং সে তার জবাব দিতে পারে। এর প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করার ক্ষমতা আমাদের বুদ্ধি ও বোশক্তির নেই। তাই এটা পুরোপুরিই সম্ভব যে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ‌ নিজেই এ বিরাট বোঝা তাদের সামনে পেশ করে থাকবেন এবং তারা তা দেখে কেঁপে উঠে থাকবে আর তারা তাদের প্রভু ও স্রষ্টার কাছে এ নিবেদন পেশ করে থাকবে যে, আমরা তো আপনারই ক্ষমতাহীন সেবক হয়ে থাকার মধ্যেই নিজেদের মঙ্গল দেখতে পাই। নাফরমানী করার স্বাধীনতা নিয়ে তার হক আদায় করা এবং হক আদায় না করতে পারলে তার শাস্তি বরদাশত করার সাহস আমাদের নেই। অনুরূপভাবে এটাও সম্ভব, আমাদের বর্তমান জীবনের পূর্বে আল্লাহ‌ সমগ্র মানবজাতিকে অন্য কোন ধরনের একটি অস্তিত্ব দান করে নিজের সামনে হাজির করে থাকবেন এবং তারা নিজেরাই এ দায়িত্ব বহন করার আগ্রহ প্রকাশ করে থাকবেন। একথাকে অসম্ভব গণ্য করার জন্য কোন যুক্তি আমাদের কাছে নেই। একে সম্ভাবনার গণ্ডীর বাইরে রাখার ফায়সালা সেই ব্যক্তিই করতে পারে যে নিজের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে।

তবে এ বিষয়টাও সমান সম্ভবপর যে, নিছক রূপকের আকারে আল্লাহ‌ এ বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন এবং অবস্থার অস্বাভাবিক গুরুত্বের ধারণা দেবার জন্য এমনভাবে তার নকশা পেশ করা হয়েছে যেন একদিকে পৃথিবী ও আকাশ এবং হিমালয়ের মতো গগণচুম্বী পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে ৫/৬ ফুট লম্বা একজন মানুষ। আল্লাহ‌ জিজ্ঞেস করছেনঃ

“আমি আমার সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্যে কোন একজনকে এমন শক্তি দান করতে চাই যার ফলে আমার সার্বভৌম কর্তৃত্বের মধ্যে অবস্থান করে সে নিজেই স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে আমার প্রাধান্যের স্বীকৃতি এবং আমার হুকুমের আনুগত্য করতে চাইলে করবে অন্যথায় সে আমাকে অস্কীকার করতেও পারবে আর আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা নিয়েও উঠতে পারবে। এ স্বাধীনতা দিয়ে আমি তার কাছ থেকে এমনভাবে আত্মগোপন করে থাকবো যেন আমি কোথাও নেই। এ স্বাধীনতাকে কার্যকর করার জন্য আমি তাকে ব্যাপক ক্ষমতা দান করবো, বিপুল যোগ্যতার অধিকারী করবো এবং নিজের অসংখ্য সৃষ্টির ওপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করবো। এর ফলে বিশ্ব-জাহানে সে যা কিছু ভাঙা-গড়া করতে চায় করতে পারবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমি তার কাজের হিসেব নেবো। যে আমার প্রদত্ত স্বাধীনতাকে ভুল পথে ব্যবহার করবে তাকে এমন শাস্তি দেবো যা কখনো আমার কোন সৃষ্টিকে আমি দেইনি। আর যে নাফরমানীর সমস্ত সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমার আনুগত্যের পথই অবলম্বন করে থাকবে তাকে এমন উচ্চ মর্যাদা দান করবো যা আমার কোন সৃষ্টি লাভ করেনি। এখন বলো তোমাদের মধ্য থেকে কে এ পরীক্ষাগৃহে প্রবেশ করতে প্রস্তুত আছে?

এ ভাষণ শুনে প্রথমে তো বিশ্ব-জগত নিরব নিথর দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একের পর এক এগিয়ে আসে। সকল প্রকাণ্ড অবয়ব ও শক্তির অধিকারী সৃষ্টি এবং তারা হাঁটু গেড়ে বসে কান্নাজড়িত স্বরে সানুনয় নিবেদন করে যেতে থাকে তাদেরকে যেন এ কঠিন পরীক্ষা থেকে মুক্ত রাখা হয়। সবশেষে এ একমুঠো মাটির তৈরি মানুষ ওঠে। সে বলে, হে আমার পওয়ারদিগার! আমি এ পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত। এ পরীক্ষায় সফলকাম হয়ে তোমার সালতানাতের সবচেয়ে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হবার যে আশা আছে সে কারণে আমি এ স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারের মধ্যে যেসব আশঙ্কা ও বিপদাপদ রয়েছে সেগুলো অতিক্রম করে যাবো।

নিজের কল্পনাদৃষ্টির সামনে এ চিত্র তুলে ধরেই মানুষ এই বিশ্ব-জাহানে কেমন নাজুক স্থানে অবস্থান করছে তা ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারে। এখন এ পরীক্ষাগৃহে যে ব্যক্তি নিশ্চিন্তে বসে থাকে এবং কতবড় দায়িত্বের বোঝা যে সে মাথায় তুলে নিয়েছে, আর দুনিয়ার জীবনে নিজের জন্য কোন নীতি নির্বাচন করার সময় যে ফায়সালা সে করে তার সঠিক বা ভুল হবার ফল কি দাঁড়ায় তার কোন অনুভূতিই যার থাকে না তাকেই আল্লাহ‌ এ আয়াতে জালেম ও অজ্ঞ বলে অভিহিত করছেন। সে অজ্ঞ, কারণ সেই বোকা নিজেই নিজেকে অদায়িত্বশীল মনে করে নিয়েছে। আবার সে জালেম, কারণ সে নিজেই নিজের ধ্বংসের ব্যবস্থা করছে এবং নাজানি নিজের সাথে সে আরো কতজনকে নিয়ে ডুবতে চায়।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এস্থলে আমানত অর্থ ‘নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার যিম্মাদারী গ্রহণ’। বিশ্বজগতে আল্লাহ তাআলার কিছু বিধান তো সৃষ্টিগত বা প্রাকৃতিক (তাকবীনী), যা মেনে চলতে সমস্ত সৃষ্টি বাধ্য; কারও পক্ষে তা অমান্য করা সম্ভবই নয়। যেমন জীবন ও মৃত্যু সংক্রান্ত ফায়সালা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চাইলেন এমন কিছু বিধান দিতে যা সৃষ্টি তার স্বাধীন ইচ্ছা বলে মান্য করবে। এজন্য তিনি তার কোন-কোন সৃষ্টির সামনে এই প্রস্তাবনা রাখলেন যে, কিছু বিধানের ব্যাপারে তাদেরকে এখতিয়ার দেওয়া হবে। চাইলে তারা নিজ ইচ্ছায় সেসব বিধান মেনে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করবে কিংবা চাইলে তা অমান্য করবে। মান্য করলে তারা জান্নাতের স্থায়ী নি‘আমত লাভ করবে আর যদি অমান্য করে তবে তাদেরকে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে। যখন এ প্রস্তাব আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে রাখা হল, তারা এ যিম্মাদারী গ্রহণ করতে ভয় পেয়ে গেল ফলে তারা এটা গ্রহণ করল না। ভয় পেল এ কারণে যে, এর পরিণতিতে জাহান্নামে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু যখন মানুষকে এ প্রস্তাব দেওয়া হল, তারা এটা গ্রহণ করে নিল। আসমান, যমীন ও পাহাড় আপাতদৃষ্টিতে যদিও এমন বস্তু, যাদের কোন বোধশক্তি নেই, কিন্তু কুরআন মাজীদের কয়েকটি আয়াত দ্বারা জানা যায়, তাদের মধ্যে এক পর্যায়ের বোধশক্তি আছে, যেমন সূরা বনী ইসরাঈলে (১৭ : ৪৪) গত হয়েছে। সুতরাং এসব সৃষ্টিকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সেটা যদি প্রতীকী অর্থে না হয়ে বাস্তব অর্থে হয় এবং তাদের অস্বীকৃতিও হয় একই অর্থে, তাতে আপত্তির কোন অবকাশ নেই। অবশ্য এটাও সম্ভব যে, আমানত গ্রহণের প্রস্তাব দান ও তাদের প্রত্যাখ্যান প্রতীকী অর্থে হয়েছিল। অর্থাৎ আমানত বহনের যোগ্যতা না থাকাকে প্রত্যাখ্যান শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সূরা আরাফের ১৭২ নং আয়াত (৭ : ১৭২) ও তার টীকা দেখে নেওয়া যেতে পারে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৭২. আমরা তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত(১) পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শংকিত হল, আর মানুষ তা বহন করল; সে অত্যন্ত যালিম, খুবই অজ্ঞ।(২)

(১) এখানে আমানত শব্দের তাফসীর প্রসঙ্গে সাহাবী ও তাবেয়ী প্রমুখ তাফসীরবিদগণের ধন-সম্পদের আমানত, অপবিত্রতার গোসল, সালাত, যাকাত, সওম, হাজ্জ ইত্যাদি। এ কারণেই অধিকাংশ তাফসীরবিদ বলেন যে, দ্বীনের যাবতীয় কর্তব্য ও কর্ম এই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তের যাবতীয় আদেশ নিষেধের সমষ্টিই আমানত। আমানতের উদ্দেশ্য হচ্ছে শরীয়তের বিধানাবলী দ্বারা আদিষ্ট হওয়া, যেগুলো পুরোপুরি পালন করলে জান্নাতের চিরস্থায়ী নেয়ামত এবং বিরোধিতা অথবা ত্রুটি করলে জাহান্নামের আযাব প্রতিশ্রুত। কেউ কেউ বলেনঃ আমানতের উদ্দেশ্য আল্লাহর বিধানাবলীর ভার বহনের যোগ্যতা ও প্রতিভা, যা বিশেষ স্তরের জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনার উপর নির্ভরশীল। উন্নতি এবং আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা এই বিশেষ যোগ্যতার উপর নির্ভরশীল।

মোটকথা, এখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও তাঁদের আদেশাবলী পালনকে “আমানত” শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এ আমানত কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও দুৰ্বহ সে ধারণা দেবার জন্য আল্লাহ বলেন, আকাশ ও পৃথিবী তাদের সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব এবং পাহাড় তার বিশাল ও বিপুলায়তন দেহাবয়ব ও গভীরতা সত্ত্বেও তা বহন করার শক্তি ও হিম্মত রাখতো না কিন্তু দুর্বল দেহাবয়বের অধিকারী মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতম প্রাণের ওপর এ ভারী বোঝা উঠিয়ে নিয়েছে। (দেখুন: ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর; কুরতুবী, বাগভী)

(২) ظلوم অর্থ নিজের প্রতি যুলুমকারী এবং جهول এর মর্মার্থ পরিণামের ব্যাপারে অজ্ঞ। (বাগভী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৭২) নিশ্চয়ই আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত অর্পণ করতে চেয়েছিলাম। ওরা ভয়ে বহন করতে অস্বীকার করল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। (1) নিশ্চয় সে অতিশয় যালেম ও অতিশয় অজ্ঞ। (2)

(1) পূর্বে মহান আল্লাহ আনুগত্যকারীদের প্রাপ্য নেকী এবং অবাধ্যদের শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন, এখন শরয়ী আদেশ ও তার কঠিনতার কথা বর্ণনা করছেন। আমানত বলতে ঐ সকল শরয়ী আদেশ; ফরয ও ওয়াজেব কর্মসমূহকে বুঝানো হয়েছে, যা পালন করলে নেকী ও সওয়াব লাভ হয় এবং তা হতে বৈমুখ হলে বা তা অস্বীকার করলে শাস্তি ভোগ করতে হবে। যখন এই শরীয়তের গুরুভার আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার উপর পেশ করা হল, তখন তারা এর যথাযথ হক আদায় করার ব্যাপারে ভীত হয়ে গেল। কিন্তু যখন মানুষের উপর তা পেশ করা হল, তখন তারা আল্লাহর আমানতের (আনুগত্যের) নেকী ও ফযীলত (প্রতিদান ও মাহাত্ম্য) দেখে সেই কঠিন গুরুভার বহন করতে উদ্বুদ্ধ হয়ে গেল। শরয়ী আহ্কামকে ‘আমানত’ বলে এই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তা আদায় করা মানুষের উপর ঐ রকম ওয়াজেব যেমন আমানত আদায় করা ওয়াজেব। ‘আমানত অর্পণ’ করার অর্থ কি? আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালা কিভাবেই বা তার প্রত্যুত্তর দিল এবং মানুষ তা কোন্ সময়ে গ্রহণ বা বহন করল? এ সবের পূর্ণ বিবরণ না আমরা জানতে পারি আর না বর্ণনা করতে পারি। আমাদেরকে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল সৃষ্টির মাঝে বিশেষ অনুভব ও বুঝার শক্তি রেখেছেন; যদিও আমরা তার প্রকৃতত্ব সম্বন্ধে অবগত নই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের কথা বুঝার ক্ষমতা রাখেন। তিনি অবশ্যই সেই আমানতকে (কোন একভাবে) তাদের উপর পেশ করেছিলেন, যা গ্রহণ করতে তারা অস্বীকার করেছে। অবশ্য তারা বিদ্রোহী বা অবাধ্য হয়ে তা অস্বীকার করেনি; বরং তাদের মাঝে এই ভয় ছিল যে, যদি আমরা উক্ত আমানতের দাবী পূর্ণ করতে (সে আমানত যথার্থরূপে রক্ষা করতে) অক্ষম হই, তাহলে তার কঠিন শাস্তি আমাদেরকে ভোগ করতে হবে। মানুষ যেহেতু ত্বরাপ্রবণ, তাই তারা শাস্তির দিকটা না ভেবে প্রতিদান ও পুরস্কার লাভের লোভে উক্ত আমানত কবুল করে নিল।

(2) অর্থাৎ, এই গুরুভার বহন করে নিজের উপর যুলুম করেছে এবং তার দাবী পূরণে বৈমুখ হয়ে অথবা তার মান ও মূল্য সম্বন্ধে উদাসীন থেকে অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।